বাংলাদেশ পুলিশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় শান্তিরক্ষী কন্টিনজেন্ট মোতায়েন হচ্ছে অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত আমেরিকা মহাদেশের ক্যারিবিয় দ্বীপরাষ্ট্র হাইতিতে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী মাস থেকে ৫৩০ পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য পৃথক তিনটি কন্টিনজেন্ট এফপিইউ হাইতি হিসেবে মোতায়েন হবে।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে দারিদ্র্যে নিমজ্জিত দেশটিতে শান্তি ফেরাতে এবং অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলায় ভূমিকা রাখতে বাংলাদেশ পুলিশের কন্টিনজেন্ট মোতায়েনের জন্য নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় জাতিসংঘ। ক্ষতিগ্রস্ত এ দেশটি বিভিন্ন গোষ্ঠী ও উগ্রবাদীদের দমনের পাশাপাশি স্থানীয় জনসাধারণের শান্তি ফেরাতে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী হিসেবে সর্বোচ্চসংখ্যক মিশনটি ১০ বছর বা তারও বেশি সময়ের জন্য মোতায়েন থাকতে পারে।
ইতোমধ্যে পুলিশ সদর দপ্তরের জাতিসংঘ মিশন শাখা থেকে সব প্রস্তুতি শেষ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন পর এত বড় সংখ্যক সদস্যদের শান্তিরক্ষী হিসেবে মিশনে অংশ নেওয়া পুলিশের জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। যা দেশের জন্য বড় ধরনের অর্থনৈতিক আয়ের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে বলেও বলা হচ্ছে। ছয় বছর পর নতুন করে হাইতির মিশন চালু হওয়ায় সেই ভাবমূর্তি সংকট কাটিয়ে উঠার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
জানা গেছে, ক্যারিবীয় দ্বীপ রাষ্ট্র হাইতিতে ২০১৮ সালের পর আর কোনো বাংলাদেশ পুলিশের নতুন কোনো কন্টিনজেন্ট মোতায়েন হয়নি। সর্বশেষ মিশনটি ছিল ডিআর কঙ্গোতে ১৮০ সদস্যের। যেটি পূর্ণ মিশন শেষ করার আগে ফেরত এসেছে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাজেট ঘাটতি ও অন্যান্য সমস্যার কারণে। হাইতিতে অন্যান্য দেশ থেকে পুলিশ বাহিনী থেকে শান্তিরক্ষী হিসেবে মোতায়েন হলেও বাংলাদেশ পুলিশের কোনো শান্তিরক্ষী হিসেবে মোতায়েন হয়নি গত ৬ বছর।
তবে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর জাতিসংঘের বিভিন্ন মিশনে বাংলাদেশ পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনী থেকে শান্তিরক্ষী কন্টিনজেন্ট আরও বেশিসংখ্যক মোতায়েনের জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়। সর্বশেষ গত কয়েক মাস আগে আমেরিকায় জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোর পুলিশপ্রধানদের সম্মেলনে বাংলাদেশ পুলিশের শান্তিরক্ষী হিসেবে কন্টিনজেন্ট মোতায়েনের বিষয়টি অগ্রাধিকার হিসেবে দেখতে সরকারের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে ওই সম্মেলনে পুলিশপ্রধান আলী হোসেন ফকির ছাড়াও অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম, পুলিশ সদর দপ্তরের ইউএন মিশনের অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল মামুন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা অংশ নেন। মূলত ওই সম্মেলনে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের সাথে একাধিক দ্বিপাক্ষিক সভায় বাংলাদেশ পুলিশের জাতিসংঘের বিভিন্ন দেশে শান্তিরক্ষী হিসেবে কাজ করার সক্ষমতা তুলে ধরা হয়।
মূলত এ সভাগুলো থেকে হাইতিতে পুলিশের সর্বোচ্চ সংখ্যক শান্তিরক্ষী মোতায়েনের পথ সুগম হয়। পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনে ব্যয় সংকোশন ও বাজেট ঘাটতির কারণে গত বছর ডিআর কঙ্গো মিশন থেকে বাংলাদেশ পুলিশের ১৮০ সদস্যের পুরো কন্টিনজেন্ট প্রত্যাহার করা হয়। মিশন শেষ হওয়ার আগেই বাংলাদেশ পুলিশের ওই কন্টিনজেন্ট প্রত্যাহারে বাংলাদেশের জন্য বড় ধাক্কা তৈরি হয়েছিল।
অন্যান্য দেশের পুলিশ কঙ্গো মিশনে আংশিক প্রত্যাহার হলেও কেবল বাংলাদেশ পুলিশের পুরো কন্টিনজেন্ট প্রত্যাহারের নেপথ্যে ছিল আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে মিশনে নানা ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া। ফলে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনে পুলিশের ভাবমূর্তিও সংকটে পড়েছিল। নতুন করে হাইতির মিশন সেই ভাবমূর্তি সংকট কাটিয়ে উঠার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
কারণ বাংলাদেশ পুলিশ অন্যান্য দেশের পুলিশের চেয়ে পেশাদারিত্বের সাথে মিশনে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে দেশের সুমান বয়ে এনেছিল। সূত্র জানিয়েছে, ৫৭টি এপিসি, তিনটি ট্যাংকার, জিপ তিনটি অ্যাম্বুলেন্স রেকারসহ ছোট-বড় বিভিন্ন পর্যায়ের ১০৪ যানবাহন থাকবে এ মিশনে। প্রতিটি গাড়ির জন্য প্রতিদিন নির্ধারিত ভাড়া পাবে বাংলাদেশ সরকার। বিপুল পরিমাণ এ টাকা সরকারের রাজস্ব খাতে জমা হবে।
জাতিসংঘের এ মিশনে শান্তিরক্ষীরা বেতন-ভাতা হিসেবে একটি বিপুল অংকের আর্থিক সুবিধা পাবেন। পাশাপাশি লজিস্ট্রিক সাপোর্ট যেমন গাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স, জেনারেটরসহ অন্যান্য যেসব ইকুয়েপমেন্ট মিশনে যুক্ত থাকবে সেগুলোর ভাড়াও জাতিসংঘ থেকে পরিশোধ করা হবে। শান্তিরক্ষীদের যেসব অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিরাপত্তার জন্য দেওয়া হয় সেগুলো থেকেও ভাড়া পাবে বাংলাদেশ পুলিশ।
ফলে এখান থেকে বড় অঙ্কের আয় হবে বাংলাদেশের। যা দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখার সুযোগ হচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানিয়েছে, ১৭৫ জন করে তিন কন্টিনজেন্টের কমান্ডার হিসেবে থাকছেন তিনজন পুলিশ সুপার পদমর্যাদার কর্মকর্তা। এর মধ্যে প্রথম কন্টিনজেন্ট মোতায়েন হবে পুলিশ সুপার লিমন রায়ের নেতৃত্বে ১৭৫ জনে। দ্বিতীয় কন্টিনজেন্ট মোতায়েন হবে পুলিশ সুপার সফিউল ইসলামের নেতৃত্বে।
তৃতীয় কন্টিনজেন্টের নেতৃত্বে থাকছেন পুলিশ সুপার আবদুল্লাহ বিন কালাম। এ ছাড়া একজন ডিআইজি, অতিরিক্ত ডিআইজি, দুজন পুলিশ সুপার এবং এডিশনাল এসপি পদমর্যাদার দুজনসহ পাঁচজন হাইতির রাজধানীতে মিশন হেডকোয়াটার্সে মোতায়েন থাকবেন। ২০১০ সালে প্রথমবারের মতো হাইতিতে বাংলাদেশ পুলিশের শান্তিরক্ষী কন্টিনজেন্ট মোতায়েন হয়। ২০১৮ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে হাইতিতে পুলিশের যেসব কন্টিনজেন্ট মোতায়েন ছিল তারা জাতিসংঘের নির্ধারিত কাজের বাইরে কিছু সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন।
ফলে স্থানীয় জনগণের মধ্যে বাংলাদেশ পুলিশের জনপ্রিয়তা ব্যাপকভাবে প্রসংশিত হয়। ফলে পুলিশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সর্বোচ্চ সংখ্যক শান্তিরক্ষী মিশন হাইতিতে মোতায়েন হচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল মামুন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, হাইতিতে আগামী মাসে যে কন্টিনজেন্ট মোতায়েন হবে ওই কন্টিনজেন্টের জন্য জাতিসংঘের মিশন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে পরীক্ষার মাধ্যমে মেধাবী ও দক্ষ পুলিশ কর্মকর্তা এবং কনস্টেবলদের চূড়ান্ত করা হয়েছে।
চূড়ান্ত হওয়া পুলিশ কর্মকর্তাদের বিভিন্ন ধাপে প্রশিক্ষণ দিয়ে শান্তিরক্ষী হিসেবে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সাথে কাজ করার জন্য ইতোমধ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে। মিশন সদস্যদের লজিস্ট্রিক সাপোর্টের জন্য ৭৫টি কন্টেইনারে অস্ত্র, গুলি, বুলেটপ্রুফ এপিসি, জিপ গাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স, জেনারেটরসহ সব ধরনের ইকুয়েপমেন্ট যাবে। ইতেমধ্যে লজিস্টিক কন্টেইনার পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে হাইতির রাজধানীতে।
লজিস্টিক ইকুয়েপমেন্ট, গাড়ি, এপিসি, অ্যাম্বুলেন্স, জেনারেটরসহ সবকিছু যাওয়ার পর মূল কন্টিনজেন্ট যাবে। প্রথম কন্টিনজেন্টে ১৭৫ জন পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য মোতায়েন হবে। দ্বিতীয় দাপে ও তৃতীয় ধাপেও ১৭৫ জনের কন্টিনজেন্ট মোতায়েন হবে। মূল কন্টিনজেন্ট ছাড়াও পুলিশ সদর দপ্তরের একটি প্রতিনিধি দল মিশন সদর দপ্তরে সার্বিক মিশন মনিটরিংয়ের জন্য মোতায়েন থাকবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এইচ এম সাহাদাত হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে জানান, ১৯৮৯ সালে নামিবিয়া মিশনের মাধ্যমে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ পুলিশের পদযাত্রা শুরু হয়। সেই থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ পুলিশের ১ হাজার ৯২৮ জন নারী পুলিশসহ মোট ২২ হাজার ২০৮ জন শান্তিরক্ষী ২৪টি দেশে ২৬টি শান্তিরক্ষা মিশনে পেশাদারিত্ব ও সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে বিশ্ব শান্তিরক্ষায় অনন্য অবদান রেখেছেন।
হাইতিতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ পুলিশের ৫২৫ সদস্য শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে নিয়োজিত হতে যাচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশের ৮ জন নারীসহ ৩৭ জন পুলিশ কর্মকর্তা ইউনাইটেড নেশনস পুলিশে (ইউএনপোল) ও ইউএন জবে নিয়োজিত রয়েছেন। বাংলাদেশ পুলিশের নারী সদস্যরা ২০০০ সাল থেকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করছেন। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালনকালে বাংলাদেশ পুলিশের ২৫ জন সদস্য জীবন উৎসর্গ করেছেন এবং ১৫ জন আহত হয়েছেন।





















