কুষ্টিয়ার গড়াই নদীতে ৩ দিনব্যাপী নৌকা বাইচে লাখো মানুষের মিলনমেলা সৃষ্টি হয়েছে। শনিবার দ্বিতীয় দিন। রোববার সমাপনী অনুষ্ঠানে পুরস্কার বিতরণ করা হবে। প্রায় চার বছর পর কুষ্টিয়ার গড়াই নদীতে অনুষ্ঠিত নৌকাবাইচ ঘিরে ফিরে এসেছে সেই চিরচেনা লোকজ আমেজ।
নদীর তীরে বসেছে গ্রামীণ মেলা, আর মানুষের মিলনমেলায় প্রাণ ফিরে পেয়েছে হারিয়ে যেতে বসা বাংলার ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ। উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে ঘোড়াই ঘাট থেকে হরিপুর ব্রিজ এলাকা পর্যন্ত। নৌকাবাইচ দেখতে গড়াই নদীর তীরে ভিড় করতে থাকেন বিভিন্ন বয়সি মানুষ। পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব নিয়ে দূর-দূরান্ত থেকে আসেন অনেকে। শুক্রবার বিকেল ৪টায় আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় প্রতিযোগিতা।
নদীর বুকে নৌকা ছুটে চলার সঙ্গে সঙ্গে তীরে থাকা দর্শকরাও উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠেন। প্রিয় নৌকা এগিয়ে গেলে করতালি, স্লোগান ও উল্লাসে মাঝিদের উৎসাহ দেন তারা। বৈঠার ছন্দ আর নৌকার গতির সঙ্গে দর্শকদের উচ্ছ্বাসে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে গড়াই নদীর দুই পাড়। তিন দিনব্যাপী নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে নদীর তীরে বসেছে গ্রামীণ মেলা। মেলায় দেশীয় খাবার, খেলনা ও বিভিন্ন সামগ্রীর পসরা সাজিয়ে বসেছেন দোকানিরা।
শিশু-কিশোরদের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মেলায় ঘুরতে দেখা যায় অনেককে। কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার কয়া ইউনিয়নবাসীর উদ্যোগে তিন দিনব্যাপী এ নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক ও কয়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ইমরান হোসেন ইউনুসের সভাপতিত্বে প্রতিযোগিতার উদ্বোধন করেন কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের প্রশাসক ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ সোহবার উদ্দিন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন কুষ্টিয়া-১ (দৌলতপুর) আসনের সংসদ সদস্য রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা। প্রধান বক্তা ছিলেন সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য ফরিদা ইয়াসমিন। বিশেষ অতিথি ছিলেন কুষ্টিয়া সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম বিপ্লব, জেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোজাক্কির রহমান রাব্বি, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক শরিফুল ইসলাম শরিফসহ অন্যরা।
আয়োজকরা বলেন, নৌকাবাইচ শুধু একটি প্রতিযোগিতা নয়, এটি গ্রামবাংলার দীর্ঘদিনের লোকজ সংস্কৃতি ও মানুষের মিলন মেলার অংশ। হারিয়ে যেতে বসা এ ঐতিহ্যকে ধরে রাখা এবং স্থানীয় মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধন দৃঢ় করাই আয়োজনের অন্যতম উদ্দেশ্য। গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য ধরে রাখতেই এই নৌকাবাইচের আয়োজন। দীর্ঘদিন এ ধরনের আয়োজন না থাকায় যুবসমাজের একটি অংশ মাদকসহ নানা অপসংস্কৃতির দিকে ঝুঁকে পড়ছে।
যুবসমাজকে মাদক থেকে দূরে রাখা, তাদের সুস্থ বিনোদনের সুযোগ তৈরি করা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তুলে ধরাই এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য। এ ধরনের আয়োজনের মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধন আরও দৃঢ় হবে। ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে নৌকাবাইচসহ গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলার আয়োজন করা হবে। কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের প্রশাসক অধ্যক্ষ সোহবার উদ্দিন বলেন, ‘গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা ও লোকজ সংস্কৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে এ ধরনের আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ।
দেশ থেকে মাদক নির্মূল করতে হলে যুবসমাজকে খেলাধুলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে। নতুন প্রজন্মকে গ্রামবাংলার ঐতিহ্য, লোকজ সংস্কৃতি ও শেকড়ের সঙ্গে পরিচিত করে তুলতে নৌকাবাইচের মতো আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ’ কুষ্টিয়া-১ আসনের সংসদ সদস্য রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা বলেন, প্রতিবছর যেন এ নৌকাবাইচের আয়োজন অব্যাহত থাকে। পাশাপাশি গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলাগুলোও নিয়মিত আয়োজনের উদ্যোগ নিতে হবে।
এসব আয়োজন লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ধরে রাখার পাশাপাশি যুবসমাজকে মাদকসহ বিভিন্ন সামাজিক অপরাধ থেকে দূরে রাখতে ভুমিকা রাখে। রোববার ফাইনাল প্রতিযোগিতা ও পুরস্কার বিতরণের মধ্য দিয়ে শেষ হবে তিন দিনব্যাপী এ আয়োজন।



















