রুপালি পর্দার রোমান্টিক হিরো হিসেবে কোটি দর্শকের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন চিত্রনায়ক রিয়াজ আহমেদ। সালমান শাহ পরবর্তী ঢালিউডে এক বিশাল শূন্যতা পূরণ করেছিলেন তিনি। তবে বাস্তব জীবনের এক অনাকাঙ্ক্ষিত পটপরিবর্তনে তিনি এখন পর্দার অন্তরালে, লোকচক্ষুর সম্পূর্ণ আড়ালে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই খোঁজ নেই এক সময়ের এই শীর্ষ নায়কের। এদিকে, চলচ্চিত্রপাড়ায় গুঞ্জন গত বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে চুপিসারে দেশত্যাগ করেছেন রিয়াজ! তবে এ নিয়ে নায়কের এবং তার পরিবারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এয়ারপোর্টের একটি সূত্র রূপালী বাংলাদেশকে জানিয়েছে, আমরা এমন কিছু টের পাইনি।
ল্যান্ডপোর্ট দিয়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে আমাদের জানার কথা না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের ঠিক পরদিনই, অর্থাৎ ৬ আগস্ট রাতে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যান রিয়াজ। এমিরেটস এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে দুবাই হয়ে তার যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার কথা ছিল। তবে দেশের তৎকালীন অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং গোয়েন্দা সংস্থার কড়া নজরদারির কারণে ইমিগ্রেশন পুলিশ বিমানবন্দর থেকেই তাকে আটকে দেয় এবং ফেরত পাঠায়।
সেই ঘটনার পর থেকেই মূলত তার দেশত্যাগের চেষ্টার খবর বারবার নতুন করে ডালপালা মেলতে শুরু করে। জুলাই বিপ্লবের সময় শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের বিপক্ষে রাজপথে এবং বিতর্কিত ‘আলো আসবেই’ হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে রিয়াজের সক্রিয় অবস্থানের কারণে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের হয়। সম্প্রতি জুলাই অভ্যুত্থান-সংশ্লিষ্ট দুটি হত্যা মামলায় আগাম জামিন চেয়ে পাননি রিয়াজ।
গত ৩ সেপ্টেম্বর আদালত তার জামিন আবেদনটি খারিজ করে দেন। দীর্ঘদিন রিয়াজকে কোনো পাবলিক প্লেসে বা এফডিসিতে দেখা যায়নি। এই দীর্ঘ অনুপস্থিতিই জন্ম দিয়েছে নানা গুঞ্জনের, যার সর্বশেষ সংযোজন ছিল তার ‘মৃত্যুর গুজব’। শেখ হাসিনার পতনের আগ পর্যন্ত কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বেশ সক্রিয় ছিলেন রিয়াজ।
দলের বিভিন্ন প্রচার-প্রচারণা ছাড়াও বিটিভি ও এফডিসির একাধিক কর্মসূচিতে তাকে সামনের সারিতে দেখা যেত। ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই তিনি আত্মগোপনে চলে যান। সেদিন থেকেই তার ব্যবহৃত ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরটি বন্ধ রয়েছে। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির কোনো দায়িত্বশীল নেতাই বলতে পারছেন না রিয়াজ এখন কোথায় আছেন। রিয়াজের নিখোঁজ থাকা নিয়ে চলচ্চিত্রপাড়ায় ডালপালা মেলেছে নানা জল্পনা-কল্পনা।
সবচেয়ে জোরালো গুঞ্জনটি হলো, তিনি গোপনে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন। আবার অনেকের মতে, তিনি দেশ ছাড়েননি; আইনি জটিলতা বা জনরোষের ভয়ে দেশেরই কোনো নিরাপদ আস্তানায় গা ঢাকা দিয়ে আছেন। তবে কোনো পক্ষ থেকেই রিয়াজের বর্তমান অবস্থানের সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য মেলেনি। দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকার সুযোগ নিয়ে মাঝে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে রিয়াজের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে।
বেশ কিছু ফেসবুক পেজ ও গ্রুপ থেকে দাবি করা হয় যে, আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় চিত্রনায়ক রিয়াজ মারা গেছেন। সে সময় খবরটি মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায় এবং কোটি ভক্ত ও সহশিল্পীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সৃষ্টি করে। মৃত্যুর খবরটি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়লে নীরবতা ভাঙতে বাধ্য হয় রিয়াজের পরিবার। গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে রিয়াজের স্ত্রী একে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ‘ভিত্তিহীন গুজব’ বলে উড়িয়ে দেন।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন, এ ধরনের খবর একেবারেই সত্য নয়। তিনি যেখানেই আছেন, ভালো আছেন। সে সময় পরিবার থেকে মৃত্যুর খবর অস্বীকার করা হলেও, রিয়াজ বর্তমানে ঠিক কোন দেশে বা কোথায় অবস্থান করছেন, সে ব্যাপারে তার স্ত্রীও স্পষ্ট করে কিছু বলেননি। নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ‘বাংলার নায়ক’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ঢালিউডে পা রেখেছিলেন রিয়াজ।
এরপর ‘প্রাণের চেয়ে প্রিয়’, ‘হৃদয়ের আয়না’ কিংবা হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসের জনপ্রিয় চরিত্র ‘শুভ্র’ হয়ে তিনি দর্শকদের মন জয় করেন। ২০২২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘অপারেশন সুন্দরবন’ ছিল তার অভিনীত সর্বশেষ সিনেমা। এক সময়ের বিমান বাহিনীর প্রশিক্ষিত পাইলট থেকে ঢালিউডের শীর্ষ আসন জয় করা রিয়াজ, রাজনীতির ঘূর্ণিপাকে পড়ে আজ এক রহস্যময় অন্তরালে।
ভক্তদের মনে এখন একটাই প্রশ্ন—কবে কাটবে এই রহস্যের কুয়াশা? তিনি কি আবার কখনো প্রকাশ্যে আসবেন, নাকি এই অন্তরালই হবে তার জীবনের নতুন বাস্তবতা?


















