আজ সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
২৩ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
৩২°C
সর্বোচ্চ: ৩২°C
সর্বনিম্ন: ২৭°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৯৮%

কওমি শিক্ষার্থীদের মানবসম্পদে রূপান্তরে ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ

  • MIT ERP
  • Update Time : 12:26:50 pm, Monday, 7 September 2026
  • 12

কওমি শিক্ষার্থীদের মানবসম্পদে রূপান্তরে ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক কাঠামোর এক অনন্য এবং বিশাল অংশ জুড়ে বিস্তৃত রয়েছে কওমি মাদরাসা শিক্ষা। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই শিক্ষা ব্যবস্থা মূলত ইসলাম ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা, নৈতিক চরিত্র গঠন এবং ঐতিহ্যবাহী সামাজিক মূল্যবোধ রক্ষায় আপসহীন ভূমিকা পালন করে আসছে।

তবে একবিংশ শতাব্দীর চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও উন্মুক্ত বৈশ্বিক অর্থনীতির এই যুগে শুধু প্রথাগত ধর্মীয় জ্ঞানে সীমাবদ্ধ থেকে বিশাল এক জনগোষ্ঠীকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা সমীচীন নয়। কওমি শিক্ষার্থীদের প্রখর মেধা ও অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সঠিক সুযোগ, প্রযুক্তিগত জ্ঞান, আধুনিক কারিগরি শিক্ষা এবং বৈশ্বিক চাহিদামুখী প্রশিক্ষণের অভাবে তারা মূলধারার প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।

এই প্রেক্ষাপটে কওমি শিক্ষার্থীদের আধুনিক ও দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করে বৈশ্বিক কর্মবাজারে যুক্ত করার সাম্প্রতিক রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনীতি ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নীতিতে এক বড় ও সম্ভাবনাময় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীর সংখ্যা নিয়ে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় তথ্যঘাটতি রয়েছে।

BANBEIS-এর ২০১৫ সালের একটি জরিপে ১৩,৯০২টি কওমি মাদরাসায় প্রায় ১৪ লাখ শিক্ষার্থীর তথ্য পাওয়া যায়। ওই হিসাবে ১০ লাখ ৫৮ হাজারের বেশি ছিল ছাত্র এবং প্রায় ৩ লাখ ৪০ হাজার ছিল ছাত্রী; শিক্ষক ছিলেন ৭৩ হাজারের বেশি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে কওমি শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে শিক্ষামন্ত্রী সংসদে আনুমানিক ২৫ হাজার কওমি মাদরাসায় প্রায় ৭০ লাখ শিক্ষার্থী থাকার তথ্য দেন।

একই সঙ্গে তিনি জানান, হাফিজিয়া ও নূরানি মাদরাসাও সাধারণত কওমি ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত। দুটি হিসাবের মধ্যে এই বড় ব্যবধানই একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে—বাংলাদেশে কওমি শিক্ষা ব্যবস্থার একটি পূর্ণাঙ্গ, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ও নির্ভরযোগ্য জাতীয় ডাটাবেস অত্যন্ত প্রয়োজন। কতটি প্রতিষ্ঠান, কতজন শিক্ষার্থী, কোন অঞ্চলে কী ধরনের শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে এবং কতজন পড়াশোনা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করছেন—এসব নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া কার্যকর কর্মসংস্থান ও জাতীয় শিক্ষা নীতি প্রণয়ন কঠিন।

তাই এই জনশক্তিকে মূলধারার অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করার প্রাথমিক পদক্ষেপ হওয়া উচিত একটি বস্তুনিষ্ঠ ও সর্বজনগ্রাহ্য জাতীয় কওমি শিক্ষা ডাটাবেস গড়ে তোলা। কওমি মাদরাসার ভেতরের পরিবেশ অত্যন্ত অনুশাসিত, সুশৃঙ্খল এবং একাগ্রতাপূর্ণ। এখানকার শিক্ষার্থীরা প্রখর মেধা, ধৈর্য ও দীর্ঘ সময় পাঠাভ্যাসের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠে।

বিশেষ করে বিশাল পবিত্র কোরআন মুখস্থ করা, কঠিন ব্যাকরণভিত্তিক আরবি ভাষা শেখা, ফার্সি ও উর্দু সাহিত্য আয়ত্ত করা এবং ইসলামী ফিকহ ও হাদিস দর্শনের বিচার-বিশ্লেষণ করার যে অসাধারণ মেধা তারা অর্জন করে, তা অত্যন্ত উঁচুমানের মানসিক সক্ষমতার প্রমাণ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, দীর্ঘদিনের একমুখী কারিকুলাম, আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ইংরেজি ভাষা এবং সমসাময়িক সাধারণ জ্ঞানের সাথে পর্যাপ্ত সংযোগ না থাকায় এই বিশাল মেধা প্রদীপের নিচের অন্ধকারের মতো জাতীয় অর্থনীতির মূলধারায় যথাযথ অবদান রাখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে।

কওমি মাদরাসাকে শুধু কর্মসংস্থানের সাধারণ পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করলে এর নিজস্ব মৌলিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি আড়ালে পড়ে যাবে। প্রথাগতভাবে এটি ইসলামী জ্ঞানচর্চা, আরবি সাহিত্য ও ধর্মীয় গবেষণার অনন্য কেন্দ্র। তবে মূল সংকটটি তৈরি হয় যখন এই ভেতরের শক্তির সাথে আধুনিক অর্থনীতির প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার সংযোগটি শিথিল থাকে।

একজন শিক্ষার্থী আরবি ভাষায় দক্ষ বা ধর্মীয় দর্শনে প্রজ্ঞাবান হলেও তিনি যদি ইংরেজিতে প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ করতে না পারেন, ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারে পিছিয়ে থাকেন কিংবা আধুনিক হিসাবরক্ষণ ও ব্যবসায়িক ধারণার বাইরে থাকেন, তবে বৈশ্বিক কর্মবাজারে তাঁর প্রতিযোগিতা স্বাভাবিকভাবেই সীমিত হয়ে পড়ে। প্রতিযোগিতামূলক কর্মক্ষেত্রে যে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, আধুনিক প্রযুক্তি ও বিশ্ব কাঠামোর ধারণা চাওয়া হয়, তার চর্চা কওমি কারিকুলামে অপ্রতুল থাকায় মেধা থাকা সত্ত্বেও তারা পিছিয়ে পড়ে।

এটি কোনো শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, বরং সুযোগের অসমতা। তাই কওমি শিক্ষাকে রাতারাতি পুরোপুরি বদলে ফেলা সমাধান নয়; বরং এর নিজস্ব ধর্মীয় ও ভাষাগত ভিত্তির সাথে আধুনিক কারিগরি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার সফল মেলবন্ধন ঘটানোই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য। এই শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এবং মূলধারায় নিয়ে আসার প্রচেষ্টায় একটি বড় বাঁধা ছিল এর আইনি কাঠামো ও সরকারি স্বীকৃতির অভাব।

ঐতিহাসিকভাবে কওমি মাদরাসাগুলো সরকারি অনুদানমুক্ত ও স্বাধীনভাবে পরিচালিত হয়ে আসলেও পরবর্তীতে প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ও মান নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনতে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০০৬ সালের প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালের ৮ অক্টোবর ‘কওমি মাদরাসাসমূহের দাওরায়ে হাদিস (তাকমীল)-এর সনদকে মাস্টার্স ডিগ্রি (ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি)-এর সমমান প্রদান আইন, ২০১৮’ জাতীয় সংসদে পাস হয় এবং গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়।

বর্তমানে এটি ‘আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিয়াতিিল কওমিয়া বাংলাদেশ’-এর অধীনে পরিচালিত হচ্ছে, যার সাথে বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া ও গহরডাঙ্গাসহ দেশের প্রধান ছয়টি কওমি শিক্ষা বোর্ড আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই আইনি স্বীকৃতি কওমি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি ঐতিহাসিক প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা ও স্বীকৃতির পথ খুলে দিয়েছে।

তবে একটি সনদকে ডিগ্রির সমমান দেওয়া এবং সেই সনদের অধিকারীকে বাস্তব বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতার উপযোগী করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। আধুনিক পেশাগত দক্ষতা ছাড়া কেবল সনদের সমতা দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজার জয় করা সম্ভব নয়। সম্প্রতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীদের দেশ ও বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

সংসদে এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে সংসদ নেতা স্পষ্ট করেছেন যে, কওমি শিক্ষার্থীদের আধুনিক ও কর্মমুখী শিক্ষায় দক্ষ করে তুলতে সরকার বহুমুখী পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। এটি নিছক কোনো সাময়িক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নয়; রাষ্ট্রযন্ত্রের এমন ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন নীতিতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপের বার্তা দেয়। বিশ্বায়ন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে বৈশ্বিক কর্মবাজার প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে।

বিদ্যমান মাদরাসা কাঠামোর মূল স্বকীয়তা অক্ষুণ্ণ রেখে যদি নির্দিষ্ট স্কিল মডিউল যুক্ত করা যায়, তবে কওমি তরুণরা একাধিক আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অসাধারণ নৈপুণ্য দেখাতে পারে। প্রথমত, কওমি শিক্ষার্থীরা প্রথাগতভাবে আরবি ব্যাকরণের সাথে পরিচিত হওয়ায় তাদের সেই ভিত্তির সাথে আধুনিক কথ্য আরবি, ব্যবসায়িক অনুবাদ ও প্রাতিষ্ঠানিক ইংরেজি শেখানো হলে তারা মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলোতে diplomatic mission, অনুবাদ কেন্দ্র, বিমান সংস্থা ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে দোভাষী বা যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে বড় সুযোগ পাবে।

দ্বিতীয়ত, বিশ্বজুড়ে প্রসারমান ইসলামিক ব্যাংকিং ও শরিয়াহ ফাইন্যান্স খাতে তাদের ফিকহ ও শরিয়াহর গভীর জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে আধুনিক ব্যাংকিং ও হিসাববিজ্ঞানের ওপর ডিপ্লোমা দিলে তারা বৈশ্বিক শরিয়াহ উপদেষ্টা বা অডিটর হিসেবে নেতৃত্ব দিতে পারবে। তৃতীয়ত, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ফ্রিল্যান্সিং, কোডিং, ডাটা এন্ট্রি, গ্রাফিক্স ডিজাইন ও ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মতো বিষয়ে তাদের সুনির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে তারা ঘরে বসেই প্রচুর বৈদেশী মুদ্রা উপার্জন করতে পারবে।

পাশাপাশি ইলেকট্রিক্যাল, অটোমোবাইল, মেকানিক্স ও আধুনিক কৃষির মতো হাতে-কলমে শেখার দক্ষতাগুলো আন্তর্জাতিক অভিবাসন বাজারে কওমি তরুণদের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, এই প্রশিক্ষণ যেন কেবল সনদ বিতরণে থমকে না যায়; বরং আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফিকেশন ও সরাসরি কর্মসংস্থানের সংযোগ তৈরি করতে হবে। এই রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় কওমি শিক্ষাব্যবস্থার নারী শিক্ষার্থীদের কথা ভুলে গেলে চলবে না।

বিভিন্ন জরিপে কওমি মাদরাসায় বিপুল সংখ্যক নারী শিক্ষার্থীর উপস্থিতি দেখা যায়, যাদের বাদ দিয়ে সার্বিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি সম্ভব নয়। নারী কওমি শিক্ষার্থীদের জন্য উপযুক্ত ও সম্মানজনক পরিবেশ বজায় রেখে অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং, অনুবাদ, তথ্যপ্রযুক্তি, ই-কমার্স ও শিক্ষাদানের মতো পেশাগত প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করা গেলে তা পরিবার ও জাতীয় অর্থনীতি—উভয় ক্ষেত্রেই বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে।

তবে কওমি শিক্ষাব্যবস্থাকে বৈশ্বিক বাজারের সাথে যুক্ত করতে গেলে কিছু মনস্তাত্ত্বিক ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে একে জোর করে একীভূত করার চেষ্টা করলে হিতে বিপরীত হতে পারে। তাই কওমি ব্যবস্থার ঐতিহ্য ও ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় অনুশাসনকে পূর্ণ সম্মান জানিয়েই সরকারকে সহযোগী ও সুযোগ-সৃষ্টিকারী ভূমিকায় নামতে হবে।

এজন্য মূল ধর্মীয় শিক্ষা অক্ষুণ্ণ রেখে ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে কারিগরি ও আইটি শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা, উলামায়ে কেরাম ও কওমি শিক্ষা বোর্ডগুলোর সাথে যৌথ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে পাইলট প্রজেক্ট চালানো এবং শিক্ষকদের আগে আধুনিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার কৌশল গ্রহণ করতে হবে। একই সাথে কারিগরি শিক্ষা শেষে কওমি তরুণদের আত্মকর্মসংস্থানের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা রাখা এবং সচেতনতামূলক আলোচনার মাধ্যমে এটি স্পষ্ট করা প্রয়োজন যে, আধুনিক প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করা ইসলামের মূলনীতির পরিপন্থী নয়, বরং স্বাবলম্বী হওয়ার অন্যতম মাধ্যম।

পরিশেষে বলা যায়,কওমি মাদরাসার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা কেবল ধর্মীয় শিক্ষা বনাম আধুনিক শিক্ষার অহেতুক বিতর্কে আটকে থাকা উচিত নয়। মূল বিষয় হলো—কীভাবে একজন কওমি শিক্ষার্থী তার ধর্মীয় ও নৈতিক আদর্শের দৃঢ় ভিত্তি বজায় রেখে আধুনিক বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষ হয়ে উঠবে। আজ যে কওমি তরুণটি সুযোগের অভাবে মূলধারার অর্থনীতি থেকে দূরে রয়েছে, সঠিক প্রশিক্ষণ ও দিকনির্দেশনা পেলে আগামীকাল তিনিই হতে পারেন একজন দক্ষ আন্তর্জাতিক পেশাজীবী, অনুবাদক, সফল উদ্যোক্তা কিংবা আইটি বিশেষজ্ঞ।

কওমি শিক্ষাকে বদলে দেওয়া নয়—কওমি শিক্ষার্থীর সুপ্ত সম্ভাবনাকে মুক্ত করে দেওয়া এবং বৈশ্বিক কর্মবাজারের সাথে টেকসই সেতু তৈরি করাই হওয়া উচিত আমাদের মূল লক্ষ্য। যে রাষ্ট্র তার প্রতিটি নাগরিকের মেধাকে কাজে লাগাতে পারে, সেই রাষ্ট্রই শেষ পর্যন্ত আত্মনির্ভরশীল ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম হয়ে ওঠে। সুতরাং কওমি মাদরাসা থেকে বিশ্বমঞ্চে পদার্পণের এই নতুন অভিযাত্রা বাংলাদেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায় হয়ে থাকবে ইনশাল্লাহ।

মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদের সহায় হোন। লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

কওমি শিক্ষার্থীদের মানবসম্পদে রূপান্তরে ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ

Update Time : 12:26:50 pm, Monday, 7 September 2026

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক কাঠামোর এক অনন্য এবং বিশাল অংশ জুড়ে বিস্তৃত রয়েছে কওমি মাদরাসা শিক্ষা। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই শিক্ষা ব্যবস্থা মূলত ইসলাম ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা, নৈতিক চরিত্র গঠন এবং ঐতিহ্যবাহী সামাজিক মূল্যবোধ রক্ষায় আপসহীন ভূমিকা পালন করে আসছে।

তবে একবিংশ শতাব্দীর চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও উন্মুক্ত বৈশ্বিক অর্থনীতির এই যুগে শুধু প্রথাগত ধর্মীয় জ্ঞানে সীমাবদ্ধ থেকে বিশাল এক জনগোষ্ঠীকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা সমীচীন নয়। কওমি শিক্ষার্থীদের প্রখর মেধা ও অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সঠিক সুযোগ, প্রযুক্তিগত জ্ঞান, আধুনিক কারিগরি শিক্ষা এবং বৈশ্বিক চাহিদামুখী প্রশিক্ষণের অভাবে তারা মূলধারার প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।

এই প্রেক্ষাপটে কওমি শিক্ষার্থীদের আধুনিক ও দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করে বৈশ্বিক কর্মবাজারে যুক্ত করার সাম্প্রতিক রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনীতি ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নীতিতে এক বড় ও সম্ভাবনাময় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীর সংখ্যা নিয়ে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই একটি বড় তথ্যঘাটতি রয়েছে।

BANBEIS-এর ২০১৫ সালের একটি জরিপে ১৩,৯০২টি কওমি মাদরাসায় প্রায় ১৪ লাখ শিক্ষার্থীর তথ্য পাওয়া যায়। ওই হিসাবে ১০ লাখ ৫৮ হাজারের বেশি ছিল ছাত্র এবং প্রায় ৩ লাখ ৪০ হাজার ছিল ছাত্রী; শিক্ষক ছিলেন ৭৩ হাজারের বেশি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে কওমি শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে শিক্ষামন্ত্রী সংসদে আনুমানিক ২৫ হাজার কওমি মাদরাসায় প্রায় ৭০ লাখ শিক্ষার্থী থাকার তথ্য দেন।

একই সঙ্গে তিনি জানান, হাফিজিয়া ও নূরানি মাদরাসাও সাধারণত কওমি ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত। দুটি হিসাবের মধ্যে এই বড় ব্যবধানই একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতাকে স্পষ্ট করে—বাংলাদেশে কওমি শিক্ষা ব্যবস্থার একটি পূর্ণাঙ্গ, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর ও নির্ভরযোগ্য জাতীয় ডাটাবেস অত্যন্ত প্রয়োজন। কতটি প্রতিষ্ঠান, কতজন শিক্ষার্থী, কোন অঞ্চলে কী ধরনের শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে এবং কতজন পড়াশোনা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করছেন—এসব নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া কার্যকর কর্মসংস্থান ও জাতীয় শিক্ষা নীতি প্রণয়ন কঠিন।

তাই এই জনশক্তিকে মূলধারার অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করার প্রাথমিক পদক্ষেপ হওয়া উচিত একটি বস্তুনিষ্ঠ ও সর্বজনগ্রাহ্য জাতীয় কওমি শিক্ষা ডাটাবেস গড়ে তোলা। কওমি মাদরাসার ভেতরের পরিবেশ অত্যন্ত অনুশাসিত, সুশৃঙ্খল এবং একাগ্রতাপূর্ণ। এখানকার শিক্ষার্থীরা প্রখর মেধা, ধৈর্য ও দীর্ঘ সময় পাঠাভ্যাসের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠে।

বিশেষ করে বিশাল পবিত্র কোরআন মুখস্থ করা, কঠিন ব্যাকরণভিত্তিক আরবি ভাষা শেখা, ফার্সি ও উর্দু সাহিত্য আয়ত্ত করা এবং ইসলামী ফিকহ ও হাদিস দর্শনের বিচার-বিশ্লেষণ করার যে অসাধারণ মেধা তারা অর্জন করে, তা অত্যন্ত উঁচুমানের মানসিক সক্ষমতার প্রমাণ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, দীর্ঘদিনের একমুখী কারিকুলাম, আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ইংরেজি ভাষা এবং সমসাময়িক সাধারণ জ্ঞানের সাথে পর্যাপ্ত সংযোগ না থাকায় এই বিশাল মেধা প্রদীপের নিচের অন্ধকারের মতো জাতীয় অর্থনীতির মূলধারায় যথাযথ অবদান রাখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে।

কওমি মাদরাসাকে শুধু কর্মসংস্থানের সাধারণ পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার করলে এর নিজস্ব মৌলিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি আড়ালে পড়ে যাবে। প্রথাগতভাবে এটি ইসলামী জ্ঞানচর্চা, আরবি সাহিত্য ও ধর্মীয় গবেষণার অনন্য কেন্দ্র। তবে মূল সংকটটি তৈরি হয় যখন এই ভেতরের শক্তির সাথে আধুনিক অর্থনীতির প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতার সংযোগটি শিথিল থাকে।

একজন শিক্ষার্থী আরবি ভাষায় দক্ষ বা ধর্মীয় দর্শনে প্রজ্ঞাবান হলেও তিনি যদি ইংরেজিতে প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ করতে না পারেন, ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারে পিছিয়ে থাকেন কিংবা আধুনিক হিসাবরক্ষণ ও ব্যবসায়িক ধারণার বাইরে থাকেন, তবে বৈশ্বিক কর্মবাজারে তাঁর প্রতিযোগিতা স্বাভাবিকভাবেই সীমিত হয়ে পড়ে। প্রতিযোগিতামূলক কর্মক্ষেত্রে যে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, আধুনিক প্রযুক্তি ও বিশ্ব কাঠামোর ধারণা চাওয়া হয়, তার চর্চা কওমি কারিকুলামে অপ্রতুল থাকায় মেধা থাকা সত্ত্বেও তারা পিছিয়ে পড়ে।

এটি কোনো শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়, বরং সুযোগের অসমতা। তাই কওমি শিক্ষাকে রাতারাতি পুরোপুরি বদলে ফেলা সমাধান নয়; বরং এর নিজস্ব ধর্মীয় ও ভাষাগত ভিত্তির সাথে আধুনিক কারিগরি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার সফল মেলবন্ধন ঘটানোই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য। এই শিক্ষাব্যবস্থাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এবং মূলধারায় নিয়ে আসার প্রচেষ্টায় একটি বড় বাঁধা ছিল এর আইনি কাঠামো ও সরকারি স্বীকৃতির অভাব।

ঐতিহাসিকভাবে কওমি মাদরাসাগুলো সরকারি অনুদানমুক্ত ও স্বাধীনভাবে পরিচালিত হয়ে আসলেও পরবর্তীতে প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা ও মান নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনতে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০০৬ সালের প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালের ৮ অক্টোবর ‘কওমি মাদরাসাসমূহের দাওরায়ে হাদিস (তাকমীল)-এর সনদকে মাস্টার্স ডিগ্রি (ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি)-এর সমমান প্রদান আইন, ২০১৮’ জাতীয় সংসদে পাস হয় এবং গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়।

বর্তমানে এটি ‘আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিয়াতিিল কওমিয়া বাংলাদেশ’-এর অধীনে পরিচালিত হচ্ছে, যার সাথে বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া ও গহরডাঙ্গাসহ দেশের প্রধান ছয়টি কওমি শিক্ষা বোর্ড আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এই আইনি স্বীকৃতি কওমি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি ঐতিহাসিক প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদা ও স্বীকৃতির পথ খুলে দিয়েছে।

তবে একটি সনদকে ডিগ্রির সমমান দেওয়া এবং সেই সনদের অধিকারীকে বাস্তব বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতার উপযোগী করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। আধুনিক পেশাগত দক্ষতা ছাড়া কেবল সনদের সমতা দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজার জয় করা সম্ভব নয়। সম্প্রতি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীদের দেশ ও বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

সংসদে এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে সংসদ নেতা স্পষ্ট করেছেন যে, কওমি শিক্ষার্থীদের আধুনিক ও কর্মমুখী শিক্ষায় দক্ষ করে তুলতে সরকার বহুমুখী পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। এটি নিছক কোনো সাময়িক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নয়; রাষ্ট্রযন্ত্রের এমন ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন নীতিতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপের বার্তা দেয়। বিশ্বায়ন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই যুগে বৈশ্বিক কর্মবাজার প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে।

বিদ্যমান মাদরাসা কাঠামোর মূল স্বকীয়তা অক্ষুণ্ণ রেখে যদি নির্দিষ্ট স্কিল মডিউল যুক্ত করা যায়, তবে কওমি তরুণরা একাধিক আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অসাধারণ নৈপুণ্য দেখাতে পারে। প্রথমত, কওমি শিক্ষার্থীরা প্রথাগতভাবে আরবি ব্যাকরণের সাথে পরিচিত হওয়ায় তাদের সেই ভিত্তির সাথে আধুনিক কথ্য আরবি, ব্যবসায়িক অনুবাদ ও প্রাতিষ্ঠানিক ইংরেজি শেখানো হলে তারা মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় দেশগুলোতে diplomatic mission, অনুবাদ কেন্দ্র, বিমান সংস্থা ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে দোভাষী বা যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে বড় সুযোগ পাবে।

দ্বিতীয়ত, বিশ্বজুড়ে প্রসারমান ইসলামিক ব্যাংকিং ও শরিয়াহ ফাইন্যান্স খাতে তাদের ফিকহ ও শরিয়াহর গভীর জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে আধুনিক ব্যাংকিং ও হিসাববিজ্ঞানের ওপর ডিপ্লোমা দিলে তারা বৈশ্বিক শরিয়াহ উপদেষ্টা বা অডিটর হিসেবে নেতৃত্ব দিতে পারবে। তৃতীয়ত, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ফ্রিল্যান্সিং, কোডিং, ডাটা এন্ট্রি, গ্রাফিক্স ডিজাইন ও ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মতো বিষয়ে তাদের সুনির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে তারা ঘরে বসেই প্রচুর বৈদেশী মুদ্রা উপার্জন করতে পারবে।

পাশাপাশি ইলেকট্রিক্যাল, অটোমোবাইল, মেকানিক্স ও আধুনিক কৃষির মতো হাতে-কলমে শেখার দক্ষতাগুলো আন্তর্জাতিক অভিবাসন বাজারে কওমি তরুণদের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। তবে খেয়াল রাখতে হবে, এই প্রশিক্ষণ যেন কেবল সনদ বিতরণে থমকে না যায়; বরং আন্তর্জাতিক মানের সার্টিফিকেশন ও সরাসরি কর্মসংস্থানের সংযোগ তৈরি করতে হবে। এই রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় কওমি শিক্ষাব্যবস্থার নারী শিক্ষার্থীদের কথা ভুলে গেলে চলবে না।

বিভিন্ন জরিপে কওমি মাদরাসায় বিপুল সংখ্যক নারী শিক্ষার্থীর উপস্থিতি দেখা যায়, যাদের বাদ দিয়ে সার্বিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি সম্ভব নয়। নারী কওমি শিক্ষার্থীদের জন্য উপযুক্ত ও সম্মানজনক পরিবেশ বজায় রেখে অনলাইন ফ্রিল্যান্সিং, অনুবাদ, তথ্যপ্রযুক্তি, ই-কমার্স ও শিক্ষাদানের মতো পেশাগত প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করা গেলে তা পরিবার ও জাতীয় অর্থনীতি—উভয় ক্ষেত্রেই বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে।

তবে কওমি শিক্ষাব্যবস্থাকে বৈশ্বিক বাজারের সাথে যুক্ত করতে গেলে কিছু মনস্তাত্ত্বিক ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে একে জোর করে একীভূত করার চেষ্টা করলে হিতে বিপরীত হতে পারে। তাই কওমি ব্যবস্থার ঐতিহ্য ও ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় অনুশাসনকে পূর্ণ সম্মান জানিয়েই সরকারকে সহযোগী ও সুযোগ-সৃষ্টিকারী ভূমিকায় নামতে হবে।

এজন্য মূল ধর্মীয় শিক্ষা অক্ষুণ্ণ রেখে ঐচ্ছিক বিষয় হিসেবে কারিগরি ও আইটি শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা, উলামায়ে কেরাম ও কওমি শিক্ষা বোর্ডগুলোর সাথে যৌথ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে পাইলট প্রজেক্ট চালানো এবং শিক্ষকদের আগে আধুনিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার কৌশল গ্রহণ করতে হবে। একই সাথে কারিগরি শিক্ষা শেষে কওমি তরুণদের আত্মকর্মসংস্থানের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা রাখা এবং সচেতনতামূলক আলোচনার মাধ্যমে এটি স্পষ্ট করা প্রয়োজন যে, আধুনিক প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করা ইসলামের মূলনীতির পরিপন্থী নয়, বরং স্বাবলম্বী হওয়ার অন্যতম মাধ্যম।

পরিশেষে বলা যায়,কওমি মাদরাসার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা কেবল ধর্মীয় শিক্ষা বনাম আধুনিক শিক্ষার অহেতুক বিতর্কে আটকে থাকা উচিত নয়। মূল বিষয় হলো—কীভাবে একজন কওমি শিক্ষার্থী তার ধর্মীয় ও নৈতিক আদর্শের দৃঢ় ভিত্তি বজায় রেখে আধুনিক বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দক্ষ হয়ে উঠবে। আজ যে কওমি তরুণটি সুযোগের অভাবে মূলধারার অর্থনীতি থেকে দূরে রয়েছে, সঠিক প্রশিক্ষণ ও দিকনির্দেশনা পেলে আগামীকাল তিনিই হতে পারেন একজন দক্ষ আন্তর্জাতিক পেশাজীবী, অনুবাদক, সফল উদ্যোক্তা কিংবা আইটি বিশেষজ্ঞ।

কওমি শিক্ষাকে বদলে দেওয়া নয়—কওমি শিক্ষার্থীর সুপ্ত সম্ভাবনাকে মুক্ত করে দেওয়া এবং বৈশ্বিক কর্মবাজারের সাথে টেকসই সেতু তৈরি করাই হওয়া উচিত আমাদের মূল লক্ষ্য। যে রাষ্ট্র তার প্রতিটি নাগরিকের মেধাকে কাজে লাগাতে পারে, সেই রাষ্ট্রই শেষ পর্যন্ত আত্মনির্ভরশীল ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম হয়ে ওঠে। সুতরাং কওমি মাদরাসা থেকে বিশ্বমঞ্চে পদার্পণের এই নতুন অভিযাত্রা বাংলাদেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী অধ্যায় হয়ে থাকবে ইনশাল্লাহ।

মহান আল্লাহ সুবহানাতায়ালা আমাদের সহায় হোন। লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।