প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজ বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে ভাষণ দিয়েছেন। এটিই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘে তার প্রথম ভাষণ। নিউইয়র্ক সময় বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে সাধারণ পরিষদ হলে বক্তব্য দেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, যা বাংলাদেশ সময় হিসেবে শুক্রবার ভোর সাড়ে ৩টা।
বিকেলের অধিবেশনে ১৮ জন বক্তার মধ্যে ১১তম বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন তারেক রহমান। বাংলায় দেওয়া এ ভাষণের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি ও অগ্রাধিকার তুলে ধরেন তিনি। তারেক রহমানের বাবা শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ছিলেন পরিবারের প্রথম সদস্য, যিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেন।
১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট সাধারণ পরিষদের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে তিনি ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান ব্যবধান, দারিদ্র্য ও ক্ষুধা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার ওপর আলোকপাত করেন। শান্তি, মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও দেশগুলোর পারস্পরিক দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে বিশ্ব গড়ে তোলার আহ্বানও জানান তিনি।
এর ১৩ বছর পর, ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর সাধারণ পরিষদের ৪৮তম অধিবেশনে ভাষণ দেন তারেক রহমানের মা ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। জাতিসংঘের নথি অনুযায়ী, ১৯৯৩ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে তিনি মোট পাঁচবার সাধারণ পরিষদের কার্যক্রমে বক্তব্য দেন। এ ছাড়া ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বিশেষ সভা, ২০০২ সালে শিশুবিষয়ক ২৭তম বিশেষ অধিবেশন এবং ২০০৫ সালে ৬০তম অধিবেশন চলাকালে দুটি পৃথক সভায়ও ভাষণ দেন তিনি।
ফলে এবার তারেক রহমানের ভাষণের মধ্য দিয়ে একই পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বক্তব্য দেওয়ার ঘটনা ঘটল। গুরুত্ব পেল যেসব বিষয় : সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভাষণে বাংলাদেশের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছে। দেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর, আইনের শাসন ও জবাবদিহি, উন্নয়নের অগ্রাধিকার, বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক সংকটের টেকসই সমাধানের বিষয়গুলোও গুরুত্ব পায় এ ভাষণে।
একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন, জলবায়ু অর্থায়ন, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, দারিদ্র্য বিমোচন, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, যুব ও নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, আধুনিক প্রযুক্তির ন্যায্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবহার এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সংস্কারের বিষয়ও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরা হয় এ ভাষণে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম ও হুমায়ুন কবির এবং পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম এর আগে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের অগ্রাধিকারগুলো সম্পর্কে গণমাধ্যমকে অবহিত করেন। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের জন্য ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বর্তমানে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
আজকের কর্মসূচি : সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ সদরদপ্তরে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট অস্তিত্বের সংকট মোকাবিলায় একটি উচ্চপর্যায়ের সভায় উদ্বোধনী বক্তব্য দেন। এরপর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ শাহবাজ শরিফের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন। ‘অঙ্গীকার থেকে কার্যক্রম : প্রতিরোধযোগ্য মাতৃ ও নবজাতকের মৃত্যু বন্ধে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় ধাত্রীসেবাকে একীভূতকরণ’ শীর্ষক একটি উচ্চপর্যায়ের পার্শ্ব-অনুষ্ঠানেও যোগ দেন তিনি।
এ ছাড়া জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুলের সঙ্গেও তার বৈঠক হয়। ভাষণ শেষে নিউইয়র্কে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আয়োজিত নৈশভোজে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রোহিঙ্গা, জলবায়ু ও মধ্যপ্রাচ্য : জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাইডলাইনে বুধবার ব্যস্ত সময় কাটান প্রধানমন্ত্রী।
বিশ্বনেতাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন তিনি। একই দিনে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের সঙ্গে ১১টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার চুক্তিও হয়। এদিন সন্ধ্যায় ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী।
ম্যানহাটনের হায়াত গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল নিউইয়র্ক হোটেলে অনুষ্ঠিত বৈঠকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্্দী আমিন উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক প্রসঙ্গে হুমায়ুন কবির বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের দিকে না গেলে এর প্রভাব বাংলাদেশ ও প্রবাসী কর্মীদের ওপর পড়বে।
রেমিট্যান্স ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়েও বাংলাদেশের উদ্বেগ রয়েছে। সংঘাতের কারণে অনেক জাহাজ আটকে থাকা এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার বিষয়টি তুলে ধরে বাংলাদেশ কূটনীতির মাধ্যমে দ্রুত সংঘাতের সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে। সংঘাতের অবসানের পর আটকে থাকা বাংলাদেশি জাহাজগুলো যাতে নিরাপদে দেশে ফিরতে পারে, সে বিষয়েও ইরানের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে।
এর আগে গাম্বিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের পার্শ্ব-আয়োজনে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে পাঁচ দফা রোডম্যাপ তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। এতে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন এবং মিয়ানমারে সংঘটিত অপরাধের বিচার ও জবাবদিহির ওপর জোর দেওয়া হয়। মানবিক এ সংকটে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আহ্বানও জানান তিনি।
বাংলাদেশে বর্তমানে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের ওপর চাপ বাড়ছে বলে জানানো হয়েছে। স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা : বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মার্ক সুজম্যানের সঙ্গে বৈঠকে জনস্বাস্থ্য, শিশু ও মাতৃমৃত্যু হ্রাস, ধাত্রীসেবা নীতি, কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং বাংলাদেশে টিকা উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তুলতে যৌথভাবে কাজ করার বিষয়ে আলোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী।
ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেই প্লেনকোভিচের সঙ্গেও দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন তিনি। এতে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও জোরদার, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। অর্থনৈতিক সহযোগিতা, দক্ষ জনশক্তি, শিক্ষা ও প্রযুক্তিসহ সম্ভাবনাময় বিভিন্ন খাতে যৌথভাবে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দেন দুই নেতা।
জাতিসংঘসহ বহুপক্ষীয় ফোরামে সহযোগিতা এবং অভিন্ন স্বার্থের আন্তর্জাতিক ইস্যুতে সমন্বয় বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়। বোয়িংয়ের সঙ্গে ১১ উড়োজাহাজের চুক্তি : বাংলাদেশের বিমান পরিবহন খাত সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জন্য বোয়িংয়ের সঙ্গে ১১টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি হয়েছে। নিউইয়র্কের গ্র্যান্ড হায়াত হোটেলে সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্্দী আমিন এ তথ্য জানান।
নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালু এবং দেশের বিমান পরিবহন খাতের সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়েই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। বাংলাদেশের প্রয়োজন অনুযায়ী ভবিষ্যতে এয়ারবাসের সঙ্গেও আলোচনা হতে পারে। বোয়িংয়ের সঙ্গে নতুন চুক্তির ফলে উড়োজাহাজ সংগ্রহে বাংলাদেশের পরিকল্পনা আরও বিস্তৃত হলো। এর আগে বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার জন্য ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি হয়েছিল।
নতুন ১১টি যুক্ত হলে বোয়িং থেকে পরিকল্পিত উড়োজাহাজের সংখ্যা দাঁড়াবে ২৫টি। জলবায়ু ইস্যুতে বাংলাদেশের পাঁচ প্রস্তাব : জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের আহ্বানে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত ‘জলবায়ু পদক্ষেপ ও ন্যায্য উত্তরণ’বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের সভায় বাংলাদেশের জলবায়ু ঝুঁকি তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিশ্বের মোট গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান শূন্য দশমিক ৫ শতাংশেরও কম।
অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। শতাব্দীর শেষ নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে দেশের উপকূলীয় এলাকার ১২ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে যেতে পারে। এতে কোটি কোটি মানুষের জীবিকা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১ শতাংশ এবং খাদ্যনিরাপত্তাও গুরুতর ঝুঁকির মুখে রয়েছে বলে জানান তারেক রহমান।
সভায় পাঁচটি জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
এগুলো হলো— প্যারিস চুক্তিতে নির্ধারিত ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সীমা বজায় রাখতে বিশ্বব্যাপী গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ কমানো; জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য অভিযোজন খাতে পূর্বানুমেয় ও সহজলভ্য অর্থায়ন নিশ্চিত করা; জলবায়ু-স্মার্ট প্রযুক্তিতে আরও বেশি প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করে ন্যায্য ও সমতাভিত্তিক জলবায়ু উত্তরণ; সহজলভ্য অর্থায়ন, সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসান তহবিলের পূর্ণ বাস্তবায়ন ও নিয়মিত অর্থ পুনঃপূরণ নিশ্চিত করা।
সফরের শেষ দিনের কর্মসূচি : ২৫ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক ত্যাগের আগে ম্যানহাটনে জেপি মরগানের সদর দপ্তরে ওয়াল স্ট্রিটের প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাতরাশ বৈঠকে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। একই দিনে কুয়েতের ক্রাউন প্রিন্স শেখ সাবাহ খালেদ আল-হামাদ আল-সাবাহর সঙ্গেও দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের কর্মসূচি রয়েছে। জাতিসংঘ সফরে অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে বিনিয়োগ, উৎপাদন, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, মানবসম্পদ ও তরুণদের কর্মসংস্থান নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রসঙ্গত, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে ২১ সেপ্টেম্বর সস্ত্রীক নিউইয়র্কে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

























