দীর্ঘ ১৭ বছরের বেশি সময় ধরে রাজপথের তীব্র আন্দোলন-সংগ্রাম এবং অগণিত মিথ্যা মামলার ধকল সয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এরপর থেকে দলের ভেতরে নতুন এক রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে।
রাজপথের পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশের মধ্যে তৈরি হয়েছে তীব্র অসন্তোষ। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে নতুন মুখের সমাহার এবং দীর্ঘদিনের দুঃসময়ে দলের পাশে থাকা ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়নে ঘাটতি থাকায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
ত্যাগী নেতাকর্মীদের মনে কেন এই ক্ষোভ ও হতাশা : দলের বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, বিগত সরকারবিরোধী আন্দোলনে যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাজপথে ছিলেন, পুলিশি নির্যাতন সয়েছেন এবং কারাবরণ করেছেন, সরকার গঠনের পর মন্ত্রিসভা ও গুরুত্বপূর্ণ পদবণ্টনে তাদের বড় একটি অংশ উপেক্ষিত হয়েছেন। তৃণমূলের অভিযোগ, সুসময়ে অনেক হাইব্রিড ও সুবিধাভোগী নেতা দলের নীতিনির্ধারণী ও ক্ষমতার কাছাকাছি চলে এলেও রাজপথের লড়াকু সৈনিকেরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন।
বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে হামলা-মামলার শিকার হয়ে যারা সর্বস্ব হারিয়েছেন, তারা নিজেদের যথাযথ মূল্যায়ন না পেয়ে মানসিক বেদনায় ভুগছেন। কী চান ত্যাগী নেতাকর্মীরা : ক্ষমতার ভাগাভাগিতে নয়; বরং বিগত দিনে দলের জন্য ত্যাগের প্রকৃত মূল্যায়ন চান তারা। দলে কোনো ধরনের সুবিধাবাদী ও অনুপ্রবেশকারীদের ঠাঁই না দিয়ে পরীক্ষিত ও প্রবীণ-নবীন সমন্বয়ে নেতৃত্ব গঠন।
ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করে সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং দলের দুর্দিনের কর্মীদের খোঁজখবর নেওয়ার দাবি ত্যাগীদের। রাজপথের কোনো ত্যাগী নেতাকর্মীকে ভুলে যায়নি দল : দলের প্রভাবশালী একজন স্থায়ী কমিটির সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘বিএনপি একটি বিশাল রাজনৈতিক দল। এত বড় পরিসরে সবাইকে একসঙ্গে মূল্যায়ন করা রাতারাতি সম্ভব হয়ে ওঠে না।
তবে আমাদের দলের চেয়ারম্যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান থেকে শুরু করে শীর্ষ নেতৃত্ব সবার ত্যাগের ইতিহাস সম্পর্কে ওয়াকিবহাল আছেন। রাজপথের কোনো ত্যাগী নেতাকর্মীকে দল ভুলে যায়নি; পর্যায়ক্রমে যোগ্যতার ভিত্তিতে সবাইকে যথাযথ জায়গায় মূল্যায়ন করা হবে। ’ অন্য আরেকজন স্থায়ী কমিটির সদস্য বলেন, ‘দলের ভেতর ছোটখাটো ক্ষোভ বা ভুল-বোঝাবুঝি থাকতেই পারে, যা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব।
সরকার গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বিন্যাসে দীর্ঘসূত্রতা হতে পারে, তবে আমাদের মূল শক্তি হলো তৃণমূল। তৃণমূলকে অসন্তুষ্ট রেখে দল সামনে এগোতে পারে না। ’ এদিকে মন্ত্রিসভার একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রী বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেন, ‘আমরা আজ যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি, তা এক দিনে তৈরি হয়নি। এর পেছনে লাখো নেতাকর্মীর রক্ত ও শ্রম রয়েছে।
সরকার ও দল একসঙ্গে কাজ করছে যেন কোনো ত্যাগী কর্মী অবমূল্যায়িত না হন। কিছুটা সময় হয়তো লাগবে, কিন্তু আমরা সবার অধিকার ও সম্মান রক্ষায় বদ্ধপরিকর। ’ মন্ত্রিসভার অপর একজন সদস্য যোগ করেন, ‘জনগণের প্রত্যাশা এখন অনেক বেশি। বিগত দিনের সব ভুলত্রুটি শুধরে একটি সুশৃঙ্খল ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলাই আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
রাজপথের লড়াকু ভাইদের মনে কোনো কষ্ট থাকলে দলীয় ফোরামে আলোচনার মাধ্যমে তার অবসান ঘটানো হবে। ’ সরকার পরিচালনা বড় চ্যালেঞ্জ : এসব বিষয়ে বিএনপিপন্থী একাধিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলছেন, রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদলের পর এ ধরনের অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন নতুন নয়। তবে দীর্ঘ আন্দোলনের পর ক্ষমতায় আসা বিএনপির জন্য এটি একটি বড় পরীক্ষা ছিল, তেমননি বিগত দিনে দেশের কথা চিন্তা করে এখন সরকার পরিচালনা করাও দলটির জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ।
ত্যাগী ও রাজপথের নেতাকর্মীদের না পাওয়ার বেদনা ঘুচিয়ে যদি দলকে সুসংহত করা না যায়, তবে তা দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব কীভাবে এই ক্ষোভ প্রশমিত করে সবাইকে আস্থায় নিয়ে এগিয়ে যান, এখন সেটাই দেখার বিষয়। তথ্যমতে, সরকার গঠনের পর বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলোয় অভ্যন্তরীণ হিসাব-নিকাশ এবং পদায়ন নিয়ে নানা আলোচনা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
বিএনপির ক্ষেত্রেও সরকার গঠনের পর দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন এবং দলের সাংগঠনিক পুনর্গঠন নিয়ে নানা মহলে আলোচনা রয়েছে। দলীয় সূত্রে জানা যায়, একসঙ্গে সবাইকে মূল্যায়ন করা বা সবার প্রত্যাশা পূরণ করা কঠিন হওয়ায় কিছু নেতাকর্মীর মধ্যে কিছুটা মানসিক দূরত্ব বা ক্ষোভ তৈরি হলেও হাইকমান্ড তা সুশৃঙ্খলভাবে সমাধানের চেষ্টা করছেন।
সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ সংবাদমাধ্যমে স্পষ্ট করেছেন, সরকার ও দলের অবস্থান সম্পূর্ণ আলাদা রাখা হচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, দলের অনেক নেতাই সরকার বা সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তবে এর মানে এই নয় যে দলীয় পরিচয় বা কার্যক্রম সরকারের ভেতরে বিলীন হয়ে গেছে। হাইকমান্ডের পক্ষ থেকে ত্যাগী নেতাকর্মীদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে যথাযথ মূল্যায়ন করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।
এটি আমাদের দল এবং নেতৃত্বের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল : জানতে চাইলে বিএনপির প্রচার সম্পাদক এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, ‘যারা রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছেন, পঙ্গুত্ববরণ করেছেন এবং মিথ্যা মামলায় বছরের পর বছর জেল-জুলুম সহ্য করেছেন, আজ সরকার গঠনের পর তাদের অনেকের মনেই একধরনের মানসিক বেদনা ও ক্ষোভ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
এটি আমাদের দল এবং নেতৃত্বের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি বিষয়। ’ তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে বিএনপি এবং এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা চরম নির্যাতন সহ্য করেছেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে, যাদের ত্যাগের বিনিময়ে আজ এই পরিবর্তিত পরিস্থিতি এসেছে, তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা আমাদের রাজনৈতিক নৈতিক দায়িত্ব। দলের ভেতরে বা বাইরে কেউ যেন মনে না করেন যে ত্যাগী কর্মীরা উপেক্ষিত হচ্ছেন।
’ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান বলেন, ‘শহীদদের রক্ত এবং নেতাকর্মীদের আত্মত্যাগকে কোনোভাবেই ম্লান হতে দেওয়া যাবে না। চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনা অনুযায়ী, রাজপথের পরীক্ষিত, ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতাকর্মীদের যথাযথ মর্যাদা ও মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে আমরা বদ্ধপরিকর। নেতাকর্মীদের এই ক্ষোভ ও অভিমান দূর করতে দলের সর্বস্তরের নেতৃত্বকে আরও দায়িত্বশীল ও সংবেদনশীল হতে হবে।





















