ছয় দফা দাবিতে ঢাকা থেকে লালদীঘি লংমার্চের মধ্য দিয়ে শক্তি প্রদর্শনে নেমেছে ১১-দলীয় ঐক্য। গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন ও জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাস, সার সংকট নিরসন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি-দুর্নীতি বন্ধ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের দাবিতে আজ শনিবার লংমার্চ করছে জোটটি। কর্মসূচিতে বাধা বা হামলা হলে কঠোর প্রতিরোধের পাশাপাশি দেশব্যাপী বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন জোটের নেতারা।
প্রায় দেড় হাজার গাড়ির বহর নিয়ে আয়োজিত এই লংমার্চ সফল করতে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। তবে সরকারি দল বিএনপির নেতারা বলছেন, পরিকল্পিত অচলাবস্থা তৈরি করা ঠিক হবে না। পাশাপাশি রাজপথে আন্দোলনের হুমকি না দিয়ে সমস্যা সমাধানে পরামর্শ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। অন্যদিকে ১১-দলীয় জোটের নেতারা বলছেন, সরকার উৎখাতের কোনো আন্দোলন নয়; জনগণের অধিকার ও দাবি আদায়ের জন্য পালিত হচ্ছে লংমার্চ।
লংমার্চের বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, এটি কোনো রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে আন্দোলন নয়। লংমার্চ হচ্ছে দেশের জন্য, দেশের মানুষের অধিকার নিশ্চিতের জন্য। এটা নট সফট, নট হার্ড। এটা একটা ব্যালেন্সড, পাবলিক ওরিয়েন্টেড, জনসম্পৃক্ত জনমত গঠনের কর্মসূচি।
তিনি বলেন, সরকারে যারাই থাকুন না কেন, মানুষের মৌলিক অধিকার, নিরাপত্তা, স্বাধীনতা এবং দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। বর্তমান সরকার সে জায়গায় ব্যর্থ হয়েছে। ১১-দলীয় নির্বাচনি ঐক্য থেকে আমরা এখনো অব্যাহতভাবে দেশ ও জাতির জন্য ভূমিকা পালন করে যাচ্ছি। নির্বাচিত হয়ে সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে যেমন ভূমিকা পালন করছি, তেমনি রাজপথেও একই দাবি, বক্তব্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে আমরা আন্দোলন করছি।
তিনি বলেন, জনগণের দাবিই আমাদের দাবি। এটি কোনো দলীয় ইস্যু নয়। তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর জনগণের আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে যে জুলাই সনদ হয়েছে, আদেশ হয়েছে এবং গণভোট হয়েছে, সরকার তা উপেক্ষা করেছে। জনগণের দাবি ও তাদের ম্যান্ডেটকে উপেক্ষা করা হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, দখলবাজি, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, দুর্নীতি এবং সংকীর্ণ দলীয়করণের বিরুদ্ধে আমাদের দাবি নিয়ে আন্দোলন চলমান রয়েছে।
লংমার্চ কর্মসূচি সম্পর্কে তিনি বলেন, সকাল ৭টায় রাজধানীর শাপলা চত্বর থেকে লংমার্চ শুরু হয়ে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদীঘি ময়দানে গিয়ে শেষ হবে। এদিকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে সরকারকে বিকল্প পরিকল্পনা দিতে বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, রাজপথে আন্দোলনের হুমকি না দিয়ে গ্যাস-বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানে জাতীয় সংসদে পরামর্শ দেন।
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট আন্তর্জাতিক যুদ্ধ ও বিগত সরকারের ভুল পরিকল্পনার জন্য হয়েছে। রিজভী বলেন, আপনারা গ্যাস, বিদ্যুতের জন্য লংমার্চ করবেন, কর্মসূচি দেবেন ঠিক আছে। কিন্তু আপনারা একটা অল্টারনেটিভ বলুন, আমরা গ্যাস ও বিদ্যুৎ কীভাবে সরবরাহ করব, কোথা থেকে পাব, কীভাবে পাব। কী কী পদক্ষেপ নিলে বর্তমান সংকট মোকাবিলা সম্ভব, সে বিষয়ে বিরোধী দলের একটি পরিকল্পনা দেওয়া উচিত।
সংসদে বিরোধী দলের সদস্যদের কথা বলার সুযোগ রয়েছে। সরকারের সমালোচনা ও সংসদের বাইরে কর্মসূচি পালন গণতন্ত্রের স্বাভাবিক চর্চা হলেও সংকট মোকাবিলায় পরামর্শ দেওয়াও প্রয়োজন। রিজভী বলেন, একটা পরিকল্পিত অচলাবস্থা তৈরি করা আমার মনে হয় ঠিক হবে না। বরং কীভাবে এই সংকট নিবারণ করা যায়, সেই বিষয়ে পরিকল্পনা দিতে হবে। অতীতের পুনরাবৃত্তি হলে পরিস্থিতি আরও অন্ধকারের দিকে যাবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
লংমার্চ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকারি দল, তাদের সহযোগী সংগঠন কিংবা প্রশাসনের কোনো অংশ বিরোধী দলের লংমার্চে প্রতিকূল পরিবেশ তৈরি করলে সরকার জনআস্থা আরও হারাবে। জনরোষের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হবে। একই সঙ্গে বৃহৎ আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দেন তিনি। তবে সরকারি দল সে পথে হাঁটবে না বলে আশা প্রকাশ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর এই নেতা।
ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত ১১ দলের লংমার্চ : কর্মসূচি বাস্তবায়নে সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, প্রাথমিকভাবে প্রায় এক হাজার গাড়ি নিয়ে লংমার্চের পরিকল্পনা করা হলেও গাড়ির সংখ্যা বেড়ে দেড় হাজারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। তিনি বলেন, শনিবার সকাল ৭টায় ঢাকায় উদ্বোধনী সমাবেশ শুরু হবে। ৮টা পর্যন্ত সমাবেশ চলার পর গাড়িবহর ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ধরে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানের উদ্দেশে যাত্রা করবে।
পথে নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লাসহ কয়েকটি স্থানে পথসভা অনুষ্ঠিত হবে বলে জানান তিনি। তবে সময় সাশ্রয়ের জন্য সব পথসভায় ১১ দলের সব নেতা বক্তব্য দেবেন না। পথে একটি অগ্রবর্তী প্রতিনিধিদল পরবর্তী সমাবেশস্থলে আগে পৌঁছে বক্তব্য দেবে। পরে মূল গাড়িবহর ও শীর্ষ নেতারা সেখানে পৌঁছাবেন। যানজট বা যান্ত্রিক কোনো সমস্যা না হলে সন্ধ্যা বা মাগরিবের মধ্যে গাড়িবহর চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে পৌঁছানোর আশা করা হচ্ছে বলে জানান জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল।
লালদীঘি ময়দানে ১১ দলের নেতাদের অংশগ্রহণে জনসভা হবে। লংমার্চে অংশগ্রহণকারীদের ডেলিগেট কার্ড দেওয়া হবে জানিয়ে গোলাম পরওয়ার বলেন, প্রতিটি গাড়িতে স্টিকার ও নম্বর থাকবে। বহরে শীর্ষ নেতাদের গাড়ি, নিরাপত্তা দল, মেডিকেল টিম, অ্যাম্বুলেন্স, আইটি ও মিডিয়া টিমের জন্য পৃথক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। গাড়িবহরের বিভিন্ন অংশের দায়িত্বে পৃথক দায়িত্বশীল থাকবেন।
পথে গাড়ি থেকে নামা যাবে না : লংমার্চে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা পথে গাড়ি থেকে নামবেন না বলে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পথসভাগুলোয় স্থানীয়ভাবে ১১ দলের নেতাকর্মীরা জনসমাগম নিশ্চিত করবেন। অংশগ্রহণকারীদের সারা দিনের যাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় শুকনো খাবার, পানি ও ওষুধ সঙ্গে রাখার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। লংমার্চ শুরুর পর নতুন কোনো গাড়ি বহরের মাঝখানে যুক্ত হতে পারবে না।
অংশ নিতে চাইলে বহরের একেবারে শেষ প্রান্তে যুক্ত হতে হবে বলে জানান গোলাম পরওয়ার। সরকার ও প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করে তিনি বলেন, এটি সরকার পতনের কোনো আন্দোলন নয়। গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, জনদুর্ভোগ নিরসনসহ ঘোষিত ছয় দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যেই এ কর্মসূচি। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিরোধী দলের রাজনৈতিক কর্মসূচি গণতন্ত্রচর্চার অংশ।
তাই শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালনে সরকার ও প্রশাসনের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন তারা। পুলিশ প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ১১ দলের নেতারা সাক্ষাৎ করে লংমার্চের বিস্তারিত তথ্য জানিয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। মহাসড়কের দুই পাশে শুভেচ্ছা জানানোর আহ্বান : ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দুই পাশে সাধারণ মানুষকে দাঁড়িয়ে লংমার্চের গাড়িবহর ও নেতাকর্মীদের শুভেচ্ছা জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন গোলাম পরওয়ার।
চট্টগ্রামের প্রস্তুতির বিষয়ে তিনি বলেন, লালদীঘি ময়দানের জনসভাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। চট্টগ্রাম মহানগরের ১১ দলের নেতারা প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়েছেন। একই সঙ্গে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘ পথের এ কর্মসূচি কাভার করতে সাংবাদিকেরা সময় ও শ্রম দিচ্ছেন। ১১ দলের পক্ষ থেকে তাদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানানো হচ্ছে।
এদিকে জনগণের ভোগান্তি নিরসন এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই ১১-দলীয় ঐক্যের ব্যানারে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত লংমার্চে এনসিপি অংশ নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেন। আখতার হোসেন বলেন, ১১-দলীয় ঐক্যের ব্যানারে আমরা ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত লংমার্চের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের বর্তমান যে প্রেক্ষাপট দেখছি, তাতে করে জনভোগান্তি নিরসন করা এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করা, সেই লক্ষ্য নিয়েই আমরা এই লংমার্চে উপস্থিত হচ্ছি।
তিনি আরও বলেন, সরকার গঠন করার ছয় মাস সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। কিন্তু এই ছয় মাস সময়কালজুড়ে সরকার গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করছে না, সরকার জনগণের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছে না, জনগণের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সারের সরবরাহ করতে পারছে না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও ভালো না। জনগণের যে দাবি-দাওয়াগুলো রয়েছে, সেগুলো নিয়ে আমরা সংসদে কথা বলছি।
কিন্তু এখন পর্যন্ত সরকারের তরফ থেকে এই দাবি-দাওয়াগুলোকে গ্রাহ্য করার মতো মানসিকতা প্রদর্শন করা হয়নি।
















