আগামীর বরিশাল: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়। এই শিরোনামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দটি হলো, আগামী। আগামীর বরিশালবাসী উন্নয়নের জন্য ঢাকার দিকে তাকিয়ে থাকবে না; বরং উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে বরিশাল থেকেই। যেখানে নদী কোনো বাধা নয়, নদী হবে অর্থনীতির সম্পদ; সমুদ্র কোনো ঝুঁকি নয়, সমুদ্র হবে সম্ভাবনার দুয়ার; আর পায়রা শুধু একটি বন্দর নয়, এটা হবে অর্থনীতির নতুন প্রবেশদ্বার।
বরিশাল দেশের অন্যতম প্রাকৃতিক সম্পদসমৃদ্ধ অঞ্চল। নদী আছে, কৃষি আছে, মৎস্য আছে, ইলিশ আছে, সমুদ্র আছে, বন্দর আছে, পর্যটনের অপার সম্ভাবনা আছে। আছে বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী এবং মেধাবী তরুণ প্রজন্ম। তারপরও উন্নয়নের সূচকে বরিশালকে দীর্ঘদিন ধরে পিছিয়ে থাকা অঞ্চলের তালিকায় দেখতে হচ্ছে। কিন্তু কেন? এর একটি বড় কারণ, বরিশালের উন্নয়নকে কখনো একটি সমন্বিত আঞ্চলিক উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা হয়নি।
১. উপকূলীয় বাস্তবতার সঙ্গে উন্নয়ন পরিকল্পনার সমন্বয় নেই বরিশালের বড় বাস্তবতা হলো, এটি মূলত নদী ও সমুদ্রঘেরা একটি অঞ্চল। এই ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য যেমন সম্পদ, তেমনি এটি ঝুঁকিও। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা, নদীর গতিপথ পরিবর্তন, এসব সমস্যা বরিশালবাসীর জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উপকূল অঞ্চলের ২ লাখ ৮৬ হাজার হেক্টর জমি বিভিন্ন মাত্রায় লবণাক্ত। আশঙ্কা করা হচ্ছে এর ফলে ১৫ শতাংশ ধান উৎপাদক কমে যেতে পারে। দেখা দিতে পারে সুপেয় পানির সংকট।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই উপকূলীয় বাস্তবতার জন্য কি আমাদের প্রশাসনিক কাঠামো যথেষ্ট প্রস্তুত? উপকূলবাসীর সমস্যা সমাধানে একাধিক মন্ত্রণালয় ও সংস্থা কাজ করে। কৃষির জন্য একটি, মৎস্যের জন্য আরেকটি, পানি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য আরেকটি, স্থানীয় সরকার, পরিবেশ, সবাই যার যার জায়গা থেকে কাজ করছে। কিন্তু উপকূলের মানুষ তো সমস্যাকে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক ভাগ করে দেখে না। তার কাছে নদীভাঙন, বাঁধ, কৃষি, পানি, ঘূর্ণিঝড়, জীবিকা, সব একই জীবনের অংশ। তাই পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আদলে একটি পৃথক উপকূলীয় মন্ত্রণালয় গঠনের প্রস্তাব গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা যেতে পারে। এটি শুধু বরিশালের জন্য নয়, বাংলাদেশের পুরো উপকূলের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ হতে পারে। এই মন্ত্রণালয়ের কাজ হতে পারে, উপকূলীয় বাঁধ, নদী ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু অভিযোজন, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, নিরাপদ পানি, উপকূলীয় কৃষি, মৎস্য, চর উন্নয়ন, দুর্যোগ প্রস্তুতি এবং উপকূলীয় অবকাঠামোর মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা।
২. যোগাযোগ ও পরিবহনের সীমাবদ্ধতা উন্নয়নের অন্যতম শর্ত হলো যোগাযোগ। পদ্মা সেতু দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগে গতি আনলেও এখন পরবর্তী প্রশ্ন, পদ্মা সেতুর পূর্ণ অর্থনৈতিক সুফল কীভাবে মিলবে?
এর একটি বড় উত্তর হলো, রেল যোগাযোগ। ঢাকা–পদ্মা সেতু–বরিশাল–পটুয়াখালী–পায়রা বন্দর রেল করিডোর। এছাড়াও বরিশাল থেকে পাথরঘাটা পর্যন্ত আরেকটি রেল সংযোগ দক্ষিণের এই অংশে ব্লু ইকোনমির নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে।
একই সঙ্গে পদ্মা সেতুর পূর্ণ সুবিধা পেতে ঢাকা-ভাঙ্গা-বরিশাল-পটুয়াখালী-কুয়াকাটা মহাসড়কটিকে অবিলম্বে এক্সপ্রেসওয়ে বা ছয় লেনে রূপান্তর করতে হবে। পটুয়াখালী থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত সড়কটি প্রশস্ত ও আন্তর্জাতিক মানের চার লেনে রূপান্তর করা হলে ঢাকা থেকে কুয়াকাটা পৌঁছাতে মাত্র ৫ থেকে সাড়ে ৫ ঘণ্টা সময় লাগবে। যা এই অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য ও পর্যটনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে। এছাড়া বরিশাল-ভোলা মহাসড়ক দ্রুত বাস্তবায়নের চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।
৩. উৎপাদন আছে, কিন্তু মূল্য সংযোজন নেই বরিশালের কৃষি ও মৎস্য খাতের দিকে তাকালেই একটি বড় বৈপরীত্য দেখা যায়। এই অঞ্চলে উৎপাদন আছে, কিন্তু উৎপাদনের পরবর্তী ধাপের শিল্প নেই। বরিশালে বিপুল পরিমাণে ধান, মাছ, ফল, সবজি উৎপাদিত হয়। কিন্তু এসব পণ্যের বড় অংশই কাঁচামাল হিসেবে বাইরে চলে যায়। অর্থাৎ বরিশাল উৎপাদন করে, কিন্তু মূল্য সংযোজন করে অন্য অঞ্চল। এই চিত্র বদলাতে হবে। বরিশালে গড়ে তুলতে হবে, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, কোল্ড স্টোরেজ, আধুনিক গুদাম, প্যাকেজিং শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা এবং রপ্তানিমুখী শিল্প। সঠিক পরিকল্পনায়, স্বরূপকাঠির পেয়ারা ও আমড়ার বার্ষিক বাণিজ্য শত কোটি টাকা ছাড়িয়ে হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হতে পারে।
৪. মৎস্য কেন্দ্রীক অর্থনীতি বরিশালের অর্থনীতির অন্যতম বড় সম্পদ মৎস্য। বিশেষ করে ইলিশের সঙ্গে বরিশালের পরিচয় প্রায় অবিচ্ছেদ্য। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশের মোট উৎপাদিত ইলিশের প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ ভাগ আসে বরিশাল বিভাগের নদী ও উপকূলীয় অঞ্চল থেকে। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১২ শতাংশ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মৎস্য খাতের ওপর নির্ভরশীল। বৈজ্ঞানিক উপায়ে মৎস্য হিমাগার এবং প্রসেসিং প্ল্যান্ট স্থাপন করা গেলে এই খাত থেকে বছরে হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব। একইভাবে সামুদ্রিক মাছ, কাঁকড়া, চিংড়ি, সামুদ্রিক শৈবালসহ ব্লু-ইকোনমির বিভিন্ন সম্ভাবনাকে গবেষণা ও প্রযুক্তির মাধ্যমে কাজে লাগাতে হবে।
৫. নদী ও সমুদ্রকে অর্থনীতির শক্তিতে রূপান্তর বরিশালের মানুষ নদীর সঙ্গে বসবাস করে। কিন্তু আমরা নদীকে এখনো অনেকাংশে শুধু যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে দেখি। এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে।
নদী হতে পারে পণ্য পরিবহনের সবচেয়ে সাশ্রয়ী মাধ্যম। নদীকেন্দ্রিক পর্যটন হতে পারে নতুন শিল্প। নৌযান নির্মাণ ও মেরামত হতে পারে নতুন কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র। মৎস্যসম্পদ হতে পারে রপ্তানির বড় উৎস। সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতি বা Blue Economy হতে পারে দক্ষিণাঞ্চলের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক শক্তি। তাই বরিশালের উন্নয়ন পরিকল্পনায় নদী ও সমুদ্রকে শুধু ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে নয়, অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
৬. পায়রা বন্দর অর্থনীতির নতুন করিডোর বরিশালের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনাগুলোর একটি হচ্ছে পায়রা বন্দর। এটি হতে পারে দক্ষিণাঞ্চলের একটি বিশাল অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দর পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হলে বার্ষিক ৭৫ হাজার কনটেইনার হ্যান্ডলিং করার সক্ষমতা তৈরি হবে, যা মোংলা ও চট্টগ্রাম বন্দরের চাপ কমাবে। যদি রেল যোগাযোগ, মহাসড়ক, নৌপথ, শিল্পাঞ্চল, লজিস্টিক হাব, গুদাম ও কোল্ড চেইন যুক্ত করা যায়, তাহলে বরিশাল বিভাগে একটি নতুন অর্থনৈতিক বলয় তৈরি হতে পারে।
সরকারের পরিকল্পনা হওয়া উচিত, পায়রা বন্দরকে কেন্দ্র করে একটি “দক্ষিণাঞ্চলীয় অর্থনৈতিক করিডোর” তৈরি করা। তখন বরিশাল বিভাগ শুধু কৃষি উৎপাদনের অঞ্চল থাকবে না। বরং এখানে বিশাল উপকূলীয় অঞ্চলে ‘ব্লু-ইকোনমি’ বা সমুদ্র অর্থনীতি ভিত্তিক মাছ ধরা, সামুদ্রিক শৈবাল চাষ এবং খনিজ সম্পদ আহরণের সম্ভাবনা উন্মোচিত হবে। গড়ে উঠতে পারে, লজিস্টিকস, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, মৎস্য শিল্প, হালকা প্রকৌশল, আমদানি-রপ্তানি এবং বন্দরকেন্দ্রিক বিভিন্ন সেবা খাত।
৭. পর্যটনের অপার সম্ভাবনা বরিশালের আরেকটি বড় সম্পদ হলো পর্যটন। কুয়াকাটা, নদী, চর, দ্বীপ, গ্রামীণ জীবন, ভাসমান পেয়ারা বাজার এবং দক্ষিণাঞ্চলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সব মিলিয়ে এখানে একটি বড় পর্যটন অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব।
কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক পর্যটনের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটকদের ১৫ শতাংশ এখন প্রতি বছর কুয়াকাটা, ভাসমান পেয়ারা বাজার এবং সুন্দরবনের দক্ষিণাংশ ভ্রমণ করেন। মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী পর্যটন খাতের উন্নয়ন করলে এই অঞ্চল থেকে সরকারের রাজস্ব আয় দ্বিগুণ করা সম্ভব।
কিন্তু শুধু কুয়াকাটাকে আলাদা করে উন্নয়ন করলেই হবে না; প্রয়োজন একটি দক্ষিণাঞ্চলীয় পর্যটন সার্কিট। বরিশাল থেকে পটুয়াখালী, কুয়াকাটা, বরগুনা এবং সুন্দরবনমুখী পর্যটনকে নদী ও সড়ক যোগাযোগের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে। পর্যটনের অর্থ শুধু হোটেল নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হবে পরিবহন, স্থানীয় খাবার, হস্তশিল্প, গাইড, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান।
৮. শিল্পায়ন ও জ্বালানি ভাবনা জাতীয় অর্থনীতিতে যেখানে শিল্পখাতের অবদান ৩০ শতাংশেরও বেশি, সেখানে বরিশাল অঞ্চলের অবদান মাত্র ২ শতাংশ। বরিশালে শিল্পায়নের অন্যতম বাধা হচ্ছে জ্বালানি, বিনিয়োগ ও অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা। বিসিক শিল্পনগরী থাকা সত্ত্বেও উদ্যোক্তারা মূলধনের সংকট ও জ্বালানি সরবরাহকে বড় বাধা হিসেবে দেখছেন।
তাই শিল্পায়ন করতে হলে শুধু জমি বরাদ্দ দিলেই হবে না। প্রয়োজন, জমি, বিদ্যুৎ, গ্যাস/জ্বালানি, যোগাযোগ, অর্থায়ন, বাজার সবকিছুর সমন্বিত নিশ্চয়তা। ভোলার গ্যাসসম্পদসহ দক্ষিণাঞ্চলের জ্বালানি সম্ভাবনাকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে হবে। একই সঙ্গে উপকূলীয় এলাকায় সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের সম্ভাবনাও আপার।
৯. তরুণদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বরিশালের সবচেয়ে বড় সম্পদ আসলে নদী বা সমুদ্র নয়, বরং বরিশালের মানুষ। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম। বরিশালের বহু মেধাবী তরুণ পড়াশোনা শেষ করে কর্মসংস্থানের জন্য ঢাকায় চলে যায়। অনেকে দেশের বাইরে। তাই এমন বরিশাল গড়তে হবে যেখানে মেধা তৈরি হবে বরিশালে, সেই মেধার কর্মক্ষেত্রও হবে এখানে। চাকরির জন্য তরুণ ঢাকায় যাবে না; বরং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের জন্য প্রতিষ্ঠান বরিশালে আসবে। এজন্য প্রয়োজন, আইটি ও ডিজিটাল কর্মসংস্থান কেন্দ্র, কারিগরি শিক্ষা, মেরিটাইম প্রশিক্ষণ, কৃষি প্রযুক্তি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও স্থানীয় শিল্পের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংযোগ।
১০. স্বাস্থ্য ও উচ্চশিক্ষা দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের চিকিৎসার জন্য এখনো ঢাকামুখী হওয়ার বিকল্প নেই। এটি শুধু স্বাস্থ্যসেবার সমস্যা নয়; এটি আঞ্চলিক বৈষম্যেরও একটি চিত্র। বরিশালকে দক্ষিণাঞ্চলের একটি বিশেষায়িত স্বাস্থ্য ও উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। বিশেষায়িত হাসপাতাল, আধুনিক চিকিৎসা, চিকিৎসা গবেষণা, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি শিক্ষা এবং উপকূলীয় কৃষি, মৎস্য ও জলবায়ু নিয়ে গবেষণার সুযোগ বাড়াতে হবে। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে শুধু ডিগ্রি প্রদানের প্রতিষ্ঠান নয়, বরং দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়ন গবেষণার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে।
তাহলে করণীয় কী? বরিশালের জন্য এখন প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি “বরিশাল ভিশন–২০৫০”। যাতে আগামী ২০ থেকে ৩০ বছরের জন্য বরিশালের অর্থনীতি, যোগাযোগ, কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পর্যটন, জলবায়ু ও নগরায়ণের ১০টি সমন্বিত রূপরেখা থাকবে। এগুলো হলো: ১. পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আদলে পৃথক উপকূলীয় উন্নয়ন মন্ত্রণালয় গঠনের উদ্যোগ নেওয়া।
২. ঢাকা–পদ্মা সেতু–বরিশাল–পটুয়াখালী–পায়রা রেল করিডোরকে জাতীয় অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে বিবেচনা করা। অতি দ্রুত ভাঙ্গা থেকে কুয়াকাটা সড়ক ৬ লেনে উন্নীত করা। বরিশাল ভোলা মহাসড়ক দ্রুত বাস্তবায়ন। ৩. পায়রা বন্দরকে কেন্দ্র করে দক্ষিণাঞ্চলীয় অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তোলা। ৪. কৃষি ও মৎস্যভিত্তিক শিল্পের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও শিল্পপার্ক গড়ে তোলা।
৫. জলাবদ্ধতা ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি উপকূলীয় মহাপরিকল্পনা গ্রহণ। ৬. বরিশালের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নাব্যতা ফিরিয়ে এনে নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতি ও পণ্য পরিবহন সম্প্রসারণ করা। ৭. কুয়াকাটা ও দক্ষিণাঞ্চলের অন্যান্য পর্যটন সম্ভাবনাকে নিয়ে একটি সমন্বিত পর্যটন সার্কিট তৈরি করা। ৮. তরুণদের জন্য আইটি, কারিগরি, মেরিটাইম ও উদ্যোক্তা উন্নয়নের বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা।
৯. বরিশালকে দক্ষিণাঞ্চলের বিশেষায়িত স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা। ১০. দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজের মধ্যে সমন্বয়ের জন্য একটি বরিশাল আঞ্চলিক উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা সমন্বিত উন্নয়ন কাউন্সিল গঠন করা।
পদ্মা সেতু দক্ষিণাঞ্চলের দরজা খুলে দিয়েছে। এখন সেই দরজা দিয়ে অর্থনীতি, শিল্প, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে বরিশালের ভেতরে নিয়ে আসার দায়িত্ব আমাদের। রেললাইন সেই সংযোগকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। প্রশস্ত সড়ক চলাচলের গতি ও অর্থনীতির চাকাকে করতে পারে গতিশীল। পায়রা বন্দর খুলে দিতে পারে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নতুন দরজা। আর উপকূলীয় মন্ত্রণালয় হতে পারে সমুদ্র ও নদীঘেরা জনপদের জন্য একটি নতুন প্রশাসনিক ও উন্নয়ন কাঠামো।
বরিশালকে আর পিছিয়ে থাকা অঞ্চল হিসেবে নয়, সম্ভাবনার অঞ্চল হিসেবে দেখতে হবে। নদীকে সমস্যা নয়, সম্পদ হিসেবে দেখতে হবে। সমুদ্রকে ঝুঁকি নয়, সম্ভাবনা হিসেবে দেখতে হবে। পায়রাকে শুধু বন্দর নয়, অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বার হিসেবে দেখতে হবে। আর তরুণদের শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, ভবিষ্যৎ উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারী হিসেবে দেখতে হবে। বরিশাল বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রান্তে নয়, উন্নয়নের অগ্রভাগে থাকুক। যেখানে নদীভাঙনে ঘর হারানো মানুষকে বারবার নতুন করে জীবন শুরু করতে হবে না।
বরিশালের নদী শিখিয়েছে প্রবাহিত হতে। সমুদ্র শিখিয়েছে সীমাহীন সম্ভাবনার কথা। আর এই অঞ্চলের মানুষ আমাদের শিখিয়েছে প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকতে। এখন প্রয়োজন সেই শক্তিকে উন্নয়নের শক্তিতে রূপান্তর করা। শুধু শস্যভাণ্ডার নয়, বরিশাল হোক দক্ষিণ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বার।
লেখক: প্রধান বার্তা সম্পাদক, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]


















