ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ পৌরসভা ১২ দশমিক ৪১ বর্গকিলোমিটার আয়তনে মোট ৯টি ওয়ার্ড নিয়ে ১৯৯৭ সালে গঠিত হয়। বর্তমানে পৌরসভার জনসংখ্যা ৬৫ হাজার ৬৭৫ জন। ২০১১ সালে এটি প্রথম শ্রেণির পৌরসভা হিসেবে মর্যাদা লাভ করে।
প্রথম শ্রেণির মর্যাদা লাভের ১৫ বছর পরও শহরের বিভিন্ন এলাকায় ডাম্পিং স্টেশন বা আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠেনি। ফলে কাঁচামাটিয়া নদীর তীর ও ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়ক, যা পৌরবাজারে প্রবেশের অন্যতম প্রধান পথ, তার পাশ ঘেঁষে গড়ে উঠেছে ময়লার ভাগাড়। সেখানে বিভিন্ন বাসাবাড়ি, হোটেল ও দোকানপাটের নানা ধরনের বর্জ্য প্রতিদিনই ফেলা হচ্ছে।
প্রতিদিনের কাজের তাগিদে এই প্রবেশপথ দিয়ে ভাগাড়ের পাশ হয়ে বিভিন্ন ইউনিয়নের লোকজনসহ পৌরসভায় অবস্থিত বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের হাজারো মানুষ শহরে প্রবেশ করে থাকেন। এ ছাড়া ভাগাড়ের আশপাশে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, একাধিক সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের শাখাসহ ছোট-বড় নানা ধরনের ব্যবসা।
ফলে ময়লার ভাগাড় থেকে ভেসে আসা উৎকট দুর্গন্ধে একদিকে যেমন পরিবেশ বিপর্যয় ঘটেছে, অন্যদিকে হুমকিতে পড়েছে জনস্বাস্থ্য। বাড়ছে শিশু ও বৃদ্ধদের শ্বাসকষ্টসহ মশাবাহিত রোগ। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কাঁচামাটিয়া নদীর তীর ও পৌরবাজারের অন্যতম প্রবেশপথ ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশেই পচনশীল ও অপচনশীল নানা ধরনের বর্জ্য ফেলে ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।
সেই ভাগাড় থেকে ময়লা মূল সড়কের ওপরের অংশেও ছড়িয়ে রয়েছে। যেখান থেকে আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে উৎকট দুর্গন্ধ। এই দুর্গন্ধ থেকে বাঁচতে পথচারীরা নাক-মুখে হাত চেপে ধরে দ্রুত ভাগাড়ের স্থান ত্যাগ করছেন। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকেই। প্রতিবেদনটি লেখার সময়ও মহাসড়কের ওপর ছড়িয়ে থাকা ময়লা সরিয়ে নেওয়াসহ প্রতিদিনের ময়লা নদীর তীরে ফেলা হচ্ছে।
ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ সড়কের পাশের ভাগাড় এলাকার পুরাতন কাপড় ব্যবসায়ী আক্কাস আলী বলেন, দিনের অধিকাংশ সময় ভাগাড় থেকে ভেসে আসা দুর্গন্ধে বসে থাকাটাই অনেক কষ্টকর হয়ে যায়। অনেক সময় ক্রেতা চলে যান। ফলে বিক্রি কমেছে, বাড়ছে আর্থিক ক্ষতি। ষাটোর্ধ্ব ইসব আলী বলেন, পুরো বাজারের পচা-ময়লা গাড়ি ভর্তি করে রাস্তার পাশে ফেলে যায় এবং শুকনো ময়লায় কে যেন আগুন ধরিয়ে দেয়।
তা থেকে মাঝেমধ্যে এমন তীব্র দুর্গন্ধ আসে যে শ্বাসকষ্ট ও কাশিতে এই বুঝি দম যায় অবস্থা। তখন মাঝেমধ্যে দোকান থেকে দূরে চলে যাই। হোসেন আলীও একই কথা বলেন। ময়লার ভাগাড়ের পাশ দিয়ে নাক-মুখ চেপে ধরে আসা পথচারী, চর হোসেনপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল বারেক বলেন, শহরের বিভিন্ন ময়লা-আবর্জনা এখানে ফেলে স্তূপ করায় দুর্গন্ধে বাজারে ঢোকার এই রাস্তাটি দিয়ে প্রবেশ করতে খুব কষ্ট হয়ে পড়ে।
ময়লার ভাগাড়ের পাশে বুলবুল টাওয়ারের গার্মেন্ট কাপড় ব্যবসায়ী জিয়া উদ্দিন বলেন, ময়লার ভাগাড়ের দুর্গন্ধ পেরিয়ে ক্রেতাদের দোকানে আসতে কষ্ট হয়। অনেক সময় গাড়ির নিচে পিষ্ট হওয়া কুকুর ময়লার ভাগাড়ের ওপর ফেলে রাখায় দোকানের গ্লাস বন্ধ রাখতে হয়। ঈশ্বরগঞ্জ সরকারি কলেজের উপাধ্যক্ষ মো. আব্দুল হান্নান বলেন, প্রথম শ্রেণির এ পৌরসভাটিতে আমাদের সরকারি কলেজসহ অনেক সুনামধন্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যাকে আমরা শিক্ষা নগরী হিসেবে ধরে নিতে পারি।
এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র-ছাত্রীসহ অসংখ্য মানুষ মহাসড়কের পাশে গড়ে ওঠা ময়লার ভাগাড়ের পাশ দিয়ে অনেক বিড়ম্বনা নিয়ে চলাচল করতে হয়। পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে প্রত্যাশা, তারা সরকারি অন্য কোনো জায়গায় ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণ করে জনসাধারণসহ ছাত্র-ছাত্রীদের স্বস্তি ফিরিয়ে দেবে। ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের (আবাসিক সার্জন-রোগ নিয়ন্ত্রণ) ডা. তানভিন হাসান তরঙ্গ বলেন, ময়লার দূষিত দুর্গন্ধে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, হাঁপানি, কাশি ও শ্বাসকষ্টসহ নানা ধরনের রোগ হয়ে থাকে।
এ থেকে বেঁচে থাকতে হলে আমাদের প্রয়োজন নিয়মিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করা। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা শাখার সভাপতি সাইফুল ইসলাম তালুকদার বলেন, পৌর নাগরিকদের কাছ থেকে ট্যাক্স আদায় করলেও পৌর কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের প্রয়োজনমাফিক সেবা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। শহরের প্রবেশপথে ময়লার ভাগাড়ের ব্যাপারে উদাসীনতার পরিচয় দিচ্ছে।
ফলে জনভোগান্তির পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়ছে। এ থেকে মুক্তি দিতে যেকোনো জায়গায় চাহিদা অনুযায়ী জায়গা ক্রয় করে ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণের সক্ষমতা পৌর কর্তৃপক্ষের রয়েছে। কাজেই পৌর কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত জায়গা ক্রয় করে ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণ করে এ জনভোগান্তি থেকে মানুষকে মুক্তি দেওয়া। এ ব্যাপারে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও পৌর প্রশাসক সালাউদ্দিন বিশ্বাস বলেন, ময়লার ভাগাড়টি এখান থেকে সরিয়ে নিতে (হরি শর্রী) এলাকায় সরকারি একটি জায়গায় ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণের স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে।
বর্তমানে সেখানে স্থানীয় কিছু লোকের বাধার মুখে পড়েছে। আমাদের চেষ্টা অব্যাহত আছে।

















