শুধু পাঠ্যবইয়ের শিক্ষা নয়, শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলাবোধ, নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ ও আত্মবিশ্বাসী মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাচ্ছেন সেন্ট মেরী’স গার্লস হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ সি. বীনা খ্রীস্টিনা রোজারিও। শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি পরিচিত ‘সিস্টার মেরী খ্রীস্টিনা’ নামে। প্রায় চার দশকের শিক্ষকতা জীবনে কখনো শিক্ষক, কখনো অভিভাবক, আবার কখনো পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করে আসছেন তিনি।
তার নেতৃত্বে গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার তুমিলিয়া মিশন এলাকায় অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি মেয়েদের শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। ১৯৮৪ সালে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হন সি. বীনা খ্রীস্টিনা রোজারিও। কর্মজীবনের শুরুতে দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার ধানজুড়ি সেন্ট ফ্রান্সিস উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন তিনি। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের একপর্যায়ে ২০০৯ সালে সেন্ট মেরী’স গার্লস হাইস্কুলের প্রধানের দায়িত্ব নেন।
২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠানটিতে কলেজ শাখা চালু হলে তিনি অধ্যক্ষের দায়িত্ব পান। এরপর থেকে একাডেমিক কার্যক্রমের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন, সহশিক্ষা কার্যক্রম এবং শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। স্থানীয় ও প্রতিষ্ঠানসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সি. বীনা খ্রীস্টিনা রোজারিও কালীগঞ্জ পৌরসভার বাঙ্গালহাওলা গ্রামের বাসিন্দা।
সেন্ট মেরী’স প্রতিষ্ঠান থেকেই মাধ্যমিক পর্যায়ের পড়াশোনা শেষ করেন তিনি। পরে ঢাকার তেজগাঁও কলেজ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে প্রথম শ্রেণিতে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি গার্লস গাইড, সায়েন্স ল্যাব ও ওয়াইসিএসের মডারেটর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। প্রায় এক দশক ধরে এসব কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত থেকে শিক্ষার্থীদের সহশিক্ষা কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করতে ভূমিকা রাখছেন।
শিক্ষকতা জীবনে বিভিন্ন পর্যায়ে সম্মাননাও পেয়েছেন সি. বীনা খ্রীস্টিনা রোজারিও। জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক, আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে শিক্ষা ব্যক্তিত্ব হিসেবে সম্মাননা, নেপাল-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পুরস্কার ও মাদার তেরেসা স্বর্ণপদকসহ বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। তবে পুরস্কার বা পদককে নিজের সবচেয়ে বড় অর্জন মনে করেন না তিনি।
তার কাছে শিক্ষার্থীদের সাফল্যই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। তার দর্শন—শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করলেই হবে না, তাদের ভালো মানুষ হিসেবেও গড়ে উঠতে হবে। প্রতিষ্ঠানের একাধিক শিক্ষক-শিক্ষিকা জানান, অধ্যক্ষ সি. বীনা খ্রীস্টিনা রোজারিও তাদের কাছে একজন অভিভাবকের মতো। পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলার বিষয়ে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন।
শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি, পাঠদানের মান, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক, পরীক্ষার ফলাফল ও সহশিক্ষা কার্যক্রম—প্রতিটি বিষয় তিনি নিয়মিত তদারকি করেন। এক শিক্ষক বলেন, ‘প্রিন্সিপাল ম্যাডামের কাছে শুধু ভালো ফলাফলই গুরুত্বপূর্ণ নয়। তিনি চান শিক্ষার্থীরা সৎ, দায়িত্বশীল ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে উঠুক। এ কারণে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত সমস্যা ও পড়াশোনার বিষয়েও তিনি সময় দেন।
’ প্রতিষ্ঠানসংশ্লিষ্টরা জানান, সি. বীনা খ্রীস্টিনা রোজারিও দায়িত্ব নেওয়ার পর শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নের পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রমেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিতর্ক প্রতিযোগিতা, পাঠচক্র, বই পড়া, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এতে তাদের আত্মবিশ্বাস ও নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
একান্ত সাক্ষাৎকারে সি. বীনা খ্রীস্টিনা রোজারিও বলেন, ‘প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম তদারকি করা আমার প্রধান দায়িত্ব। তবে আমার কাছে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ পরিবেশ এবং তাদের সঠিকভাবে গড়ে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ভালো ফলাফল নয়, তারা যেন নৈতিক, দায়িত্বশীল ও মানবিক মানুষ হিসেবে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে—সেদিকেই আমরা বেশি গুরুত্ব দিই।
’ তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধ্যে সুন্দর সম্পর্ক থাকলে শিক্ষার পরিবেশও ভালো থাকে। এজন্য শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি, পাঠদানের মান, পরীক্ষার ফলাফল ও সহশিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি তাদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশের বিষয়েও নজর দেওয়া হয়। ’ প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সেন্ট মেরী’স গার্লস হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রায় ১ হাজার ৭০০ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে।
শিক্ষক ও কর্মচারী মিলিয়ে রয়েছেন প্রায় ৬০ জন। চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় প্রতিষ্ঠানটির ২৭ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে এবং পাসের হার প্রায় ৯৭ শতাংশ। মেয়েদের নিরাপত্তার বিষয়টিকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানান প্রতিষ্ঠানসংশ্লিষ্টরা। প্রাচীরবেষ্টিত ক্যাম্পাস ও নিয়ন্ত্রিত প্রবেশব্যবস্থার পাশাপাশি কিশোরীদের মাদক, অতিরিক্ত মোবাইল ব্যবহার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে নিয়মিত সচেতন করা হয়।
মাদকবিরোধী সচেতনতা, মাদক সেবনের কুফল ও বিভিন্ন ঝুঁকি সম্পর্কে কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থাও রয়েছে। সি. বীনা খ্রীস্টিনা রোজারিও বলেন, ‘মেয়েদের জন্য নিরাপদ, সুন্দর ও অনুকূল শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা আমাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সৃজনশীল কাজে শিক্ষার্থীদের যুক্ত করা হলে তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ে এবং নেতৃত্বের গুণ তৈরি হয়।
’ দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তিনি নিজের জীবনকে সেবার কাজে উৎসর্গ করেছেন। তার নেতৃত্বে সেন্ট মেরী’স গার্লস হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষা ও শৃঙ্খলার পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধকে গুরুত্ব দেওয়ার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, সেটিই প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য বলে মনে করেন শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা। শিক্ষার্থীদের স্বপ্নপূরণের পথ সহজ করতে একজন শিক্ষক কতটা অভিভাবক হয়ে উঠতে পারেন—সি. বীনা খ্রীস্টিনা রোজারিওর দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন তারই একটি উদাহরণ।
শ্রেণিকক্ষের পাঠদান থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্ব বিকাশ, নিরাপত্তা, নৈতিকতা ও ভবিষ্যৎ নির্মাণ—সব ক্ষেত্রেই তাঁর লক্ষ্য একটাই, আলোকিত ও মানবিক প্রজন্ম তৈরি করা।



















