পাহাড় মানেই কি সুউচ্চ কোনো চূড়া বা আকাশছোঁয়া কোনো শিখর? সবসময় তা নয়। কখনো কখনো পাহাড় তার সৌন্দর্য লুকিয়ে রাখে অদ্ভুত এক সমতলে। চারপাশে সবুজ পাহাড়ের ঢেউ, নিচে মেঘের আস্তরণ আর মাথার ওপর খোলা আকাশ নিয়ে এমনই এক রহস্যময় ভূখণ্ডের নাম কপিতাল।
বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে দাঁড়িয়ে থাকা কপিতাল বাংলাদেশের সহজে পৌঁছানো যায় এমন কোনো পর্যটনকেন্দ্র নয়। এখানে নেই রিসোর্ট, নেই পাকা সড়ক, নেই শহুরে কোলাহল। বরং আছে দীর্ঘ পথ, খাড়া পাহাড়, ঘন বাঁশঝাড়, জোঁকের ভয়, গলা-সমান ঘাস আর পাহাড়ি জনপদের সরল আতিথেয়তা। যারা পাহাড়কে শুধু দেখেন না, পাহাড়কে অনুভব করতে চানÑকপিতাল তাদের জন্য।
দূর থেকে দেখা সেই অদ্ভুত পাহাড় সুংসাংপাড়ার জুমের কিনারায় দাঁড়ালে দূরে সারি সারি পাহাড় চোখে পড়ে। সবুজের ঢেউ যেন একটির পর একটি গড়িয়ে গেছে দিগন্তের দিকে। কিন্তু সেই অসংখ্য পাহাড়ের ভিড়েও একটি পাহাড় আলাদা করে নজর কাড়ে। দূর থেকে মনে হয়, বিশাল কোনো ছুরি দিয়ে পাহাড়টির মাথা সমান করে দেওয়া হয়েছে। অন্য পাহাড়ের মতো তীক্ষ্ণ কোনো চূড়া নেই।
বরং চূড়াটি অনেকটা বিশাল টেবিলের মতো সমতল। সেটিই কপিতাল। প্রায় ৩ হাজার ফুট উচ্চতার এই পাহাড়ের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ তার উচ্চতা নয়, বরং এই অস্বাভাবিক সমতল চূড়া। চূড়ায় উঠলে চারপাশের পাহাড়, আকাশ আর মেঘ মিলে তৈরি করে এক অসাধারণ দৃশ্যপট। নামের আড়ালে ইতিহাসের গল্প কপিতালের নাম নিয়েও রয়েছে ভিন্নধর্মী গল্প। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, একসময় ভারতের মিজোরামভিত্তিক একটি সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী এই দুর্গম ও সমতল পাহাড়কে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করত।
পাহাড়টির অবস্থান ও সমতল চূড়া তাদের জন্য ছিল কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক। স্থানীয়দের মুখে মুখে জায়গাটি পরিচিতি পায় ‘ক্যাপিটাল’ নামে। সময়ের সঙ্গে স্থানীয় উচ্চারণে সেই নামই হয়ে যায় ‘কপিতাল’। তবে আজ সেই অতীতের চিহ্নের চেয়ে প্রকৃতির রূপই বেশি দৃশ্যমান। সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা কপিতাল এখন অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের কাছে এক রহস্যময় গন্তব্য।
শুরুটা যত সহজ, পথ তত কঠিন কপিতালের পথে যাত্রার শুরুতে হয়তো মনে হবে, এ আর এমন কী! আনারসের জুম পেরিয়ে পাহাড়ি পথে হাঁটা শুরু করলেই ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে দৃশ্য। কিছুদূর যেতেই শুরু হয় খাঁড়া চড়াই। কোথাও মাটির পথ, কোথাও গাছের শিকড়, কোথাও পিচ্ছিল ঢাল। এরপর পথ ঢুকে যায় ঘন বাঁশঝাড়ের ভেতর। বাঁশঝাড়ের এই পথ দেখতে যতটা সুন্দর, হাঁটতে ততটাই কঠিন।
বাতাস কম, চারপাশে স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ। তার ওপর রয়েছে জোঁকের উপদ্রব। বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। ভেজা মাটি, পিচ্ছিল পাথর আর পাহাড়ি ঝিরির পানি মিলিয়ে প্রতিটি পদক্ষেপেই থাকতে হয় সতর্ক। গলা-সমান ঘাসের সেই শেষ লড়াই কপিতালের পথে সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অংশগুলোর একটি সামিটের আগের ঘাসবন। কোথাও কোথাও ঘাস মানুষের গলা পর্যন্ত উঠে যায়।
সামনে থাকা মানুষটিকেও তখন পুরোপুরি দেখা যায় না। গাইড পথ দেখিয়ে সামনে এগিয়ে যান, আর পেছনের দল অনুসরণ করে। এই অংশটিই যেন কপিতালের সঙ্গে শেষ লড়াই। ঘাসের ভেতর দিয়ে পথ কেটে এগিয়ে যেতে যেতে যখন হঠাৎ ঘাস শেষ হয়ে যায়, তখন চোখের সামনে খুলে যায় একেবারে অন্য এক পৃথিবী। চারদিকে আর কোনো উঁচু দেয়াল নেই। সামনে শুধু আকাশ। নিচে মেঘ। দূরে পাহাড়ের সারি।
দীর্ঘ পথের ক্লান্তি তখন মুহূর্তেই মিলিয়ে যায়। মেঘের সমুদ্রের ওপর দাঁড়িয়ে কপিতালের চূড়ায় দাঁড়িয়ে পাহাড় দেখার অনুভূতি অন্যরকম। নিচে তাকালে মনে হয়, পাহাড়গুলো যেন মেঘের মধ্যে ভেসে আছে। দূরের নীল পাহাড়গুলো একে অন্যের সঙ্গে মিশে গেছে। কখনো মেঘ এসে পুরো চূড়াকে ঢেকে দেয়, আবার কয়েক মুহূর্ত পর বাতাসে মেঘ সরে গিয়ে খুলে যায় দিগন্ত।
ভোরের সময় এই দৃশ্য আরও মোহময়। সূর্যের আলো যখন মেঘের ওপর পড়ে, তখন পুরো পাহাড়ি অঞ্চল যেন সোনালি আলোয় ভেসে ওঠে। কপিতালের আসল সৌন্দর্য তাই কোনো ছবিতে পুরোপুরি ধরা পড়ে না। সেখানে যেতে হয়, দাঁড়াতে হয় এবং কিছুক্ষণ নীরবে দেখতে হয়। এক পাহাড়ে থামে না ভ্রমণ কপিতালের সৌন্দর্যের আরেকটি দিক হলোÑ এই ভ্রমণ শুধু একটি পাহাড়কে ঘিরে নয়।
একই অভিযানে দেখা মিলতে পারে বাকলাই ঝর্ণা, ৎলাবং বা ডাবল ফলস, জাদিপাই ঝর্ণা, কেওক্রাডং, বগালেক ও সুংসাংপাড়ার। বাকলাই ঝর্ণার গর্জন, জাদিপাইয়ের জলধারা, ৎলাবংয়ের বুনো সৌন্দর্য আর কেওক্রাডংয়ের পাহাড়ি আবহÑ সব মিলিয়ে পুরো যাত্রাটিই হয়ে ওঠে একটি দীর্ঘ পাহাড়ি গল্প। থানচি না রুমাÑদুই পথেই কপিতাল কপিতালে যাওয়ার জন্য রুমা ও থানচিÑদুই দিক থেকেই পথ রয়েছে।
রুমা হয়ে গেলে পথটি হতে পারে বান্দরবান থেকে রুমা বাজার, এরপর বগালেক, কেওক্রাডং, পাসিংপাড়া, সুংসাংপাড়া, থাইক্ষ্যংপাড়া হয়ে কপিতাল। অন্যদিকে থানচি হয়ে যাত্রা করলে বাকলাইপাড়া ও বাকলাই ঝর্ণা পেরিয়ে থাইক্ষ্যংপাড়ার ওয়াই জংশনে পৌঁছাতে হয়। সেখান থেকে শুরু হয় কপিতালের শেষ খাঁড়া চড়াই। অভিজ্ঞ ট্রেকাররা অনেক সময় একদিকে ঢুকে অন্যদিকে বের হওয়ার পথ বেছে নেন।
এতে একই পথ আবার হাঁটতে হয় না এবং এক যাত্রাতেই বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের বেশ কয়েকটি আকর্ষণ দেখা সম্ভব হয়। ছয় দিনের পাহাড়ি অভিযান কপিতাল ভ্রমণকে সাধারণ একদিনের ভ্রমণ হিসেবে ভাবার সুযোগ নেই। পুরো সার্কিট শেষ করতে সাধারণত কয়েক দিন সময় হাতে রাখতে হয়। প্রথম দিন বান্দরবান থেকে থানচি গিয়ে গাইড ও প্রয়োজনীয় নিবন্ধন সম্পন্ন করে যাত্রা শুরু করা যায়।
পরের দিন বাকলাই পাড়ার দিকে দীর্ঘ ট্রেক এবং বাকলাই ঝর্ণা দেখা। তৃতীয় দিনে বাকলাই ঝর্ণা থেকে কয়েক ঘণ্টার পথ পেরিয়ে থাইক্ষ্যং পাড়ার ওয়াই জংশন। সেখান থেকে ব্যাগ রেখে শুরু হতে পারে কপিতালের সামিট অভিযান। পরের দিন সুংসাংপাড়ার দিকে যাত্রা করতে করতে দেখা যেতে পারে ৎলাবং। এরপর জাদিপাই ঝর্ণা, কেওক্রাডং ও বগালেক হয়ে রুমা বাজার দিয়ে বান্দরবান ফেরার পরিকল্পনা করা যায়।
অবশ্য পাহাড়ে কোনো সময়সূচিই চূড়ান্ত নয়। আবহাওয়া, নিরাপত্তা, স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা এবং দলের সক্ষমতার ওপর পুরো পরিকল্পনা নির্ভর করে।


















