যশোরের শার্শা উপজেলার স্বরূপদাহ গ্রামে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এক ব্যবসায়ীর ৩৫ বিঘা জমির মাছের ঘের দখলে নেওয়া এবং এলাকায় থাকতে ৬০ লাখ টাকা দাবির অভিযোগ উঠেছে হুমায়ুন কবির ওরফে ঝনুর বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী তবিবুর রহমানের অভিযোগ, টাকা না দেওয়ায় প্রাণভয়ে তিনি বাড়িছাড়া। পরিবারের সদস্যরা নিজেদের ঘেরে মাছ ধরতে গেলেও তাদের বাধা, মারধর ও হুমকি দেওয়া হচ্ছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ঝনু বলেছেন, ৬০ লাখ টাকা চাঁদা নয়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তাকে অস্ত্র মামলায় ফাঁসানোর কারণে যে টাকা খরচ হয়েছে, সেই মামলার খরচ তিনি তবিবুরের কাছে দাবি করেছেন।
ঘের দখলের অভিযোগও অস্বীকার করে তিনি বলেন, ঘের থেকে তিনি কোনো মাছ ধরেননি, বরং অন্যদের লুট ঠেকাতে ঘেরটি পাহারা দিয়ে রেখেছেন। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগে স্বরূপদাহে উত্তেজনা বিরাজ করছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত বিরোধের নিষ্পত্তি না হলে যেকোনো সময় সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে। তবিবুর রহমান স্বরূপদাহ গ্রামের ইউসুফ আলীর ছেলে।
আর হুমায়ুন কবির ঝনু একই গ্রামের জোহর আলী গাজীর ছেলে। স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় দু’জনের মধ্যে ঘনিষ্ঠ ব্যাবসায়িক সম্পর্ক ছিল এবং বিভিন্ন ব্যবসায় তারা অংশীদার ছিলেন। তবিবুর রহমান বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর একপর্যায়ে ঝনু তাকে বাড়িতে ডেকে ব্যবসার হিসাব করতে বলেন। হিসাব শেষে তার কাছে প্রায় সাড়ে ১২ লাখ টাকা পাওনা থাকার কথা জানান তিনি।
কিন্তু উল্টো ঝনু তার কাছে ৬০ লাখ টাকা দাবি করেন বলে অভিযোগ তবিবুরের। তিনি বলেন, কেন ৬০ লাখ টাকা দিতে হবে জানতে চাইলে বলে- এমনিই দিতে হবে। টাকা না দিলে সমস্যা হবে। এরপর থেকে জীবন ও মামলার ভয়ে আমি বাইরে পালিয়ে বেড়াচ্ছি। এই সুযোগে আমার ৩৫ বিঘা জমির মাছের ঘেরও দখলে নেওয়া হয়েছে। তবিবুরের অভিযোগ, আমার বাবা ও পরিবারের লোকজন ঘেরে মাছ ধরতে গেলে মারধর, অকথ্য ভাষায় গালাগাল ও হুমকি দেওয়া হয়।
মাছও ধরতে দেওয়া হচ্ছে না। তবিবুরের বাবা ইউসুফ আলী বলেন, ‘আমাদের ঘেরে আমাদেরই জাল ফেলতে দেয় না ঝনুর লোকজন। জাল ফেললে জাল ছিনিয়ে নিয়ে ঘের থেকে তাড়িয়ে দেয়। ’ মা সহিতা বেগম বলেন, আমার ছেলেকে বাড়িতে উঠতে দেওয়া হচ্ছে না। আমাদের জমি ও মাছের ঘের হয়েও আমরা ব্যবহার করতে পারছি না। আমরা এর বিচার চাই। সরেজমিনে স্বরূপদাহের মাঠে গিয়ে ঘেরটি অনেকটা পরিত্যক্ত অবস্থায় দেখা যায়।
ঘেরপাড়ে কোনো পাহারাদার বা দৃশ্যমান স্থাপনা চোখে পড়েনি। মাঠে থাকা কয়েকজন চাষি জানান, ঘেরটি তবিবুর রহমানের পরিবারের- এমনটাই তারা জানেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই তবিবুরকে ঘেরে যেতে দেওয়া হচ্ছে না বলে তারা জানান। স্থানীয় চাষি ফজলুর রহমান বলেন, আমরা গ্রামের লোকজন মিলে ঝনুকে বিষয়টি মীমাংসা করে ফেলতে বলেছি। এভাবে চলতে থাকলে যেকোনো সময় বড় ধরনের সমস্যা হতে পারে।
রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা শরিফুল, সফিকুল ও হাফিজুরসহ কয়েকজনও জানান, আগে তবিবুরকে ঘেরে যেতে কেউ বাধা দিত না। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই পরিস্থিতি বদলে গেছে। অভিযোগের বিষয়ে হুমায়ুন কবির ঝনু বলেন, আমি তার কাছে ৬০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করিনি। আমাকে মিথ্যা নাটক সাজিয়ে অস্ত্র মামলায় ফাঁসানো হয়েছিল।
ওই মামলায় আমার যে টাকা খরচ হয়েছে, সেই মামলার খরচ দাবি করেছি। ঝনুর দাবি, নাভারণ গরুর হাটের সামনে থেকে তাকে তুলে নিয়ে ঢাকার মুগদা থানার একটি অস্ত্র মামলায় ফাঁসানো হয়েছিল এবং এর পেছনে তবিবুরের কারসাজি ছিল। পরে জামিনে বের হয়ে তিনি ঝিকরগাছা এলাকায় বসবাস করতেন বলেও জানান। ঝনু আরও বলেন, আমি আগাগোড়াই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সোহরাব চেয়ারম্যান ছিলেন অনেক ক্ষমতাধর। তবিবুর ছিলেন স্বরূপদাহ গ্রামের মেম্বার। ওই সময় এলাকায় ব্যবসা করতে হলে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলতে হতো। তারপরও আমাকে মিথ্যা অস্ত্র মামলায় আটক দেখানো হয়েছিল। ঘের দখলের অভিযোগও অস্বীকার করে ঝনু বলেন, ঘেরটি আমি দখল করে রাখিনি এবং কোনো মাছও ধরিনি। বর্ষার পানিতে ঘেরে প্রাকৃতিকভাবে মাছ ঢুকলে গ্রামের লোকজন হয়তো তা ধরতে পারে।
বরং ঘেরপাড়ে তবিবুরের উত্তোলন করা বালি যাতে অন্য কেউ নিয়ে যেতে না পারে, সে জন্য আমি পাহারা দিয়ে রেখেছি। বিরোধের সমাধান প্রসঙ্গে ঝনু বলেন, বিষয়টি নিয়ে যশোর জেলা ও শার্শা উপজেলা পর্যায়ের বিএনপির নেতৃবৃন্দের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। নেতারা যে সিদ্ধান্ত দেবেন, তা মেনে নেবেন। মামলার খরচ হিসেবে টাকা দিতে বললে নেবেন, আবার মাফ করে দিতে বললেও আপত্তি নেই বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে ঘের মালিক তবিবুর বলেন, আমি নিজেও ওই অস্ত্র মামলার আসামি ছিলাম। তাহলে আমি কীভাবে তাকে ডিবি দিয়ে আটক করালাম? সে তো আমার কেস-পার্টনারও ছিল। তিনি নিজের বাড়ি ও ৩৫ বিঘা মাছের ঘেরের শান্তিপূর্ণ দখল ফিরে পেতে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তার দাবি, রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সুযোগে কেউ যেন তার বৈধ সম্পত্তি দখলে নিতে না পারে, সে বিষয়ে সাংবাদিকদের লেখনীর মাধ্যমে প্রশাসনের কাছে সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।
স্থানীয়দেরও দাবি, দুই পক্ষের অভিযোগ তদন্ত করে ঘেরের প্রকৃত মালিকানা ও দখল পরিস্থিতি যাচাই করা হোক। পাশাপাশি হুমকি, মারধর বা জোরপূর্বক দখলের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হোক। দ্রুত বিরোধের নিষ্পত্তি না হলে পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা করছেন তারা। এ ব্যাপারে শার্শা থানার ওসি শামিমুল হক বলেন, এ ব্যাপারে থানায় কেউ কোন অভিযোগ করেনি।
অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।


















