দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন, শোষণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক ধ্বংসলীলার অন্ধকার কাটিয়ে বাংলাদেশ আজ এক নতুন সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে। স্বৈরাচারমুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশে এখন নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর পালা।
রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ঐতিহাসিক ‘রাজস্ব সম্মেলন ২০২৬’-এ প্রধান অতিথির ভাষণে এমন জোরালো বার্তা দিয়েছেন সরকার প্রধান। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই সম্মেলনে দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে এবং রাজস্ব খাতের আমূল সংস্কারে এক যুগান্তকারী রূপরেখা তুলে ধরা হয়।
সম্মেলনে শুধু প্রধানমন্ত্রীই নন, সরকারের নীতিনির্ধারক মন্ত্রী, বিএনপির শীর্ষস্থানীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং এনবিআরের দায়িত্বশীল উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বক্তব্যেও উঠে এসেছে এক নতুন ও জনবান্ধব বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপরেখার রূপায়ণ। দেশের অর্থনীতিতে এক নতুন রূপান্তরের ডাক দেশের অর্থনীতিতে এক নতুন রূপান্তরের ডাক দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন ও শোষণের অভিশাপ থেকে রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো জাতীয় রাজস্ব বোর্ডও (এনবিআর) মুক্ত থাকতে পারেনি বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদমুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশে এবার আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর পালা। ভঙ্গুর ও বিপর্যস্ত এক অর্থনীতির মধ্যে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং এর সফল বাস্তবায়ন অনেকাংশেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের গতিশীল কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করছে।
সম্মেলনের প্রধান অতিথির ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার বিশদ চিত্র তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেন যে, দেশের মানুষ বর্তমানে এনবিআরকে একটি চরম আস্থার ও নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে চায়। অতীতে নীতি ও নিয়মকে উপেক্ষা করে ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থে কাউকে বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া, আবার কারও প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ এবং রাজস্ব আহরণে স্বেচ্ছাচারিতার কারণে প্রতিষ্ঠানটি চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিল।
এর ফলে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের মনে এনবিআরের ওপর থেকে আস্থা উঠে গিয়েছিল। বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রকৃতির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একের পর এক অত্যাধুনিক প্রযুক্তির বিকাশ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নতুন নতুন মডেল এবং ব্যবসায়িক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় রাজস্ব কর্মকর্তাদের বহুমাত্রিক দক্ষতা অর্জন এখন সময়ের দাবি।
ডিজিটাল ইকোনমি, ই-কমার্স, ট্রান্সফার প্রাইসিং, ইন্টারন্যাশনাল ট্যাক্সেশন, ট্রেড ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম, মানি লন্ডারিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)—এসব বিষয়ে বর্তমান রাজস্ব কর্মকর্তাদের সুস্পষ্ট ও গভীর জ্ঞান থাকা অত্যন্ত জরুরি। আমাদের দেশে কর-জিডিপি অনুপাত এখনো সক্ষমতার তুলনায় অনেক কম উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নিয়মিত ও সীমিত কিছু করদাতার ওপর বারবার নির্ভরতা কমানোর সময় এসেছে।
আধুনিক কর প্রশাসনের মূল উদ্দেশ্য শুধু জোর করে বেশি কর আদায় করা নয়, বরং বেশি মানুষকে স্বেচ্ছায় কর প্রদানে উদ্বুদ্ধ করা। একই করদাতার ওপর বারবার করের বোঝা চাপানোর প্রাচীন ও টেকসইহীন নীতি পরিহার করে, কর দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে এমন নতুন ব্যক্তিদের সঠিকভাবে শনাক্ত করে নিয়মের আওতায় আনতে হবে। ভ্যাট ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে উল্লেখ করে তিনি কড়া বার্তা দেন যে, ভ্যাট বা কাস্টমসের জটিলতায় কোনোভাবেই যেন ব্যবসা-বাণিজ্য বাধাগ্রস্ত না হয়।
মানুষ যেন এনবিআরকে ভয় না পায়, বরং প্রতিষ্ঠানটিকে নিজেদের বন্ধু ও আস্থার ঠিকানা হিসেবে বিবেচনা করে—এমন একটি জনবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার জোর তাগিদ দেন তিনি। সিন্ডিকেটকে সুবিধা দিতে গিয়ে সাধারণ ব্যবসায়ী ও করদাতাদের হয়রানি, পেশিশক্তি দেখিয়ে টেকসই রাজস্ব আহরণ সম্ভব নয় এসব বিষয়ে রাজস্ব সম্মেলনের পরপরই সরকারের অন্যতম প্রভাবশালী একজন মন্ত্রীর সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে রাষ্ট্রের প্রতিটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে লুটপাটের হাতিয়ার বানানো হয়েছিল।
এনবিআর তার ব্যতিক্রম ছিল না। তিনি বলেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছেন যে, কাউকে ভীতি প্রদর্শন করে বা পেশিশক্তি দেখিয়ে টেকসই রাজস্ব আহরণ সম্ভব নয়। বিগত দিনে গুটিকয়েক দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটকে সুবিধা দিতে গিয়ে সাধারণ ব্যবসায়ী ও করদাতাদের হয়রানি করা হতো। বর্তমান সরকার সেই সংস্কৃতির সম্পূর্ণ উল্টো পথে হাঁটছে।
আমরা ব্যবসা-বাণিজ্যকে সহজীকরণ করতে চাই এবং করদাতাদের হয়রানিমুক্ত সেবা নিশ্চিত করতে চাই। ডিজিটাল ডেটাবেজ ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে আমরা এমন এক রাজস্ব কাঠামো তৈরি করতে যাচ্ছি, যেখানে ট্যাক্স ফাঁকি যেমন কমবে, তেমনি সৎ ব্যবসায়ীরা সম্পূর্ণ নিরাপদে ও সম্মানের সাথে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবেন। তিনি আরও যোগ করেন, সরকারের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সংস্কারের মূল লক্ষ্য হলো সাধারণ মানুষের ওপর জীবনযাত্রার অতিরিক্ত চাপ না কমিয়ে রাজস্ব আহরণের পরিধি বৃদ্ধি করা।
সম্মেলনের সমাপনী পর্বে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একজন দায়িত্বশীল পরিচালক এনবিআরের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা ও বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে আলোকপাত করেন এবং তিনি অত্যন্ত আশাবাদী সুরে বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আজ যে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা আমাদের দিয়েছেন, এনবিআর পরিবার তা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করেছে। বিগত দিনে যে সমস্ত আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে আমরা ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করে দিয়েছি।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত রাজস্ব আহরণের যে ইতিবাচক গতি আমরা অর্জন করেছি, তা প্রমাণ করে যে আমাদের কর্মকর্তারা কাজ করতে সক্ষম এবং তারা আন্তরিক। তিনি আরও জানান যে, হয়রানিমুক্ত ও দুর্নীতিমুক্ত কর প্রশাসন গড়তে এনবিআর সম্পূর্ণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের দিকে এগোচ্ছে। করদাতারা যেন ঘরে বসেই তাদের বার্ষিক রিটার্ন জমা দিতে পারেন এবং ভ্যাট বা কাস্টমসের যেকোনো ঝামেলা অনলাইনেই নিষ্পত্তি করতে পারেন, সে লক্ষ্যে আধুনিক ডেটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করা হচ্ছে।
সাধারণ করদাতাদের হয়রানি রোধে কঠোর মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে এবং ইচ্ছাকৃত করখেলাপিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ কিন্তু স্বচ্ছ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। প্রধানমন্ত্রী যেভাবে এনবিআরকে ভয় নয়, বিশ্বাসের প্রতীকে পরিণত করার আহ্বান জানিয়েছেন, এনবিআরের প্রতিটি কর্মী সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সর্বাত্মকভাবে বদ্ধপরিজ্ঞাত।
বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন জ্যেষ্ঠ সদস্য বলেন, যেহেতু এই বিষয়টি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী কথা বলেছেন যদিও এটি নিয়ে আমাদের কথা বলার দরকার হয় না। তবে এতটুকু বলতে চায় বাংলাদেশ আজ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। বিগত সরকারের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা থেকে উত্তরণে বর্তমান সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপ অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
তিনি বলেন, একটি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে অর্থবহ করতে হলে নিজস্ব রাজস্ব খাতের ওপর ভিত্তি করে স্বাবলম্বী হওয়া জরুরি। কিন্তু বিগত ১৫ বছর ধরে এনবিআরকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করে দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছিল। মানি লন্ডারিং, আন্ডার-ইনভয়েসিং ও ওভার-ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন—বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল ইকোনমি ও ট্রান্সফার প্রাইসিংয়ের মতো জটিল বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণে রাজস্ব কর্মকর্তাদের দক্ষ করে তোলার আহ্বান—তা সত্যিই যুগোপযোগী। আমরা বিশ্বাস করি, আইনের শাসন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা গেলে এ দেশের মানুষ সানন্দে ও স্বেচ্ছায় রাষ্ট্রীয় কোষাগারে কর জমা দেবে।



















