বিশ্ব চলচ্চিত্রের বাজারে একসময় হলিউড কিংবা বলিউডের জয়জয়কার থাকলেও, বর্তমান সময়ে দর্শক রুচির এক বিশাল পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অ্যাকশন, ইমোশন, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি আর নিখুঁত ভিএফএক্সের মেলবন্ধনে বিশ্বজুড়ে এখন আলোড়ন সৃষ্টি করছে চীনা সিনেমা।
চীনের গ-ি পেরিয়ে এশিয়ার বিভিন্ন দেশসহ বিশ্ববাজারে এখন চীনা চলচ্চিত্রের জয়জয়কার। এই জোয়ারের হাওয়া এসে লেগেছে বাংলাদেশেও। এদেশের সিনেমাপ্রেমীদের কাছে এখন বিনোদনের এক বড় খোরাক হয়ে উঠেছে ম্যান্ডারিন ভাষার এই চলচ্চিত্রগুলো। ফলে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাগৃহে আনুষ্ঠানিকভাবে চীনা সিনেমা মুক্তির দাবি ও আহ্বান এখন বেশ জোরালো হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশে চীনা সিনেমার জনপ্রিয়তার পেছনে বড় ভূমিকা রাখছেÑ বিভিন্ন ওটিটি প্ল্যাটফর্ম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। মার্শাল আর্ট, ঐতিহাসিক ড্রামা এবং অ্যানিমেশন সিনেমার প্রতি তরুণ প্রজন্মের আগ্রহ দীর্ঘদিনের। আগে যেখানে কেবল জ্যাকি চ্যান বা জেট লি-র সিনেমাতেই দর্শক সীমাবদ্ধ ছিল, এখন তা বদলেছে। ‘দ্য ওয়ান্ডারিং আর্থ’, ‘ফুল রিভার রেড’ কিংবা ‘চ্যাং আন’-এর মতো আধুনিক চীনা মাস্টারপিসগুলো নিয়ে এদেশের সিনে-গ্রুপগুলোতে নিয়মিত আলোচনা ও প্রশংসা চলছে।
সাবটাইটেল বা ডাবিং সংস্কৃতির কল্যাণে ভাষার প্রাচীর টপকে চীনা সিনেমাগুলো এখন বাংলাদেশের দর্শকদের ঘরে ঘরে জায়গা করে নিয়েছে। কেন এত জনপ্রিয়তা? দর্শকদের মতে, চীনা সিনেমার গল্প বলার ধরন এবং তাদের সংস্কৃতির উপস্থাপন অত্যন্ত আকর্ষণীয়। বিশেষ করে বড় বাজেটের সায়েন্স ফিকশন এবং ঐতিহাসিক যুদ্ধভিত্তিক সিনেমাগুলোর ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস (ভিএফএক্স) আন্তর্জাতিক মানের।
পাশাপাশি, পারিবারিক মূল্যবোধ এবং মানবিক আবেগের গল্পগুলোও বাঙালি দর্শকদের হৃদয়ে সহজেই দাগ কাটে। সিনেমা দেখার অভিজ্ঞতাকে আরও চমকপ্রদ করতে চীন যেমন তাদের নিজস্ব সিনেমা হলে হট-পট বা ভিআর প্রযুক্তির মতো নতুনত্ব আনছে, তেমনি তাদের বিশ্বমানের সেই কনটেন্টগুলোও বিশ্বজুড়ে দর্শকদের টানছে। ২০২৪ থেকে শুরু করে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বিশ্ব বক্স অফিসে চীনা চলচ্চিত্র যে অভূতপূর্ব জোয়ার সৃষ্টি করেছে, তা শুধু ব্যবসাই বাড়ায়নি, বরং বদলে দিয়েছে বৈশ্বিক বিনোদনের সমীকরণও।
চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত চীনের অভ্যন্তরীণ বক্স অফিসে মোট আয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৮.২১ বিলিয়ন ইউয়ান (যা প্রায় ৪.১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি)। এই আট মাসে চীনের প্রেক্ষাগৃহগুলোতে প্রায় ৭১ কোটি ৭ লাখ দর্শক সিনেমা দেখতে গিয়েছেন। বিশেষ করে জুনের ১ থেকে আগস্টের ৩১ তারিখ পর্যন্ত চলা চীনের জমজমাট ‘সামার মুভি সিজন’-এ রেকর্ডসংখ্যক সিনেমা মুক্তি পায়।
এই তিন মাসে মোট ৩ কোটি ৮৫ লাখের বেশি প্রদর্শনীর মাধ্যমে ১২.৪৯ বিলিয়ন ইউয়ান বা ১.৮৫ বিলিয়ন ডলার বক্স অফিস আয় ঘরে তোলে চীনা সিনেমা, যা গত বছরের তুলনায় ৪.৪৫ শতাংশ বেশি। আর সবচেয়ে বড় চমক হলো, এই সময়ে বক্স অফিসের শীর্ষ পাঁচটি সিনেমার মধ্যে চারটেই ছিল চীনের নিজস্ব দেশীয় চলচ্চিত্র।
আগস্ট পর্যন্ত চীনের বাজারে মুক্তি পাওয়া অসংখ্য সিনেমার মধ্যে বাণিজ্যিক ও সমালোচকদের দৃষ্টিতে শীর্ষস্থান দখল করা কিছু সিনেমা হলো ‘পেগাসাস ৩’, ‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন দ্য মিডল ইস্ট’, ‘কুংফু সকার’, ‘ডিয়ার ইউ’, ‘ব্লেডস অব দ্য গার্ডিয়ানস’। পেগাসাস ৩ : বছরের শুরুতেই মুক্তি পাওয়া এই স্পোর্টস-ড্রামা এবং কার রেসিং সিক্যুয়েলটি বিশ্বজুড়ে প্রায় ৬৪৮.৭ মিলিয়ন ডলার (৪.৪২ বিলিয়ন ইউয়ান) ব্যবসা করে সর্বকালের সেরা সফল স্পোর্টস সিনেমার একটি হিসেবে নাম লেখায়।
এর নিখুঁত সিজিআই এবং রেসিং দৃশ্য দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করেছে। ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন দ্য মিডল : আগস্টের ১১ তারিখে মুক্তি পাওয়া এই যুদ্ধভিত্তিক ড্রামা-কমেডি সিনেমাটি মাত্র কয়েক সপ্তাহেই বক্স অফিসে ঝড় তোলে। এক ঋণগ্রস্ত চীনা শেফের গল্প নিয়ে তৈরি এই সিনেমাটি আগস্টের শেষ নাগাদ ১.৫ বিলিয়ন ইউয়ান (প্রায় ২২ কোটি ডলার) আয়ের মাইলফলক স্পর্শ করে অনন্য রেকর্ড গড়ে।
কুংফু সকার : বছরের অন্যতম আলোচিত এই কমেডি সিনেমাটি মুক্তির পর থেকে দুর্দান্ত গতিতে ব্যবসা সফল হয় এবং আগস্ট মাসের মধ্যে এর মোট বক্স অফিস আয় ২.৩৪ বিলিয়ন ইউয়ান ছাড়িয়ে যায়। ডিয়ার ইউ : মাত্র ১৪ মিলিয়ন ইউয়ানের স্বল্প বাজেটে তৈরি এই ড্রামা সিনেমাটি চলতি বছরে ‘স্লিপার হিট’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং আগস্টের মধ্যে ২ বিলিয়ন ইউয়ানের (২৮৫ মিলিয়ন ডলার) বেশি আয় করে সবাইকে চমকে দেয়।
ব্লেডস অব দ্য গার্ডিয়ানস : মার্শাল আর্ট ও কমব্যাট ঘরানার এই ঐতিহাসিক সিনেমাটি তার চোখ ধাঁধানো কোরিওগ্রাফির মাধ্যমে বক্স অফিসে ব্যাপক বাণিজ্যিক সাফল্য অর্জন করেছে। চলতি গ্রীষ্মকালীন মৌসুমে চীনা অ্যানিমেশনের দাপট ছিল চোখে পড়ার মতো। পুরাণের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত ফ্যান্টাসি অ্যানিমেশন সিনেমাগুলো ব্যাপক ব্যবসা সফল হয়েছে।
বিশেষ করে ‘নিউ লাই’ নামক অ্যানিমেশন সিনেমাটির অবিশ্বাস্য টিকিট বিক্রির কারণে সিনেমা হলগুলোর অনুরোধে এর প্রদর্শনী অক্টোবর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারেও এটি মুক্তির প্রক্রিয়া চলছে। এই বছরের অন্যতম ব্লকবাস্টার কমেডি-অ্যাকশন সিনেমা ‘পেগাসাস ৩’ এবং গ্যাংস্টার-অ্যাকশন ঘরানার ‘কোল্ড ওয়ার ১৯৯৪’ বিশ্বজুড়ে ঝড় তুলেছে।
এ ছাড়া ২০২৬ সালে চীন সরকার ‘চলচ্চিত্র অর্থনীতি উন্নয়ন বছর’ ঘোষণা করায় সিনেমা হলের সঙ্গে পর্যটন ও রেস্তোরাঁ খাতকে যুক্ত করে এক অভিনব ‘মুভি প্লাস’ বাণিজ্য মডেল তৈরি করেছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির আহ্বান আগস্ট পর্যন্ত চীনা সিনেমার এই অবিশ্বাস্য সাফল্যের পরিসংখ্যান বাংলাদেশের সিনেমাপ্রেমী দর্শকদের মধ্যেও ব্যাপক উদ্দীপনা তৈরি করেছে।
তরুণ প্রজন্মের দর্শকদের মতে, যেভাবে টানা ৪৩ দিন ধরে চীনের দৈনিক বক্স অফিস আয় ১০০ মিলিয়ন ইউয়ান ছাড়ানোর রেকর্ড গড়েছে, তা প্রমাণ করে সিনেমাগুলোর কনটেন্ট কতটা শক্তিশালী। বাংলাদেশের দর্শকরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দাবি তুলছেন, ঢাকার মাল্টিপ্লেক্সগুলোতে হলিউড সিনেমার পাশাপাশি এই বছরের ব্লকবাস্টার চীনা সিনেমা ‘পেগাসাস ৩’ কিংবা ‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন দ্য মিডল ইস্ট’ সরাসরি মুক্তি দেওয়া হোক।
সেইসঙ্গে আন্তর্জাতিক মুক্তির দিনেই স্টার সিনেপ্লেক্সে চীনা সিনেমা মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানান। দক্ষিণ এশিয়ার বাজারে যখন ভারতের সিনেমা নিয়মিত মুক্তি পাচ্ছে, তখন দেশের বড় একটি দর্শক সমাজ প্রশ্ন তুলছেনÑ কেন চীনা সিনেমা প্রেক্ষাগৃহে আসবে না? মাল্টিপ্লেক্স ও বড় সিনেমা হলগুলোর দর্শক এবং চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের একাংশের মতে, বড় পর্দায় চীনা সিনেমার জমকালো অ্যাকশন ও ভিজ্যুয়াল দেখার অভিজ্ঞতা হবে সম্পূর্ণ আলাদা।
বাংলাদেশের স্টার সিনেপ্লেক্সসহ আধুনিক প্রেক্ষাগৃহগুলোতে যদি আনুষ্ঠানিকভাবে চীনা সিনেমা আমদানি ও মুক্তি দেওয়া হয়, তবে তা দেশের সিনেমা ব্যবসার ঝিমিয়ে পড়া বাজারকে চাঙ্গা করতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার দীর্ঘদিনের দ্বিপাক্ষিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক অত্যন্ত সুদৃঢ়। এদেশের দর্শকরা মনে করেন, চীনা চলচ্চিত্র প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেলে কেবল বিনোদনই মিলবে না, বরং দুই দেশের সাংস্কৃতিক বিনিময় আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে।
সিনেমাপ্রেমীদের এই জোরালো আহ্বান এবং বিশ্ববাজারে চীনা সিনেমার এই ক্রমাগত সাফল্যের পর, বাংলাদেশের আমদানিকারক ও হল মালিকরা বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবেনÑ এমনটাই এখন প্রত্যাশা সবার।


















