আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন, বিশেষ করে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন তোড়জোড় শুরু হয়েছে। জাতীয় রাজনীতির পালাবদলের পর তৃণমূলের এই নির্বাচনকে প্রতিটি রাজনৈতিক দল ‘অ্যাসিড টেস্ট’ হিসেবে দেখছে। এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে উঠেপড়ে লেগেছে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
তবে দলটির কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলছে অন্তর্কোন্দল এবং সঠিক ও পরিচ্ছন্ন প্রার্থী বাছাই। অন্যদিকে শক্ত শৃঙ্খলায় আবদ্ধ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে এসব সমস্যা নেই বললেই চলে। দলটি নীরবে চালিয়ে যাচ্ছে নির্বাচনকেন্দ্রিক স্বতঃস্ফূর্ত তৎপরতা। রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির জন্য আসন্ন ইউপি নির্বাচন শুধু কিছু স্থানীয় পদে জয়লাভের বিষয় নয়; বরং এটি তাদের দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক ভিত্তি ও জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের বড় ক্ষেত্র।
তবে এই নির্বাচনে বিএনপির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সঠিক ও পরিচ্ছন্ন প্রার্থী বাছাই করা। দলের ভেতরের কোন্দল এবং বিতর্কিত বা অযোগ্য ব্যক্তিদের বাছাই বিএনপিকে ব্যাকফুটে ঠেলে দিতে পারে। একই সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সুসংগঠিত মাঠ প্রস্তুতি বিএনপিকে রাজনৈতিক চাপেও ফেলে দিতে পারে। গত কয়েক বছরে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তৃণমূল পর্যায়ে বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে একই সঙ্গে কিছু স্থানে দলটির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার লড়াই প্রকট হয়ে উঠেছে। বিগত নির্বাচনগুলো বিশ্লেষণে স্পষ্ট, ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান ও সদস্যপদে জয়ী হতে হলে দলীয় পরিচয়ের চেয়ে প্রার্থীর ব্যক্তিগত ইমেজ, সততা, গ্রহণযোগ্যতা ও এলাকার মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্ক বেশি জরুরি। কিন্তু অনেক এলাকাতেই ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের বাদ দিয়ে বিতর্কিত বা সুযোগসন্ধানীদের প্রার্থী করার প্রবণতা বা লবিং দেখা যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি যদি অযোগ্য বা বিতর্কিত ব্যক্তিদের মনোনয়ন দেয়, তাহলে দলের ভেতর বিদ্রোহ সৃষ্টিসহ সাধারণ মানুষের মধ্যেও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে। এরই প্রেক্ষাপটে বর্তমানে বিএনপির প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ জামায়াত বেশ আগেভাগেই মাঠে নেমে পড়েছে। জামায়াত ও তাদের সমমনা দলগুলো বেশ আগে থেকেই ইউনিয়ন, ওয়ার্ড ও উপজেলা পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট ছক কষে প্রার্থী বাছাই এবং প্রাথমিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে।
দলীয় প্রতীক ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সিদ্ধান্ত হওয়ার পর থেকে জামায়াত অত্যন্ত সুচারুভাবে তাদের ক্লিন ইমেজের এবং ধর্মীয় ও সামাজিক প্রভাবসম্পন্ন ব্যক্তিদের মাঠে নামিয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে জামায়াতের এই সুসংগঠিত ক্যাডারভিত্তিক নেটওয়ার্ক এবং আগাম প্রস্তুতি বিএনপির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
রাজনীতি বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, বিএনপি যদি শেষ মুহূর্তে এসে প্রার্থী বাছাইয়ে কোনো ধরনের ভুল করে বা স্বজনপ্রীতির শিকার হয়, তবে সেই সুযোগ লুফে নেবে জামায়াত; বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের রাজনীতিতে প্রার্থীর ব্যক্তিগত সততা এবং পারিবারিক সুনাম অনেক বড় ভূমিকা রাখে। জামায়াত যদি প্রতিটি ইউনিয়নে অপেক্ষাকৃত পরিচ্ছন্ন ও গ্রহণযোগ্য মুখ উপহার দিতে পারে, আর বিএনপি যদি অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী বা বিতর্কিত ব্যক্তিকে মাঠে ধরে রাখে, তবে ভোটের সমীকরণে বিএনপি পিছিয়ে পড়তে পারে।
এটি শুধু ইউপি নির্বাচনের ফলাফল নয়; বরং জাতীয় রাজনীতির আগামী দিনের ভারসাম্যের ওপরও প্রভাব ফেলবে। বিএনপির হাইকমান্ড বিষয়টি নিয়ে যথেষ্ট সজাগ রয়েছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিগত দিনে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে আমাদের নেতাকর্মীরা যেভাবে রক্ত দিয়েছে, তার সঠিক মূল্যায়নের মাধ্যমেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী দিতে হবে।
কোনোভাবেই চাঁদাবাজ, দখলদার বা বিতর্কিত কাউকে দলে বা নির্বাচনে স্থান দেওয়া হবে না। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্পষ্ট নির্দেশ হলো— জনগণ যাকে চায় এবং যার ইমেজ পরিচ্ছন্ন, তিনিই মনোনয়ন পাবেন। এখানে কোনো স্বজনপ্রীতির সুযোগ নেই। ’ দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন হলো গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি।
বিগত বছরগুলোয় প্রহসনের নির্বাচনের কারণে তৃণমূলের মানুষ ভোট দেওয়ার অধিকার হারিয়েছিল। এখন মানুষ সুষ্ঠু পরিবেশে ভোট দিতে চায়। তাই আমাদের দলের ভেতর থেকে যোগ্য, সৎ এবং সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদেরই প্রার্থী করতে হবে। যদি আমরা প্রার্থী নির্বাচনে ভুল করি বা অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জড়িয়ে পড়ি, তবে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হাইকমান্ড এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছেন।
’ স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘রাজনীতিতে ফাঁকফোকর রাখার কোনো সুযোগ নেই। অন্য কোনো দল বা শক্তি কী প্রস্তুতি নিল, তার চেয়ে বড় কথা হলো আমাদের ঘর কতটা গোছানো। অতীতে দলের ভেতরে কিছু হাইব্রিড বা সুযোগসন্ধানী ঢুকে পড়েছিল, যারা দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে। ইউপি নির্বাচনে এই ধরনের অযোগ্য ব্যক্তিদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
পরীক্ষিত ও রাজপথের লড়াকু সৈনিকদের পক্ষেই তৃণমূলের জনমত গড়ে তুলতে হবে। ’ জামায়াতের কৌশলগত অবস্থান : জামায়াতের কৌশলগত অবস্থান এবং তাদের নীরব অথচ গোছানো প্রচারের কারণে সাধারণ ভোটারদের মন জয় করার লড়াইয়ে বিএনপিকে বেশ কড়া প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বিশ্লেষকেরা জানান, জামায়াত সাধারণত স্থানীয় সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগের মাধ্যমে নিজেদের ভোটব্যাংক সুরক্ষিত রাখে।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সব সময় জনকল্যাণমুখী রাজনীতিতে বিশ্বাস করে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে জনগণের অধিকার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যাচ্ছি। আসন্ন স্থানীয় সরকার বা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে জনগণ পরিবর্তন চায়। মানুষ এমন জনপ্রতিনিধি চায় যারা দুর্নীতিমুক্ত, সৎ এবং জনসেবায় নিবেদিত।
আমরা প্রতিটি এলাকায় ক্লিন ইমেজসম্পন্ন ও যোগ্য প্রার্থীদের প্রাথমিক তালিকা তৈরি করেছি। জনমুখী রাজনীতির মাধ্যমেই জনগণ আমাদের প্রার্থীদের বেছে নেবে বলে আমাদের পূর্ণ আস্থা রয়েছে। ’ জামায়াতের কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া সেক্রেটারি মতিউর রহমান আকন্দ বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন দেশের মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।
বিগত দিনে স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে দলীয়করণ ও লুটপাটের আখড়ায় পরিণত করা হয়েছিল। জামায়াত সব সময় একটি জবাবদিহিমূলক ও নৈতিকতাসম্পন্ন সমাজ গঠনে বিশ্বাসী। তৃণমূলের সাধারণ মানুষ আজ পরিবর্তন চাইছে। আমরা জনগণের সেই প্রত্যাশাকে সম্মান জানিয়ে সুশৃঙ্খল ও সুসংগঠিতভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। সৎ ও দক্ষ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই কেবল তৃণমূলের প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব।
’ কেন্দ্রের ভাবনা বিএনপির তৃণমূলেও : কেন্দ্রের ভাবনার রেশ মাঠের রাজনীতিতেও এখন স্পষ্ট। ইউনি নির্বাচন বিষয়ে ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার রূপসী ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদির বলেন, ‘আমাদের এলাকায় বিএনপির বিপুল জনপ্রিয়তা রয়েছে, কিন্তু বিগত দিনে কুচক্রী মহলের কারণে কিছু বিভেদ তৈরি হয়েছিল। ইউপি নির্বাচনে যদি কেন্দ্র থেকে যোগ্য ও ত্যাগী কর্মীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়, তবে আমাদের বিজয় কেউ আটকাতে পারবে না।
তবে স্থানীয়ভাবে কিছু সুবিধাবাদী লোক এখনো ঘাপটি মেরে আছে, তাদের বিষয়ে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। ’ কুষ্টিয়া সদর উপজেলার ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বাবলু বলেন, ‘তৃণমূল পর্যায়ে জামায়াত ও অন্যান্য দল দীর্ঘদিন ধরে নীরবে নিজেদের গোছানোর কাজ করে যাচ্ছে। আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো নিজেদের মধ্যকার গ্রুপিং দূর করে ঐক্যবদ্ধ হওয়া।
যদি আমরা সঠিক এবং গ্রহণযোগ্য প্রার্থী মাঠে নামাতে পারি, তবে জামায়াত তো দূরের কথা, কোনো শক্তিই আমাদের রুখতে পারবে না। কিন্তু ভুল প্রার্থী দিলে সাধারণ ভোটাররা মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন, যা আমাদের জন্য দুঃখজনক হবে। ’ এসব বিষয়ে বিএনপির প্রচার সম্পাদক এবং সরকারের কৃষি প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, ‘ইউপি নির্বাচনে বিএনপি দক্ষ ও ত্যাগীদের মূল্যায়ন করবে।
পাশাপাশি বেশ কিছু কৌশল নিয়ে কাজ করবে, যাতে জনগণের সুনজর বিএনপির দিকে থাকে। ’ সব মিলিয়ে বিএনপিপন্থী রাজনীতি বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, আসন্ন ইউপি নির্বাচন বিএনপির জন্য নিছক কোনো সাধারণ স্থানীয় নির্বাচন নয়; এটি তাদের সাংগঠনিক সক্ষমতার এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও অযোগ্যতার সঠিক মূল্যায়ন করতে না পারলে একদিকে যেমন অভ্যন্তরীণ কোন্দল তীব্র আকার ধারণ করবে, অন্যদিকে সুসংগঠিত জামায়াতের রাজনৈতিক চাপের মুখে তৃণমূলের জনসমর্থনে বড় ধরনের ধস নামতে পারে।
তাই হাইকমান্ডের ঘোষিত শুদ্ধি অভিযান ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন নীতি কতটা কঠোরভাবে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। রাজনীতির মাঠে বিএনপির টিকে থাকা এবং তৃণমূলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার স্বার্থে দলকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
















