সকালেও কেউ বুঝতে পারেনি, দিনের শেষে তার নাম একটি অপরাধের ঘটনায় উঠবে। পরিচিত স্কুলে পড়ে। পরিচিত পরিবার। বাসায় কোনো অভাব নেই। বাবা-মা দুজনই প্রতিষ্ঠিত। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় চারটি, আশপাশে নিজেদের আরও ৭টি বাড়ি।
পড়াশোনার খরচ নিয়ে ভাবতে হয় না। হাতে স্মার্টফোন আছে, পকেটেও প্রয়োজনের চেয়ে কম টাকা নেই। অথচ পরিবারের অজান্তেই সে এমন একটি বন্ধুবৃত্তে ঢুকে পড়েছে, যেখানে মাদক, মারামারি, ভয় দেখানো কিংবা নানা ধরনের অপরাধকে স্বাভাবিক বলে মনে করা হয়। শেষ পর্যন্ত একটি ঘটনার সূত্র ধরে বিষয়টি সামনে আসে। পরিবারের লোকজনও তখন জানতে পারেন, সন্তানের জীবনের একটি বড় অংশ তাদের অগোচরেই চলছিল।
ঘটনাটি বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা সংলগ্ন সোলমাইদ এলাকার। পরিবারের সদস্যরা জানতে পারেন গত শুক্রবার রাতে। ১৫ বছরের কিশোর এখন পুলিশ হেফাজতে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। ছিনতাই, মাদক সেবন, ইভটিজিং। আর সব অপরাধই সে করে বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে। কিশোরের ভাষ্য মতে, এগুলো এখন তার নেশা, করতে ভালো লাগে। এসব কাজে এক ধরনের এডভেঞ্চার খুঁজে পায় সে।
তাকে দেখে কেউ ভয় পাচ্ছে, এটা ভাবতে তার ভালো লাগে, পুলকিত বোধ করে। ধনী এবং প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান অয়ন। বাবা শহরের নামকরা ব্যবসায়ী, মা সমাজসেবামূলক নানা সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। অয়নের যা চাওয়া, তা মুহূর্তের মধ্যেই তার সামনে হাজির হয়ে যায়। দামি গ্যাজেট, ব্র্যান্ডেড পোশাক, পকেটভর্তি টাকা— কোনো কিছুরই অভাব নেই তার। কিন্তু এই প্রাচুর্যের আড়ালে যে জিনিসটার সবচেয়ে বড় অভাব ছিল, তা হলো সঠিক দিকনির্দেশনা এবং বাবা-মায়ের গুণগত সময়।
ছোটবেলা থেকেই অয়নের যেকোনো ভুলকে তার পরিবার ‘বাচ্চা মানুষের ভুল’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। স্কুল থেকে অভিযোগ এলে টাকা বা ক্ষমতার জোরে তা ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে। এই প্রশ্রয়ই আস্তে আস্তে অয়নকে এক অন্ধকার পথের দিকে ঠেলে দেয়। শুরুটা হয়েছিল বন্ধুদের সঙ্গে দামি গাড়িতে মাঝরাতে রেসিং করা দিয়ে। এরপর জড়িয়ে পড়ে মাদক, জুয়া এবং সাইবার অপরাধের সঙ্গে।
ক্ষমতার দাপট দেখাতে গিয়ে এক সহপাঠীকে মারাত্মকভাবে হেনস্তা করে। ভুক্তভোগী পরিবার আইনের আশ্রয় নেয়। মিডিয়া এবং পুলিশের হস্তক্ষেপে পুরো বিষয়টি সামনে চলে আসে। অয়নকে যখন জুভেনাইল হোমে (কিশোর সংশোধন কেন্দ্র) পাঠানো হয়, তখন তার অভিভাবকেরা বুঝতে পারেন, টাকা দিয়ে সব কিছু কেনা যায় না। প্রতিবেদনের শুরুটা সদ্য পাওয়া দুটি সত্য ঘটনা দিয়ে।
কিন্তু মনোবিজ্ঞানী আর অপরাধবিজ্ঞানীদের ভাষায়— সম্প্রতি এ ধরনের অপরাধ প্রবণতা শিশু-কিশোরদের মধ্যে অনেক বেশি বেড়ে গেছে। এটা সমাজের জন্য রীতিমতো হুমকিস্বরূপ। এর ঊর্ধ্বগতি থামাতে হলে সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে পরিবারের সদস্য এবং অভিভাবকদের। নইলে এই নীরব মহামারি কঠিন আকার ধারণ করবে।
মানবাধিকার সংগঠন ‘হেলপ ফর ইউ’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ৮ মাসে দেশে শিশু ও কিশোরীদের ওপর বহু নির্যাতন ও ধর্ষণের ঘটনা রেকর্ড হয়েছে, যার অনেকগুলোর সঙ্গে বড়লোকের আদুরে দুলাল হিসেবে পরিচিত স্থানীয় কিশোর বা তরুণ অপরাধী চক্রের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। তাদের অপরাধের ধরনগুলো হলো, আধিপত্য বিস্তার ও গ্রুপভিত্তিক মারামারি।
ছিনতাই ও অস্ত্র প্রদর্শন করে আতঙ্ক সৃষ্টি। মাদক সেবন। ইন্টারনেটে বা সামাজিক মাধ্যমে গ্যাং কালচার তৈরি ও হ্যাকিং বা সাইবার বুলিং। কিছু ক্ষেত্রে চুক্তিভিত্তিক হত্যাকাণ্ড বা টার্গেটেড কিলিং এবং টিকটক বা ফেসবুকের মতো সামাজিক মাধ্যমে নিজেদের জাহির করার প্রবণতা। অধ্যাপক ডা. হেদায়েত হোসেন। ঢাকার একটি মাদক মুক্তি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন।
একজন রোগীর কাছ থেকে পাওয়া ঘটনা উল্লেখ করে রূপালী বাংলাদেশকে তিনি বলেন, ‘নামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়া এক কিশোর তার পরিবারের চোখের সামনে স্বাভাবিক জীবনযাপন করলেও অনলাইনে যোগাযোগের পরিধি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে তৈরি হয়েছিল নতুন পরিচিতি। সেই সূত্র ধরেই সে জড়িয়ে পড়ে ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ডে।
পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য, সামাজিক অবস্থান কিংবা সন্তানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান— কোনোটিই তাকে অপরাধের ঝুঁঁকি থেকে দূরে রাখতে পারেনি। ’ অধ্যাপক হেদায়েত আরও বলেন, ‘অনেকেই মনে করেন অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা কিশোর অপরাধের গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি। কিন্তু অর্থের অভাব না থাকলেও একজন কিশোর অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে, তার অজস্র প্রমাণ মিলছে।
পারিবারিক দূরত্ব, একাকিত্ব, ভুল বন্ধুত্ব, সহপাঠীদের চাপ, মাদক ও সহিংসতার সহজলভ্যতা, অনলাইনে ঝুঁকিপূর্ণ যোগাযোগ, অপরাধকে রোমাঞ্চ হিসেবে দেখার প্রবণতা এবং সন্তানের প্রতি পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে এসব কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। ’ কিশোর অপরাধ বৃদ্ধি নিয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন সময়ে তাঁদের বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছেন।
এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘কিশোর-কিশোরীদের মাঝে ধৈর্য এবং সহনশীলতার তীব্র ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। কিশোরদের সুস্থ বিনোদনের জায়গা নেই। তারা অতিরিক্ত মাত্রায় ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ভিডিও গেমে আসক্ত হয়ে পড়ছে, যা তাদের মানসিক অস্থিরতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। পরিবার, সমাজ, রাজনীতি বা স্কুল কমিটি— সব জায়গাতেই মারামারি, কলহ ও দ্বন্দ্বের এক ধরনের নেতিবাচক সংস্কৃতি চলছে।
শিশুরা এই পরিবেশ দেখে বড় হচ্ছে এবং অবচেতনভাবেই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ’ অধ্যাপক ডা. মেখলা সরকার রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘অনেক পরিবারে বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের গভীর মানসিক দূরত্ব থাকে। এই সুযোগেই কিশোররা মাদক বা কিশোর গ্যাংয়ের মতো অপরাধমূলক পথে পা বাড়ায়। সন্তানদের বকাঝকা না করে তাদের কথা খোলামেলাভাবে শুনতে হবে।
তার মানসিক চাহিদা বা শূন্যতা কোথায়, তা আগে বুঝতে হবে। সঠিক পারিবারিক গাইডলাইন না পেলে তারা সহজেই পথভ্রষ্ট হতে পারে। ’ অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ এস আই মল্লিক বলেন, “কিশোর অপরাধের পেছনে ‘কনডাক্ট ডিজঅর্ডার’ বা আচরণগত মানসিক সমস্যা ভূমিকা রাখে। এই সমস্যায় আক্রান্ত কিশোররা নিয়ম ভাঙা, মিথ্যা বলা, স্কুল পালানো, চুরি করা এবং পরবর্তীতে অপরাধ বা গ্যাং কালচারে জড়িয়ে পড়ে।
” মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিশোর বয়স একটি পরিবর্তনের সময়। এ বয়সে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা বাড়ে, পরিচয় তৈরির চেষ্টা চলে এবং সমবয়সীদের স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু ঝুঁকি মূল্যায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি বোঝার ক্ষমতা তখন পরিণত হয় না। ফলে বন্ধুর চাপ, দল থেকে বাদ পড়ার ভয়, নিজের সাহস প্রমাণের চেষ্টা কিংবা সাময়িক উত্তেজনায় ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে।
অপরাধ বিশ্লেষক অধ্যাপক সাইফুল আলম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে অভিভাবকেরা সন্তানের প্রতি দায়িত্ব পালনের বিকল্প হিসেবে ধরে নেন। স্কুলের বেতন দেওয়া হচ্ছে, কোচিংয়ের ব্যবস্থা করা হচ্ছে, প্রয়োজনের আগেই নতুন মোবাইল বা অন্যান্য জিনিস কিনে দেওয়া হচ্ছে। কাজের বুয়া বা চাকর রেখে দেওয়া হচ্ছে। একাধিক গাড়ির ড্রাইভার রাখা হচ্ছে সন্তানের জন্য।
কিন্তু সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত কথা বলা হচ্ছে কি না, তার বন্ধু কারা, কোথায় সময় কাটাচ্ছে, অনলাইনে কী করছে, আচরণে হঠাৎ কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না— এসব প্রশ্ন অনেক অভিভাবকই করেন না। ফলে একই বাড়িতে থেকেও বাবা-মা ও সন্তানের মধ্যে তৈরি হয় এক ধরনের অদৃশ্য দূরত্ব। আর এখানেই বাসা বাঁধে নিষিদ্ধ জগত। ’ তিনি আরও বলেন, ‘সন্তানের আচরণে হঠাৎ পরিবর্তনকে সব সময় বয়সের স্বাভাবিক দোষ বলে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়।
ঘন ঘন মেজাজ পরিবর্তন, পরিবার থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, পুরোনো বন্ধুদের এড়িয়ে নতুন গোষ্ঠীর সঙ্গে সময় কাটানো, অস্বাভাবিক খরচ, পড়াশোনায় অনাগ্রহ, রাত জাগা, গোপন অনলাইন যোগাযোগ, মিথ্যা বলা কিংবা আগ্রাসী আচরণ— এসবের কোনো একটি দেখা গেলেই যে কিশোর অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে, তা নয়। কিন্তু একাধিক পরিবর্তন একসঙ্গে দেখা দিলে অভিভাবকের সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।
অনেক পরিবারে মুখোমুখি কথোপকথনের সময় কমে গেছে। সন্তান কী ভাবছে, কী নিয়ে উদ্বিগ্ন, কার সঙ্গে মিশছে কিংবা কোনো সমস্যায় পড়েছে কি না— এসব জানার বদলে অনেক সময় বাবা-মায়ের সঙ্গে তার যোগাযোগ সীমিত হয়ে থাকে পড়াশোনা, পরীক্ষার ফল, টাকা-পয়সা এবং শাসনের মধ্যে। সন্তানের জীবনে প্রয়োজনীয় বস্তু আছে; কিন্তু প্রয়োজনীয় আবেগগত উপস্থিতি নেই, এমন পরিস্থিতি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
’ অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার রুহুল কবির রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একটি কিশোরের হাতে শুধু ফোন থাকে না; থাকে বিশাল ভাচ্যুয়াল জগৎ। সেখানে বন্ধু আছে, অপরিচিত মানুষ আছে, বিভিন্ন ধরনের কনটেন্ট আছে, গোপন গ্রুপ আছে এবং কখনো কখনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগও থাকে।
’ রুহুল কবিরের মতে, সচ্ছল পরিবারের সন্তানদের হাতে বয়সের তুলনায় বেশি অর্থ থাকে। সেই অর্থ কোথায় যাচ্ছে, কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, তার কোনো হিসাব অনেক পরিবার রাখে না। এর কারণে, অনলাইন জুয়া, প্রতারণা, অবৈধ লেনদেন কিংবা অন্যের প্ররোচনায় অর্থসংক্রান্ত অপরাধে জড়ানোর ঝুঁঁকি তৈরি হয়।



















