একটি পাথরের মূর্তি। ওজন প্রায় ৭৩ কেজি। দাম আনুমানিক ৭৩ লাখ টাকা। চলতি বছরের ২ সেপ্টেম্বর জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে যৌথ অভিযানে মূর্তিটি উদ্ধারের পর আটক করা হয় চারজনকে। এরপর ১০ সেপ্টেম্বর নওগাঁর সাপাহার সীমান্তে উদ্ধার হয় আরও একটি মূর্তি।
ওজন ৪ কেজি ৪০০ গ্রাম। সেটি ছিল রাধা-রানীর মূর্তি। ১৯ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে ফরিদপুরের পুরোনো কালীবাড়ি মন্দিরে চুরি হয়। ২০ সেপ্টেম্বর নওগাঁ শহরে মালিকবিহীন অবস্থায় উদ্ধার হয় দুটি মূর্তি। একটির ওজন ২৮ কেজি ১৫০ গ্রাম, অন্যটির ১২ কেজি ১৫০ গ্রাম। দুটির আনুমানিক মূল্য ৪০ লাখ টাকার বেশি। এরপর গত ২২ সেপ্টেম্বর জয়পুরহাটের আক্কেলপুরে বিজিবি ও স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের যৌথ অভিযানে উদ্ধার হয় ৭৩ কেজি ওজনের আরেকটি মূর্তি।
বাহিনীর হিসাবে এর আনুমানিক বাজারমূল্য ৭৩ লাখ টাকা। ঘটনাপ্রবাহ ও তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণে স্পষ্ট, সম্প্রতি বেড়ে গেছে কষ্টিপাথরের মূর্তি বেচাকেনা ও পাচার। সীমান্তবর্তী বিভিন্ন জেলা থেকে একের পর এক উদ্ধার হচ্ছে কথিত কষ্টিপাথরের মূর্তি। গ্রেপ্তার হচ্ছে পাচারচক্রের সদস্যরা। কোথাও আবার পুরোনো মন্দির বা ধর্মীয় স্থাপনা থেকে চুরি যাচ্ছে প্রাচীন মূর্তি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাম্প্রতিক অভিযানে ধরা পড়ছে লাখ লাখ টাকা মূল্যের এসব মূর্তি। কোথাও একটি মূর্তির দাম বলা হচ্ছে ৩০-৪০ লাখ টাকা, কোথাও আবার ৭০ লাখের বেশি। কিন্তু এসব দামের ভিত্তি কতটা বাস্তব? একটি কালো পাথরের মূর্তি কীভাবে কোটি টাকার সম্পদে পরিণত হচ্ছে? এর পেছনে কি সত্যিই রয়েছে দুর্লভ কোনো পাথর, নাকি দীর্ঘদিনের ভ্রান্ত ধারণা, কুসংস্কার ও মুখে মুখে ছড়ানো অবাস্তব গল্প?
বিজ্ঞান বলছে, কষ্টিপাথর নিয়ে মানুষের মধ্যে রয়েছে ভুল ধারণা। ভূতত্ত্বের ভাষায়, ‘কষ্টিপাথর’ বলে বিশেষ কোনো পাথরের অস্তিত্ব নেই। সাধারণ মানুষ বা বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী উদ্ধারকৃত প্রাচীন মূল্যবান কালো রঙের প্রাচীন মূর্তিগুলোকে যেভাবে ঢালাওভাবে ‘কষ্টিপাথর’ বলে থাকে, প্রত্নতাত্ত্বিকদের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় তা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক, প্রত্নতত্ত্ববিদ ও বিশেষজ্ঞ ড. মোস্তাফিজুর রহমান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমে বা সাধারণ মানুষের মুখে যেটিকে ‘কষ্টিপাথর’ বলা হয়, সেটি আসলে ‘ব্ল্যাক বেসল্ট’ বা কৃষ্ণপ্রস্তর বা কালো পাথর। এটি এক ধরনের কঠিন আগ্নেয় বা রূপান্তরিত শিলা। প্রাচীন যুগে, বিশেষ করে পাল ও সেন আমলে ভাস্কররা দীর্ঘস্থায়ী ও নিখুঁত খোদাই কাজের জন্য শক্ত কালো পাথর ব্যবহার করতেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ বলেন, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের কোনো আর্থিক বা বৈজ্ঞানিক বাজারমূল্য হয় না, এর মূল্য ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক। সাধারণ মানুষ বা চোরাকারবারিরা প্রচার করে যে, এক একটি কষ্টিপাথরের মূর্তির দাম ১০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে বা প্রত্নতত্ত্বের নিয়মে এর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক আর্থিক ভিত্তি নেই।
আরেক প্রত্নতত্ত্ববিদ অধ্যাপক সুফি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, উদ্ধার হওয়া কৃষ্ণপ্রস্তরের মূর্তিগুলোর আসল গুরুত্ব লুকিয়ে আছে এর নির্মাণশৈলী, বয়স ও ঐতিহাসিক তথ্যে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যখন কোটি কোটি টাকা মূল্য নির্ধারণ করে সংবাদ প্রকাশ করে, তখন তা আসলে নিদর্শনের চোরাচালান ও চুরি করার প্রবণতা আরও বাড়িয়ে দেয়। তিনি আরও বলেন, প্রত্নতত্ত্ব ও ভূতত্ত্বের পরিভাষায় একে ‘কালো কেল্লা পাথর’, ‘ব্ল্যাক বেসল্ট’ বা ‘ডার্ক স্কিস্ট’ বলা হয়।
আসল কষ্টিপাথর আকারে খুবই ছোট ও মসৃণ হয়, যা সোনা-রুপা খাঁটি কি না— এমন পরীক্ষায় ব্যবহৃত হয়। কয়েক মণ ওজনের বড় বড় মূর্তি আসলে কষ্টিপাথর নয়, সাধারণ ব্ল্যাক বেসল্ট শিলা। ল্যাবে পরীক্ষার পর দেখা যায়, উদ্ধারকৃত তথাকথিত কষ্টিপাথরের সিংহভাগ মূর্তিরই কোটি টাকার বাজারমূল্য নেই। হয়তো প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে এগুলো ঐতিহাসিক দিক থেকে ‘অমূল্য’; কিন্তু বাণিজ্যিক দিক থেকে এর কোনো সুনির্দিষ্ট দাম নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কালো পাথরগুলো প্রাচীনকালে ভারতের রাজমহল পাহাড় বা ছোটনাগপুর মালভূমি অঞ্চল থেকে বাংলায় আনা এবং তা দিয়ে মূর্তি তৈরি করা হতো। সাধারণ মানুষ কালো রঙের প্রাচীন পাথর দেখলেই তাকে ‘কষ্টিপাথর’ মনে করে ভুল করে। বলা হয়ে থাকে, এটি অতি দুর্লভ ও মহামূল্যবান। কোথাও এর সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় চুম্বকীয় শক্তি, বিশেষ ধাতু কিংবা অলৌকিক ক্ষমতার গল্প।
আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটি পুরোনো কালো পাথরের মূর্তিকে দেখিয়ে বলা হয়, বিদেশে এর দাম কোটি টাকা। এই গল্প যত ছড়াচ্ছে, তত বাড়ছে মূর্তি খোঁজা, সংগ্রহ, দালালি ও পাচারের আগ্রহ। সেই সুযোগে সক্রিয় হয়ে উঠছে একটি অস্বচ্ছ বাজার। কষ্টিপাথর নিয়ে সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তি হলো, এর সঙ্গে অলৌকিক ক্ষমতার সম্পর্ক। পাথরটি কোনো বিশেষ ধাতু টানে, অস্বাভাবিক শক্তি রয়েছে গুপ্তধন শনাক্তে— এ ধরনের দাবির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
কোথাও বলা হয়, কোনো পুরোনো বাড়ির নিচে মূর্তি আছে। কোথাও বলা হয়, মন্দির বা দীঘির তলায় রয়েছে কষ্টিপাথরের সম্পদ। আবার কথিত তান্ত্রিক বা গুপ্তধন সন্ধানীদের মাধ্যমে নির্দিষ্ট জায়গা দেখিয়ে মানুষকে বিনিয়োগে উৎসাহিত করার ঘটনাও রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাস্তবে কষ্টিপাথর মূলত মূল্যবান ধাতুর বিশুদ্ধতা পরীক্ষায় ব্যবহৃত হয়। আর প্রাচীন কালো পাথরের মূর্তির মূল্যও শুধু ওজন দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না।
বয়স, নির্মাণকাল, শিল্পরীতি, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, উৎস, সংরক্ষণ অবস্থা ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব, সবকিছু বিবেচনা করতে হয়। তারপরও কষ্টিপাথরের মূর্তি নামটি ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে কোটি টাকার বাজার। আর সাম্প্রতিক একের পর এক উদ্ধার ও গ্রেপ্তারের ঘটনা বলছে, বিষয়টি এখন শুধু লোকমুখে ছড়ানো কুসংস্কার বা প্রতারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রকৃত মূর্তি চুরি ও সীমান্তপথে পাচারের সিন্ডিকেট।
পুলিশের সাবেক ডিআইজি আজিজুল হক রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, তিনিও এ ধরনের অনেক মূর্তি উদ্ধার করেছেন। উদ্ধারের সময় লাখ লাখ টাকা মূল্য উল্লেখ করা হয়, এখনো হচ্ছে। কিন্তু এসব মূল্যকে প্রত্নতাত্ত্বিক মূল্যায়নের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলার সুযোগ নেই। একটি মূর্তির আনুমানিক মূল্য এবং তার ঐতিহাসিক বা প্রত্নতাত্ত্বিক মূল্য এক বিষয় নয়। কোনো মূর্তির প্রকৃত গুরুত্ব নির্ধারণে প্রয়োজন বিশেষজ্ঞ পরীক্ষা।
তিনি আরও বলেন, প্রত্নতত্ত্বের দৃষ্টিতে প্রাচীন বাংলার পাথরের ভাস্কর্য অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। পাল-সেন যুগসহ বিভিন্ন সময়ের ভাস্কর্য বাংলাদেশের ইতিহাস, ধর্মীয় সংস্কৃতি ও শিল্প ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ দলিল। কিন্তু কোনো কালো পাথরের মূর্তি দেখেই সেটিকে কষ্টিপাথরের বলে দেওয়া বা তার দাম কোটি টাকা বলা গ্রহণযোগ্য নয়। এখন যেটা বলা হয়, সেটা গ্রেপ্তারকৃতদের দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে।
পুলিশ সূত্রমতে, মূর্তি চোরাচালানের একটি বড় সিন্ডিকেট সম্প্রতি আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। চলতি বছরে মূর্তি পাচারচক্রের অনেক সদস্য গ্রেপ্তার হয়েছে। ঘটনাগুলোর একটি বড় অংশ ঘটছে সীমান্তবর্তী জেলা ঘিরে। নওগাঁ, জয়পুরহাট, দিনাজপুরসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় প্রাচীন জনপদ, মন্দির, পুরোনো স্থাপনা ও প্রত্নঐতিহ্যের অস্তিত্ব রয়েছে।
ফলে সেখানে পুরোনো নিদর্শন পাওয়ার সম্ভাবনা যেমন রয়েছে, তেমনি সেগুলোকে কেন্দ্র করে অবৈধ বাণিজ্যের ঝুঁকিও রয়েছে। তাই সীমান্তবর্তী এলাকাকে বেছে নিচ্ছে এই চক্র। প্রত্নতত্ত্ববিদ ফারুক আহমেদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, উদ্ধার হওয়া বা পাচার হওয়া কষ্টিপাথরের প্রাচীন মূর্তিগুলো মূলত প্রতিবেশী দেশ ভারতে পাচার করা হয়। সেখান থেকে মধ্যপ্রাচ্যসহ পশ্চিমা বিশ্বের আন্তর্জাতিক প্রাচীন নিদর্শন বা পুরাকীর্তির কালো বাজারে চলে যায়।
ভৌগোলিক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী জেলাগুলো এ কাজের জন্য উপযুক্ত। স্থলপথে ভারত হয়ে এসব মূর্তি চলে যায় ইউরোপ, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের আন্তর্জাতিক প্রাচীন সংগ্রাহক ও আর্ট ডিলারদের কাছে। দেশি ও বিদেশি কিছু সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র বা সিন্ডিকেট এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তিনি আরও বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নামিদামি প্রাচীন শিল্পকর্ম সংগ্রহকারী বা শৌখিন বিত্তশালী ব্যক্তিরা গোপনে এগুলোর ক্রেতা।
অনেক সময় ভিনদেশি ডিলাররা প্রত্নতাত্ত্বিক সংস্থার নজর এড়িয়ে গোপন নিলামের মাধ্যমেও এসব অমূল্য সম্পদ কিনে নেন। কষ্টিপাথরের (সাধারণত ব্ল্যাক ব্যাসাল্ট) প্রাচীন মূর্তিগুলো দিয়ে চমৎকার ও নিখুঁত ভাস্কর্য তৈরি করা হয়। এগুলো প্রাচীন আমলের শিল্পকলার নিদর্শন। এসব কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রাচীন ও দুর্লভ পাথরের মূর্তির প্রচুর চাহিদা ও উচ্চ মূল্য থাকায় চোরাকারবারিরা একে বিনিয়োগ বা লাভের মাধ্যম হিসেবে দেখে।
তিনি আরও বলেন, সময় এসেছে সোচ্চার আর কঠোর হওয়ার। বাংলাদেশের মাটির নিচে ইতিহাস আছে। সেই ইতিহাসের দাম হয়তো কোটি টাকা দিয়ে মাপা যায় না। কিন্তু একবার তা দেশের বাইরে চলে গেলে একটি হারানো অধ্যায় আর সহজে ফিরে আসে না। তাই প্রয়োজন শুধু বাহক গ্রেপ্তার নয়, মিথের বাজার ভাঙা, প্রকৃত প্রত্নসম্পদ শনাক্ত করা এবং এর পেছনে থাকা পাচারচক্র খুঁজে বের করা।
কারণ কষ্টিপাথরের নামে যে কোটি টাকার গল্প ছড়ানো হচ্ছে, তার সবটা হয়তো সত্য নয়। কিন্তু সেই গল্পের আড়ালে যে ইতিহাস-ঐতিহ্য পাচার হচ্ছে, সেটা তো সত্য।


















