বাংলাদেশের কৃষি এখন শুধু খাদ্য উৎপাদনের বিষয় নয়; এটি জ্বালানি, পানি, জলবায়ু পরিবর্তন ও জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, সেচ মৌসুমে বিদ্যুৎ সরবরাহের চাপ এবং ডিজেলের ওপর নির্ভরতা কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়াচ্ছে।
তাই ভবিষ্যতের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষিতে এমন ব্যবস্থা প্রয়োজন, যা হবে জ্বালানিসাশ্রয়ী, পানিসাশ্রয়ী, প্রযুক্তিনির্ভর ও পরিবেশবান্ধব। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, কৃষি, বন ও মৎস্য খাত মিলিয়ে জাতীয় জিডিপির প্রায় ১১ দশমিক ৭ শতাংশ আসে কৃষি থেকে। ২০২৫ সালে দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৪৪ শতাংশও কৃষির সঙ্গে যুক্ত ছিল।
ফলে কৃষিতে জ্বালানি সংকটের প্রভাব শুধু কৃষকের ওপর নয়, সমগ্র অর্থনীতি ও খাদ্যব্যবস্থার ওপর পড়ে। কৃষির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি সেচ। টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এসআরইডিএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১ দশমিক ৩৪ মিলিয়ন বা ১৩ লাখ ৪০ হাজার ডিজেলচালিত সেচপাম্প রয়েছে, যা প্রায় ৩ দশমিক ৪ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে সেচ দেয়।
কৃষির মোট ব্যয়ের প্রায় ৪৩ শতাংশ পর্যন্ত সেচে ব্যয় হতে পারে। ফলে ডিজেলের দাম বাড়লে কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ও দ্রুত বেড়ে যায়। কৃষি সেচ ব্যবস্থার ৭৫ শতাংশেরও বেশি ডিজেলচালিত হওয়ায় জ্বালানি ভর্তুকির ওপরও চাপ তৈরি হয়। সরকার কখনো কখনো প্রতি মাসে প্রায় ২,৫০০-৩,০০০ কোটি টাকা জ্বালানি ভর্তুকিতে ব্যয় করেছে; পাশাপাশি সরাসরি কৃষি ভর্তুকির জন্য প্রায় ১৭,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
জ্বালানির দাম ব্যয়মূল্যের নিচে রাখার ফলে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর লোকসানের কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তাই সৌরচালিত সেচ ও নবায়নযোগ্য প্রযুক্তির ব্যবহার কৃষকের ডিজেলনির্ভরতা এবং সরকারের ভর্তুকির চাপ কমাতে পারে। এ সমস্যার সমাধানে সামনে আসতে পারে স্মার্ট ইকো-ফ্রেন্ডলি ফার্মিং সিস্টেম। এর মূল লক্ষ্য হলো জাতীয় গ্রিডের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল না থেকে স্থানীয়ভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহার।
জমি বা খামারের উপযোগী স্থানে সোলার প্যানেল, ব্যাটারি স্টোরেজ ও উচ্চদক্ষতার পাম্প স্থাপন করা যেতে পারে। এতে সেচের পাশাপাশি খামারের আলো, সেন্সর, স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম পরিচালনা সম্ভব। বাংলাদেশে সৌরসেচের ধারণাটি ইতোমধ্যে পরীক্ষিত। এসআরইডিএর সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২,৩০০-এর বেশি সোলার ইরিগেশন পাম্প স্থাপন করা হয়েছে।
অন্যদিকে ২০২৩ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে আইডিসিওএলের অর্থায়নে ১,৫২৩টি সৌরসেচ পাম্প, প্রায় ৪২.০৮ মেগাওয়াট সক্ষমতা এবং প্রায় ৭০,০০০ উপকারভোগী কৃষকের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব প্রকল্পে বছরে প্রায় ৪৮,৭৩৬ টন গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর হিসাবও দেওয়া হয়েছে। শুধু সৌর পাম্প স্থাপন করলেই স্মার্ট কৃষি হবে না। প্রয়োজন স্মার্ট ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট।
মাটির আর্দ্রতা পরিমাপের জন্য সেন্সর স্থাপন করে ডিজিটাল কন্ট্রোলারের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। মাটিতে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা থাকলে পাম্প বন্ধ থাকবে এবং নির্দিষ্ট সীমার নিচে নামলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেচ চালু হবে। ড্রিপ বা মাইক্রো-ইরিগেশনের সঙ্গে এ প্রযুক্তি যুক্ত হলে অতিরিক্ত পানি তোলা বন্ধ করা সম্ভব। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশের সেচের প্রায় ৭৫ শতাংশ ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল।
উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে অতিরিক্ত সেচের কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন, সেচ, মাছ চাষ, গবাদিপশু পালন ও জৈবসার উৎপাদনকে সমন্বিত করে একটি সার্কুলার রুরাল এনার্জি সিস্টেম গড়ে তোলা সম্ভব। খামারের বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস উৎপাদনও এ ব্যবস্থার অংশ হতে পারে। ডিজেল আমদানি কমলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপও কমবে।
বিশ্বব্যাংকের একটি পূর্ববর্তী বিশ্লেষণে দেখা যায়, এক পর্যায়ে বাংলাদেশ সেচের জন্য বছরে প্রায় ১০ লাখ টন ডিজেল আমদানি করে প্রায় ৯০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করত। সময়ের সঙ্গে হিসাব পরিবর্তিত হলেও সেচের জ্বালানি আমদানি কমানো অর্থনীতি ও কৃষি উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। অতএব, স্মার্ট ইকো-ফ্রেন্ডলি ফার্মিংকে বিচ্ছিন্ন পাইলট প্রকল্প হিসেবে নয়, জাতীয় কৃষি ও জ্বালানি নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
স্বল্পসুদে অর্থায়ন, সহজ কিস্তি, সৌরসেচে প্রণোদনা, সেন্সর ও দক্ষ পাম্প আমদানিতে শুল্ক সুবিধা এবং স্থানীয় প্রযুক্তি উৎপাদনে সহায়তা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কৃষক, উদ্যোক্তা, ব্যাংক, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সরকারকে নিয়ে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ মডেল সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। বাংলাদেশের সামনে জ্বালানি সংকট যেমন চ্যালেঞ্জ, তেমনি এটি একটি সুযোগ।
কম জ্বালানি, কম পানি ও কম দূষণে বেশি খাদ্য উৎপাদনের সক্ষমতাই হতে পারে ভবিষ্যতের কৃষির সাফল্যের মাপকাঠি। তাই এখনই সময় কৃষিকে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর ব্যবস্থা থেকে স্মার্ট ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থায় রূপান্তরের।



















