শরীরে বার্ধক্যের ছাপ পড়লেও অদম্য জীবনতৃষ্ণা ও আত্মমর্যাদাবোধের কারণে বয়সের ক্লান্তি তাকে দমাতে পারেনি। বগুড়ার দুপচাঁচিয়া পৌরসভার পালপাড়ার প্রবীণ কারিগর গীরেন বৈরাগী জীবনের চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বাঁশশিল্পের মাধ্যমে নিজের জীবিকা নির্বাহের পাশাপাশি গ্রামীণ ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রেখেছেন।
জীবনের ৭৬টি বসন্ত পার করলেও কারো করুণার মুখাপেক্ষী হননি; স্বীয় শ্রম ও নিষ্ঠায় আজও সচল রেখেছেন জীবনের চাকা। শৈশবে বাবার হাত ধরে এই কুটির শিল্পের প্রতি ভালোবাসার সূচনা। পরবর্তী সময়ে এটিকেই জীবনের প্রধান অবলম্বন হিসেবে বেছে নেন তিনি। সময়ের আবর্তে চারপাশে অনেক কিছু বদলে গেলেও তার কর্মস্পৃহায় ভাটা পড়েনি। ভোরের আলো ফুটতেই বাঁশ কাটা, চেঁছা আর বুননের নিপুণ কারুকাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েন এই শিল্পী।
তার দক্ষ হাতে রূপ নেয় গ্রামীণ জীবনের দৈনন্দিন অনুষঙ্গ—মই, বাঁশের চাটাই, ঝুড়ি, ডালা, কুলা, চালুনি কিংবা মাছ ধরার বৈচিত্র্যময় চাঁই ও ফাঁদ। কেবল বাঁশেই সীমাবদ্ধ থাকেননি তিনি; তাল ও ডাবগাছের পাতা এবং খাগড়া দিয়ে পরম যত্নে তৈরি করেন টেকসই ঝাড়ু। গীরেন বৈরাগীর হস্তশিল্পের কদরও বেশ ভালো। স্থানীয় হাটের গণ্ডি পেরিয়ে দূর-দূরান্তের ক্ষুদ্র ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা নিয়মিত এসে কিনে নিয়ে যান তার তৈরি সামগ্রী।
আধুনিক প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়ামের ভিড়ে ঐতিহ্যবাহী ও পরিবেশবান্ধব পণ্যের যে আবেদন, তা আজও ধরে রেখেছেন তিনি। বয়সের ভারে শারীরিক সামর্থ্য আগের মতো নেই, সামান্য কাজেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে হাত দুটি। তবু অদম্য তাগিদে প্রতিদিন তিনি মগ্ন থাকেন নিজের সৃষ্টিশীলতায়। স্মৃতির ঝাঁপি খুলে প্রবীণ এই কারিগর বলেন, ‘৩০-৩৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই কাজে যুক্ত আছি।
বয়সের কারণে শরীর আর আগের মতো সায় দেয় না, দ্রুত অবসাদ আসে। তবু কারও কাছে হাত না পেতে নিজের মেহনতেই শেষ দিন পর্যন্ত মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকতে চাই। ’ কুটির শিল্পের পাশাপাশি হিন্দু সনাতন ধর্মের নামসংকীর্তন থেকেও কিছু পারিশ্রমিক উপার্জন করেন তিনি। এভাবে অর্জিত আয় দিয়ে ৬ সদস্যের সংসার পরিচালনা করছেন। প্লাস্টিকমুখী এই যুগে দাঁড়িয়ে ৭৬ বছর বয়সেও গীরেন বৈরাগীর এই নিভৃত কর্মসাধনা ও আত্মনির্ভরশীলতা আধুনিক সমাজের কাছে এক অনন্য অনুপ্রেরণার দৃষ্টান্ত।


















