গ্যাসের সংকট এখন কেবল রান্নার চুলা আর পরিবহনের ক্ষেত্রে থেমে নেই। এই সংকট দেশের শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতিকে আঘাত করছে। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
কোথাও কোথাও কারখানাগুলো দিনের একটি বড় সময় বন্ধ থাকছে। কোথাও উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, আবার কোথাও কারখানা বন্ধও করে দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র দেখা যাচ্ছে গ্যাসনির্ভর শিল্পাঞ্চলগুলোতে। নরসিংদীর বিভিন্ন এলাকায় এরই মধ্যে অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। একই ধরনের সংকটের খবর আসছে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার-আশুলিয়াসহ দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চল থেকেও।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিবহন খাতে সিএনজি সংকট। গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক সিএনজি ফিলিং স্টেশনে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে। এতে একদিকে যাত্রী পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে চালকদের আয় কমছে। একটি গাড়ি যদি প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা গ্যাসের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে, সেই সময় আর আয় করার কাজে ব্যবহার করতে পারেন না চালক। ফলে গ্যাস সংকটের অর্থনৈতিক মূল্য শুধু কারখানার উৎপাদন কমে যাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; পরিবহন শ্রমিক ও সাধারণ যাত্রীর সময় এবং অর্থও এর সঙ্গে নষ্ট হচ্ছে।
গার্মেন্টস ব্যবসায়ী এবং বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি খন্দকার রফিকুল ইসলাম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, সবচেয়ে বড় আশঙ্কা তৈরি হয়েছে শিল্পকারখানার উৎপাদন নিয়ে। বাংলাদেশের বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান গ্যাসনির্ভর। বিশেষ করে গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, স্পিনিং, ডাইং, নিটিং, স্টিল, সিরামিক, গ্লাসসহ বিভিন্ন শিল্পে বয়লার ও উৎপাদন যন্ত্র চালাতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ প্রয়োজন।
গ্যাসের চাপ প্রয়োজনীয় মাত্রার নিচে নেমে গেলে কারখানা চালু রেখেও স্বাভাবিক উৎপাদন সম্ভব হয় না। অনেক ক্ষেত্রে মেশিন চালু ও বন্ধ করার কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি যন্ত্রপাতির ক্ষতির ঝুঁকিও থাকে। ফলে শিল্পমালিকদের সামনে একদিকে শ্রমিকের বেতন, বিদ্যুৎ, ব্যাংক ঋণ, কাঁচামাল ও অন্যান্য স্থায়ী ব্যয় বহনের চাপ; অন্যদিকে উৎপাদন কমে যাওয়ার বাস্তবতা- দুই দিক থেকেই সংকট তৈরি হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, নরসিংদীর মতো শিল্পনির্ভর জেলার জন্য পরিস্থিতি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। জেলার বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসনির্ভর কারখানার সংখ্যা অনেক। এসব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কমে গেলে শুধু শিল্পমালিক নন, পুরো স্থানীয় অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটি কারখানা বন্ধ থাকলে সেখানে কর্মরত শ্রমিকের আয় কমে, কাঁচামাল পরিবহনের কাজ কমে, পরিবহন শ্রমিকের আয় কমে এবং স্থানীয় দোকানপাট, খাবারের হোটেল থেকে শুরু করে ছোট ব্যবসায়ীদের ওপরও তার প্রভাব পড়ে।
একটি শিল্পকারখানার উৎপাদন বন্ধ হওয়ার অভিঘাত তাই কারখানার সীমানার মধ্যে আটকে থাকে না; তা ছড়িয়ে পড়ে পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থায়। অর্থনীতিবিদ আবু সালেহ আকরাম রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হলে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হবে কর্মসংস্থানে। কোনো কারখানা সাধারণত প্রথম দিনেই শ্রমিক ছাঁটাই করে না। উৎপাদন কমলে প্রথমে ওভারটাইম বন্ধ হয়, অতিরিক্ত শিফট কমে, নতুন নিয়োগ স্থগিত হয়।
এরপর কর্মঘণ্টা কমানো, সাময়িক ছুটি কিংবা আংশিক উৎপাদনের সিদ্ধান্ত আসতে পারে। সংকট যদি দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং কারখানার লোকসান বাড়তে থাকে, তখন শ্রমিক ছাঁটাই কিংবা কারখানা বন্ধের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত আসতে পারে। অর্থাৎ, আজ যে গ্যাস সংকটকে আমরা কেবল উৎপাদন সমস্যা হিসেবে দেখছি, সেটি আগামী দিনে বড় ধরনের কর্মসংস্থান সংকটে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কতজন শ্রমিক ইতিমধ্যে চাকরি হারিয়েছেন বা ভবিষ্যতে হারাবেন- এমন নির্ভরযোগ্য জাতীয় পরিসংখ্যান কারো হাতে নেই। তাই আতঙ্ক ছড়ানোর মতো কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা বলা দায়িত্বশীল হবে না। তবে অর্থনীতির সাধারণ বাস্তবতা বলছে, দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ থাকলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হয় এবং তার সরাসরি প্রভাব পড়ে কর্মসংস্থানে।
বিশেষ করে যেসব কারখানা আগে থেকেই ঋণের চাপ, কম অর্ডার, কাঁচামালের উচ্চমূল্য কিংবা রপ্তানি বাজারের প্রতিযোগিতার মধ্যে রয়েছে, তাদের জন্য দীর্ঘস্থায়ী গ্যাসের সংকট বড় ধাক্কা হয়ে উঠতে পারে। আবু সালেহ বলেন, রপ্তানিমুখী শিল্পের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। বিদেশি ক্রেতারা নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য চান। গ্যাসের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হলে নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এতে ক্রেতার আস্থা নষ্ট হতে পারে, অর্ডার বাতিল হতে পারে কিংবা প্রতিযোগী দেশের কাছে বাজার চলে যেতে পারে। একটি রপ্তানি অর্ডার হারানো মানে শুধু একটি কারখানার ক্ষতি নয়, এর সঙ্গে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ও জড়িত। তাই শিল্পে গ্যাসের অনিয়মিত সরবরাহ দীর্ঘস্থায়ী হলে তার প্রভাব রপ্তানি আয় ও সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়তে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশে গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুটের কাছাকাছি হলেও সরবরাহ অনেক সময় ২৫০ থেকে ২৬০ কোটি ঘনফুটের আশপাশে রয়েছে। ফলে প্রতিদিন বিপুল ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে আসা, পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রগুলোর সক্ষমতা হ্রাস এবং এলএনজি আমদানির ওপর বাড়তি নির্ভরতা পরিস্থিতিকে আর জটিল করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এই সংকট মোকাবিলায় স্বল্প মেয়াদে এলএনজি টার্মিনালগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালু করা এবং বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি আনার চেষ্টা চলছে।
মহেশখালীর টার্মিনালগুলোর কার্যক্রম স্বাভাবিক হলে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ কিছুটা বাড়তে পারে। ভোলার গ্যাস কমপ্রেসড অবস্থায় শিল্পাঞ্চলে আনার উদ্যোগ, পুরোনো কূপে ওয়ার্কওভার এবং দ্রুত কিছু গ্যাস উৎপাদনে আনার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। এগুলো বাস্তবায়িত হলে আগামী কয়েক মাসে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার যেটাই বলুক বা দাবি করুক না কেন, সমস্যার স্থায়ী সমাধান আরও কঠিন।
দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে নতুন অনুসন্ধান কূপ খনন, পুরোনো ক্ষেত্রের উন্নয়ন, নতুন এলএনজি টার্মিনাল ও পাইপলাইন নির্মাণ এবং গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধান- সবই সময় সাপেক্ষ। ফলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তীব্র সংকট কিছুটা কমলেও শিল্প, পরিবহন ও বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে আরও সময় লাগতে পারে। এ অবস্থায় সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, অর্থনীতি কি এই ধাক্কা সামলাতে পারবে?
উত্তর নির্ভর করছে সংকট কত দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা যায় তার ওপর। কয়েক সপ্তাহের সংকট শিল্পমালিকেরা কোনোভাবে সামাল দিতে পারেন। কিন্তু মাসের পর মাস গ্যাসের অনিশ্চয়তা চলতে থাকলে পরিস্থিতি ভিন্ন হবে। তখন উৎপাদন কমবে, বিনিয়োগের আগ্রহ কমবে, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি থমকে যাবে, ব্যাংক ঋণ পরিশোধে চাপ বাড়বে এবং দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, এই মুহূর্তে গ্যাস সরবরাহকে শুধু জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একটি খাতভিত্তিক সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি শিল্পনীতি, কর্মসংস্থান, রপ্তানি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রশ্ন। শিল্পাঞ্চলগুলোতে প্রকৃত গ্যাসের চাহিদা ও সরবরাহের তথ্য প্রকাশ, গ্যাস বিতরণে স্বচ্ছতা, রপ্তানিমুখী ও কর্মসংস্থাননির্ভর শিল্পকে যৌক্তিক অগ্রাধিকার এবং ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান ও শ্রমিকদের জন্য জরুরি সহায়তার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
তাদের মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, সাময়িক ব্যবস্থা দিয়ে সংকট চাপা না দিয়ে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন করা। কারণ শিল্পের মেশিন একবার থেমে গেলে তা আবার চালু করা যতটা কঠিন, হারানো বিদেশি ক্রেতা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ফিরিয়ে আনা তার চেয়েও কঠিন। গ্যাস সংকটের বর্তমান চিত্র তাই একটি বড় সতর্কবার্তা।
আজ নরসিংদীর কোনো কারখানায় মেশিন থামছে, কোথাও শ্রমিকের ওভারটাইম বন্ধ হচ্ছে, কোথাও সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। আগামীকাল যদি এই চিত্র দেশের আরও শিল্পাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে এটি আর বিচ্ছিন্ন জ্বালানি সংকট থাকবে না। পরিণত হবে অর্থনীতির বহুমুখী সংকটে। গ্যাসনির্ভর শিল্পমালিকদের প্রত্যাশা, বাংলাদেশের শিল্পের চাকা থামার আগেই গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
গ্যাসের সংকটে শুধু কারখানার আগুন নিভবে না, নিভে যেতে পারে হাজারো শ্রমিকের পরিবারের জীবিকার আলোও।














