আজ বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬
৪ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ০৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
২৮°C
সর্বোচ্চ: ৩২°C
সর্বনিম্ন: ২৬°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৯৮%

হেফাজতের নেতৃত্বে আসছে নতুন বড় জোট

  • MIT ERP
  • Update Time : 10:17:07 pm, Wednesday, 19 August 2026
  • 7

হেফাজতের নেতৃত্বে আসছে নতুন বড় জোট

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

দেশের রাজনীতিতে নতুন মেরূকরণের আভাস দিচ্ছে কওমি ঘরানার ইসলামী দলগুলোর ঐক্যপ্রক্রিয়া। জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট ও বিএনপির রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে কওমি ধারার ৭টি দলকে এক প্ল্যাটফর্মে আনার উদ্যোগ নিয়েছে হেফাজতে ইসলাম।

হেফাজতের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর উদ্যোগে দলগুলোর মধ্যে ইতিমধ্যে ঐক্য ও সমন্বয় নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। উদ্যোগটি বাস্তব রূপ পেলে ইসলামী দলগুলোর ভোট ও সাংগঠনিক শক্তির সমীকরণে পরিবর্তন আসবে। একই সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক বলয়ের জন্যও এটি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। বিএনপির সঙ্গে হেফাজতের সাম্প্রতিক ঘনিষ্ঠতা এবং জামায়াতের সঙ্গে হেফাজতের দীর্ঘদিনের আদর্শিক দূরত্বের কারণে এ উদ্যোগকে জামায়াতের রাজনৈতিক প্রভাবের জন্য সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দল বা জোটের বিরোধিতা না করেও কওমি আলেম ও ইসলামী দলগুলোর ওপর নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর মাধ্যমে হেফাজত পৃথক একটি বলয় তৈরি করতে চাইছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথম চট্টগ্রাম সফরে ফটিকছড়ির আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় গিয়ে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।

এ সময় হেফাজতের শীর্ষ নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী হেফাজত আমিরকে বুকে জড়িয়ে ধরে দোয়া চান এবং পরে সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা আল্লামা শাহ আহমদ শফীর কবর জিয়ারত করেন। বৈঠকে হেফাজতের পক্ষ থেকে নয় দফা দাবিও তুলে ধরা হয়। ফলে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সঙ্গে কওমি আলেম সমাজের এই সরাসরি যোগাযোগকে নিছক সৌজন্য সাক্ষাতের বাইরে নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্কের ইঙ্গিত হিসেবেও দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

৭ দলের সঙ্গে আলোচনা : কওমি ঘরানার দলগুলোকে নতুনভাবে একত্র করার উদ্যোগের অংশ হিসেবে বাবুনগর মাদ্রাসায় ৭টি ইসলামী দলের নেতাদের নিয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। উদ্যোগের লক্ষ্য হিসেবে ইসলামী দলগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও ঐক্যের কথা বলা হলেও রাজনৈতিক অঙ্গনে এর ভিন্ন তাৎপর্যও খুঁজে দেখা হচ্ছে। কারণ, এই ৭ দলের মধ্যে কয়েকটি দল সম্প্রতি জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে ছিল বা রয়েছে।

ফলে হেফাজতের উদ্যোগ সফল হলে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের বাইরে কওমি ঘরানার একটি পৃথক বলয় তৈরির জোর সম্ভবনা সৃষ্টি হয়েছে। হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী প্রচার সম্পাদক মাওলানা ফয়সাল আহমদ বলেন, ‘হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের উদ্যোগে কওমি ঘরানার ৭টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঐক্য নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এখনই আনুষ্ঠানিকভাবে জোটের বিষয়টি নির্ধারণ হয়নি।

আপাতত নীতিগত ঐক্য ও সমন্বয়ের আলোচনা চলছে। পরবর্তী বৈঠকের পর কাঠামো ও রাজনৈতিক রূপরেখা স্পষ্ট হতে পারে’। আলোচনায় থাকা ৭ দল হলো-ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি। আকিদায় ঐকমত্য : ৭ দলের প্রস্তাবনায় সবচেয়ে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে আদর্শিক সামঞ্জস্যের বিষয়টি।

দলগুলোর বক্তব্যে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা ও আদর্শকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে। বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের সাংগঠনিক সম্পাদক সুলতান মহিউদ্দীন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘জোট হলে ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত’-এর আকিদা ও আদর্শের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ করতে হবে। কোনো দলের নীতি, আদর্শ বা কর্মকাণ্ড যদি আকিদা লঙ্ঘন করে কিংবা দ্বীনের স্বার্থপরিপন্থি হয়, তাহলে উপদেষ্টা পরিষদ ওই দলের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ এখতিয়ার রাখবে’।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সহকারী মহাসচিব শেখ ফজলুল করীম মারুফ বলেন, ‘রাজনৈতিক ও ধর্মীয়ভাবে কাছাকাছি দৃষ্টিভঙ্গি, হক্কানি উলামায়ে কেরামের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা পোষণ করার কারণে প্রাথমিকভাবে নিবন্ধিত ৭টি ইসলামী রাজনৈতিক দল এই ঐক্যে শামিল থাকবে। এই ঐক্য একটি রাজনৈতিক সমঝোতা হিসেবে অভিহিত হবে’।

ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাজী বলেন, ‘ইসলামী দলগুলোর ঐক্য হলে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা প্রাধান্য পাবে। কেউ তা লঙ্ঘন করলে তারা ওই ঐক্যে থাকতে পারবে না’। এদিকে হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইমান-আকিদা সংরক্ষণ, দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থ এবং ইসলামী দলগুলোর মধ্যে ঐক্য ও সমন্বয়ই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।

কওমি ঘরানার দলগুলোর দীর্ঘদিনের বিভক্তি ও পারস্পরিক দূরত্ব কমিয়ে একটি অভিন্ন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে চায় হেফাজত। জামায়াতের সঙ্গে দূরত্ব : হেফাজতের নায়েবে আমির মাওলানা মহিউদ্দিন রাব্বানী বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলামের দীর্ঘদিনের আদর্শিক দূরত্ব এই উদ্যোগকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করেছে। দেওবন্দি ধারার হেফাজত নেতারা বিভিন্ন সময় জামায়াতের মওদুদী চিন্তাধারা ও আকিদাগত অবস্থানের সমালোচনা করেছেন’।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন জোট সৃষ্টি হলে সরাসরি জামায়াতবিরোধী অবস্থানে না গিয়েও হেফাজত ও কওমি ঘরানার দলগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়ে ইসলামী রাজনৈতিক পরিসরে নিজেদের প্রভাব ধরে রাখার সুযোগ পাবে বিএনপি। একই সঙ্গে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ইসলামী জোটের বাইরে একটি পৃথক বলয় তৈরি হলে জামায়াতের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।

জোটের কাঠামো নিয়ে প্রস্তাব : ৭ দলের শীর্ষ নেতাদের সম্মানজনক অবস্থান এবং লিয়াজোঁ কমিটির মাধ্যমে কর্মসূচি ও নীতি নির্ধারণের প্রস্তাব এসেছে। শেখ ফজলুল করীম মারুফ রূপালী বাংলাদেশকে জানান, ৭ দলের শীর্ষ নেতারা সম্মানজনক অবস্থানে থাকবেন। কর্মসূচি ও নীতি নির্ধারণের জন্য প্রতিটি দল থেকে দুজন করে প্রতিনিধি নিয়ে একটি লিয়াজোঁ কমিটি থাকবে।

এদিকে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের নেতাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, জোটের বিভিন্ন কর্মসূচি ও বৈঠকে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর আমিররা পর্যায়ক্রমে নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করবেন। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট সংখ্যক সদস্য নিয়ে একটি বিশেষ ফোরাম গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ঐক্যের কার্যক্রম পরিচালনায় ওই ফোরামের জন্য নির্দিষ্ট কর্মপদ্ধতি ও রূপরেখার কথাও বলা হয়েছে।

বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সমন্বয় কমিটি বা মজলিসে শূরা গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। খেলাফত আন্দোলনের সুলতান মহিউদ্দীন জানান, জোটের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রতিটি শরিক দল থেকে দুজন বা তিনজন করে প্রতিনিধি নিয়ে একটি শক্তিশালী সমন্বয় কমিটি থাকবে। তবে বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস ও ইসলামী ঐক্যজোটের এ বিষয়ে বিস্তারিত অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয়।

জামায়াতের জন্য চ্যালেঞ্জ : ইসলামী দলগুলোর ওপর জামায়াতের রাজনৈতিক প্রভাব যতটা বিস্তৃত করার প্রত্যাশা রয়েছে, পৃথক কওমি প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠলে তা সীমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে জামায়াতের সঙ্গে থাকা দলগুলোর কেউ যদি হেফাজতের উদ্যোগে যুক্ত হয়, তাহলে ১১-দলীয় জোটের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্যেও পরিবর্তন আসতে পারে। বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াতকে একদিকে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে সংসদীয় ও রাজনৈতিক বিরোধিতা করতে হবে, অন্যদিকে ইসলামী দলগুলোর মধ্যেও নিজেদের নেতৃত্ব ধরে রাখার লড়াই চালাতে হবে।

নির্বাচনের পর কওমি ঘরানার দলগুলোর বিভক্তি সেই সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়েছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ‘আদর্শের দ্বন্দ্বের’ কথা বলে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট থেকে সরে গেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও নেজামে ইসলাম পার্টির মতো দলগুলো জামায়াতের সঙ্গে থাকলেও হেফাজতের উদ্যোগে কওমি দলগুলোর বৃহত্তর ঐক্য গড়ে উঠলে তাদের অবস্থান নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি হতে পারে।

যদিও জামায়াত বিষয়টিকে নিজেদের জন্য বড় কোনো হুমকি হিসেবে দেখছে না। দলটির নেতাদের বক্তব্য, ইসলামী দলগুলোর ঐক্য হলে তাতে জামায়াতের রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না। এ বিষয়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল হালিম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘হেফাজত আমির ইসলামী ৭ দলকে ধর্মীয় বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ করতে চাচ্ছেন। এতে জামায়াতের রাজনীতিতে কোনো প্রভাব পড়বে না’।

একই সঙ্গে উদ্যোগটি সফল হওয়ার আগে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা উচিত নয় বলেও মনে করেন তিনি। প্রসঙ্গত, ৭ দলের প্রস্তাবনার বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। প্রস্তাবগুলো নিয়ে আলোচনা করেই পরবর্তী কাঠামো নির্ধারণের কথা রয়েছে। ফলে শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগ শুধু আদর্শিক সমঝোতায় সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি একটি কার্যকর রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে- সেটি নিয়ে চলছে বিশ্লেষণ।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

কলকাতায় অগ্নিকাণ্ডে নিহত ৫ বাংলাদেশির মধ্যে ৪ জনের বাড়ি কুষ্টিয়ায়

হেফাজতের নেতৃত্বে আসছে নতুন বড় জোট

Update Time : 10:17:07 pm, Wednesday, 19 August 2026

দেশের রাজনীতিতে নতুন মেরূকরণের আভাস দিচ্ছে কওমি ঘরানার ইসলামী দলগুলোর ঐক্যপ্রক্রিয়া। জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট ও বিএনপির রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে কওমি ধারার ৭টি দলকে এক প্ল্যাটফর্মে আনার উদ্যোগ নিয়েছে হেফাজতে ইসলাম।

হেফাজতের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর উদ্যোগে দলগুলোর মধ্যে ইতিমধ্যে ঐক্য ও সমন্বয় নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। উদ্যোগটি বাস্তব রূপ পেলে ইসলামী দলগুলোর ভোট ও সাংগঠনিক শক্তির সমীকরণে পরিবর্তন আসবে। একই সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক বলয়ের জন্যও এটি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। বিএনপির সঙ্গে হেফাজতের সাম্প্রতিক ঘনিষ্ঠতা এবং জামায়াতের সঙ্গে হেফাজতের দীর্ঘদিনের আদর্শিক দূরত্বের কারণে এ উদ্যোগকে জামায়াতের রাজনৈতিক প্রভাবের জন্য সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দল বা জোটের বিরোধিতা না করেও কওমি আলেম ও ইসলামী দলগুলোর ওপর নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর মাধ্যমে হেফাজত পৃথক একটি বলয় তৈরি করতে চাইছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথম চট্টগ্রাম সফরে ফটিকছড়ির আল জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় গিয়ে হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।

এ সময় হেফাজতের শীর্ষ নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী হেফাজত আমিরকে বুকে জড়িয়ে ধরে দোয়া চান এবং পরে সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা আল্লামা শাহ আহমদ শফীর কবর জিয়ারত করেন। বৈঠকে হেফাজতের পক্ষ থেকে নয় দফা দাবিও তুলে ধরা হয়। ফলে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সঙ্গে কওমি আলেম সমাজের এই সরাসরি যোগাযোগকে নিছক সৌজন্য সাক্ষাতের বাইরে নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্কের ইঙ্গিত হিসেবেও দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

৭ দলের সঙ্গে আলোচনা : কওমি ঘরানার দলগুলোকে নতুনভাবে একত্র করার উদ্যোগের অংশ হিসেবে বাবুনগর মাদ্রাসায় ৭টি ইসলামী দলের নেতাদের নিয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। উদ্যোগের লক্ষ্য হিসেবে ইসলামী দলগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও ঐক্যের কথা বলা হলেও রাজনৈতিক অঙ্গনে এর ভিন্ন তাৎপর্যও খুঁজে দেখা হচ্ছে। কারণ, এই ৭ দলের মধ্যে কয়েকটি দল সম্প্রতি জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে ছিল বা রয়েছে।

ফলে হেফাজতের উদ্যোগ সফল হলে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের বাইরে কওমি ঘরানার একটি পৃথক বলয় তৈরির জোর সম্ভবনা সৃষ্টি হয়েছে। হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় কমিটির সহকারী প্রচার সম্পাদক মাওলানা ফয়সাল আহমদ বলেন, ‘হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের উদ্যোগে কওমি ঘরানার ৭টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঐক্য নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে এখনই আনুষ্ঠানিকভাবে জোটের বিষয়টি নির্ধারণ হয়নি।

আপাতত নীতিগত ঐক্য ও সমন্বয়ের আলোচনা চলছে। পরবর্তী বৈঠকের পর কাঠামো ও রাজনৈতিক রূপরেখা স্পষ্ট হতে পারে’। আলোচনায় থাকা ৭ দল হলো-ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, ইসলামী ঐক্যজোট ও বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি। আকিদায় ঐকমত্য : ৭ দলের প্রস্তাবনায় সবচেয়ে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে আদর্শিক সামঞ্জস্যের বিষয়টি।

দলগুলোর বক্তব্যে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা ও আদর্শকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি প্রাধান্য পেয়েছে। বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের সাংগঠনিক সম্পাদক সুলতান মহিউদ্দীন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘জোট হলে ‘আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত’-এর আকিদা ও আদর্শের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ করতে হবে। কোনো দলের নীতি, আদর্শ বা কর্মকাণ্ড যদি আকিদা লঙ্ঘন করে কিংবা দ্বীনের স্বার্থপরিপন্থি হয়, তাহলে উপদেষ্টা পরিষদ ওই দলের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ এখতিয়ার রাখবে’।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সহকারী মহাসচিব শেখ ফজলুল করীম মারুফ বলেন, ‘রাজনৈতিক ও ধর্মীয়ভাবে কাছাকাছি দৃষ্টিভঙ্গি, হক্কানি উলামায়ে কেরামের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা এবং আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা পোষণ করার কারণে প্রাথমিকভাবে নিবন্ধিত ৭টি ইসলামী রাজনৈতিক দল এই ঐক্যে শামিল থাকবে। এই ঐক্য একটি রাজনৈতিক সমঝোতা হিসেবে অভিহিত হবে’।

ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাজী বলেন, ‘ইসলামী দলগুলোর ঐক্য হলে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা প্রাধান্য পাবে। কেউ তা লঙ্ঘন করলে তারা ওই ঐক্যে থাকতে পারবে না’। এদিকে হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইমান-আকিদা সংরক্ষণ, দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থ এবং ইসলামী দলগুলোর মধ্যে ঐক্য ও সমন্বয়ই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।

কওমি ঘরানার দলগুলোর দীর্ঘদিনের বিভক্তি ও পারস্পরিক দূরত্ব কমিয়ে একটি অভিন্ন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে চায় হেফাজত। জামায়াতের সঙ্গে দূরত্ব : হেফাজতের নায়েবে আমির মাওলানা মহিউদ্দিন রাব্বানী বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলামের দীর্ঘদিনের আদর্শিক দূরত্ব এই উদ্যোগকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করেছে। দেওবন্দি ধারার হেফাজত নেতারা বিভিন্ন সময় জামায়াতের মওদুদী চিন্তাধারা ও আকিদাগত অবস্থানের সমালোচনা করেছেন’।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন জোট সৃষ্টি হলে সরাসরি জামায়াতবিরোধী অবস্থানে না গিয়েও হেফাজত ও কওমি ঘরানার দলগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়ে ইসলামী রাজনৈতিক পরিসরে নিজেদের প্রভাব ধরে রাখার সুযোগ পাবে বিএনপি। একই সঙ্গে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ইসলামী জোটের বাইরে একটি পৃথক বলয় তৈরি হলে জামায়াতের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে।

জোটের কাঠামো নিয়ে প্রস্তাব : ৭ দলের শীর্ষ নেতাদের সম্মানজনক অবস্থান এবং লিয়াজোঁ কমিটির মাধ্যমে কর্মসূচি ও নীতি নির্ধারণের প্রস্তাব এসেছে। শেখ ফজলুল করীম মারুফ রূপালী বাংলাদেশকে জানান, ৭ দলের শীর্ষ নেতারা সম্মানজনক অবস্থানে থাকবেন। কর্মসূচি ও নীতি নির্ধারণের জন্য প্রতিটি দল থেকে দুজন করে প্রতিনিধি নিয়ে একটি লিয়াজোঁ কমিটি থাকবে।

এদিকে বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের নেতাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, জোটের বিভিন্ন কর্মসূচি ও বৈঠকে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর আমিররা পর্যায়ক্রমে নেতৃত্বের দায়িত্ব পালন করবেন। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট সংখ্যক সদস্য নিয়ে একটি বিশেষ ফোরাম গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ঐক্যের কার্যক্রম পরিচালনায় ওই ফোরামের জন্য নির্দিষ্ট কর্মপদ্ধতি ও রূপরেখার কথাও বলা হয়েছে।

বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সমন্বয় কমিটি বা মজলিসে শূরা গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। খেলাফত আন্দোলনের সুলতান মহিউদ্দীন জানান, জোটের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রতিটি শরিক দল থেকে দুজন বা তিনজন করে প্রতিনিধি নিয়ে একটি শক্তিশালী সমন্বয় কমিটি থাকবে। তবে বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস ও ইসলামী ঐক্যজোটের এ বিষয়ে বিস্তারিত অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয়।

জামায়াতের জন্য চ্যালেঞ্জ : ইসলামী দলগুলোর ওপর জামায়াতের রাজনৈতিক প্রভাব যতটা বিস্তৃত করার প্রত্যাশা রয়েছে, পৃথক কওমি প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠলে তা সীমিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে জামায়াতের সঙ্গে থাকা দলগুলোর কেউ যদি হেফাজতের উদ্যোগে যুক্ত হয়, তাহলে ১১-দলীয় জোটের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্যেও পরিবর্তন আসতে পারে। বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াতকে একদিকে বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে সংসদীয় ও রাজনৈতিক বিরোধিতা করতে হবে, অন্যদিকে ইসলামী দলগুলোর মধ্যেও নিজেদের নেতৃত্ব ধরে রাখার লড়াই চালাতে হবে।

নির্বাচনের পর কওমি ঘরানার দলগুলোর বিভক্তি সেই সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়েছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ইতিমধ্যে ‘আদর্শের দ্বন্দ্বের’ কথা বলে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট থেকে সরে গেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও নেজামে ইসলাম পার্টির মতো দলগুলো জামায়াতের সঙ্গে থাকলেও হেফাজতের উদ্যোগে কওমি দলগুলোর বৃহত্তর ঐক্য গড়ে উঠলে তাদের অবস্থান নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি হতে পারে।

যদিও জামায়াত বিষয়টিকে নিজেদের জন্য বড় কোনো হুমকি হিসেবে দেখছে না। দলটির নেতাদের বক্তব্য, ইসলামী দলগুলোর ঐক্য হলে তাতে জামায়াতের রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে না। এ বিষয়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল হালিম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘হেফাজত আমির ইসলামী ৭ দলকে ধর্মীয় বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ করতে চাচ্ছেন। এতে জামায়াতের রাজনীতিতে কোনো প্রভাব পড়বে না’।

একই সঙ্গে উদ্যোগটি সফল হওয়ার আগে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা উচিত নয় বলেও মনে করেন তিনি। প্রসঙ্গত, ৭ দলের প্রস্তাবনার বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। প্রস্তাবগুলো নিয়ে আলোচনা করেই পরবর্তী কাঠামো নির্ধারণের কথা রয়েছে। ফলে শেষ পর্যন্ত এই উদ্যোগ শুধু আদর্শিক সমঝোতায় সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি একটি কার্যকর রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে- সেটি নিয়ে চলছে বিশ্লেষণ।