আজ রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
২৮ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ৩০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
২৭°C
সর্বোচ্চ: ৩৩°C
সর্বনিম্ন: ২৬°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৭৬%

লোনাপানির প্রভাবে দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিজমি হারাচ্ছেন কৃষকরা

  • MIT ERP
  • Update Time : 11:13:27 pm, Saturday, 12 September 2026
  • 9

লোনাপানির প্রভাবে দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিজমি হারাচ্ছেন কৃষকরা

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত ও সমুদ্রের লোনাপানির আস্তরণে বিষাক্ত হয়ে উঠছে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকার আবাদি জমি। লোনাপানির কারণে দেশের অন্যতম প্রধান খাদ্যভান্ডার দক্ষিণাঞ্চল এখন ভয়াবহ অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।

আন্তর্জাতিক এক নতুন গবেষণায় ওই এলাকার কৃষকদের আশঙ্কাজনক এক বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণা বলছে, লবণাক্ততা ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে ধানের ফলন মাত্র ২০ শতাংশ কমে গেলেই এই অঞ্চলের প্রায় ৮৯ শতাংশ কৃষক আবাদ বন্ধ করে দেওয়ার চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবেন। ধান চাষ ছেড়ে তারা আবাদি জমিকে লাভজনক চিংড়ি ঘের, সমন্বিত কাঁকড়া চাষ কিংবা অন্য অকৃষি ও বিকল্প জীবিকায় রূপান্তর করবেন।

কৃষকদের এই বাধ্যবাধকতামূলক রূপান্তর আগামীতে দেশের জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তাকে ভয়ংকর বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেবে। গবেষণার সারসংক্ষেপ ও পটভূমি গবেষণা প্রকাশনা সংস্থা ‘স্প্রিঞ্জার নেচার’-এর পিয়ার-রিভিউড সাময়িকী ডিসকাভার ফুডে উপকূলীয় কৃষির এই চিত্র তুলে ধরে গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণাপত্রটির মূল শিরোনাম ছিল— ‘বাংলাদেশি কোস্টাল রাইস ফার্মার্স নেভিগেট এনভারমেন্টাল আনসার্টেনিটি থ্রু অ্যাডাপ্টিভ ম্যানেজমেন্ট স্ট্র্যাটেজিস’।

অস্ট্রেলিয়ার সেন্ট্রাল কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেন্টার ফর রিজিওনাল ইকোনমিকস অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন’-এর গবেষক দল এটি পরিচালনা করে। গবেষণার প্রধান লেখক ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চ ফেলো ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জবা রানী সরকার। সহলেখক হিসেবে যুক্ত ছিলেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক জন রোলফ এবং সহযোগী অধ্যাপক ড. জয়নাথ আনন্দ।

খাদ্য নিরাপত্তা বনাম জীবনধারণের নির্মম লড়াই গবেষকদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তীব্র লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও কৃষক পরিবারগুলোর খাদ্য নিরাপত্তা ও মৌলিক জীবনধারণের তাগিদই মূলত ধান চাষ অব্যাহত রাখার প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। তবে গবেষণার মডেলিং বলছে, প্রতিকূলতার কারণে যদি ফসল উৎপাদন ১৫ থেকে ২০ শতাংশের বেশি স্থায়ীভাবে কমে যায়, তখন ক্ষতি সামলাতে না পেরে অধিকাংশ কৃষকই বাধ্য হয়ে বিকল্প জীবিকা হিসেবে ধানের চাষ ত্যাগ করবেন।

তারা জমি রূপান্তর করে বাণিজ্যিক চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষ বা উদ্যানজাত সবজি চাষের দিকে ঝুঁকে পড়বেন। এতে ধানের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন এক ধাক্কায় বহু নিচে নেমে আসবে। গবেষণার আওতা ও বৈজ্ঞানিক মডেল দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে বেশি জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ ও লবণাক্ততায় আক্রান্ত চারটি জেলাকে এই অনুসন্ধানের ক্ষেত্র হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে।

জেলাগুলো হলো— বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা ও পটুয়াখালী। গবেষক দল এই চার জেলার লোনাপানিতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হওয়া মোট ২০০ কৃষক পরিবারকে নমুনা হিসেবে গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করেন। তথ্য সংগ্রহের জন্য মাঠপর্যায়ে ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশন, সাক্ষাৎকার, প্রশ্নমালা পর্যবেক্ষণ এবং ‘কনটিনজেন্ট বিহেভিয়ার সার্ভে’ পরীক্ষা চালানো হয়।

পরবর্তীতে এসব তথ্য-উপাত্তকে ‘বাইনারি লজিস্টিক রিগ্রেশন’ নামক অর্থনৈতিক মডেলে বিশ্লেষণ করা হয়, যা ভবিষ্যতে জমিতে লোনা পানির পরিমাণ বৃদ্ধি, ধানের বাজারমূল্য ও ফলন হ্রাসের প্রক্ষেপণ কীভাবে উপকূলীয় কৃষকের সিদ্ধান্ত গ্রহণকে বদলে দেয়, তা নির্দেশ করে। উপকূলীয় কৃষকের মনস্তত্ত্ব ও আচরণগত সমীকরণ : গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যে উপকূলীয় পরিবেশ ও কৃষকদের আচরণগত বেশ কিছু চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, উপকূলীয় এলাকার প্রায় ৮৫ দশমিক ৫ শতাংশ কৃষকই ‘ঝুঁকি এড়িয়ে চলতে’ পছন্দ করেন। বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হওয়ায় তারা মানসিক ও আর্থিকভাবে এতটাই ভঙ্গুর যে, নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বা ভারি আর্থিক ঝুঁকি নিতে চরম আতঙ্কবোধ করেন। দেখা যায়, ধানের জাত নির্বাচনের ক্ষেত্রেও এই মনস্তত্ত্ব কাজ করে।

সামান্য ঝুঁকি নিতে সক্ষম কৃষকেরা ঐতিহ্যবাহী জাতের ধান চাষে মনোযোগী হন। অন্যদিকে, ঝুঁকি একদমই পছন্দ না করা এমন কৃষকেরা নিশ্চিত ফলন পেতে সরকার বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল ও লবণাক্ততা-সহনশীল আধুনিক ধানের জাত ব্যবহারকে অগ্রাধিকার দেন।

অর্থনৈতিক সীমারেখা ও ফলন হ্রাসের প্রক্ষেপণ গবেষণায় জানা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় মাটিতে ধানের সার্বিক ফলন যদি ২০ শতাংশের বেশি কমে যায়, তাহলে ৮৮ দশমিক ৭ শতাংশ ঝুঁকি-অনিচ্ছুক কৃষক এবং প্রায় ৭৫ দশমিক ২ শতাংশ ঝুঁকি গ্রহণকারী কৃষক সম্পূর্ণরূপে ধানের চাষ ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা শুরু করবেন। ফলন ২০ শতাংশের নিচে নামলে মাটির পেছনে বাড়তি সার ও পরিশ্রম ঢালাকে কৃষকেরা অর্থহীন মনে করেন।

প্রাতিষ্ঠানিক সেবার ঘাটতি ও প্রযুক্তির সম্ভাবনা গবেষণায় উঠে এসেছে স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধার চরম ঘাটতির কথা। জরিপে অংশ নেওয়া সিংহভাগ কৃষক জানান, সরকারি কৃষি সম্প্রসারণ সেবাকেন্দ্র থেকে সংকটকালে লবণসহনশীল উন্নত মানসম্পন্ন বীজ ও প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ পেতে তাদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। তবে এই সংকটের মধ্যেও আশার আলো দেখিয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি।

গবেষণায় তুলে ধরা হয়েছে যে, ফসল কাটার পর শস্য গুদামজাতকরণে ‘ইন্টারনেট অব থিংস’ ও আধুনিক সেন্সর প্রযুক্তি ব্যবহার করা গেলে আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা সঠিক মাত্রায় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ফলে ফসল কাটার পরবর্তী সময়ে গুদামে যে বিপুল পরিমাণ ধান নষ্ট হয়, সেই ক্ষতির পরিমাণ ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব। প্রান্তিক কৃষকের আকুতি : সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার প্রবীণ কৃষক আব্দুল মজিদ বলেন, ‘আমাদের জমিতে আর আগের মতো ধান হয় না।

জলোচ্ছ্বাস হয়ে জমিতে লোনাপানি আটকে থাকলে পরের তিন-চার বছর আর কোনো বীজের অঙ্কুর গজায় না। মাটি সাদা হয়ে নোনা ফুটে থাকে। ’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘পরিবার বাঁচাতে আমরা প্রতি বছর ঋণের টাকা মাথায় নিয়ে আবার লোনা জমিতে ধান বুনি। কিন্তু দিন শেষে সারের মূল টাকাই ওঠে না। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের ঘের করা ছাড়া বা ভিটা ছেড়ে শহরে দিনমজুরি করতে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।

’ গবেষকদের বক্তব্য গবেষণার প্রধান লেখক ড. জবা রানী সরকার মাঠের বাস্তবতার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘উপকূলীয় কৃষক পরিবারগুলো শুধু অর্থনৈতিক মুনাফার অঙ্ক কষে ধান চাষ করে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাদের অস্তিত্ব, পারিবারিক খাদ্য নিরাপত্তা ও গভীর সামাজিক-সাংস্কৃতিক বন্ধন। ’ তিনি আরও বলেন, কেবল ধানের সরকারি ক্রয়মূল্য বাড়িয়ে উপকূলের কৃষকদের জমিতে ধরে রাখা যাবে না।

জলবায়ুর ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে লবণসহনশীল আধুনিক প্রজাতির বীজ তাদের হাতে সময়মতো পৌঁছানো, আইওটি প্রযুক্তির প্রসার ঘটানো এবং কৃষকের মনস্তত্ত্ব বুঝে একটি নতুন ‘ঝুঁকিমুখী কৃষিনীতি’ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। সরকারি নীতিমালার বাস্তবতা : বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিআরআরআই) ইতিমধ্যে ব্রি ধান-৬৭, ৮৭, ৯৭ ও ৯৯-এর মতো কয়েকটি লবণসহনশীল জাত উদ্ভাবন করলেও মাঠপর্যায়ে বিতরণে সমন্বয়হীনতা রয়ে গেছে।

কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, বিআরআরআই বা পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বীজ তৈরি করলেও মাঠপর্যায়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষকের হাতে পৌঁছাতে মৌসুম পার হয়ে যায়। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে যদি জরুরি ভিত্তিতে কম মূল্যে বীজ সরবরাহ নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে এই গবেষণার আশঙ্কাই বাস্তবে রূপ নেবে। জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তায় আঘাত : বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, জাতীয় খাদ্য সংস্থানের একটি বিশাল জোগান আসে এই দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলীয় জেলাগুলো থেকে।

আমন ও বোরো মৌসুমে এখানকার ধান দেশের খাদ্য চাহিদায় বড় ভূমিকা রাখে। লবণাক্ততার কারণে যদি ধানের আবাদ বন্ধ হয়ে যায় এবং ৮৯ শতাংশ কৃষক জমিকে মাছের ঘেরে রূপান্তর করেন, তাহলে দেশে চালের মোট উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাবে। এর ফলে চালের জন্য আমদানিনির্ভরতা বাড়বে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে এবং বাজারে চালের দাম বাড়িয়ে দেবে।

সমাধানের রূপরেখা : গবেষণাপত্রে উপকূলীয় কৃষিব্যবস্থা পুনর্গঠন ও জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে নীতি-সুপারিশ করা হয়েছে। যেমন— একক ধান চাষের বদলে ‘ধান ও সমন্বিত মাছ চাষ’ ব্যবস্থার বিস্তার ঘটাতে হবে। লোনা মাটি ও লোনা পানিতে টিকে থাকার উপযোগী আধুনিক জাতের বীজ ল্যাব থেকে সরাসরি প্রান্তিক কৃষকদের হাতে সময়মতো পৌঁছাতে হবে।

জলবায়ু বিপর্যয়ে ফসলহানির ঝুঁকি কমাতে সরকারি অর্থায়নে ‘বিশেষ জলবায়ু ঝুঁকি কৃষি বীমা’ চালু করতে হবে। গুদামজাতকরণে আইওটি ও সেনসর প্রযুক্তির স্থানীয় সংস্করণ তৈরি করা এবং সহজ শর্তে কৃষি ঋণের ব্যবস্থা করা জরুরি। এবং স্থানীয় পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কৃষকদের পৃথক ঝুঁকির ক্ষমতা মূল্যায়ন করে আলাদা অভিযোজন পরামর্শ নিশ্চিত করতে হবে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

নদীভাঙন স্থায়ীভাবে ঠেকাতে বাঁধ নির্মাণের কথা বললেন মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক

লোনাপানির প্রভাবে দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিজমি হারাচ্ছেন কৃষকরা

Update Time : 11:13:27 pm, Saturday, 12 September 2026

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত ও সমুদ্রের লোনাপানির আস্তরণে বিষাক্ত হয়ে উঠছে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকার আবাদি জমি। লোনাপানির কারণে দেশের অন্যতম প্রধান খাদ্যভান্ডার দক্ষিণাঞ্চল এখন ভয়াবহ অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।

আন্তর্জাতিক এক নতুন গবেষণায় ওই এলাকার কৃষকদের আশঙ্কাজনক এক বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে। গবেষণা বলছে, লবণাক্ততা ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে ধানের ফলন মাত্র ২০ শতাংশ কমে গেলেই এই অঞ্চলের প্রায় ৮৯ শতাংশ কৃষক আবাদ বন্ধ করে দেওয়ার চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবেন। ধান চাষ ছেড়ে তারা আবাদি জমিকে লাভজনক চিংড়ি ঘের, সমন্বিত কাঁকড়া চাষ কিংবা অন্য অকৃষি ও বিকল্প জীবিকায় রূপান্তর করবেন।

কৃষকদের এই বাধ্যবাধকতামূলক রূপান্তর আগামীতে দেশের জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তাকে ভয়ংকর বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেবে। গবেষণার সারসংক্ষেপ ও পটভূমি গবেষণা প্রকাশনা সংস্থা ‘স্প্রিঞ্জার নেচার’-এর পিয়ার-রিভিউড সাময়িকী ডিসকাভার ফুডে উপকূলীয় কৃষির এই চিত্র তুলে ধরে গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণাপত্রটির মূল শিরোনাম ছিল— ‘বাংলাদেশি কোস্টাল রাইস ফার্মার্স নেভিগেট এনভারমেন্টাল আনসার্টেনিটি থ্রু অ্যাডাপ্টিভ ম্যানেজমেন্ট স্ট্র্যাটেজিস’।

অস্ট্রেলিয়ার সেন্ট্রাল কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সেন্টার ফর রিজিওনাল ইকোনমিকস অ্যান্ড সাপ্লাই চেইন’-এর গবেষক দল এটি পরিচালনা করে। গবেষণার প্রধান লেখক ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্ট ডক্টরাল রিসার্চ ফেলো ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জবা রানী সরকার। সহলেখক হিসেবে যুক্ত ছিলেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক জন রোলফ এবং সহযোগী অধ্যাপক ড. জয়নাথ আনন্দ।

খাদ্য নিরাপত্তা বনাম জীবনধারণের নির্মম লড়াই গবেষকদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তীব্র লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও কৃষক পরিবারগুলোর খাদ্য নিরাপত্তা ও মৌলিক জীবনধারণের তাগিদই মূলত ধান চাষ অব্যাহত রাখার প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। তবে গবেষণার মডেলিং বলছে, প্রতিকূলতার কারণে যদি ফসল উৎপাদন ১৫ থেকে ২০ শতাংশের বেশি স্থায়ীভাবে কমে যায়, তখন ক্ষতি সামলাতে না পেরে অধিকাংশ কৃষকই বাধ্য হয়ে বিকল্প জীবিকা হিসেবে ধানের চাষ ত্যাগ করবেন।

তারা জমি রূপান্তর করে বাণিজ্যিক চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষ বা উদ্যানজাত সবজি চাষের দিকে ঝুঁকে পড়বেন। এতে ধানের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন এক ধাক্কায় বহু নিচে নেমে আসবে। গবেষণার আওতা ও বৈজ্ঞানিক মডেল দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে বেশি জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ ও লবণাক্ততায় আক্রান্ত চারটি জেলাকে এই অনুসন্ধানের ক্ষেত্র হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে।

জেলাগুলো হলো— বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা ও পটুয়াখালী। গবেষক দল এই চার জেলার লোনাপানিতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হওয়া মোট ২০০ কৃষক পরিবারকে নমুনা হিসেবে গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করেন। তথ্য সংগ্রহের জন্য মাঠপর্যায়ে ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশন, সাক্ষাৎকার, প্রশ্নমালা পর্যবেক্ষণ এবং ‘কনটিনজেন্ট বিহেভিয়ার সার্ভে’ পরীক্ষা চালানো হয়।

পরবর্তীতে এসব তথ্য-উপাত্তকে ‘বাইনারি লজিস্টিক রিগ্রেশন’ নামক অর্থনৈতিক মডেলে বিশ্লেষণ করা হয়, যা ভবিষ্যতে জমিতে লোনা পানির পরিমাণ বৃদ্ধি, ধানের বাজারমূল্য ও ফলন হ্রাসের প্রক্ষেপণ কীভাবে উপকূলীয় কৃষকের সিদ্ধান্ত গ্রহণকে বদলে দেয়, তা নির্দেশ করে। উপকূলীয় কৃষকের মনস্তত্ত্ব ও আচরণগত সমীকরণ : গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যে উপকূলীয় পরিবেশ ও কৃষকদের আচরণগত বেশ কিছু চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, উপকূলীয় এলাকার প্রায় ৮৫ দশমিক ৫ শতাংশ কৃষকই ‘ঝুঁকি এড়িয়ে চলতে’ পছন্দ করেন। বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হওয়ায় তারা মানসিক ও আর্থিকভাবে এতটাই ভঙ্গুর যে, নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বা ভারি আর্থিক ঝুঁকি নিতে চরম আতঙ্কবোধ করেন। দেখা যায়, ধানের জাত নির্বাচনের ক্ষেত্রেও এই মনস্তত্ত্ব কাজ করে।

সামান্য ঝুঁকি নিতে সক্ষম কৃষকেরা ঐতিহ্যবাহী জাতের ধান চাষে মনোযোগী হন। অন্যদিকে, ঝুঁকি একদমই পছন্দ না করা এমন কৃষকেরা নিশ্চিত ফলন পেতে সরকার বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল ও লবণাক্ততা-সহনশীল আধুনিক ধানের জাত ব্যবহারকে অগ্রাধিকার দেন।

অর্থনৈতিক সীমারেখা ও ফলন হ্রাসের প্রক্ষেপণ গবেষণায় জানা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় মাটিতে ধানের সার্বিক ফলন যদি ২০ শতাংশের বেশি কমে যায়, তাহলে ৮৮ দশমিক ৭ শতাংশ ঝুঁকি-অনিচ্ছুক কৃষক এবং প্রায় ৭৫ দশমিক ২ শতাংশ ঝুঁকি গ্রহণকারী কৃষক সম্পূর্ণরূপে ধানের চাষ ছেড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা শুরু করবেন। ফলন ২০ শতাংশের নিচে নামলে মাটির পেছনে বাড়তি সার ও পরিশ্রম ঢালাকে কৃষকেরা অর্থহীন মনে করেন।

প্রাতিষ্ঠানিক সেবার ঘাটতি ও প্রযুক্তির সম্ভাবনা গবেষণায় উঠে এসেছে স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধার চরম ঘাটতির কথা। জরিপে অংশ নেওয়া সিংহভাগ কৃষক জানান, সরকারি কৃষি সম্প্রসারণ সেবাকেন্দ্র থেকে সংকটকালে লবণসহনশীল উন্নত মানসম্পন্ন বীজ ও প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ পেতে তাদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। তবে এই সংকটের মধ্যেও আশার আলো দেখিয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি।

গবেষণায় তুলে ধরা হয়েছে যে, ফসল কাটার পর শস্য গুদামজাতকরণে ‘ইন্টারনেট অব থিংস’ ও আধুনিক সেন্সর প্রযুক্তি ব্যবহার করা গেলে আর্দ্রতা ও তাপমাত্রা সঠিক মাত্রায় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। ফলে ফসল কাটার পরবর্তী সময়ে গুদামে যে বিপুল পরিমাণ ধান নষ্ট হয়, সেই ক্ষতির পরিমাণ ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব। প্রান্তিক কৃষকের আকুতি : সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার প্রবীণ কৃষক আব্দুল মজিদ বলেন, ‘আমাদের জমিতে আর আগের মতো ধান হয় না।

জলোচ্ছ্বাস হয়ে জমিতে লোনাপানি আটকে থাকলে পরের তিন-চার বছর আর কোনো বীজের অঙ্কুর গজায় না। মাটি সাদা হয়ে নোনা ফুটে থাকে। ’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘পরিবার বাঁচাতে আমরা প্রতি বছর ঋণের টাকা মাথায় নিয়ে আবার লোনা জমিতে ধান বুনি। কিন্তু দিন শেষে সারের মূল টাকাই ওঠে না। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের ঘের করা ছাড়া বা ভিটা ছেড়ে শহরে দিনমজুরি করতে যাওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না।

’ গবেষকদের বক্তব্য গবেষণার প্রধান লেখক ড. জবা রানী সরকার মাঠের বাস্তবতার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘উপকূলীয় কৃষক পরিবারগুলো শুধু অর্থনৈতিক মুনাফার অঙ্ক কষে ধান চাষ করে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাদের অস্তিত্ব, পারিবারিক খাদ্য নিরাপত্তা ও গভীর সামাজিক-সাংস্কৃতিক বন্ধন। ’ তিনি আরও বলেন, কেবল ধানের সরকারি ক্রয়মূল্য বাড়িয়ে উপকূলের কৃষকদের জমিতে ধরে রাখা যাবে না।

জলবায়ুর ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে লবণসহনশীল আধুনিক প্রজাতির বীজ তাদের হাতে সময়মতো পৌঁছানো, আইওটি প্রযুক্তির প্রসার ঘটানো এবং কৃষকের মনস্তত্ত্ব বুঝে একটি নতুন ‘ঝুঁকিমুখী কৃষিনীতি’ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি। সরকারি নীতিমালার বাস্তবতা : বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিআরআরআই) ইতিমধ্যে ব্রি ধান-৬৭, ৮৭, ৯৭ ও ৯৯-এর মতো কয়েকটি লবণসহনশীল জাত উদ্ভাবন করলেও মাঠপর্যায়ে বিতরণে সমন্বয়হীনতা রয়ে গেছে।

কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, বিআরআরআই বা পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বীজ তৈরি করলেও মাঠপর্যায়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষকের হাতে পৌঁছাতে মৌসুম পার হয়ে যায়। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে যদি জরুরি ভিত্তিতে কম মূল্যে বীজ সরবরাহ নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে এই গবেষণার আশঙ্কাই বাস্তবে রূপ নেবে। জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তায় আঘাত : বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, জাতীয় খাদ্য সংস্থানের একটি বিশাল জোগান আসে এই দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলীয় জেলাগুলো থেকে।

আমন ও বোরো মৌসুমে এখানকার ধান দেশের খাদ্য চাহিদায় বড় ভূমিকা রাখে। লবণাক্ততার কারণে যদি ধানের আবাদ বন্ধ হয়ে যায় এবং ৮৯ শতাংশ কৃষক জমিকে মাছের ঘেরে রূপান্তর করেন, তাহলে দেশে চালের মোট উৎপাদন আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাবে। এর ফলে চালের জন্য আমদানিনির্ভরতা বাড়বে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে এবং বাজারে চালের দাম বাড়িয়ে দেবে।

সমাধানের রূপরেখা : গবেষণাপত্রে উপকূলীয় কৃষিব্যবস্থা পুনর্গঠন ও জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে নীতি-সুপারিশ করা হয়েছে। যেমন— একক ধান চাষের বদলে ‘ধান ও সমন্বিত মাছ চাষ’ ব্যবস্থার বিস্তার ঘটাতে হবে। লোনা মাটি ও লোনা পানিতে টিকে থাকার উপযোগী আধুনিক জাতের বীজ ল্যাব থেকে সরাসরি প্রান্তিক কৃষকদের হাতে সময়মতো পৌঁছাতে হবে।

জলবায়ু বিপর্যয়ে ফসলহানির ঝুঁকি কমাতে সরকারি অর্থায়নে ‘বিশেষ জলবায়ু ঝুঁকি কৃষি বীমা’ চালু করতে হবে। গুদামজাতকরণে আইওটি ও সেনসর প্রযুক্তির স্থানীয় সংস্করণ তৈরি করা এবং সহজ শর্তে কৃষি ঋণের ব্যবস্থা করা জরুরি। এবং স্থানীয় পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কৃষকদের পৃথক ঝুঁকির ক্ষমতা মূল্যায়ন করে আলাদা অভিযোজন পরামর্শ নিশ্চিত করতে হবে।