আজ সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
৬ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ০৮ রবিউস সানি ১৪৪৮
ঢাকা
পরিষ্কার আকাশ
৩৫°C
সর্বোচ্চ: ৩৬°C
সর্বনিম্ন: ২৭°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৪৫%

দুঃসময়ের ত্যাগ ও সুসময়ে মূল্যায়ন: প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ

  • MIT ERP
  • Update Time : 01:18:11 pm, Sunday, 20 September 2026
  • 14

দুঃসময়ের ত্যাগ ও সুসময়ে মূল্যায়ন: প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

একটি রাজনৈতিক দলের প্রকৃত শক্তি কেবল ভোট বা মিছিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং দলের আসল শক্তি হলো তার ত্যাগী মানুষ। দুঃসময়ে যারা দলের পাশে থাকেন, তারাই মূলত দলের প্রকৃত সম্পদ এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল একটি বড় রাজনৈতিক দল।

দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় এ দলের সঙ্গে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ যুক্ত হয়েছেন। গত প্রায় ১৭ বছরের রাজনৈতিক প্রতিকূলতায় অনেক নেতা-কর্মী রাজপথে ছিলেন। অনেকে মামলা মোকাবিলা করেছেন। অনেকে চাকরি হারানোর ঝুঁকি নিয়েছেন। কেউ ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। কেউ সামাজিক চাপ সহ্য করেছেন। কেউ গ্রেপ্তার হয়েছেন। কেউ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

এই সংগ্রামে শুধু পেশাদার রাজনীতিবিদ ছিলেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। চিকিৎসক ছিলেন। প্রকৌশলী ছিলেন। কৃষিবিদ ছিলেন। আইনজীবী ছিলেন। সাংবাদিক ছিলেন। সরকারি-বেসরকারি পেশাজীবী ছিলেন। তারা প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছেন। তাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা ছিল, সুদিন এলে এই মানুষগুলোর ত্যাগের মূল্যায়ন হবে।

কিন্তু আজ অনেকের মনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। দুঃসময়ের সেই মানুষগুলো কি যথাযথভাবে মূল্যায়িত হচ্ছেন? প্রশ্নটি অমূলক নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছরে দেশের ৫৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন মোট ১২ হাজার ৩০০ কোটি টাকার বাজেট অনুমোদন করেছে। অর্থাৎ উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাপনার প্রতিটি শীর্ষ পদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভাইস চ্যান্সেলর, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর ও ট্রেজারার কোনো সাধারণ পদ নয়। এগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক নেতৃত্বের কেন্দ্র। ইউজিসির উচ্চশিক্ষা কৌশলগত পরিকল্পনাতেও যোগ্য ব্যক্তিকে সঠিক পদে বসানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনায় ভাইস চ্যান্সেলর নিয়োগে একটি প্যানেল ও অংশীজনের অংশগ্রহণের কথাও বলা হয়েছে। ২০২৬ সালে একাধিক দফায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন ভিসি, প্রোভিসি ও ট্রেজারার নিয়োগ হয়েছে।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা আগে। সততা আগে। প্রশাসনিক দক্ষতা আগে। একাডেমিক নেতৃত্বের সক্ষমতা আগে। তবে তার সঙ্গে ত্যাগের ইতিহাসও বিবেচনায় থাকা উচিত। কারণ একটি রাজনৈতিক দল যখন দীর্ঘদিন বিরোধী অবস্থানে থাকে, তখন যারা প্রকাশ্যে পাশে দাঁড়ায় তাদের ঝুঁকি থাকে। আবার যারা নিরাপদ দূরত্বে থাকে, তাদের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম।

সুসময়ে যদি দুই পক্ষকে একইভাবে মূল্যায়ন করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে দুঃসময়ে কে ঝুঁকি নেবে? এটি শুধু আবেগের প্রশ্ন নয়। এটি রাজনৈতিক সংগঠন টিকিয়ে রাখার প্রশ্ন। একটি দল যদি শুধু সুসময়ের সুযোগসন্ধানীদের পুরস্কৃত করে, তাহলে দলের সাংগঠনিক সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে যায়। কর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। তারা ভাবতে শুরু করে—ত্যাগ করে লাভ কী?

এই প্রশ্নের উত্তর দলকে এখনই দিতে হবে। আরেকটি বিষয় আরও গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে যদি আগের সরকারের বিতর্কিত ভূমিকার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা বহাল থাকেন, তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে কাউকে শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে সরিয়ে দেওয়াও সমাধান নয়। প্রত্যেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা প্রমাণিত হতে হবে।

যথাযথ তদন্ত হতে হবে। আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রতিশোধ নয়। ন্যায়বিচার চাই। দলীয় সরকার পরিচালনার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখানেই। সরকার পরিবর্তনের পর শুধু চেয়ার বদলালেই পরিবর্তন আসে না। নিয়োগের সংস্কৃতি বদলাতে হয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি বদলাতে হয়। যোগ্যতার মূল্যায়ন করতে হয়। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হয়।

এখানে প্রধানমন্ত্রী তার নেতৃত্বের মাধ্যমে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, প্রো-ভিসি ও ট্রেজারার নিয়োগে একটি স্বচ্ছ নীতিমালা করা যেতে পারে। প্রার্থীর একাডেমিক যোগ্যতা, গবেষণা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, নেতৃত্বের দক্ষতা, সততা ও পেশাগত অবদান মূল্যায়ন করা যেতে পারে। পাশাপাশি দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তার ভূমিকার তথ্যও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।

একই নীতি সাংবাদিকতা, চিকিৎসা, প্রকৌশল, কৃষি ও অন্যান্য পেশাজীবীর ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা যেতে পারে। সবচেয়ে জরুরি হলো একটি ভারসাম্য। ত্যাগী হলেই পদ নয়। আবার ত্যাগী বলে যোগ্যতাকে উপেক্ষাও নয়। যোগ্য ও ত্যাগী মানুষকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এটাই হওয়া উচিত নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তি। কারণ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদ দলীয় পুরস্কার নয়।

এগুলো জনস্বার্থের দায়িত্ব। তাই রাজনৈতিক আনুগত্যের চেয়ে রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য, ব্যক্তিগত সম্পর্কের চেয়ে যোগ্যতা এবং গোষ্ঠীগত পরিচয়ের চেয়ে সততা বড় হতে হবে। একই সঙ্গে দলের দুঃসময়ের কর্মীদের প্রতি ন্যায্য সম্মানও নিশ্চিত করতে হবে। তাদের পদ দেওয়া সম্ভব না হলেও তাদের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া যায়। বিভিন্ন সরকারি ও সাংগঠনিক কমিটিতে যোগ্যদের সুযোগ দেওয়া যায়।

গবেষণা, শিক্ষা, নীতি প্রণয়ন ও জনসেবায় তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যায়। একটি রাজনৈতিক দল শুধু ক্ষমতায় থাকার জন্য নয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করার জন্যও কাজ করে। সেই প্রতিষ্ঠানকে টেকসই করতে হলে ত্যাগের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আজ যারা দুঃসময়ে পাশে ছিলেন, তাদের যদি সুসময়ে উপেক্ষা করা হয়, তাহলে আগামী দিনের কর্মীরা একটি ভুল বার্তা পাবেন।

তারা ভাববেন—সংকটে সামনে থাকার চেয়ে নিরাপদ দূরত্বে থাকাই ভালো। এমন সংস্কৃতি কোনো বড় দলের জন্য শুভ নয়। তাই প্রধানমন্ত্রীকে এখনই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। একটি স্বাধীন ও স্বচ্ছ মূল্যায়ন ব্যবস্থা করা যেতে পারে। দলের দুঃসময়ের আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী পেশাজীবীদের তথ্য সংরক্ষণ করা যেতে পারে। তাদের পেশাগত যোগ্যতা ও অবদান যাচাই করা যেতে পারে।

একই সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের অতীত ভূমিকা, যোগ্যতা ও সততার বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা যেতে পারে। এতে কাউকে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত করার সুযোগ থাকবে না। আবার শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অযোগ্য কাউকে গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়ার সুযোগও কমবে। এটাই হবে প্রকৃত পরিবর্তন। প্রধানমন্ত্রী যদি একটি কথা পরিষ্কার করেন—ত্যাগ সম্মান পাবে, যোগ্যতা অগ্রাধিকার পাবে এবং অন্যায়ের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় থাকবে না—তাহলে দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে নতুন আস্থা তৈরি হবে।

এছাড়া প্রধানমন্ত্রী যে সোর্সের ওপর ভিত্তি করে সুপারিশ করছেন সেটাও দৈবিকভাবে যাচাই করা উচিত। কারণ সোর্স কি সঠিক তথ্য দিচ্ছেন নাকি অনিয়মের আশ্রয় নিচ্ছেন? বাংলাদেশের মানুষও একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি দেখতে চাইছে। সেই সংস্কৃতিতে প্রতিহিংসা থাকবে না। থাকবে ন্যায়বিচার। অন্ধ আনুগত্য থাকবে না। থাকবে যোগ্যতার মূল্যায়ন। তোষামোদ থাকবে না।

থাকবে সততা। আর দুঃসময়ে যারা পাশে ছিলেন, তাদের ত্যাগ বিস্মৃত হবে না। কারণ ক্ষমতা আসে-যায়। পদ আসে-যায়। কিন্তু ত্যাগের ইতিহাস থেকে যায়। সেই ইতিহাসের প্রতি সম্মান দেখানো শুধু দলের প্রতি দায়িত্ব নয়। এটি ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিও দায়িত্ব। দুঃসময়ের ত্যাগীদের যথাযথ মূল্যায়ন করুন। যোগ্যতার সঙ্গে ত্যাগের মর্যাদা দিন।

কারণ ত্যাগী মানুষকে সম্মান করা মানেই দলের ভবিষ্যৎকে শক্তিশালী করা। লেখক: অধ্যাপক (কৃষি) ও সাবেক ডিন, কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন অনুষদ এবং সাধারণ সম্পাদক, জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

শাপলার সৌন্দর্যে মুখরিত নাটোরের গুরুদাসপুরের চাকলবিল

দুঃসময়ের ত্যাগ ও সুসময়ে মূল্যায়ন: প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ

Update Time : 01:18:11 pm, Sunday, 20 September 2026

একটি রাজনৈতিক দলের প্রকৃত শক্তি কেবল ভোট বা মিছিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং দলের আসল শক্তি হলো তার ত্যাগী মানুষ। দুঃসময়ে যারা দলের পাশে থাকেন, তারাই মূলত দলের প্রকৃত সম্পদ এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল একটি বড় রাজনৈতিক দল।

দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় এ দলের সঙ্গে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ যুক্ত হয়েছেন। গত প্রায় ১৭ বছরের রাজনৈতিক প্রতিকূলতায় অনেক নেতা-কর্মী রাজপথে ছিলেন। অনেকে মামলা মোকাবিলা করেছেন। অনেকে চাকরি হারানোর ঝুঁকি নিয়েছেন। কেউ ব্যবসায়িক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। কেউ সামাজিক চাপ সহ্য করেছেন। কেউ গ্রেপ্তার হয়েছেন। কেউ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

এই সংগ্রামে শুধু পেশাদার রাজনীতিবিদ ছিলেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। চিকিৎসক ছিলেন। প্রকৌশলী ছিলেন। কৃষিবিদ ছিলেন। আইনজীবী ছিলেন। সাংবাদিক ছিলেন। সরকারি-বেসরকারি পেশাজীবী ছিলেন। তারা প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছেন। তাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা ছিল, সুদিন এলে এই মানুষগুলোর ত্যাগের মূল্যায়ন হবে।

কিন্তু আজ অনেকের মনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। দুঃসময়ের সেই মানুষগুলো কি যথাযথভাবে মূল্যায়িত হচ্ছেন? প্রশ্নটি অমূলক নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছরে দেশের ৫৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন মোট ১২ হাজার ৩০০ কোটি টাকার বাজেট অনুমোদন করেছে। অর্থাৎ উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাপনার প্রতিটি শীর্ষ পদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভাইস চ্যান্সেলর, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর ও ট্রেজারার কোনো সাধারণ পদ নয়। এগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক নেতৃত্বের কেন্দ্র। ইউজিসির উচ্চশিক্ষা কৌশলগত পরিকল্পনাতেও যোগ্য ব্যক্তিকে সঠিক পদে বসানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনায় ভাইস চ্যান্সেলর নিয়োগে একটি প্যানেল ও অংশীজনের অংশগ্রহণের কথাও বলা হয়েছে। ২০২৬ সালে একাধিক দফায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন ভিসি, প্রোভিসি ও ট্রেজারার নিয়োগ হয়েছে।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা আগে। সততা আগে। প্রশাসনিক দক্ষতা আগে। একাডেমিক নেতৃত্বের সক্ষমতা আগে। তবে তার সঙ্গে ত্যাগের ইতিহাসও বিবেচনায় থাকা উচিত। কারণ একটি রাজনৈতিক দল যখন দীর্ঘদিন বিরোধী অবস্থানে থাকে, তখন যারা প্রকাশ্যে পাশে দাঁড়ায় তাদের ঝুঁকি থাকে। আবার যারা নিরাপদ দূরত্বে থাকে, তাদের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম।

সুসময়ে যদি দুই পক্ষকে একইভাবে মূল্যায়ন করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে দুঃসময়ে কে ঝুঁকি নেবে? এটি শুধু আবেগের প্রশ্ন নয়। এটি রাজনৈতিক সংগঠন টিকিয়ে রাখার প্রশ্ন। একটি দল যদি শুধু সুসময়ের সুযোগসন্ধানীদের পুরস্কৃত করে, তাহলে দলের সাংগঠনিক সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে যায়। কর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। তারা ভাবতে শুরু করে—ত্যাগ করে লাভ কী?

এই প্রশ্নের উত্তর দলকে এখনই দিতে হবে। আরেকটি বিষয় আরও গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে যদি আগের সরকারের বিতর্কিত ভূমিকার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা বহাল থাকেন, তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে কাউকে শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে সরিয়ে দেওয়াও সমাধান নয়। প্রত্যেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা প্রমাণিত হতে হবে।

যথাযথ তদন্ত হতে হবে। আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রতিশোধ নয়। ন্যায়বিচার চাই। দলীয় সরকার পরিচালনার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখানেই। সরকার পরিবর্তনের পর শুধু চেয়ার বদলালেই পরিবর্তন আসে না। নিয়োগের সংস্কৃতি বদলাতে হয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি বদলাতে হয়। যোগ্যতার মূল্যায়ন করতে হয়। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হয়।

এখানে প্রধানমন্ত্রী তার নেতৃত্বের মাধ্যমে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, প্রো-ভিসি ও ট্রেজারার নিয়োগে একটি স্বচ্ছ নীতিমালা করা যেতে পারে। প্রার্থীর একাডেমিক যোগ্যতা, গবেষণা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, নেতৃত্বের দক্ষতা, সততা ও পেশাগত অবদান মূল্যায়ন করা যেতে পারে। পাশাপাশি দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তার ভূমিকার তথ্যও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।

একই নীতি সাংবাদিকতা, চিকিৎসা, প্রকৌশল, কৃষি ও অন্যান্য পেশাজীবীর ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা যেতে পারে। সবচেয়ে জরুরি হলো একটি ভারসাম্য। ত্যাগী হলেই পদ নয়। আবার ত্যাগী বলে যোগ্যতাকে উপেক্ষাও নয়। যোগ্য ও ত্যাগী মানুষকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এটাই হওয়া উচিত নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিত্তি। কারণ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদ দলীয় পুরস্কার নয়।

এগুলো জনস্বার্থের দায়িত্ব। তাই রাজনৈতিক আনুগত্যের চেয়ে রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য, ব্যক্তিগত সম্পর্কের চেয়ে যোগ্যতা এবং গোষ্ঠীগত পরিচয়ের চেয়ে সততা বড় হতে হবে। একই সঙ্গে দলের দুঃসময়ের কর্মীদের প্রতি ন্যায্য সম্মানও নিশ্চিত করতে হবে। তাদের পদ দেওয়া সম্ভব না হলেও তাদের অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া যায়। বিভিন্ন সরকারি ও সাংগঠনিক কমিটিতে যোগ্যদের সুযোগ দেওয়া যায়।

গবেষণা, শিক্ষা, নীতি প্রণয়ন ও জনসেবায় তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যায়। একটি রাজনৈতিক দল শুধু ক্ষমতায় থাকার জন্য নয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করার জন্যও কাজ করে। সেই প্রতিষ্ঠানকে টেকসই করতে হলে ত্যাগের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আজ যারা দুঃসময়ে পাশে ছিলেন, তাদের যদি সুসময়ে উপেক্ষা করা হয়, তাহলে আগামী দিনের কর্মীরা একটি ভুল বার্তা পাবেন।

তারা ভাববেন—সংকটে সামনে থাকার চেয়ে নিরাপদ দূরত্বে থাকাই ভালো। এমন সংস্কৃতি কোনো বড় দলের জন্য শুভ নয়। তাই প্রধানমন্ত্রীকে এখনই বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার। একটি স্বাধীন ও স্বচ্ছ মূল্যায়ন ব্যবস্থা করা যেতে পারে। দলের দুঃসময়ের আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী পেশাজীবীদের তথ্য সংরক্ষণ করা যেতে পারে। তাদের পেশাগত যোগ্যতা ও অবদান যাচাই করা যেতে পারে।

একই সঙ্গে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের অতীত ভূমিকা, যোগ্যতা ও সততার বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা যেতে পারে। এতে কাউকে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত করার সুযোগ থাকবে না। আবার শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অযোগ্য কাউকে গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়ার সুযোগও কমবে। এটাই হবে প্রকৃত পরিবর্তন। প্রধানমন্ত্রী যদি একটি কথা পরিষ্কার করেন—ত্যাগ সম্মান পাবে, যোগ্যতা অগ্রাধিকার পাবে এবং অন্যায়ের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় থাকবে না—তাহলে দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে নতুন আস্থা তৈরি হবে।

এছাড়া প্রধানমন্ত্রী যে সোর্সের ওপর ভিত্তি করে সুপারিশ করছেন সেটাও দৈবিকভাবে যাচাই করা উচিত। কারণ সোর্স কি সঠিক তথ্য দিচ্ছেন নাকি অনিয়মের আশ্রয় নিচ্ছেন? বাংলাদেশের মানুষও একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি দেখতে চাইছে। সেই সংস্কৃতিতে প্রতিহিংসা থাকবে না। থাকবে ন্যায়বিচার। অন্ধ আনুগত্য থাকবে না। থাকবে যোগ্যতার মূল্যায়ন। তোষামোদ থাকবে না।

থাকবে সততা। আর দুঃসময়ে যারা পাশে ছিলেন, তাদের ত্যাগ বিস্মৃত হবে না। কারণ ক্ষমতা আসে-যায়। পদ আসে-যায়। কিন্তু ত্যাগের ইতিহাস থেকে যায়। সেই ইতিহাসের প্রতি সম্মান দেখানো শুধু দলের প্রতি দায়িত্ব নয়। এটি ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিও দায়িত্ব। দুঃসময়ের ত্যাগীদের যথাযথ মূল্যায়ন করুন। যোগ্যতার সঙ্গে ত্যাগের মর্যাদা দিন।

কারণ ত্যাগী মানুষকে সম্মান করা মানেই দলের ভবিষ্যৎকে শক্তিশালী করা। লেখক: অধ্যাপক (কৃষি) ও সাবেক ডিন, কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন অনুষদ এবং সাধারণ সম্পাদক, জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।