আজ বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬
১০ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
২৭°C
সর্বোচ্চ: ৩৩°C
সর্বনিম্ন: ২৬°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ১০০%

সিলেটের বিছানাকান্দি ও হাদারপাড়ে চলছে অবৈধ পাথর-বালু লুটের মহোৎসব

  • MIT ERP
  • Update Time : 11:26:10 pm, Monday, 24 August 2026
  • 20

সিলেটের বিছানাকান্দি ও হাদারপাড়ে চলছে অবৈধ পাথর-বালু লুটের মহোৎসব

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

সিলেটের ভোলাগঞ্জের সাদাপাথরকেন্দ্রিক নানামুখী ঘটনা ও আলোচনার আড়ালে কার্যত চাপা পড়ে গেছে সীমান্তঘেঁষা পর্যটনকেন্দ্র বিছানাকান্দি। প্রশাসনের নজর ও বাড়তি গুরুত্ব যখন একদিকে নিবদ্ধ, ঠিক সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সবার অলক্ষ্যে গোয়াইনঘাটের এই পর্যটন ও সীমান্ত এলাকা এবং সঙ্গে হাদারপাড় এলাকায় অবৈধভাবে চলছে পাথর-বালু লুটের মহোৎসব।

অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতা এই লুটপাটের সঙ্গে জড়িত। তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেন উপজেলা বিএনপি ও অভিযুক্তরা। এদিকে বালু-পাথর লুট বন্ধে সম্প্রতি প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। তবে স্থানীয়দের মতে, সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য থামানোর জন্য এটা যথেষ্ট নয়। এই এলাকায় খনিজসম্পদ লুটের চিত্র এটিই প্রথম নয়।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এবং আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সৃষ্ট প্রশাসনিক শূন্যতার সুযোগে বিছানাকান্দি, হাদারপাড় ও জাফলং সংলগ্ন সীমান্ত নদীতে নজিরবিহীন লুটের ঘটনা ঘটে। সে সময় স্থানীয় বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জামায়াত ও তৎকালীন প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোর আশ্রিত ক্যাডার এবং পাথর সিন্ডিকেট জোট বাঁধে। শত শত ড্রেজার বসিয়ে কোটি কোটি টাকার পাথর ও হাজার হাজার ঘনফুট বালু লুট করে তারা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে ক্ষমতার পট পরিবর্তনের সুযোগে কোটি কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় প্রাকৃতিক সম্পদ লুটপাট হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের পর নতুন সরকারের সময় নতুন করে জাঁকিয়ে বসেছে আরেকটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। শুরু করেছে লুটের মহোৎসব। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইজারার শর্তাবলি, দেশের পরিবেশ আইন এবং নদী ও সীমান্ত রক্ষার নির্ধারিত সীমানাকে অগ্রাহ্য করে দিন-রাত নদী ক্ষতবিক্ষত করছে বর্তমান চক্রটি।

ড্রেজার চালানো হচ্ছে বাদেবাসা এলাকায়। নিয়ম অনুযায়ী সনাতন পদ্ধতিতে শ্রমিকদের মাধ্যমে বেলচা ও টুকরি ব্যবহার করে বালু তোলার কথা। কিন্তু বাস্তবে তোলা হচ্ছে পরিবেশ ধ্বংসকারী ড্রেজার দিয়ে। এ ছাড়া ইজারায় শুধু বালু উত্তোলনের অনুমতি থাকলেও বালুর সঙ্গে নিয়মবহির্ভূতভাবে তুলে নেওয়া হচ্ছে মূল্যবান পাথর। একাধিক সূত্র জানায়, বিগত বছরের তুলনায় এবার প্রায় তিনগুণ টাকায় মহালটি লিজ নেওয়া হয়েছে।

কিন্তু কাগজে-কলমে ও ম্যাপে যে জায়গায় বালুমহাল চিহ্নিত করা রয়েছে, সেখানে বাস্তবে কোনো বালু নেই; অতীতে ছিল। ফলে ইজারাদার তার পুঁজির তিন ভাগের এক ভাগও তুলতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে লোকসান এড়াতে ও ব্যবসা চালিয়ে নিতে তারা রাজনৈতিক ক্ষমতাবলে নদীসংলগ্ন মসজিদ-মন্দিরের আঙিনা, খেলার মাঠ, রাস্তার পাশ কিংবা গাঙপারের বসতবাড়ির সীমানায় ড্রেজার নিয়ে হানা দিচ্ছে।

কেবল প্রবল ও শক্ত বাধার মুখে পড়লেই সেখান থেকে সাময়িকভাবে সরে আসছে তারা। এর নেপথ্যে রয়েছে স্থানীয় রাজনৈতিক শক্তি। গোয়াইনঘাট উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও স্থানীয় বিএনপি নেতা শাহ আলম স্বপন এবং গোয়াইনঘাট উপজেলা তাঁতীদলের নেতা আব্দুল মান্নানের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নেতৃত্বে এই সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। হাদারপাড় বালুমহাল ইজারা নেওয়ার বৈধতার অজুহাতে এই অঞ্চলে সিন্ডিকেটটি তাদের সাম্রাজ্য বিস্তার করেছে।

ইজারার সুনির্দিষ্ট অনুমতি রয়েছে মূলত হাদারপাড় বালুমহালের জন্য; কিন্তু বাস্তবে সেই ইজারাকে ঢাল বানিয়ে ড্রেজিং চালানো হচ্ছে সম্পূর্ণ বেআইনি ও সংরক্ষিত এলাকায়। বিছানাকান্দি সীমান্ত এলাকা, মনরতল বাজার এবং সীমান্তঘেঁষা সংরক্ষিত পয়েন্টগুলো থেকে অবাধে লাখ লাখ ঘনফুট বালু ও কোটি কোটি টাকার বিপুল পরিমাণ পাথর প্রতিদিন তুলে নেওয়া হচ্ছে।

ভোর থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত শত শত ট্রলার ট্রিপ দিচ্ছে এবং একাধিক উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ড্রেজার মেশিন ও পরিবেশ বিধ্বংসী ‘বোমা মেশিন’ ব্যবহার করে নদীর তলদেশ কেটে সাবাড় করা হচ্ছে সব খনিজসম্পদ। নদীর স্বাভাবিক চরিত্র ও রূপ এভাবে ধ্বংস করা হলেও স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নীরবতা নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।

এলাকাবাসীর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, এই অবৈধ সাম্রাজ্য নির্বিঘ্নে চালু রাখার পেছনে রয়েছে স্থানীয় থানার অসাধু কর্মকর্তাদের মদদ। গোয়াইনঘাট থানা এবং সংশ্লিষ্ট বিট ও ইউনিয়নের দায়িত্বে থাকা কয়েকজন সাব-ইন্সপেক্টরকে মোটা অঙ্কের আর্থিক সুবিধায় ‘ম্যানেজ’ করে দীর্ঘদিন ধরে নিশ্চিন্তে এ লুটপাট চালানো হচ্ছে। ফলে ৫ আগস্টের পরের লুটপাট থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের তাণ্ডব- কোনো ঘটনাতেই স্থানীয়দের লিখিত অভিযোগ বা সামাজিক মাধ্যমে প্রতিবাদের জবাবে বাস্তবে ড্রেজার বন্ধে কোনো প্রকারের দৃশ্যমান আইনি পদক্ষেপ দেখা যায়নি।

স্থানীয়দের গুরুতর অভিযোগ, পুরো বিষয়টি সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য ও ছবি থাকা সত্ত্বেও গোয়াইনঘাট উপজেলা প্রশাসন এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের দায়িত্বশীলদের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের শক্ত ভূমিকা নেওয়া হয়নি। অবশ্য সম্প্রতি তারা অভিযান পরিচালনা করেছে, তবে তা লুট হওয়ার পর। গত ৪ আগস্ট গোয়াইনঘাট উপজেলার হাদারপাড়ের বিভিন্ন এলাকায় অবৈধভাবে বালুর সঙ্গে পাথর উত্তোলনের বিরুদ্ধে একটি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়।

অভিযানকালে অবৈধভাবে উত্তোলিত বালু-পাথর বহনকারী তিনটি স্টিলবডি ট্রলার থেকে পাথর আনলোড করা হয়। একইসঙ্গে আট ব্যক্তিকে ৪ লাখ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়। সে সময় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন প্রতিরোধে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে। তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশ সচেতন মহল মনে করছেন, লাখ লাখ ঘনফুট খনিজসম্পদ ধ্বংসের বিপরীতে এই সাময়িক জরিমানা বা ছোটখাটো মোবাইল কোর্ট পরিচালনা মূল সিন্ডিকেটকে থামানোর জন্য যথেষ্ট নয়।

স্থানীয়দের মতে, ৫ আগস্টের পর থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত চলা এই ধারাবাহিক ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধে বর্তমানে সরাসরি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর, সিলেট জেলা প্রশাসন এবং পুলিশ ও বিজিবির সমন্বিত যৌথ অভিযান প্রয়োজন। পরিবেশকর্মী ও কবি কাশমির রেজা বলেন, এখনই যদি এই অবৈধ ড্রেজিং পুরোপুরি বন্ধ করে ড্রেজার জব্দ না করা হয় এবং ২০২৪ পরবর্তী সময় থেকে এখন পর্যন্ত জড়িত মূল হোতাদের আইনের আওতায় না আনা হয়, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে বিছানাকান্দি কেবল ইতিহাসের পাতায় বা ছবিতে সীমাবদ্ধ থাকবে; বাস্তবে হারিয়ে যাবে এই প্রাকৃতিক ঐতিহ্য।

সরেজমিন দেখা যায়, লাখ লাখ ঘনফুট বালু ও পাথর লাগামহীনভাবে উত্তোলনের ফলে নদীর তলদেশ গভীরভাবে খনন হয়ে এরই মধ্যে বিছানাকান্দির ভৌগোলিক গঠনে ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। নদীর গতিপথ পরিবর্তনের উপক্রম হওয়ার পাশাপাশি তীব্র নদীভাঙন দেখা দিয়েছে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে। ভাঙনের সরাসরি হুমকিতে পড়েছে স্থানীয়দের সহস্রাধিক বসতবাড়ি, কৃষিজমি এবং ঐতিহ্যবাহী ব্যবসাকেন্দ্র মনরতল বাজার।

দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু বিছানাকান্দির স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ পানির ধারা, সীমান্তঘেঁষা মেঘালয় পাহাড়ের কোলঘেঁষে থাকা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং জলজ জীববৈচিত্র্য আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারী বলেন, হাদারপাড় বা বিছানাকান্দি এলাকার কোনো সংরক্ষিত পয়েন্টে অবৈধভাবে ড্রেজার বসিয়ে বালু বা পাথর তোলার সুযোগ নেই।

ইজারার বাইরে এবং অবৈধ যন্ত্র ব্যবহার করে যারা নদী ক্ষতিগ্রস্ত করছে, তাদের বিরুদ্ধে আমরা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছি। অভিযানের ধারা অব্যাহত থাকবে এবং অনিয়মে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। গোয়াইনঘাট থানার ওসি ওমর ফারুক তার থানা পুলিশের সহায়তায় লুটের অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক লেনদেন বা পুলিশি সহায়তায় অবৈধ উত্তোলন চলছে- এমন অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।

পুলিশ সর্বদা অপরাধ দমনে তৎপর। উপজেলা প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অভিযান পরিচালনা করলে আমরা সর্বোচ্চ পুলিশি সহযোগিতা প্রদান করছি এবং অবৈধ ড্রেজিং বন্ধে নিয়মিত তদারকি চালানো হচ্ছে। অন্যদিকে জেলা বিএনপির কোষাধ্যক্ষ ও গোয়াইনঘাট উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান শাহ আলম স্বপনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে পুরো প্রক্রিয়ায় নিজের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করার চেষ্টা করেন।

তবে কথোপকথনের একপর্যায়ে তিনি স্বীকার করেন, আব্দুল মান্নানই মূলত বালুমহাল ইজারা নিয়েছেন। আমাদের পাঁচটি মৌজা ইজারা নেওয়া। কিন্তু জেলা প্রশাসকের কার্যালয় মাত্র তিনটি মৌজার ইজারা বুঝিয়ে দিয়েছে। স্বপনের দাবি, নিয়ম মেনে এবং অনুমোদিত বালুমহালের সুনির্দিষ্ট সীমানার ভেতরে বালু তোলা হচ্ছে। সীমানা টপকে বা আইনের বাইরে গিয়ে কাজ করার কোনো সুযোগ নেই।

বিএনপির কেউ বালু লুটপাট করছেন না। যারা ইজারা নিয়েছেন তারাই বালু তুলে বিক্রি করছেন।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

দক্ষিণ আফ্রিকা ‘এ’ দলের কাছে ইনিংস ব্যবধানে হারল বাংলাদেশ

সিলেটের বিছানাকান্দি ও হাদারপাড়ে চলছে অবৈধ পাথর-বালু লুটের মহোৎসব

Update Time : 11:26:10 pm, Monday, 24 August 2026

সিলেটের ভোলাগঞ্জের সাদাপাথরকেন্দ্রিক নানামুখী ঘটনা ও আলোচনার আড়ালে কার্যত চাপা পড়ে গেছে সীমান্তঘেঁষা পর্যটনকেন্দ্র বিছানাকান্দি। প্রশাসনের নজর ও বাড়তি গুরুত্ব যখন একদিকে নিবদ্ধ, ঠিক সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সবার অলক্ষ্যে গোয়াইনঘাটের এই পর্যটন ও সীমান্ত এলাকা এবং সঙ্গে হাদারপাড় এলাকায় অবৈধভাবে চলছে পাথর-বালু লুটের মহোৎসব।

অভিযোগ উঠেছে, স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতা এই লুটপাটের সঙ্গে জড়িত। তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেন উপজেলা বিএনপি ও অভিযুক্তরা। এদিকে বালু-পাথর লুট বন্ধে সম্প্রতি প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। তবে স্থানীয়দের মতে, সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য থামানোর জন্য এটা যথেষ্ট নয়। এই এলাকায় খনিজসম্পদ লুটের চিত্র এটিই প্রথম নয়।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এবং আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সৃষ্ট প্রশাসনিক শূন্যতার সুযোগে বিছানাকান্দি, হাদারপাড় ও জাফলং সংলগ্ন সীমান্ত নদীতে নজিরবিহীন লুটের ঘটনা ঘটে। সে সময় স্থানীয় বিএনপি, আওয়ামী লীগ, জামায়াত ও তৎকালীন প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোর আশ্রিত ক্যাডার এবং পাথর সিন্ডিকেট জোট বাঁধে। শত শত ড্রেজার বসিয়ে কোটি কোটি টাকার পাথর ও হাজার হাজার ঘনফুট বালু লুট করে তারা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে ক্ষমতার পট পরিবর্তনের সুযোগে কোটি কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় প্রাকৃতিক সম্পদ লুটপাট হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের পর নতুন সরকারের সময় নতুন করে জাঁকিয়ে বসেছে আরেকটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। শুরু করেছে লুটের মহোৎসব। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইজারার শর্তাবলি, দেশের পরিবেশ আইন এবং নদী ও সীমান্ত রক্ষার নির্ধারিত সীমানাকে অগ্রাহ্য করে দিন-রাত নদী ক্ষতবিক্ষত করছে বর্তমান চক্রটি।

ড্রেজার চালানো হচ্ছে বাদেবাসা এলাকায়। নিয়ম অনুযায়ী সনাতন পদ্ধতিতে শ্রমিকদের মাধ্যমে বেলচা ও টুকরি ব্যবহার করে বালু তোলার কথা। কিন্তু বাস্তবে তোলা হচ্ছে পরিবেশ ধ্বংসকারী ড্রেজার দিয়ে। এ ছাড়া ইজারায় শুধু বালু উত্তোলনের অনুমতি থাকলেও বালুর সঙ্গে নিয়মবহির্ভূতভাবে তুলে নেওয়া হচ্ছে মূল্যবান পাথর। একাধিক সূত্র জানায়, বিগত বছরের তুলনায় এবার প্রায় তিনগুণ টাকায় মহালটি লিজ নেওয়া হয়েছে।

কিন্তু কাগজে-কলমে ও ম্যাপে যে জায়গায় বালুমহাল চিহ্নিত করা রয়েছে, সেখানে বাস্তবে কোনো বালু নেই; অতীতে ছিল। ফলে ইজারাদার তার পুঁজির তিন ভাগের এক ভাগও তুলতে পারবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে লোকসান এড়াতে ও ব্যবসা চালিয়ে নিতে তারা রাজনৈতিক ক্ষমতাবলে নদীসংলগ্ন মসজিদ-মন্দিরের আঙিনা, খেলার মাঠ, রাস্তার পাশ কিংবা গাঙপারের বসতবাড়ির সীমানায় ড্রেজার নিয়ে হানা দিচ্ছে।

কেবল প্রবল ও শক্ত বাধার মুখে পড়লেই সেখান থেকে সাময়িকভাবে সরে আসছে তারা। এর নেপথ্যে রয়েছে স্থানীয় রাজনৈতিক শক্তি। গোয়াইনঘাট উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও স্থানীয় বিএনপি নেতা শাহ আলম স্বপন এবং গোয়াইনঘাট উপজেলা তাঁতীদলের নেতা আব্দুল মান্নানের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নেতৃত্বে এই সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। হাদারপাড় বালুমহাল ইজারা নেওয়ার বৈধতার অজুহাতে এই অঞ্চলে সিন্ডিকেটটি তাদের সাম্রাজ্য বিস্তার করেছে।

ইজারার সুনির্দিষ্ট অনুমতি রয়েছে মূলত হাদারপাড় বালুমহালের জন্য; কিন্তু বাস্তবে সেই ইজারাকে ঢাল বানিয়ে ড্রেজিং চালানো হচ্ছে সম্পূর্ণ বেআইনি ও সংরক্ষিত এলাকায়। বিছানাকান্দি সীমান্ত এলাকা, মনরতল বাজার এবং সীমান্তঘেঁষা সংরক্ষিত পয়েন্টগুলো থেকে অবাধে লাখ লাখ ঘনফুট বালু ও কোটি কোটি টাকার বিপুল পরিমাণ পাথর প্রতিদিন তুলে নেওয়া হচ্ছে।

ভোর থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত শত শত ট্রলার ট্রিপ দিচ্ছে এবং একাধিক উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ড্রেজার মেশিন ও পরিবেশ বিধ্বংসী ‘বোমা মেশিন’ ব্যবহার করে নদীর তলদেশ কেটে সাবাড় করা হচ্ছে সব খনিজসম্পদ। নদীর স্বাভাবিক চরিত্র ও রূপ এভাবে ধ্বংস করা হলেও স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নীরবতা নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।

এলাকাবাসীর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, এই অবৈধ সাম্রাজ্য নির্বিঘ্নে চালু রাখার পেছনে রয়েছে স্থানীয় থানার অসাধু কর্মকর্তাদের মদদ। গোয়াইনঘাট থানা এবং সংশ্লিষ্ট বিট ও ইউনিয়নের দায়িত্বে থাকা কয়েকজন সাব-ইন্সপেক্টরকে মোটা অঙ্কের আর্থিক সুবিধায় ‘ম্যানেজ’ করে দীর্ঘদিন ধরে নিশ্চিন্তে এ লুটপাট চালানো হচ্ছে। ফলে ৫ আগস্টের পরের লুটপাট থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের তাণ্ডব- কোনো ঘটনাতেই স্থানীয়দের লিখিত অভিযোগ বা সামাজিক মাধ্যমে প্রতিবাদের জবাবে বাস্তবে ড্রেজার বন্ধে কোনো প্রকারের দৃশ্যমান আইনি পদক্ষেপ দেখা যায়নি।

স্থানীয়দের গুরুতর অভিযোগ, পুরো বিষয়টি সম্পর্কে পরিষ্কার তথ্য ও ছবি থাকা সত্ত্বেও গোয়াইনঘাট উপজেলা প্রশাসন এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের দায়িত্বশীলদের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের শক্ত ভূমিকা নেওয়া হয়নি। অবশ্য সম্প্রতি তারা অভিযান পরিচালনা করেছে, তবে তা লুট হওয়ার পর। গত ৪ আগস্ট গোয়াইনঘাট উপজেলার হাদারপাড়ের বিভিন্ন এলাকায় অবৈধভাবে বালুর সঙ্গে পাথর উত্তোলনের বিরুদ্ধে একটি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়।

অভিযানকালে অবৈধভাবে উত্তোলিত বালু-পাথর বহনকারী তিনটি স্টিলবডি ট্রলার থেকে পাথর আনলোড করা হয়। একইসঙ্গে আট ব্যক্তিকে ৪ লাখ টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়। সে সময় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন প্রতিরোধে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে। তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশ সচেতন মহল মনে করছেন, লাখ লাখ ঘনফুট খনিজসম্পদ ধ্বংসের বিপরীতে এই সাময়িক জরিমানা বা ছোটখাটো মোবাইল কোর্ট পরিচালনা মূল সিন্ডিকেটকে থামানোর জন্য যথেষ্ট নয়।

স্থানীয়দের মতে, ৫ আগস্টের পর থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত চলা এই ধারাবাহিক ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধে বর্তমানে সরাসরি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর, সিলেট জেলা প্রশাসন এবং পুলিশ ও বিজিবির সমন্বিত যৌথ অভিযান প্রয়োজন। পরিবেশকর্মী ও কবি কাশমির রেজা বলেন, এখনই যদি এই অবৈধ ড্রেজিং পুরোপুরি বন্ধ করে ড্রেজার জব্দ না করা হয় এবং ২০২৪ পরবর্তী সময় থেকে এখন পর্যন্ত জড়িত মূল হোতাদের আইনের আওতায় না আনা হয়, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে বিছানাকান্দি কেবল ইতিহাসের পাতায় বা ছবিতে সীমাবদ্ধ থাকবে; বাস্তবে হারিয়ে যাবে এই প্রাকৃতিক ঐতিহ্য।

সরেজমিন দেখা যায়, লাখ লাখ ঘনফুট বালু ও পাথর লাগামহীনভাবে উত্তোলনের ফলে নদীর তলদেশ গভীরভাবে খনন হয়ে এরই মধ্যে বিছানাকান্দির ভৌগোলিক গঠনে ভয়াবহ বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। নদীর গতিপথ পরিবর্তনের উপক্রম হওয়ার পাশাপাশি তীব্র নদীভাঙন দেখা দিয়েছে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে। ভাঙনের সরাসরি হুমকিতে পড়েছে স্থানীয়দের সহস্রাধিক বসতবাড়ি, কৃষিজমি এবং ঐতিহ্যবাহী ব্যবসাকেন্দ্র মনরতল বাজার।

দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু বিছানাকান্দির স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ পানির ধারা, সীমান্তঘেঁষা মেঘালয় পাহাড়ের কোলঘেঁষে থাকা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং জলজ জীববৈচিত্র্য আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে। গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারী বলেন, হাদারপাড় বা বিছানাকান্দি এলাকার কোনো সংরক্ষিত পয়েন্টে অবৈধভাবে ড্রেজার বসিয়ে বালু বা পাথর তোলার সুযোগ নেই।

ইজারার বাইরে এবং অবৈধ যন্ত্র ব্যবহার করে যারা নদী ক্ষতিগ্রস্ত করছে, তাদের বিরুদ্ধে আমরা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছি। অভিযানের ধারা অব্যাহত থাকবে এবং অনিয়মে জড়িত কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। গোয়াইনঘাট থানার ওসি ওমর ফারুক তার থানা পুলিশের সহায়তায় লুটের অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক লেনদেন বা পুলিশি সহায়তায় অবৈধ উত্তোলন চলছে- এমন অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।

পুলিশ সর্বদা অপরাধ দমনে তৎপর। উপজেলা প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অভিযান পরিচালনা করলে আমরা সর্বোচ্চ পুলিশি সহযোগিতা প্রদান করছি এবং অবৈধ ড্রেজিং বন্ধে নিয়মিত তদারকি চালানো হচ্ছে। অন্যদিকে জেলা বিএনপির কোষাধ্যক্ষ ও গোয়াইনঘাট উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান শাহ আলম স্বপনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে পুরো প্রক্রিয়ায় নিজের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করার চেষ্টা করেন।

তবে কথোপকথনের একপর্যায়ে তিনি স্বীকার করেন, আব্দুল মান্নানই মূলত বালুমহাল ইজারা নিয়েছেন। আমাদের পাঁচটি মৌজা ইজারা নেওয়া। কিন্তু জেলা প্রশাসকের কার্যালয় মাত্র তিনটি মৌজার ইজারা বুঝিয়ে দিয়েছে। স্বপনের দাবি, নিয়ম মেনে এবং অনুমোদিত বালুমহালের সুনির্দিষ্ট সীমানার ভেতরে বালু তোলা হচ্ছে। সীমানা টপকে বা আইনের বাইরে গিয়ে কাজ করার কোনো সুযোগ নেই।

বিএনপির কেউ বালু লুটপাট করছেন না। যারা ইজারা নিয়েছেন তারাই বালু তুলে বিক্রি করছেন।