রাজধানীর স্পর্শকাতর এলাকা ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসির দায়িত্বে থেকেও রাকিবুল হাসান দেশে-বিদেশে পলাতক আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে গোপন যোগাযোগ রক্ষা করে ফ্যাসিবাদ প্রত্যাবর্তনে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন বলে জানিয়েছেন গোয়েন্দারা। তারা আরও জানান, ওসি রাকিবকে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে নেওয়ার ঘটনায় পুলিশ বাহিনীতে কর্মরত যেসব কর্মকর্তা গোপনে ফ্যাসিবাদ প্রত্যাবর্তনের চেষ্টার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তারা সতর্ক হয়ে গেছেন।
নিজের মোবাইল ফোনের অ্যাপসও মুছে ফেলেছেন তারা। এমন পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের তালিকা করা হচ্ছে বলে জানান গোয়েন্দারা। রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট থানার সাবেক ওসি রাকিবুল হাসানের পাঁচ দিনের রিমান্ডের গতকাল শুক্রবার ছিল প্রথম দিন। এর আগে তদন্ত কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে শুনানি নিয়ে গত বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দিদারুল আলম এ আদেশ দেন বলে জানান প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই তারেকুর রহমান।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচার শেখ হাসিনা ভারতের দিল্লিতে একটি ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে ঘোষণা দেন ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন। এরপর থেকেই কার্যক্রম নিসিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও অনুসারীরা নতুন করে অফলাইন-অনলাইন ষড়যন্ত্র শুরু করেছেন। ঝটিকা মিছিল ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
গুজব ছড়িয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার পাশাপাশি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনিত ঘটানোর চেষ্টা করছেন তারা। পুলিশের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ওসি রাকিবুলের ঘটনায় পুরো বাহিনী বিব্রত। তার রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে ভাবমূর্তি সংকটে পড়েছে পুলিশ বাহিনী। এ কারণে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তাকে রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে বলে আশাবাদী এই কর্মকর্তারা।
রিমান্ডে ওসি রাকিবুল অনেক প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে গেছেন বলে ডিবি সূত্রে জানা গেছে। অবশ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অংশ তার মতো পলাতক কর্মকর্তাদের কাছে তথ্য পাচার ও গোপন অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নে সচেষ্ট বলে জানা গেছে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের সময় সুবিধাভোগীরা পটপরিবর্তনের পরও মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পোস্টিং নিচ্ছেন— এমন তথ্যও মিলেছে।
সূত্র আরও জানায়, রাকিবুল গ্রেপ্তারের পরপরই চক্রের অন্যরা সতর্ক হয়ে গেছেন। তারা গোপন যোগাযোগের অ্যাপসগুলো নিজেদের মোবাইল ফোন থেকে মুছে ফেলেছেন। এসব তথ্য উদ্ধারে চেষ্টা করছেন সাইবার বিশেষজ্ঞরা। গোয়েন্দারা জানান, রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার প্রমাণসাপেক্ষে ষড়যন্ত্রকারীদের তালিকা হচ্ছে। তালিকাভুক্তদের রাখা হচ্ছে নজরদারিতে।
এ ছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুসারে পুলিশে ঘুষ-পোস্টিং নিয়েও তালিকা হচ্ছে। তথ্য অনুসারে এই কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতায় গত বৃহস্পতিবারও পুলিশের ডিআইজিসহ ছয় কর্মকর্তাকে বহিষ্কার করা হয়। পুলিশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকে খুলনা রেঞ্জের বিভিন্ন জেলায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন রাকিবুল হাসান।
পটপরিবর্তনের পর তাকে ডিএমপিতে বদলি করা হয়। তিনি প্রথমে ভাটারা ও পরে গুলশান থানায় দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ গত ৩০ মার্চ তাকে ক্যান্টনমেন্ট থানায় ওসির দায়িত্ব দেওয়া হয়। জানা গেছে, রাকিবুল একসময় কুষ্টিয়ার ইবি ও কুমারখালী থানায় ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, সে সময় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে মিলে বিএনপিসহ বিরোধী দল দমনে ভূমিকা পালন করেন তিনি।
সম্প্রতি রাকিবুলের রাষ্ট্রবিরোধী উসকানিমূলক অডিও ফাঁস হয়। এরপরই তার অতীত কর্মকাণ্ডের দিকে দৃষ্টি পড়ে সংশ্লিষ্টদের। এর আগে বৃহস্পতিবার রাকিবুল হাসানকে আদালতে হাজির করে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ক্যান্টনমেন্ট থানার পরিদর্শক এ বি এম আব্দুল্লাহ খালেদ সাকিব সাত দিনের রিমান্ড চান। তখন আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোরশেদ হোসেন শাহীন রিমান্ড বাতিল করে জামিন আবেদন করেন।
তিনি বলেন, মানুষ দেখেছে সাত দিন পর্যন্ত তাকে ডিবি কার্যালয়ে আটকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। সংবিধানে বলা আছে, গ্রেপ্তারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামিকে আদালতে হাজির করতে হবে বা আদালতকে অবহিত করতে হবে; কিন্তু সেটা করা হয়নি। কোন আইনে তাকে সাত দিন আটকে রাখা হলো? তিনি আরও বলেন, রাকিবুল সরকারি চাকরিজীবী, নিষ্ঠার সঙ্গে চাকরি করেছেন। কখনো তার বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ করেনি।
যে কথার জন্য তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তা অতিরঞ্জিতভাবে বলা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ষড়যন্ত্রমূলকভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে রাকিবুলকে। রিমান্ড আবেদনে বলা হয়, প্রাথমিক তদন্তে রাকিবুলের বিরুদ্ধে মামলায় বর্ণিত ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। তিনিসহ অজ্ঞাতনামা আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নষ্ট, সরকার পতনের ষড়যন্ত্র এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ, সরকারের প্রশাসনিক উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা ও বাহিনী সম্পর্কে অবজ্ঞা, বিদ্বেষ, ঘৃণা পোষণ করেছেন।
তারা উসকানি দিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র করেন। পরে আদালত শুনানি নিয়ে রাকিবুলের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।



















