রাত নামলেই শহরটা যেন একটু অন্যরকম হয়ে যায়। দিনের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়, দোকানের শাটার নামে, রাস্তায় গাড়ির সারি পাতলা হয়ে আসে। অথচ এই নীরবতার ভেতরেও মানুষের একটি অদৃশ্য অপেক্ষা জেগে থাকে, কখন আলো নিভে যাবে?
কখন আবার ফিরে আসবে বিদ্যুৎ? কোনো ঘরে শিশুর পড়ার টেবিলে বাতি জ¦লে ওঠে, আবার হঠাৎ নিভে যায়; কোনো কারখানায় যন্ত্রের শব্দ থেমে যায়; কোনো দোকানের ফ্রিজ, কোনো অফিসের কম্পিউটার কিংবা হাসপাতালের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির ওপর নেমে আসে অনিশ্চয়তার ছায়া। বিদ্যুৎ যেন এখন শুধু একটি সেবা নয়, মানুষের প্রতিদিনের জীবনের সঙ্গে মিশে থাকা এক অস্থির অপেক্ষার নাম।
এই অন্ধকারের পেছনে তাকালে দেখা যায়, বিদ্যুতের সংকট একা আসেনি। তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে গ্যাসের টানাপোড়েন। যে গ্যাস শিল্পকারখানার চাকা ঘোরায়, বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ¦লে, ঘরের রান্নার চুলায় আগুন জ¦ালায়-সেই গ্যাসের সরবরাহ যখন চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না, তখন তার অভিঘাত এক জায়গায় আটকে থাকে না। ছড়িয়ে পড়ে অর্থনীতির নানা স্তরে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন তার প্রথম বড় ধাক্কাগুলোর একটি। বিদ্যুৎ একটি দেশের অর্থনীতির নিছক ভোগ্যপণ্য নয়; এটি উৎপাদনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। একটি কারখানার মেশিন, কৃষকের সেচযন্ত্র, হাসপাতালের যন্ত্রপাতি, দোকানের সংরক্ষণ ব্যবস্থা কিংবা তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমÑ সবকিছুই কোনো না কোনোভাবে নির্ভর করে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের ওপর।
ফলে সরবরাহে অনিশ্চয়তা দেখা দিলে ক্ষতি শুধু কয়েক ঘণ্টার উৎপাদন বন্ধ থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ব্যবসার খরচ বাড়ে, উৎপাদন পরিকল্পনা ব্যাহত হয়, বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত পিছিয়ে যায় এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাতেও তার প্রভাব পড়ে। এখানে আরেকটি বাস্তবতা আমাদের ভাবতে বাধ্য করে। গ্যাসের ঘাটতি পূরণে আমদানিনির্ভর জ¦ালানির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
কিন্তু আমদানি মানেই ব্যয়, আর আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা মানেই অনিশ্চয়তা। ফলে জ¦ালানি সংগ্রহের প্রশ্নটি শুধু সরবরাহের প্রশ্ন থাকে না; এর সঙ্গে যুক্ত হয় অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার বিষয়টিও। এমন একটি সময়ে গত কয়েক দিন ধরে দেশের বিভিন্ন সংবাদপত্রে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে নানা প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে।
এর মধ্যে ১৬ আগস্ট দৈনিক রূপালী বাংলাদেশের প্রথম পাতায় প্রকাশিত ‘গ্যাসের বিদ্যুৎ অটোরিকশায়’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি একটি ভিন্ন দিক সামনে এনেছে। শিরোনামটি পড়লে প্রথমে প্রশ্ন জাগতেই পারেÑ অটোরিকশা তো গ্যাসে চলে না, তাহলে গ্যাসের বিদ্যুৎ অটোরিকশায় কীভাবে? উত্তরটি আসলে আমাদের বিদ্যুৎ ব্যবহারের একটি অদৃশ্য চিত্রের দিকে নিয়ে যায়।
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ করতে যে বিদ্যুৎ লাগে, তার একটি অংশ আসে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে। অর্থাৎ গ্যাস সরাসরি অটোরিকশার জ¦ালানি নয়, কিন্তু সেই গ্যাস থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ তার চলার শক্তিতে পরিণত হচ্ছে। পেট্রোবাংলার ১৫ আগস্টের তথ্যও বিষয়টির একটি তাৎপর্যপূর্ণ ছবি তুলে ধরে। ওইদিন দেশীয় উৎস ও দুটি এলএনজি টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্রিডে মোট ২ হাজার ৪২৫ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করা হয়।
এর মধ্যে ৯৩১ এমএমসিএফডি যায় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে। এই হিসাবের প্রতিটি ঘনফুট গ্যাসের গুরুত্ব তাই আলাদা করে বোঝানোর প্রয়োজন নেই। সীমিত সম্পদ যখন বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হচ্ছে, তখন সেই বিদ্যুতের কোথায় কতটা চাহিদা তৈরি হচ্ছে, সেটিও পরিকল্পনার অংশ হওয়া স্বাভাবিক। এখানেই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার প্রসঙ্গটি গুরুত্বপূর্ণ। রূপালী বাংলাদেশের প্রতিবেদনে বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে দেশে এমন অটোরিকশার সংখ্যা ৫০ থেকে ৬০ লাখ হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এত বিপুলসংখ্যক যানবাহন শুধু পরিবহন ব্যবস্থার একটি অংশ নয়; বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও এটি একটি বড় ভোক্তা শ্রেণি। কিন্তু এ খাতের প্রকৃত বিদ্যুৎ ব্যবহার কত, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব আছে কি নাÑ সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। সমস্যার জায়গাটি অটোরিকশা নয়, বরং ব্যবস্থাপনায়। এসব যানবাহন লাখো মানুষের যাতায়াত সহজ করেছে, বহু পরিবারের আয়ের উৎস তৈরি করেছে।
শহরের পাশাপাশি গ্রামীণ জনপদেও এগুলোর ওপর মানুষের নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। ফলে সংকটের সমাধান যদি শুধু ‘বন্ধ করে দেওয়া’ হয়, তাহলে তা সমস্যার বদলে নতুন সামাজিক ও অর্থনৈতিক জটিলতা তৈরি করবে। বরং প্রয়োজন এই খাতকে নিয়মের মধ্যে আনা। কোথায় চার্জিং হবে, কী ধরনের বৈদ্যুতিক সংযোগ ব্যবহার করা হবে, মিটার কীভাবে নির্ধারিত হবে, কোন সময়ে বেশি চাপ পড়ে এবং কীভাবে সেই চাপ সামলানো যায়Ñ এসব প্রশ্নের উত্তর থাকা দরকার।
রাতের সময়ে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক যান চার্জে বসলে স্থানীয় বিতরণ ব্যবস্থার ওপর যে বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে, সেটিও অবহেলা করার মতো বিষয় নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, বিদ্যুতের এই ব্যবহার বৈধ ও নিরাপদ পথে হচ্ছে কি না। আবাসিক সংযোগের আড়ালে বাণিজ্যিক চার্জিং, অননুমোদিত সংযোগ কিংবা অপরিকল্পিত বৈদ্যুতিক স্থাপনা থাকলে তার প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ বিভাগের রাজস্বে পড়ে না; স্থানীয় বিতরণব্যবস্থা, ট্রান্সফরমার এবং নিরাপত্তার ওপরও চাপ তৈরি হয়।
তবে এই বাস্তবতা আমাদের আরেকটি বিষয় মনে করিয়ে দেয়-বিদ্যুৎ ব্যবহারের ধরন বদলে যাচ্ছে। আগে যে চাহিদার হিসাব করা হতো, সেখানে এখন নতুন নতুন ব্যবহার যুক্ত হচ্ছে। বৈদ্যুতিক যানবাহন তার একটি উদাহরণ। আগামী দিনে এর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। ফলে আজ যে বিষয়টিকে ছোট বলে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে, কাল সেটিই বড় চাহিদায় পরিণত হতে পারে। এ কারণে জ¦ালানি পরিকল্পনায় শুধু উৎপাদন বাড়ানোর চিন্তা যথেষ্ট নয়।
প্রয়োজন চাহিদাকে বোঝা। কোন খাতে কত বিদ্যুৎ যাচ্ছে, কখন যাচ্ছে এবং কোথায় অপচয় হচ্ছেÑ এই তথ্যগুলোকে পরিকল্পনার কেন্দ্রে আনতে হবে। বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রে দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগগুলোও খুঁজে দেখতে হবে। স্মার্ট মিটার, পরিকল্পিত চার্জিং, নির্দিষ্ট চার্জিং স্টেশন কিংবা নবায়নযোগ্য উৎসের ব্যবহারÑ এসব এখন আর দূরের কোনো ধারণা নয়; প্রয়োজন অনুযায়ী এগুলোকে বাস্তব ব্যবস্থার অংশ করা যেতে পারে।
কিন্তু এর বাইরেও একটি বড় প্রশ্ন আছে। আমরা কি জ¦ালানি নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি চিন্তা করছি, নাকি প্রতিবার সংকট দেখা দিলে তাৎক্ষণিক সমাধান খুঁজছি? একটি দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা বাড়ানো অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেই কেন্দ্রগুলো চালানোর জ¦ালানি কোথা থেকে আসবে, তার দাম কত হবে, সরবরাহ কতটা নির্ভরযোগ্য থাকবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে বিকল্প ব্যবস্থা কীÑ এসব প্রশ্নের উত্তরও একই সঙ্গে খুঁজতে হবে।
আজকের সংকট তাই আমাদের সামনে একটি সুযোগও তৈরি করেছে। পুরোনো পদ্ধতিতে সমস্যাকে শুধু সাময়িকভাবে সামলে না রেখে যদি এখনই ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্ত কাঠামো তৈরি করা যায়, তাহলে এই দুর্ভোগের একটি ইতিবাচক শিক্ষা থাকতে পারে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, আমদানির ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ উৎপাদনের উৎসে বৈচিত্র্য, নবায়নযোগ্য জ¦ালানির ব্যবহার এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারে দক্ষতা-সবকিছুকে একটি সমন্বিত পরিকল্পনার মধ্যে আনতে হবে।
কারণ উন্নয়ন কখনো শুধু দৃশ্যমান অবকাঠামোর নাম নয়। একটি সেতু নির্মাণ করা যায়, কিন্তু সেই সেতুর ওপর দিয়ে চলা অর্থনীতিকে সচল রাখতে যে শক্তি প্রয়োজন, তার নিশ্চয়তাও থাকতে হয়। একটি শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা যায়, কিন্তু সেখানে উৎপাদনের নির্ভরযোগ্য পরিবেশ না থাকলে বিনিয়োগের স্বপ্ন পূর্ণতা পায় না। একটি শহরকে আধুনিক করা যায়, কিন্তু সেই শহরের মানুষের জীবন যদি প্রতিদিন জ¦ালানি অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করে, তাহলে উন্নয়নের ছবিটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
অন্ধকার তাই শুধু বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার নাম নয়। কখনো অন্ধকার নামে পরিকল্পনার ঘাটতিতে, কখনো সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হলে, কখনো ভবিষ্যতের চাহিদাকে সময়মতো বুঝতে না পারলে। বিদ্যুতের আলো ফিরিয়ে আনা হয়তো তুলনামূলক সহজ; কিন্তু সেই আলো যাতে বারবার অনিশ্চয়তার মুখে না পড়ে, সেই ব্যবস্থা গড়ে তোলাই আসল চ্যালেঞ্জ। আজ প্রশ্ন হওয়া উচিত শুধু-বিদ্যুৎ কখন আসবে?
প্রশ্ন হওয়া উচিতÑ কীভাবে এমন একটি জ¦ালানি ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়, যেখানে দেশের উন্নয়নের গতি জ¦ালানির অনিশ্চয়তায় বারবার থেমে যাবে না? বাংলাদেশের সামনে উন্নয়নের যে পথ খোলা, সেটি দীর্ঘ। সেই পথে আরও শিল্প হবে, আরও মানুষ বিদ্যুৎ ব্যবহার করবে, নতুন প্রযুক্তি আসবে, পরিবহন ব্যবস্থার ধরন বদলাবে। চাহিদা কমবে না; বরং বাড়বে।
তাই আজকের সংকটকে শুধু আজকের সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। আগামী দিনের প্রয়োজনকে মাথায় রেখেই এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। শেষ পর্যন্ত উন্নয়নের স্বপ্নের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলোÑ তার আলো কতটা স্থায়ী। আজ যদি সংকট আমাদের সেই স্থায়িত্বের প্রশ্নটি নতুন করে ভাবতে শেখায়, যদি আমরা জ¦ালানিকে শুধু একটি পণ্য নয়, জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের ভিত্তি হিসেবে দেখতে শিখি, তাহলে এই অন্ধকারও একদিন একটি শিক্ষার কারণ হয়ে উঠতে পারে।
গ্যাসের সংকটে বিদ্যুৎ আজ হয়তো আমাদের অস্বস্তিতে ফেলেছে, কিন্তু এই অস্বস্তিই যদি ভবিষ্যতের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সাহস জোগায়, তাহলে অন্ধকারে থেমে যাবে না উন্নয়নের স্বপ্ন। বরং সেই অন্ধকার পেরিয়েই খুঁজে নিতে হবে আরও স্থায়ী, নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য আলোর পথ।


















