দেশের অর্থনীতিতে নতুন সরকারের প্রথম ১৮০ দিন পূর্ণ হচ্ছে সোমবার (১৭ আগস্ট)। এই সময়ে অর্থনীতির সবচেয়ে বড় অর্জন কি স্থিতিশীলতা ফেরানোর চেষ্টা, নাকি সংকটের গভীরতা এখনো আগের মতোই রয়ে গেছে- এ প্রশ্ন সামনে এসেছে।
ছয় মাসের অর্থনৈতিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কিছু সূচকে স্বস্তি ফিরেছে, বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ, রিজার্ভ, রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয়ে। তবে মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ, বেসরকারি ঋণপ্রবাহ, রাজস্ব আদায় ও ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এখনো অর্থনীতির বড় বাধা। অর্থনীতিবিদদের মতে, ১৮০ দিনের সময়সীমায় অর্থনীতির মৌলিক কাঠামোর বড় পরিবর্তন প্রত্যাশা করা কঠিন।
তবে এই সময়ে সরকারের নীতি কোন দিকে যাচ্ছে এবং সেই নীতির প্রাথমিক ফল কী, তা বোঝা সম্ভব। সেই হিসাবে বর্তমান সময়কে অর্থনীতির জন্য স্থিতিশীলতা ফেরানোর পর্যায় বলা গেলেও এখনো এটিকে পূর্ণাঙ্গ ঘুরে দাঁড়ানো বলা যাচ্ছে না। জানা যায়, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় অর্থনীতি ইতোমধ্যেই নানা চাপের মধ্যে ছিল। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে অস্থিরতা, দুর্বল ব্যাংকিং খাত, খেলাপি ঋণের চাপ, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতা অর্থনীতির ওপর বড় চাপ তৈরি করেছিল।
পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সরকারি ও আন্তর্জাতিক মূল্যায়নেও অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতার বিষয়টি উঠে এসেছে; বিশেষ করে ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের ঘাটতি, বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা এবং দীর্ঘদিনের আর্থিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকে অর্থনীতির বর্তমান সমস্যার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফলে নতুন সরকারের জন্য প্রথম চ্যালেঞ্জ ছিল দ্রুত প্রবৃদ্ধি অর্জন নয়; বরং অর্থনীতিকে আরও বড় অস্থিরতা থেকে রক্ষা করা।
মূল্যস্ফীতি এখনো সবচেয়ে বড় চাপ নয়া সরকারের এই ১৮০ দিনে অর্থনৈতিক মূল্যায়নে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হচ্ছে মূল্যস্ফীতিকে। মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও তা এখনো সাধারণ মানুষের স্বস্তির পর্যায়ে আসেনি। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা চাপে রয়েছে। খাদ্য, বাসাভাড়া, পরিবহন, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর চাপ অব্যাহত রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক দীর্ঘ সময় ধরে কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণ করেছে। এর অংশ হিসেবে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে রাখা হয়েছিল। পরে জুলাইয়ের শেষ দিকে প্রায় দুই বছর পর নীতি সুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো বিনিয়োগ ও বেসরকারি ঋণপ্রবাহে গতি ফেরানো। তবে এখানেই সরকারের জন্য বড় নীতিগত দ্বন্দ্ব- মূল্যস্ফীতি কমাতে সুদহার বেশি রাখলে বিনিয়োগ কমে যায়, আবার বিনিয়োগ বাড়াতে দ্রুত সুদহার কমালে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হতে পারে।
রেমিট্যান্সে বড় স্বস্তি ১৮০ দিনের অর্থনৈতিক চিত্রের ইতিবাচক দিকগুলোর একটি রেমিট্যান্স। প্রবাসী আয়ের প্রবাহ শক্তিশালী থাকায় বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপ কমাতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। রেমিট্যান্সের এই প্রবাহ দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। চলতি হিসাব ও বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরাতে এটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হিসেবে কাজ করছে।
চলতি বছরের প্রথম দিকেও শক্তিশালী রেমিট্যান্সের কারণে বাংলাদেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যে উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা গিয়েছিল। বর্তমান সরকারের ১৮০ দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১ হাজার ৮৯৬ কোটি ডলার। এর মধ্যে রেমিট্যান্সের বড় অংশই এসেছে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ কয়েক মাসে। তবে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতেই প্রবাসী আয়ে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে।
আগস্টের প্রথম আট দিনে দেশে এসেছে ৯১৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স। গত বছরের একই সময়ে এসেছিল ৬৪০ মিলিয়ন ডলার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে আগস্টের প্রথম আট দিনে প্রবাসী আয় বেড়েছে ২৭৫ মিলিয়ন ডলার বা ৪২ দশমিক ৯ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি ৬ থেকে ৮ আগস্ট- এই তিন দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৩১৩ মিলিয়ন ডলার।
এর আগে ১ থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত মোট রেমিট্যান্সের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯১৫ মিলিয়ন ডলার। এদিকে, চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ৩ দশমিক ৭৭৩ বিলিয়ন ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ৩ দশমিক ১১৮ বিলিয়ন ডলার; অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এই সময়ে প্রবাসী আয় বেড়েছে ৬৫৫ মিলিয়ন ডলার বা ২১ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈধ বা ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রবণতা ধরে রাখা গেলে সামনে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে হুন্ডির মতো অনানুষ্ঠানিক পথে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা কমানো এবং প্রবাসীদের জন্য বৈধ চ্যানেলকে আরও সহজ ও আকর্ষণীয় করা গেলে রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক ধারা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসেই শক্তিশালী প্রবৃদ্ধির পর আগস্টের শুরুতেও রেমিট্যান্সের গতি অব্যাহত থাকায় দেশের অর্থনীতিতে নতুন করে স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে প্রবাসী আয়। রিজার্ভে স্বস্তি, তবে স্বস্তি কতটা টেকসই? বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়েও পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। একসময় দ্রুত কমতে থাকা রিজার্ভ এখন তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে।
রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবাহ এবং বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে নীতিগত পরিবর্তন এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে। তবে রিজার্ভের পরিমাণ বাড়লেই বৈদেশিক খাতের সব সমস্যা সমাধান হয়েছে- এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ দেশের আমদানি চাহিদা, জ্বালানি ব্যয়, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং রপ্তানি আয়ের প্রবণতার ওপর রিজার্ভের ভবিষ্যৎ অবস্থান নির্ভর করবে।
তথ্যমতে, বিএনপির সরকার যাত্রা শুরুর সময় দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল ৩৪ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার, আর আইএমএফের হিসাবে ২৯ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার। সবশেষ গত ১২ আগস্ট দিন শেষে দেশের মোট (গ্রেস) বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ হিসাব পদ্ধতিতে রিজার্ভের পরিমাণ ৩২ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশের ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ ২৯ বিলিয়ন ডলারের মতো আছে। প্রতি মাসে গড়ে ৫ বিলিয়ন ডলার আমদানি ব্যয় ধরা হলে, এ রিজার্ভ দিয়ে সাড়ে পাঁচ মাসের বেশি আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। সাধারণত অন্তত তিন মাসের আমদানি ব্যয়ের সমপরিমাণ রিজার্ভকে নিরাপদ ধরা হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে অর্থ পাচার ও রেমিট্যান্স রপ্তানিতে ধীরগতির কারণে রিজার্ভ চাপে পড়ে।
ওই সময় ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ ১৪ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে গিয়েছিল। সে সময় বৈদেশিক ঋণ ও বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ডলার সংগ্রহ করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। বিনিয়োগে গতি ফেরেনি অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুর্বল জায়গা এখনো বিনিয়োগ। বেসরকারি খাতে নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে ব্যবসায়ীদের মধ্যে সতর্কতা রয়েছে। উচ্চ সুদহার, রাজনৈতিক ও নীতিগত অনিশ্চয়তা, জ্বালানি সরবরাহ, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং ব্যবসার ব্যয়- সব মিলিয়ে বিনিয়োগের পরিবেশ এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিও এর প্রতিফলন দেখাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের আশপাশে নেমে আসে, যা সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম নিম্ন পর্যায়। এর অর্থ হলো, ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অর্থ থাকলেও তা পর্যাপ্ত পরিমাণে উৎপাদনশীল খাতে যাচ্ছে না। এখানে একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে- শুধু সুদহার কমিয়ে কি বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব, নাকি ব্যবসায়িক পরিবেশ ও আস্থার সংকটও সমাধান করতে হবে?
সরকারি ঋণ বাড়ছে, বেসরকারি ঋণ কমছে অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা হলো সরকারি ঋণ গ্রহণের চাপ। সরকারের ব্যাংকঋণ বাড়লেও একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ দুর্বল রয়েছে। এটি অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের কারণ। কারণ ব্যাংকগুলো যদি সরকারের ঋণ চাহিদা মেটাতে বেশি অর্থ ব্যবহার করে, তাহলে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত সরকার ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছে বলে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়। একই সময়ে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি রেকর্ড নিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। ফলে অর্থনীতিতে এখন একটি অস্বস্তিকর বৈপরীত্য তৈরি হয়েছেÑসরকারের ঋণ চাহিদা বাড়ছে, কিন্তু উদ্যোক্তাদের ঋণ চাহিদা ও ঋণপ্রাপ্তি দুটিই দুর্বল।
ব্যাংকিং খাত : সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা নতুন সরকারের ১৮০ দিনের অর্থনৈতিক মূল্যায়নে ব্যাংকিং খাতকে বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা অনেকটাই নির্ভর করছে ব্যাংকিং খাত কতটা দ্রুত পুনর্গঠন করা যায় তার ওপর। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্বল ঋণ মূল্যায়ন, রাজনৈতিক প্রভাব, খেলাপি ঋণ এবং মূলধন ঘাটতির কারণে কয়েকটি ব্যাংক বড় ধরনের সমস্যায় পড়েছে।
ফলে সরকারের সামনে এখন দ্বৈত চ্যালেঞ্জ একদিকে আমানতকারীদের আস্থা ধরে রাখা, অন্যদিকে দুর্বল ব্যাংকগুলোকে পুনর্গঠন করা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, গত মার্চ শেষে দেশের তফসিলি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। বাংলাদেশের ইতিহাসে খেলাপি ঋণের এটিই সর্বোচ্চ রেকর্ড। যদিও এপ্রিল-জুন সময়ের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের তথ্য প্রকাশ করেনি বাংলাদেশ ব্যাংক।
গত মার্চ মাস শেষে দেশের ৬১টি তফসিলি ব্যাংকে মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। তিন মাসের ব্যবধানে ঋণ বিতরণ বেড়েছে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। আর এখন মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ খেলাপি হয়ে পড়েছে। এদিকে বাংলাদেশে খেলাপি হয়ে যাওয়া ঋণের বিপরীতে প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি সংরক্ষণ করতে পারছে না অনেক ব্যাংক।
এর প্রভাবে ব্যাংক খাতে মূলধন ঘাটতি তীব্র আকার ধারণ করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত বছর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত (সিআরএআর) ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমে গেছে। যেখানে আন্তর্জাতিকভাবে চর্চিত ব্যাসেল-৩ নীতিমালা অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর সিআরএআর সর্বনিম্ন ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ থাকার কথা। কার্যকর অর্থনীতির কোনো দেশের ব্যাংক খাতের গড় মূলধন ঋণাত্মক ধারায় চলে যাওয়াকে আধুনিক বিশ্বের বিরল ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজস্ব আদায়ে চাপ অর্থনীতির আরেকটি বড় দুর্বলতা রাজস্ব খাত। সরকারের ব্যয় বাড়ছে, ঋণের সুদ পরিশোধের চাপ বাড়ছে; কিন্তু রাজস্ব আদায় সেই অনুপাতে বাড়ছে না। রাজস্ব ঘাটতির কারণে সরকারের উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে অর্থায়নের ওপর চাপ তৈরি হয়। একই সঙ্গে ঘাটতি পূরণে দেশীয় ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়লে ব্যাংকিং খাত ও বেসরকারি বিনিয়োগেও প্রভাব পড়তে পারে।
বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ মাসে রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্য গতি পেয়েছে। তবে এরপরও বিশাল ঘাটতি রেখেই অর্থবছর শেষ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। অথচ অর্থবছরের শুরু থেকেই রাজস্ব আদায়ে ব্যাপক পরিকল্পনা ও পদক্ষেপ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। এনবিআরের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনবিআরের মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে ৪ লাখ ১৫ হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা।
অথচ সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। ফলে অর্থবছর শেষে রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৮৭ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা কম হয়েছে। তবে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না হলেও আগের অর্থবছরের চেয়ে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১২ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ। কারণ, আগের বছরের চেয়ে রাজস্ব বেশি আদায় হয়েছে প্রায় ৪৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের আদায় হয়েছিল ৩ লাখ ৭০ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের হিসাব এখনো প্রকাশ করেনি এনবিআর। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু করহার বাড়িয়ে নয়; করের আওতা বাড়ানো, কর প্রশাসনে দক্ষতা, কর ফাঁকি রোধ এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার কার্যকর ব্যবহারই রাজস্ব বাড়ানোর টেকসই পথ। প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে বড় প্রশ্ন অর্থনীতির শেষ বিচারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো প্রবৃদ্ধি।
কারণ প্রবৃদ্ধি কমে গেলে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও মানুষের আয়- সবকিছুর ওপর প্রভাব পড়ে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল জুলাই ২০২৬-এ বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনে। একই সঙ্গে তারা রাজস্ব ও আর্থিক খাতের চাপের কথা উল্লেখ করেছে; অর্থাৎ আগামী দিনে সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি কীভাবে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানো যায়।
এ ক্ষেত্রে শুধু মুদ্রানীতি যথেষ্ট নয়। ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন, জ্বালানি ও অবকাঠামোগত বাধা দূর করা এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাও জরুরি। স্থিতিশীলতা এসেছে, কিন্তু ঘুরে দাঁড়ানো এখনো বাকি সব সূচক একসঙ্গে বিবেচনা করলে সরকারের প্রথম ১৮০ দিনের অর্থনৈতিক চিত্রকে এক কথায় সাফল্য বা ব্যর্থতা বলা কঠিন। রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্বস্তি এসেছে।
রিজার্ভের ওপর চাপ কিছুটা কমেছে। মুদ্রানীতিতে দীর্ঘদিনের কঠোর অবস্থান থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসার ইঙ্গিতও মিলছে। কিন্তু মূল্যস্ফীতি এখনো মানুষের জন্য বড় বোঝা। বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল। ঋণপ্রবাহ কম। ব্যাংকিং খাত বড় সংস্কারের অপেক্ষায়। রাজস্ব আদায়ে কাক্সিক্ষত গতি নেই। আর আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসও আশাব্যঞ্জক নয়।
তাই ১৮০ দিনের অর্থনৈতিক মূল্যায়নের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য শব্দ সম্ভবত ‘স্থিতিশীলতার চেষ্টা’। কারণ সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা সামাল দেওয়া গেলেও অর্থনীতির মৌলিক দুর্বলতাগুলো এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। আগামী ছয় মাসে সরকারের সামনে তাই তিনটি বড় পরীক্ষা- মূল্যস্ফীতি কমানো, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে গতি ফেরানো এবং ব্যাংকিং খাতকে কার্যকরভাবে সংস্কার করা।
এই তিন ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে রিজার্ভ বা রেমিট্যান্সের সাময়িক স্বস্তি টেকসই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে রূপ নেবে না। অর্থনীতির জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি শুধু সংকট সামাল দেওয়া নয়; বরং এমন একটি ভিত্তি তৈরি করা, যার ওপর দাঁড়িয়ে আগামী দিনের উচ্চ প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের অর্থনীতি গড়ে উঠতে পারে। ১৮০ দিনে অর্থনীতি তাই ঘুরে দাঁড়ানোর পথে পা রাখলেও এখনো গন্তব্যে পৌঁছায়নি।
গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, গত ছয় মাসে বাংলাদেশের অর্থনীতির কিছু সূচকে উন্নতি দেখা গেলেও সামগ্রিক স্বস্তির কারণ খুব বেশি নেই। প্রবাসী আয় শক্তিশালী, মূল্যস্ফীতি আগের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে কিছুটা নেমেছে, সরকার সামাজিক সুরক্ষা ও কৃষি সহায়তায় নতুন কর্মসূচি নিয়েছে।
কিন্তু এর বিপরীতে বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল, ব্যাংক খাতের সংকট গভীর, রাজস্ব আদায়ে বড় ঘাটতি রয়েছে, জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চিত এবং সরকারের ঋণ ও সুদ পরিশোধের চাপ বাড়ছে। তাই প্রশ্নটি শুধু অর্থনীতি স্থিতিশীল হচ্ছে কি না, সেটি নয়; বরং প্রশ্ন হলো, সরকার কি সমস্যাগুলোর প্রকৃতি সঠিকভাবে চিহ্নিত করে বাস্তবসম্মত নীতি গ্রহণ করছে? তার মতে, মূল্যস্ফীতি এ মুহূর্তে সবচেয়ে দৃশ্যমান সমস্যা।
জুলাইয়ে হার কিছুটা কমলেও তা এখনো ৮ শতাংশের ওপরে। এটিকে স্বাভাবিক পরিস্থিতি বলা যায় না। দীর্ঘ সময়ের উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে, সঞ্চয়ের মূল্য ক্ষয় হয়েছে এবং খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানের ব্যয় বেড়েছে।


















