একটি হামলার জবাবে পালটা হামলা। একটি হত্যার বদলা আরেকটি হত্যা। জমি দখল নিয়ে বিরোধ, এরপর মামলা। মামলার জেরে আবার হামলা। কোনো রাজনৈতিক কর্মীর ওপর হামলা হলে প্রতিপক্ষের ওপর পালটা আক্রমণ।
কোথাও আধিপত্য বিস্তার, কোথাও চাঁদাবাজি, দখল কিংবা ব্যাবসায়িক নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে সংঘাত। এভাবেই ব্যক্তিগত বিরোধ থেকে রাজনৈতিক ও সামাজিকসহ বিভিন্ন পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ছে আক্রোশ ও প্রতিহিংসার সংস্কৃতি। সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, কোনো কোনো সময় বিরোধ মীমাংসার চেয়ে হিসাব মেটানোই হয়ে উঠছে প্রধান লক্ষ্য। প্রতিপক্ষকে দুর্বল করা, এলাকায় আধিপত্য প্রতিষ্ঠা, পুরোনো ক্ষোভ থেকে প্রতিশোধ কিংবা নিজের শক্তি প্রদর্শন করতে গিয়ে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ছে মানুষ।
সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে অবৈধ অস্ত্র, চাঁদাবাজি, দখলদারি, মাদক ও অপরাধী গোষ্ঠীর নেটওয়ার্ক। ফলে সামান্য বিরোধও মুহূর্তে প্রাণঘাতী সংঘাতে রূপ নিচ্ছে। গত ৪ আগস্ট জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা, রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা কলেজে বিভিন্ন ইস্যুকে কেন্দ্র করে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিহিংসা থেকেই এসব ঘটনার সূত্রপাত। সম্প্রতি দীর্ঘদিনের জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের জেরে সিলেটে আব্দুস সাত্তার ও সুরাইয়া বেগম দম্পতি এবং তাদের গৃহকর্মীকে নিজ বাসায় নৃশংসভাবে খুন করা হয়। ভুক্তভোগী পরিবারের দায়ের করা মামলায় উল্লেখ করা হয়, জমি দখলের পুরোনো আক্রোশ থেকে ভাড়াটে খুনি দিয়ে এই ট্রিপল মার্ডারটি করানো হয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিহিংসা এখন শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়, অপরাধ সংঘটনের অন্যতম চালিকাশক্তিতে রূপ নিয়েছে। একটি ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই ঘটছে আরেকটি ঘটনা। এক পক্ষের হামলার জবাব দিচ্ছে অন্য পক্ষ। এভাবেই তৈরি হচ্ছে সহিংসতার একটি ধারাবাহিক চক্র। এই চিত্রের সঙ্গে দেশে সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের পরিসংখ্যানও উদ্বেগের। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসে দেশে ১ হাজার ৮০৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ১ হাজার ৭৮৯টি। গত বছরের প্রথম ছয় মাসে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৫৮৫। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে হত্যাকাণ্ড বেড়েছে ২২০টি বা প্রায় ১৪ শতাংশ। চলতি বছরের ছয় মাসের হত্যাকাণ্ড পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১০টি হত্যার ঘটনা ঘটছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রতিটি হত্যার পেছনে প্রতিহিংসা কাজ করেছে, এমন দাবি করার সুযোগ নেই।
পারিবারিক বিরোধ, ব্যক্তিগত শত্রুতা, জমি নিয়ে বিরোধ, রাজনৈতিক কোন্দল, আধিপত্য, চাঁদাবাজি, মাদক ও সংঘবদ্ধ অপরাধসহ হত্যার কারণ বহুমাত্রিক। তবে এসব ঘটনার একটি উল্লেখযোগ্য অংশে পূর্ববিরোধ, প্রতিশোধ ও পালটা আক্রমণের ধারাবাহিকতা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতায় ৩ হাজার ৪৫১টি ঘটনা ঘটেছে।
এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন ২ হাজার ৯৭৪ জন। হত্যাচেষ্টার শিকার হয়েছেন ৪০০ জন এবং নিহত হয়েছেন ৭৭ জন। রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনাও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে। আসকের তথ্য অনুযায়ী, বিএনপির নেতাকর্মীদের অন্তর্কোন্দলে ৯৩৩ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের ২০ জনের বেশি নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। বিভিন্ন ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে আরও প্রায় ৪০ জনের বেশি নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিহিংসার ভয়ংকর দিক হলো, একটি ঘটনায় এর শেষ হয় না। একজন আক্রান্ত হলে তার স্বজন, বন্ধু কিংবা সহযোগীরা প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করেন। কোনো রাজনৈতিক কর্মী হামলার শিকার হলে দলীয় বা গোষ্ঠীগতভাবে প্রতিপক্ষকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। আন্ডারওয়ার্ল্ডে প্রতিপক্ষকে সরিয়ে দিতে হত্যার পথ বেছে নেওয়ার ঘটনাও নতুন নয়। ফলে অপরাধ আর দুই ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় পরিবার, রাজনৈতিক অনুসারী, স্থানীয় প্রভাবশালী এবং অপরাধী গোষ্ঠী। একটি খুনের জবাবে আরেকটি খুন, একটি হামলার জবাবে পালটা হামলা, একটি দখলের জবাবে আরেকটি দখল। এভাবে পুরোনো বিরোধ নতুন প্রজন্মের মাঝেও ছড়াচ্ছে। একপর্যায়ে বিরোধের মূল কারণও গুরুত্বপূর্ণ থাকে না। শুধু পরিচয়টাই বড় হয়ে ওঠে- ওরা আমাদের শত্রু। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, স্থানীয় আধিপত্য এখন প্রতিহিংসাজনিত অপরাধের বড় ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
একটি এলাকায় কার নিয়ন্ত্রণ থাকবে, কে ব্যবসা করবে, কারা বাজার বা পরিবহন নিয়ন্ত্রণ করবে, কে চাঁদা তুলবে কিংবা কোন পক্ষ জমি দখলে রাখবে- এসব প্রশ্নকে কেন্দ্র করে শুরু হয় সংঘাত। প্রথমে বিরোধ থাকে অর্থনৈতিক। পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয় ব্যক্তিগত শত্রুতা ও রাজনৈতিক প্রভাব। পরাজিত পক্ষ সুযোগ পেলেই প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করে। এরপর শুরু হয় পালটা মামলার চক্র।
একজনের লোক গ্রেপ্তার হলে অন্য পক্ষের ওপর হামলা। কেউ জামিনে বের হলে পুরোনো বিরোধ আবার সামনে আসে। মামলায় নতুন আসামি যুক্ত করা কিংবা মামলা থেকে নাম বাদ দেওয়ার নামে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও সংঘাতকে দীর্ঘস্থায়ী করে। দেশে রাজনীতিতে প্রতিহিংসার প্রবণতা নতুন নয়। তবে রাজনৈতিক মত ও আদর্শের প্রতিযোগিতা যখন ব্যক্তিগত ক্ষমতা, পদ-পদবি ও স্থানীয় আধিপত্যের লড়াইয়ে পরিণত হয়, তখন প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার বদলে তাকে দমন করার প্রবণতা তৈরি হয়।
হত্যাকাণ্ডের ভৌগোলিক বিস্তারেও উদ্বেগজনক তথ্য রয়েছে। ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ঢাকায় ৪৩৫টি এবং চট্টগ্রাম বিভাগে ৩৯০টি হত্যা মামলা হয়েছে। দুই অঞ্চলে মোট ৮২৫টি মামলা। ছয় মাসে সারা দেশে নথিভুক্ত ১ হাজার ৭৮৯টি হত্যা মামলার প্রায় ৪৬ শতাংশই এই দুই অঞ্চলে। অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, বড় নগরাঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, জমির মূল্য, ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন, চাঁদাবাজি ও স্থানীয় আধিপত্যের স্বার্থ বেশি থাকায় সংঘাতের ধরনও জটিল হয়।
অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাব ও অপরাধী নেটওয়ার্ক যুক্ত হলে বিরোধ দ্রুত সহিংস রূপ নিতে পারে। মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটনের মতে, প্রতিহিংসার আরেক ভয়ংকর প্রকাশ মব সন্ত্রাস। অভিযোগের সত্যতা যাচাই কিংবা আইনি প্রক্রিয়ার অপেক্ষা না করেই কোনো ব্যক্তিকে টার্গেট করে জনতাকে ব্যবহার করে হামলা চালানো হয়। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত ক্ষোভও গণপিটুনির আড়ালে চরিতার্থ করার অভিযোগ রয়েছে।
অর্থাৎ সামনে থাকে বিচার শব্দটি, কিন্তু আড়ালে থাকতে পারে ব্যক্তিগত প্রতিশোধ। আসকের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন এলাকায় উত্তেজিত জনতার পিটুনিতে নিহত হয়েছেন ১৩৪ জন। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকায় ৫০, চট্টগ্রামে ৩১, খুলনায় ১৭, রাজশাহীতে ১২, বরিশালে ১০, ময়মনসিংহে ৯ ও রংপুরে ৫ জন। অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষক ড. মো. তৌহিদুল হকের মতে, প্রতিহিংসার আগুন খুবই মারাত্মক।
এই আগুনের অনেকটা দাবানলের মতো ছড়ায়। পরিবার থেকে সমাজ, সমাজ থেকে রাষ্ট্র সর্বত্র প্রতিহিংসা দিন দিন মারাত্মক আকার ধারণ করছে। তিনি বলেন, মব সহিংসতাও এক ধরনের ব্যাধিতে পরিণত হচ্ছে। মব সহিংসতার অনেক ঘটনার পেছনে পূর্ববিরোধ ও রাজনৈতিক যোগসাজশের বিষয় দেখা যায়। তার ভাষায়, মব সহিংসতা সামাজিক অস্থিরতা বাড়ানোর পাশাপাশি মানুষের মৌলিক অধিকার, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে।
তিনি আরও মনে করেন, মবের বিরুদ্ধে শুধু ঘোষণা বা নির্দেশনা যথেষ্ট নয়। দ্রুত আইনি ব্যবস্থা এবং ইন্ধনদাতাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে। পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন জানিয়েছেন, সামাজিক, পারিবারিক, ব্যক্তিগত, অর্থনৈতিক ও অপরাধমূলক বিরোধের কারণে হত্যাকাণ্ড কমবেশি হয়ে থাকে। প্রতিটি হত্যার নেপথ্যের কারণ উদ্ঘাটন করে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশ গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করছে।
মাঠপর্যায়ে টহল, গোয়েন্দা নজরদারি ও বিশেষ অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো গুজবের কারণে মব সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। কোনো অভিযোগ যাচাইয়ের আগেই তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। মুহূর্তেই উত্তেজনা তৈরি হয়। তখন সত্যতা যাচাইয়ের আগেই শুরু হয় মব। একটি পোস্ট, একটি ভিডিও কিংবা একটি অডিওর ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী ধরে নিয়ে হামলা চালানোর ঘটনাও ঘটছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, প্রতিহিংসা শুধু হামলা বা হত্যায় সীমাবদ্ধ নয়। মামলা নিয়েও ব্যক্তিগত শত্রুতা মেটানোর অভিযোগ রয়েছে। কোনো ঘটনার পর বিপুলসংখ্যক অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা, পরে তাদের নাম যুক্ত করা, মামলা থেকে নাম বাদ দেওয়ার নামে অর্থ আদায় কিংবা মামলা দিয়ে প্রতিপক্ষকে হয়রানি করার অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে। অন্যদিকে প্রকৃত অপরাধীকে রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাবের কারণে মামলা থেকে বাইরে রাখার ঘটনাও ঘটছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো স্বাধীন ও কার্যকর আইন প্রয়োগ। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কেউ যাতে আইনের বাইরে থাকার সুযোগ না পায়, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি। প্রতিহিংসাজনিত অপরাধের ক্ষেত্রে শুধু হামলাকারীকে গ্রেপ্তার করলেই তদন্ত শেষ হওয়া উচিত নয়। অস্ত্র কোথা থেকে এসেছে, অর্থের জোগানদাতা কে, কার নির্দেশে হামলা হয়েছে, অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে কার যোগাযোগ রয়েছে এবং একই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আগে কোনো মামলা ছিল কি না, এসব প্রশ্নও তদন্তের আওতায় আনা জরুরি।
বিশেষ করে চাঁদাবাজি, দখল, মাদক ও অবৈধ অস্ত্রের নেটওয়ার্ক ভাঙতে না পারলে প্রতিহিংসাজনিত অপরাধ কমানো কঠিন। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, একজন হামলাকারীকে গ্রেপ্তার করলেই একটি সংঘাতের সমাপ্তি ঘটে না। তার পেছনে যদি অর্থদাতা, অস্ত্র সরবরাহকারী, নির্দেশদাতা কিংবা রাজনৈতিক আশ্রয়দাতা থাকে, তাহলে সেই কাঠামো অক্ষত থেকে যায়।



















