আজ শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬
১২ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
৩০°C
সর্বোচ্চ: ৩৩°C
সর্বনিম্ন: ২৭°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৯৮%

শিল্পের স্বার্থে জ্বালানি সংকটের দ্রুত সমাধান প্রয়োজন

  • MIT ERP
  • Update Time : 09:29:56 am, Friday, 28 August 2026
  • 8
Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি হচ্ছে উৎপাদন। আর উৎপাদনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি শিল্প। শিল্পকারখানা শুধু পণ্য উৎপাদন করে না, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কর্মসংস্থান, রপ্তানি, বিনিয়োগ, রাজস্ব আয় এবং কোটি মানুষের জীবিকা।

ফলে শিল্পের চাকা সচল রাখা কোনো একটি খাতের স্বার্থরক্ষা নয়; এটি সামগ্রিক অর্থনীতির স্বার্থ রক্ষার বিষয়। অথচ গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটসহ নানা কারণে দেশের শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার যে খবর সামনে আসছে, তা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। দীর্ঘস্থায়ী এ সংকট অব্যাহত থাকলে এর অভিঘাত শিল্পের সীমানা ছাড়িয়ে জাতীয় অর্থনীতিতেও পড়বে। বিশেষ করে গ্যাসের স্বল্পচাপ শিল্পকারখানার উৎপাদনকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।

কোথাও উৎপাদন কমছে, কোথাও যন্ত্রপাতির পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না, আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানকে উৎপাদন বন্ধ রাখার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ সরবরাহে অনিশ্চয়তা যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিয়মিত উৎপাদন করতে না পারলে শুধু তার মালিকই ক্ষতিগ্রস্ত হন না। শ্রমিকের আয় কমে, সরবরাহব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে চাপ তৈরি হয়, রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হয় এবং সরকারের রাজস্বও কমে যায়।

এ অবস্থায় সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি সাময়িকভাবে সংকট মোকাবিলা করব, নাকি দীর্ঘমেয়াদি জ¦ালানি নিরাপত্তার ভিত্তি তৈরি করব? অতীতে আমরা বারবার সংকট দেখা দিলে তাৎক্ষণিক সমাধানের চেষ্টা করেছি। কিন্তু জ¦ালানি খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে খ-কালীন ব্যবস্থা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্য যদি সরকারের থাকে, তাহলে তার প্রথম শর্তই হতে হবে নির্ভরযোগ্য জ¦ালানি সরবরাহ। সরকারকে তাই শিল্পাঞ্চলে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে বাস্তবভিত্তিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে জোর দিতে হবে। শুধু গ্যাসের ওপর নির্ভর করেও ভবিষ্যতের জ¦ালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না।

শিল্পে নবায়নযোগ্য জ¦ালানির ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎসাহ দেওয়া, প্রয়োজনীয় নীতিগত সুবিধা দেওয়া এবং জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানোর জন্য বিকেন্দ্রীভূত জ¦ালানি ব্যবস্থার প্রসার ঘটানো যেতে পারে। একই সঙ্গে শিল্পকারখানায় জ¦ালানি দক্ষতা বাড়ানো ও অপচয় কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

সরকারকে আরও একটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। সাময়িক জ¦ালানি সংকটে যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তাদের অনেকেরই ব্যাংকঋণ, শ্রমিকের বেতন, রপ্তানি আদেশ ও সরবরাহকারীদের পাওনা পরিশোধের দায় রয়েছে। দীর্ঘদিন উৎপাদন ব্যাহত হলে এসব প্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকটে পড়তে পারে। ফলে সম্ভাবনাময় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো যাতে কেবল সাময়িক সংকটের কারণে স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে না যায়, সে জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত ও আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করা উচিত।

তবে এ সহায়তা হতে হবে স্বচ্ছ, শর্তসাপেক্ষ এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য। আমরা মনে করি, বর্তমান সংকটকে কেবল আরেকটি সাময়িক সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটিকে দেশের জ¦ালানি ও শিল্প ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার সুযোগ হিসেবে নিতে হবে।

সরকারের উচিত এখনই একটি সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি শিল্প ও জ¦ালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করা, যেখানে দেশীয় জ¦ালানি অনুসন্ধান, আমদানি ব্যবস্থাপনা, নবায়নযোগ্য জ¦ালানি, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পে সরবরাহ এবং জ¦ালানি দক্ষতা, সবকিছুকে একই কাঠামোর মধ্যে আনা হবে। শিল্পের চাকা থামিয়ে কোনো অর্থনীতিই এগোতে পারে না।

সরকারকে তাই সংকটের সাময়িক ব্যবস্থাপনার বাইরে গিয়ে এখনই এমন একটি জ¦ালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে শিল্প উদ্যোক্তা ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা রাখতে পারেন, শ্রমিক কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা পান এবং দেশ উৎপাদন ও রপ্তানির সক্ষমতা নিয়ে এগিয়ে যেতে পারে। উন্নয়নের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে সবার আগে সচল রাখতে হবে শিল্পের চাকা।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

শিল্পের স্বার্থে জ্বালানি সংকটের দ্রুত সমাধান প্রয়োজন

Update Time : 09:29:56 am, Friday, 28 August 2026

দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি হচ্ছে উৎপাদন। আর উৎপাদনের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি শিল্প। শিল্পকারখানা শুধু পণ্য উৎপাদন করে না, এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কর্মসংস্থান, রপ্তানি, বিনিয়োগ, রাজস্ব আয় এবং কোটি মানুষের জীবিকা।

ফলে শিল্পের চাকা সচল রাখা কোনো একটি খাতের স্বার্থরক্ষা নয়; এটি সামগ্রিক অর্থনীতির স্বার্থ রক্ষার বিষয়। অথচ গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটসহ নানা কারণে দেশের শিল্প খাতে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার যে খবর সামনে আসছে, তা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। দীর্ঘস্থায়ী এ সংকট অব্যাহত থাকলে এর অভিঘাত শিল্পের সীমানা ছাড়িয়ে জাতীয় অর্থনীতিতেও পড়বে। বিশেষ করে গ্যাসের স্বল্পচাপ শিল্পকারখানার উৎপাদনকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।

কোথাও উৎপাদন কমছে, কোথাও যন্ত্রপাতির পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না, আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানকে উৎপাদন বন্ধ রাখার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ সরবরাহে অনিশ্চয়তা যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিয়মিত উৎপাদন করতে না পারলে শুধু তার মালিকই ক্ষতিগ্রস্ত হন না। শ্রমিকের আয় কমে, সরবরাহব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে চাপ তৈরি হয়, রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হয় এবং সরকারের রাজস্বও কমে যায়।

এ অবস্থায় সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি সাময়িকভাবে সংকট মোকাবিলা করব, নাকি দীর্ঘমেয়াদি জ¦ালানি নিরাপত্তার ভিত্তি তৈরি করব? অতীতে আমরা বারবার সংকট দেখা দিলে তাৎক্ষণিক সমাধানের চেষ্টা করেছি। কিন্তু জ¦ালানি খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে খ-কালীন ব্যবস্থা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

শিল্পায়ন ও বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্য যদি সরকারের থাকে, তাহলে তার প্রথম শর্তই হতে হবে নির্ভরযোগ্য জ¦ালানি সরবরাহ। সরকারকে তাই শিল্পাঞ্চলে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে বাস্তবভিত্তিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে জোর দিতে হবে। শুধু গ্যাসের ওপর নির্ভর করেও ভবিষ্যতের জ¦ালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না।

শিল্পে নবায়নযোগ্য জ¦ালানির ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে হবে। বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎসাহ দেওয়া, প্রয়োজনীয় নীতিগত সুবিধা দেওয়া এবং জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানোর জন্য বিকেন্দ্রীভূত জ¦ালানি ব্যবস্থার প্রসার ঘটানো যেতে পারে। একই সঙ্গে শিল্পকারখানায় জ¦ালানি দক্ষতা বাড়ানো ও অপচয় কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে।

সরকারকে আরও একটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। সাময়িক জ¦ালানি সংকটে যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তাদের অনেকেরই ব্যাংকঋণ, শ্রমিকের বেতন, রপ্তানি আদেশ ও সরবরাহকারীদের পাওনা পরিশোধের দায় রয়েছে। দীর্ঘদিন উৎপাদন ব্যাহত হলে এসব প্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকটে পড়তে পারে। ফলে সম্ভাবনাময় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো যাতে কেবল সাময়িক সংকটের কারণে স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে না যায়, সে জন্য প্রয়োজনীয় নীতিগত ও আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করা উচিত।

তবে এ সহায়তা হতে হবে স্বচ্ছ, শর্তসাপেক্ষ এবং প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য। আমরা মনে করি, বর্তমান সংকটকে কেবল আরেকটি সাময়িক সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটিকে দেশের জ¦ালানি ও শিল্প ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার সুযোগ হিসেবে নিতে হবে।

সরকারের উচিত এখনই একটি সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি শিল্প ও জ¦ালানি নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করা, যেখানে দেশীয় জ¦ালানি অনুসন্ধান, আমদানি ব্যবস্থাপনা, নবায়নযোগ্য জ¦ালানি, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পে সরবরাহ এবং জ¦ালানি দক্ষতা, সবকিছুকে একই কাঠামোর মধ্যে আনা হবে। শিল্পের চাকা থামিয়ে কোনো অর্থনীতিই এগোতে পারে না।

সরকারকে তাই সংকটের সাময়িক ব্যবস্থাপনার বাইরে গিয়ে এখনই এমন একটি জ¦ালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে শিল্প উদ্যোক্তা ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা রাখতে পারেন, শ্রমিক কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা পান এবং দেশ উৎপাদন ও রপ্তানির সক্ষমতা নিয়ে এগিয়ে যেতে পারে। উন্নয়নের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে সবার আগে সচল রাখতে হবে শিল্পের চাকা।