কয়েক বছর ধরে ফ্যাশন জগৎ চলছিল কিছুটা গৎবাঁধা নিয়মে। সোশ্যাল মিডিয়ার দিকে তাকালে মনে হতো, সবাই যেন নিখুঁত হওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। অনেক সময় তো ভাবনা হতো নিখুঁত না হওয়া যেন অপরাধ! প্রায় সবার ছবির প্রতিটি ফ্রেম, রূপচর্চার পেছনে থাকে ফিল্টারের মারপ্যাঁচ এবং পরিপাটি সাজের সামাজিক চাপ।
চুলটা হতে হবে একদম মসৃণ, পোশাক হতে হবে ইস্তিরি করা নিখুঁত ফিটিংয়ের, গহনাগাটি মিলতে হবে ব্র্যান্ডের ক্যাটালগ মেনে। এভাবেই চলছিল। তবে দীর্ঘদিন ধরে পারফেকশনের এই কৃত্রিম বৃত্তে বন্দি থাকতে থাকতে হাঁপিয়ে উঠেছে আজকের তরুণ প্রজন্ম। সেই একঘেয়েমি ও সামাজিক শেকল ভেঙে তাই তরুণদের ফ্যাশনে জায়গা করে নিচ্ছে এক নতুন ট্রেন্ড, যাকে বলা হয় গবলিন ফ্যাশন।
প্রচলিত নিখুঁত সৌন্দর্যবোধকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ইচ্ছাকৃত অগোছালো ভাব, অদ্ভুত মোটিফ ও বুনো স্বাধীনতা গবলিন ফ্যাশন মূল ভিত্তি। তাই এক কানে দুল, দুই পায়ে দুই রঙের মোজা, নখে ভিন্ন রঙের নেলপালিশ কিংবা চুলটা না-খোঁপা না-পনিটেইল করে রাস্তায় বের হয়ে পড়া এখন আর ভুলের খতিয়ান নয়; বরং বৈচিত্র্যপিয়াসী তারুণ্যের বলিষ্ঠ ফ্যাশন স্টেটমেন্ট।
ইমপারফেকশনের উদযাপন গবলিন ফ্যাশন মূলত জেন-জি প্রজন্মের হাত ধরে আসা এমন এক ছকভাঙা চর্চা, যা গতানুগতিক সাজগোজের নিয়মাবলিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে। লোককথা বা রূপকথার গবলিনদের যেমন বনের শেওলা, কাদা কিংবা অদ্ভুত সব কুড়োনো জিনিসের প্রতি আকর্ষণ থাকে, এই ফ্যাশনও ঠিক সেই প্রকৃতির ছোঁয়াকে ধরে রাখে। এখানে কৃত্রিম সাজগোছ বা টাইট সিলুয়েটের স্থান নেই; বরং প্রাধান্য পায় ওভারসাইজড ভিনটেজ পোশাক, একাধিক স্তরের লেয়ারিং এবং সচেতনভাবে বেছে নেওয়া অগোছালো ভাব।
এই স্টাইলের আসল সৌন্দর্যই হলোÑ নিখুঁত না হওয়ার বা ইমপারফেকশনের আনন্দকে সহজভাবে গ্রহণ করা। এখানে কোনো ফ্যাশন পুলিশ নেই, নেই কোনো বাঁধাধরা নিয়ম। নিজের মানসিক স্বাধীনতা ও পরম আরামই এই ফ্যাশনের মূল। প্রকৃতিঘেঁষা ফ্যাশন গবলিন স্টাইলের মূল ভিত্তির একটি হলো প্রাকৃতিক ও মাটির কাছাকাছি রং বা আর্দি টোন। উজ্জ্বল বা ঝকঝকে কৃত্রিম রঙের বদলে এই ফ্যাশনে চোখ জুড়ায় মাটি বা কাদা বাদামি, মস সবুজ, মরচে রং, চারকোল গ্রে এবং খয়েরি শেডে।
পোশাকের কাপড়ে পছন্দ করা হয় খসখসে কর্ডুরয়, পুরোনো নরম লিনেন, ক্যানভাস কিংবা হালকা ডিসট্রেসড নিটওয়্যার। স্টাইলিংয়ের ক্ষেত্রে জনপ্রিয় রূপগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ডার্ক কটেজকোর। যেখানে ভিনটেজ লং ড্রেসের সঙ্গে ক্রপড নিটেড কার্ডিগান জড়িয়ে নিলে ভেসে ওঠে জঙ্গলপ্রেমী নস্টালজিক আমেজ। আবার মিডনাইট মার্কেট গবলিন লুকে দেখা যায় প্যাচওয়ার্ক স্কার্ট, ওভারসাইজড গ্রাফিক টি-শার্ট আর লম্বা ওভারকোটের অদ্ভুত ড্রামাটিক সমন্বয়।
খসখসে কর্ডুরয় প্যান্ট ও গোল ফ্রেমের চশমায় ফুটে ওঠে একাডেমিক গবলিন, তখন পুরো সাজে যুক্ত হয় খামখেয়ালি বুদ্ধিমত্তার স্পর্শ। অদ্ভুত অনুষঙ্গ গবলিন ফ্যাশনে সাজের প্রতিটি উপাদান আলাদাভাবে মিলিয়ে নেওয়ার কোনো তাগিদ থাকে না। সূক্ষ্ম ও প্রথাগত দামি গহনার বদলে এতে প্রাধান্য পায় ভারী অক্সিডাইজড রুপার আংটি, একাধিক স্তরের অ্যান্টিক লকেট এবং চাঙ্কি মেটাল।
অনুষঙ্গে ব্যবহার করা হয় প্রকৃতিভিত্তিক অদ্ভুত সব মোটিফ, যেমন মাশরুম, ব্যাঙ, শামুক কিংবা ছোট পোকামাকড়ের প্রতিকৃতি। দুই কানে দুটি দুই ধরনের দুল পরা, ওড়নার মতো করে মাথায় ক্রোশে স্কার্ফ জড়িয়ে নেওয়া কিংবা কাঁধে ঝুলিয়ে নেওয়া পুরোনো জীর্ণ চামড়ার স্যাচেল বা মাশরুম প্রিন্টের ক্যানভাস টোট ব্যাগ; সব মিলিয়ে পুরো চেহারায় চলে আসে বুনো রহস্যময়তা।
প্রতিটি অ্যাকসেসরি যেন কোনো গহিন বন থেকে কুড়িয়ে আনা এক-একটি স্মৃতিচিহ্ন। বিশ্বমঞ্চ থেকে স্ট্রিট স্টাইল পশ্চিমা দেশগুলোতে বিশেষ করে শরৎকালীন সময় বা হ্যালোইনের আবহাওয়া তৈরি হলে গবলিন ফ্যাশনের চাহিদা ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। তবে দ্রুত সীমান্ত ছাড়ানো ফ্যাশনের প্রভাবে আমাদের অঞ্চলের তরুণেরাও এই বৈচিত্র্যময় ধারাকে সাদরে গ্রহণ করছে।
এই অ্যান্টি-পারফেক্ট ট্রেন্ডের প্রভাব এখন আর শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের রিলস বা টিকটকে সীমাবদ্ধ নেই, বরং ছড়িয়ে পড়েছে র? ্যাম্প ও স্ট্রিট স্টাইলে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আমেরিকান মডেল বেলা হাদিদের ওভারসাইজড ভিনটেজ সোয়েটার আর থ্রিফটেড মিসম্যাচড সাজ কিংবা জুলি ফক্সের ডিকনস্ট্রাকটেড পোশাকে স্পষ্ট ধরা পড়ে গবলিন ফ্যাশনের প্রভাব।
পাশাপাশি ডেভন লি কার্লসন ও আইরিস ল-র মতো ইনফ্লুয়েন্সাররা ভারী লেয়ারিং ও বুনো অনুষঙ্গের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে এই স্বাবলম্বী ফ্যাশনকে তরুণদের হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত করছেন। পরিবেশবান্ধব জীবনযাত্রা গবলিন ফ্যাশন জনপ্রিয় হওয়ার অন্যতম বড় কারণ কেবল এর নান্দনিক বৈচিত্র্য নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে টেকসই জীবনযাত্রার গভীর ভাবনা। নতুন নতুন ফাস্ট ফ্যাশন পোশাক কিনে পরিবেশের ক্ষতি করার বদলে এই ট্রেন্ড তরুণদের উৎসাহিত করছে থ্রিফট স্টোর, সেকেন্ড-হ্যান্ড প্ল্যাটফর্ম কিংবা পুরোনো আলমারি থেকে কাপড় খুঁজে নিয়ে রিসাইকেল করতে।
এর ফলে কাপড়ের অপচয় যেমন কমছে, তেমনি ফ্যাশন হয়ে উঠছে পরিবেশবান্ধব ও অর্থশ্রয়ী। ফ্যাশন মানেই কেবল কোনো দামি ব্র্যান্ডের নিখুঁত বা টাইট সিলুয়েটের পোশাক নয়। পরিপাটি সাজের আড়ালে নিজের স্বাচ্ছন্দ্যকে বিসর্জন না দিয়ে, কৃত্রিমতার চেয়ে নিজের স্বাভাবিক রূপকে ভালোবাসাটাই আসল ফ্যাশন। গবলিন ফ্যাশন মূলত সেই মানসিক স্বাধীনতা, কমফর্ট ও ইন্ডিভিজুয়ালিটির গল্প বলে।



















