দিনভর শ্রম এবং মাস শেষে সীমিত আয় দিয়ে খাবার, বাসাভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা, পোশাক ও বিদ্যুৎ বিলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর পর অসুস্থতার খরচ জোগাড় করা নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এক কঠিন বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কারও পরিবারের একজন নিয়মিত ওষুধ সেবন করেন, আবার কারও একাধিক সদস্য অসুস্থ। মাসের শুরুতেই আয়ের একটি বড় অংশ চিকিৎসার পেছনে চলে যায়। এরপর বাকি টাকা দিয়ে সংসারের প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে শুরু হয় টানাপোড়েন। অনেকের ভাষায়, যা কামাই করি, তার অর্ধেকই চলে যায় ওষুধ কিনতে। নিম্নবিত্তের কাছে অসুস্থতা মানেই বাড়তি বিপদ দিনমজুর, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, গৃহকর্মী কিংবা নিম্নআয়ের শ্রমজীবী মানুষের আয় অনেক ক্ষেত্রেই নির্ভর করে প্রতিদিন কাজ পাওয়ার ওপর।
একদিন কাজ না করলে আয় বন্ধ। এর মধ্যে পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে চিকিৎসার খরচ জোগাড় করা তাদের জন্য আরও কঠিন হয়ে পড়ে। একজন দিনমজুরের মাসিক আয় দিয়ে যেখানে সংসারের খাবার জোগাড় করাই কঠিন, সেখানে নিয়মিত ওষুধের খরচ যুক্ত হলে পুরো হিসাব এলোমেলো হয়ে যায়। অনেক সময় পরিবারের অন্য প্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে ওষুধ কিনতে হয়। কারও ক্ষেত্রে প্রতিবেশী বা আত্মীয়ের কাছ থেকে ধার করতে হয়।
কেউ আবার স্থানীয় দোকান থেকে বাকিতে ওষুধ নিয়ে পরে টাকা পরিশোধ করেন। দীর্ঘদিন চিকিৎসা চললে সেই ধারও একসময় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। ‘ওষুধ কিনলে বাজার কম, বাজার করলে ওষুধ বন্ধ’ নিম্নবিত্ত পরিবারের বাস্তবতা আরও কঠিন। তাদের হাতে সাধারণত জরুরি সঞ্চয় থাকে না। ফলে হঠাৎ অসুস্থতা দেখা দিলে চিকিৎসার টাকা জোগাড় করাই বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।
একজন নিম্নআয়ের পরিবারের সদস্য বলেন, সংসারে পাঁচজন মানুষ। আয় যা হয়, তা দিয়ে খাবার কিনতেই কষ্ট হয়। তার ওপর নিয়মিত ওষুধ লাগলে বাজারের খরচ কমাতে হয়। অনেক সময় নিজের প্রয়োজন বাদ দিয়ে পরিবারের অসুস্থ সদস্যের ওষুধ কিনি। আরেকজন বলেন, একদিকে ওষুধের টাকা, অন্যদিকে সংসারের খরচ। দুটো একসঙ্গে চালানো কঠিন। মাসের শেষদিকে এসে বুঝতে পারি, হাতে আর টাকা নেই।
মধ্যবিত্তও নিরাপদ নয় নিম্নবিত্তের পাশাপাশি মধ্যবিত্ত পরিবারও চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ থেকে মুক্ত নয়। নির্দিষ্ট বেতন বা ব্যবসার আয় থাকলেও বাড়িভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা, বাজার, যাতায়াত ও অন্যান্য খরচের পর চিকিৎসার ব্যয় বড় চাপ তৈরি করে। বিশেষ করে পরিবারের কোনো সদস্য দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকলে সঞ্চয় ভেঙে চিকিৎসা চালাতে হয়। কারও সঞ্চয় শেষ হয়ে গেলে ধার-দেনার ওপর নির্ভর করতে হয়।
মধ্যবিত্তের সমস্যা হলো, তারা অনেক সময় নিম্নবিত্তের মতো সরকারি বা সামাজিক সহায়তার আওতায় সহজে আসতে পারেন না, আবার উচ্চবিত্তের মতো বড় চিকিৎসা ব্যয় বহনের সামর্থ্যও তাদের নেই। চিকিৎসা ব্যয় বাড়লে প্রথম আঘাত পড়ে খাবার ও শিক্ষায় পরিবারের আয় সীমিত হলে চিকিৎসা ব্যয় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্য খাতে ব্যয় কমাতে হয়। নিম্নবিত্ত পরিবারে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে খাবার ও দৈনন্দিন প্রয়োজনের ওপর।
মধ্যবিত্ত পরিবারে আবার সন্তানের শিক্ষা, সঞ্চয় কিংবা ভবিষ্যতের পরিকল্পনা পিছিয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ একজনের অসুস্থতা শুধু তার নিজের ওপর নয়, পুরো পরিবারের জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব ফেলে। সঞ্চয় নেই, নিরাপত্তাও নেই নিম্নবিত্ত পরিবারের বড় একটি অংশের জন্য সঞ্চয় করা প্রায় অসম্ভব। দিন এনে দিন খাওয়া মানুষের কাছে মাসের শেষে কিছু টাকা জমিয়ে রাখা অনেক সময় বিলাসিতার মতো।
মধ্যবিত্তের ক্ষেত্রেও নিয়মিত চিকিৎসা ব্যয় সঞ্চয়ের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে হঠাৎ বড় কোনো রোগ বা দুর্ঘটনা পুরো পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তাকে নড়বড়ে করে দিতে পারে। চিকিৎসা না করানোর ঝুঁকিও থাকে অর্থের অভাবে অনেক নিম্নআয়ের মানুষ সময়মতো চিকিৎসকের কাছে যেতে পারেন না। কেউ উপসর্গ কমে যাবে ভেবে অপেক্ষা করেন, কেউ স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নেওয়ার চেষ্টা করেন, আবার কেউ প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে দেরি করেন।
ফলে ছোট সমস্যা বড় আকার ধারণ করার আশঙ্কা তৈরি হয়। এতে পরবর্তী সময়ে চিকিৎসার ব্যয় আরও বেড়ে যেতে পারে। প্রশ্ন একটাই—অসুস্থ হলে যাবে কোথায়? নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের কাছে চিকিৎসা কোনো বিলাসিতা নয়; এটি বেঁচে থাকার প্রয়োজন। কিন্তু আয় সীমিত হলে চিকিৎসা ব্যয় অনেক পরিবারের জন্য কঠিন বাস্তবতায় পরিণত হয়। দিনশেষে শ্রমজীবী মানুষ যখন ঘরে ফেরেন, তখন তার সামনে থাকে পরিবারের খাবারের চিন্তা।
সেই পরিবারের একজন অসুস্থ হলে যুক্ত হয় ওষুধের চিন্তা। আর দীর্ঘদিন চিকিৎসা চললে যুক্ত হয় ধার-দেনার বোঝা। মধ্যবিত্তের ক্ষেত্রেও চিত্র খুব আলাদা নয়। পার্থক্য শুধু সমস্যার ধরনে। একদিকে নিম্নবিত্তের প্রশ্ন—আজকের খাবার কিনব, নাকি ওষুধ? অন্যদিকে মধ্যবিত্তের প্রশ্ন—“সংসারের খরচ চালাব, নাকি চিকিৎসার টাকা দেব? ” দুই শ্রেণির মানুষের সমস্যার ভাষা আলাদা হলেও সংকটের জায়গাটি একই—চিকিৎসার ব্যয় তাদের জীবনযাত্রার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
মানুষের নাগালের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা কতটা? স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার। তাই সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ নিশ্চিত করা শুধু স্বাস্থ্য খাতের বিষয় নয়; এটি সামাজিক নিরাপত্তারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য সাশ্রয়ী চিকিৎসা, প্রয়োজনীয় ওষুধের সহজপ্রাপ্যতা এবং কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গেলে চিকিৎসাজনিত আর্থিক চাপ অনেকটাই কমানো সম্ভব।
কারণ একজন শ্রমজীবী মানুষের কাছে একটি দিনের আয় যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি একটি পরিবারের কাছে একটি শিশুর চিকিৎসাও গুরুত্বপূর্ণ। মাস শেষে হিসাবের খাতায় যখন আয়ের বড় অংশের পাশে লেখা থাকে ‘ওষুধ’, তখন সেটি শুধু একটি পরিবারের হিসাব নয়; এটি নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযুদ্ধের প্রতিচ্ছবি।


















