ভারত থেকে ভারতীয় ও মিয়ানমারের ইলিশ আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে মৎস্য অধিদপ্তর। এর ফলে বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে কোনো ভারতীয় ইলিশের চালান প্রবেশ করেনি। এর আগে ভারত থেকে ইলিশ আমদানির জন্য দেওয়া ১০৩টি অনাপত্তি সনদ (এনওসি) বাতিল করে মৎস্য অধিদপ্তর। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ড. মো. খালেদ কনকের স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এসব অনাপত্তি সনদ বাতিল করা হয়।
এরপর থেকেই ভারত থেকে ইলিশ আমদানির প্রক্রিয়া বন্ধ রয়েছে। তবে হঠাৎ করে ইলিশ আমদানি বন্ধের সুনির্দিষ্ট কারণ মৎস্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়নি। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের ধারণা, আমদানি করা ভারতীয় ও মিয়ানমারের ইলিশকে দেশীয় বা পদ্মার ইলিশ হিসেবে বিক্রি করে ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতারণা, কম মূল্য দেখিয়ে আমদানির মাধ্যমে অর্থপাচারের সম্ভাবনা এবং দেশীয় ইলিশ উৎপাদনে জেলেদের উৎসাহ বাড়াতে আমদানি নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকতে পারে।
এদিকে হঠাৎ ইলিশ আমদানির অনুমতিপত্র (আইপি) বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন বলে দাবি করেছেন আমদানিকারকরা। অন্যদিকে দেশীয় ইলিশ ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমদানি বন্ধ থাকায় দেশীয় ইলিশের বাজার বাড়বে এবং ক্রেতারা প্রকৃত দেশীয় ইলিশ কেনার সুযোগ পাবেন। বন্দর সংশ্লিষ্টরা জানান, তুলনামূলক বেশি লাভের আশায় সাম্প্রতিক সময়ে ভারত থেকে ইলিশ আমদানি বেড়ে যায়।
আমদানির সময় প্রতি কেজি ইলিশের মূল্য ৪৮ সেন্ট থেকে ২ মার্কিন ডলার পর্যন্ত দেখানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। নির্ধারিত রাজস্ব পরিশোধের পর এসব মাছ বন্দর থেকে ছাড় করা হয়। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রতি কেজি প্রায় ৫০০ টাকার মধ্যে আমদানি করা ইলিশ পরে বাজারে ‘পদ্মার ইলিশ’ হিসেবে ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি করা হয়েছে।
এতে ক্রেতারা প্রতারিত হওয়ার পাশাপাশি দেশীয় ইলিশের বাজারেও এর প্রভাব পড়ছে। সাধারণ ক্রেতা আশিকুর রহমান বলেন, আমদানি করা ভারতীয় ইলিশ দেখতে অনেকটা বাংলাদেশের পদ্মার ইলিশের মতো। ফলে সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। স্বাদে পার্থক্য থাকলেও বাহ্যিকভাবে মিল থাকায় অনেকেই দেশি ইলিশ মনে করে ভারতীয় ইলিশ কিনছেন। তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি বাজার তদারকির সময় চড়া দামে ভারতীয় ইলিশ বিক্রির অভিযোগে কয়েকজন বিক্রেতাকে জরিমানা করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, বাজারে ভারতীয় ইলিশের সরবরাহ বেড়ে গেলে দেশীয় ইলিশ আহরণে জেলেদের আগ্রহ কমে যেতে পারে। এ ছাড়া বাজারমূল্যের তুলনায় কম দাম দেখিয়ে ইলিশ আমদানি করা হলে ‘আন্ডার ইনভয়েসিং’-এর মাধ্যমে অর্থপাচারের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলেও সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সরকার ইলিশ আমদানি নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইলিশ আমদানিকারক সৈয়দ মহিদুল হক রুবাই বলেন, ‘হঠাৎ আমদানি বন্ধ করায় আমরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছি। আমদানির উদ্দেশ্যে ওপারে ইলিশ কিনে রাখা হয়েছিল। এখন কম দামে সেগুলো ফেরত দিতে হবে। এর সঙ্গে আমদানি খরচের লোকসানও রয়েছে। ’ বেনাপোলের মৎস্য ও মান নিয়ন্ত্রণ অফিসের পরিদর্শক আসাওয়াদুল ইসলাম বলেন, মৎস্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় ইলিশ আমদানি বন্ধ রাখা হয়েছে।
তিনি জানান, আমদানি বন্ধ হওয়ায় বেনাপোলের বাজারেও ভারতীয় ইলিশের সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। চলতি বছরের জুলাই, আগস্ট এবং ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে মোট ৫৫৩ মেট্রিক টন ভারতীয় ইলিশ আমদানি হয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে ভারত থেকে বাংলাদেশে ১ হাজার ৭৩৯ দশমিক ৫০ টন ইলিশ আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
এর মধ্যে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ৫৫৩ মেট্রিক টন ইলিশ আমদানি হয়েছে। ১০৩টি অনাপত্তি সনদ বাতিলের পর অবশিষ্ট অনুমোদনের আওতায় ইলিশ আমদানি করা যাবে কি না, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছেন ব্যবসায়ীরা। বেনাপোল স্থলবন্দরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক রুহুল আমিন বলেন, ‘বুধবার সকাল থেকে কোনো ভারতীয় ইলিশ বেনাপোল বন্দরে প্রবেশ করেনি।
শুনেছি, মৎস্য অধিদপ্তর আমদানিকারকদের অনাপত্তি সনদ বাতিল করায় কেউ ইলিশ আমদানি করতে পারেনি। ’




















