প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে মহাকাশে অস্ত্র মোতায়েনের কথা স্বীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন বিমানবাহিনীর সেক্রেটারি ট্রয় মেইঙ্ক জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের স্পেস ফোর্সের কাছে কক্ষপথে থাকা অন-অরবিট স্পেস কন্ট্রোল উইপনস বা মহাকাশ নিয়ন্ত্রণ অস্ত্র রয়েছে।
মেরিল্যান্ডের ন্যাশনাল হারবারে অনুষ্ঠিত এয়ার, স্পেস অ্যান্ড সাইবার কনফারেন্সে বক্তব্য দেওয়ার সময় এ তথ্য জানান মেইঙ্ক। তিনি বলেন, এসব সক্ষমতা শত্রুপক্ষের সম্ভাব্য হামলা থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে সুরক্ষিত রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে অস্ত্রগুলোর ধরন, সংখ্যা, অবস্থান কিংবা কখন সেগুলো কক্ষপথে পাঠানো হয়েছে—এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করেননি মার্কিন এই কর্মকর্তা।
এসব অস্ত্র ইতোমধ্যে পরীক্ষা করা হয়েছে কি না, সে বিষয়েও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। মেইঙ্কের এই বক্তব্যকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতদিন যুক্তরাষ্ট্র মহাকাশযুদ্ধের জন্য বিভিন্ন সামরিক সক্ষমতা তৈরির কথা প্রকাশ করলেও কক্ষপথে অস্ত্র মোতায়েনের বিষয়টি এত সরাসরি স্বীকার করেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে ভবিষ্যৎ সামরিক সংঘাতে মহাকাশের গুরুত্ব আরও বাড়তে পারে।
বর্তমানে যোগাযোগ, নেভিগেশন, ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্তকরণ, গোয়েন্দা নজরদারি ও সামরিক লক্ষ্য নির্ধারণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্যাটেলাইটের ওপর নির্ভরশীল যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের সামরিক শক্তিগুলো। ফলে কোনো সংঘাতে প্রতিপক্ষের স্যাটেলাইটের কার্যক্রম ব্যাহত করা গেলে তার সামরিক সক্ষমতার ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্র কী ধরনের অস্ত্র কক্ষপথে মোতায়েন করেছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
বিশেষজ্ঞদের একটি অংশের ধারণা, এসব ব্যবস্থা সরাসরি স্যাটেলাইট ধ্বংসের কাইনেটিক অস্ত্র না-ও হতে পারে। এর পরিবর্তে ইলেকট্রনিক যুদ্ধের সরঞ্জাম, জ্যামিং প্রযুক্তি বা অন্যান্য নন-কাইনেটিক ব্যবস্থা থাকতে পারে। কারণ কোনো স্যাটেলাইট ধ্বংস করা হলে বিপুল পরিমাণ মহাকাশীয় ধ্বংসাবশেষ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে, যা নিজেদের ও মিত্রদের স্যাটেলাইটের জন্যও বিপজ্জনক হতে পারে।
মহাকাশ নিয়ন্ত্রণ সক্ষমতার মধ্যে শুধু স্যাটেলাইট ধ্বংসের প্রযুক্তিই অন্তর্ভুক্ত নয়। প্রতিপক্ষের স্যাটেলাইটের যোগাযোগ ব্যাহত করা, সেন্সর অকার্যকর করা কিংবা মহাকাশভিত্তিক সামরিক ব্যবস্থার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করার প্রযুক্তিও এর আওতায় পড়তে পারে। ফলে ‘মহাকাশে অস্ত্র’ বলতে ঠিক কী ধরনের ব্যবস্থা বোঝানো হয়েছে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির প্রকৃত সক্ষমতার ওপর।
যুক্তরাষ্ট্র তার মহাকাশভিত্তিক সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে চীন ও রাশিয়ার কার্যক্রমকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করে আসছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, দেশ দুটি যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ, বাধাগ্রস্ত বা সম্ভাব্যভাবে আক্রমণের সক্ষমতা বাড়াচ্ছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের এ স্বীকারোক্তির পর মহাকাশে নতুন করে অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মহাকাশ নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ভিক্টোরিয়া স্যামসনের মতে, যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে কক্ষপথে অস্ত্র থাকার কথা স্বীকার করায় চীন ও রাশিয়াও নিজেদের মহাকাশভিত্তিক সামরিক কর্মসূচি সামনে আনার সুযোগ পেতে পারে। এতে এক দেশের অস্ত্র মোতায়েনকে অন্য দেশ পরবর্তী পদক্ষেপের যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের বক্তব্য, মহাকাশে এসব সক্ষমতা মূলত প্রতিরোধ ও আত্মরক্ষার জন্য প্রয়োজন।
মেইঙ্কের ভাষায়, মহাকাশ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং সেখানে স্বাধীনভাবে কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা ধরে রাখা জরুরি। সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে মহাকাশ যে ভবিষ্যৎ সামরিক প্রতিযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠছে, সেই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হলো। ভবিষ্যতের সংঘাতে স্থল, আকাশ ও সমুদ্রের পাশাপাশি স্যাটেলাইট ও মহাকাশভিত্তিক সামরিক সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।



















