বিশ্বজুড়ে সংবাদ পাওয়ার ধরন বদলে যাচ্ছে দ্রুত। একসময় সংবাদ জানার প্রধান ভরসা ছিল সংবাদপত্র, বেতার, টেলিভিশন ও সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব প্রকাশনা। এখন সেই জায়গা দখল করছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিওভিত্তিক মাধ্যম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর কথোপকথন ব্যবস্থা।
তথ্যের এই বিস্ফোরণের মধ্যেই সত্য, নির্ভরযোগ্যতা ও পেশাদার সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্বেগ। এমন এক বাস্তবতায় সোমবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব সংবাদ দিবস। সাংবাদিকতার অস্তিত্বের সংকট এবং সমাজে নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে বিশ্বের ১ হাজারের বেশি সংবাদপ্রতিষ্ঠান এবার একসঙ্গে কাজ করছে। নিউইয়র্ক টাইমস, রয়টার্স, কিয়েভ ইনডিপেনডেন্টসহ বিভিন্ন দেশের সংবাদমাধ্যম এ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছে।
নির্ভরযোগ্য সাংবাদিকতার মূল্য তুলে ধরতে এসব প্রতিষ্ঠান সম্পাদকীয়, প্রচারমূলক বার্তা ও ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশ করছে। আস্থার সংকটে সংবাদমাধ্যম : সাম্প্রতিক এক বৈশ্বিক সংবাদবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানুষের মধ্যে সংবাদমাধ্যমের প্রতি উদ্বেগ, অনাগ্রহ ও নৈরাশ্য বাড়ছে। সংবাদ জানার জন্য মানুষ ক্রমেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে।
ফলে সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব ওয়েবসাইট ও মুঠোফোনে সংবাদপত্রের ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়ছে। তবে নতুন মাধ্যমের ব্যবহার বাড়লেও সেই সব উৎসের প্রতি মানুষের আস্থা তুলনামূলক কম। অর্থাৎ, মানুষ দ্রুত খবর পেতে নতুন মাধ্যমের দিকে যাচ্ছে, কিন্তু সেই খবর কতটা সত্য, নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য, তা নিয়ে অনিশ্চয়তাও বাড়ছে। যুক্তরাজ্যের গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রক সংস্থার সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনেও একই ধরনের চিত্র উঠে এসেছে।
সেখানে বলা হয়েছে, মানুষ আগের তুলনায় অনেক বেশি উৎস থেকে সংবাদ সংগ্রহ করছে। ভিডিওভিত্তিক মাধ্যমের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। এমনকি প্রতি পাঁচজনের একজন সংবাদ জানার জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন। কিন্তু উৎস যত বাড়ছে, কোন তথ্য বিশ্বাসযোগ্য, সেই প্রশ্নও তত জোরালো হচ্ছে। একসময় প্রতিদ্বন্দ্বী, এখন একসঙ্গে : বিশ্ব সংবাদ দিবসের সহ-আয়োজক এবং দক্ষিণ আফ্রিকার ডেইলি মাভেরিক পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা ব্রাংকো ব্রকিচ মনে করেন, সংবাদমাধ্যমের পুরোনো কাঠামো আর আগের অবস্থায় ফিরবে না।
তার মতে, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমগুলোকেও নিজেদের কাজের ধরন বদলাতে হবে। ব্রকিচের ভাষায়, একসময় যারা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল, এখন তাদের একসঙ্গে কাজ করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। সংবাদমাধ্যমগুলো যদি নিজেদের মধ্যে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকে এবং পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারে, তাহলে একে একে তাদের দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, পুরোনো দিন ফিরে আসবে না। নতুন একটি ভারসাম্য তৈরি করতে হবে। আর তা সম্ভব হবে সংবাদমাধ্যমগুলো একসঙ্গে কাজ করলে। তার মতে, মূলধারার সংবাদমাধ্যমের ভুল-ত্রুটি থাকলেও পেশাদার ও নির্ভরযোগ্য সাংবাদিকতা একটি তথ্যনির্ভর সমাজের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। সত্যের প্রশ্নে নতুন চ্যালেঞ্জ : তবে সংবাদে ‘সত্য’ কীÑএই প্রশ্নও এখন আগের চেয়ে বেশি জটিল হয়ে উঠেছে।
রাজনৈতিক বক্তব্য, মতাদর্শগত বিভাজন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুত বিস্তারের কারণে একই ঘটনা নিয়ে তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের বর্ণনা। বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তি ও গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এ অবস্থায় সংবাদমাধ্যমের সামনে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে তথ্য যাচাই করে সত্যনিষ্ঠ সংবাদ তুলে ধরা।
শুধু দ্রুত সংবাদ প্রকাশ নয়, তথ্যের উৎস যাচাই, প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা এবং ভুল তথ্য সংশোধনের বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০১৮ সালে যাত্রা শুরু করা বিশ্ব সংবাদ দিবসের পরিসর সময়ের সঙ্গে বেড়েছে। এবার এর মূল বার্তা আরও স্পষ্টÑ নির্ভরযোগ্য সাংবাদিকতা ছাড়া তথ্যনির্ভর সমাজ টেকসই হতে পারে না। একদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের কাছে খবর পৌঁছে দেওয়ার নতুন দরজা খুলছে, অন্যদিকে যাচাইহীন তথ্য, গুজব ও বিভ্রান্তিকর উপাদান সেই দরজায় অনিশ্চয়তার ছায়া ফেলছে।
তাই সংবাদমাধ্যমের সামনে এখন শুধু পাঠক ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ নয়; নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা পুনর্গঠন এবং সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতার প্রয়োজনীয়তা নতুন করে প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জও রয়েছে। বিশ্ব সংবাদ দিবসে বিশ্বের এক হাজারের বেশি সংবাদপ্রতিষ্ঠানের একজোট হওয়া সেই বাস্তবতারই ইঙ্গিত দেয়Ñ সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ রক্ষায় প্রতিযোগিতার পাশাপাশি সহযোগিতাও এখন জরুরি।
কারণ নির্ভরযোগ্য তথ্য দুর্বল হয়ে পড়লে সংকটে পড়বে শুধু সংবাদমাধ্যম নয়, পুরো সমাজ। বাংলাদেশেও উদ্বেগ ভুল তথ্য নিয়ে : বিশ্ব সংবাদ দিবসের এই আলোচনার সঙ্গে মিল রেখে বাংলাদেশেও ভুল তথ্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। সোমবার নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ভুল তথ্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের যুগে গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তারা বলেন, মিথ্যা ও সত্য তথ্যের মিশ্রণ গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবদুল হান্নান চৌধুরী বলেন, সত্যের সঙ্গে মিথ্যা মিশিয়ে তথ্য প্রচার সমাজের জন্য বড় ঝুঁকি। এ সমস্যা মোকাবিলায় আরও দক্ষ পেশাজীবী তৈরি করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে। বিশেষ অতিথি জোবায়ের বাবু বলেন, গণমাধ্যমের বিভিন্ন উপাদান বিকৃত বা পরিবর্তন করে মানুষকে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে।
ছবি, শব্দ ও দৃশ্য পরিবর্তনের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি বিভ্রান্তিকর উপাদানও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এসব মোকাবিলায় তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজন রয়েছে। তথ্য যাচাই ও গণমাধ্যম শিক্ষার ওপর জোর : সাংবাদিক ও বিশ্লেষক শাহেদ আলম বলেন, সাংবাদিকতা ও সামাজিক কর্মকা-ের ক্ষেত্রে নৈতিক ভিত্তিকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে।
তথ্য ও ছবি যাচাইয়ের মাধ্যমে সত্যতা নিশ্চিত করার সুযোগ বাড়াতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সাইফুল হক বলেন, ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য মোকাবিলায় সত্য অনুসন্ধানের ওপর বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে মানুষের গণমাধ্যমবিষয়ক সচেতনতা বাড়ানো এবং ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষাগারের প্রয়োজন রয়েছে।


















