10:53 pm, Saturday, 15 August 2026

ডিজিটাল অর্থব্যবস্থা: ব্যাংকিং খাতের দুর্নীতির বিরুদ্ধে নতুন পদক্ষেপ

  • MIT ERP
  • Update Time : 09:22:59 pm, Saturday, 15 August 2026
  • 1

ডিজিটাল অর্থব্যবস্থা: ব্যাংকিং খাতের দুর্নীতির বিরুদ্ধে নতুন পদক্ষেপ

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

আধুনিক সভ্যতার অর্থনৈতিক ফুসফুস হলো ব্যাংক। সাধারণ মানুষের জমানো সঞ্চয়কে সচল রাখা, ব্যবসার প্রসার ঘটানো এবং রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখতে ব্যাংকিং খাতের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর এই কর্পোরেট যুগে দাঁড়িয়ে ব্যাংকগুলোর দিকে তাকালে এক গভীর অস্বস্তি কাজ করে।

যে প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ ছিল আমানতকারীর কষ্টার্জিত অর্থের সুরক্ষা দেওয়া, তারাই আজ চরম আস্থার সংকটে ভুগছে। কোনো কোনো ব্যাংক আজ দেউলিয়া হয়েছে, কেউ গ্রাহকের অর্থ ফেরত দিতে বহু ধাপে কিস্তি প্ল্যান করছে, আবার কেউবা সরকারি বিশেষ সাহায্যে কোনো রকমে টিকে আছে। কিন্তু কেন এই ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হলো? শুরুতে ব্যাংক ছিল একটি সহজ ও সরল আমানত ও লেনদেনের জায়গা।

মানুষ বিশ্বাস করে তাদের টাকা ব্যাংকে রাখত, আর ব্যাংক সেই টাকা উদ্যোক্তাদের ঋণ দিয়ে অর্থনীতির চাকা ঘোরাত। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে এই সাধারণ চিত্রটি বদলে গেল। ব্যাংক কেবল আর্থিক মধ্যস্থতাকারি থাকল না; এটি বিশাল এক লাভের সাম্রাজ্যে পরিণত হলো, যার পেছনে তাড়া করে চলেছে লাগাতার মুনাফা অর্জনের এক তীব্র প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতায় যুক্ত হতে থাকল নানা কৌশল।

ব্যাংক নিজেই অর্থ তৈরির (Money Generation) কৌশল ব্যবহার করল এবং সৃষ্টি হলো অর্থনৈতিক বুদ্বুদের (Economic Bubble)। একই সম্পদ কয়েক হাত ঘুরে একটি বুদ্বুদকে আরও অনেক বুদ্বুদে পরিণত করল। নানা কারসাজিতে শেয়ারের দাম ঝড়ের বেগে বাড়তে শুরু করল। শুধু একটি কাগজ বিক্রি করে একদিনেই কেউ কেউ মিলিয়নার হয়ে গেল। কিন্তু বুদ্বুদ তো বুদ্বুদই, একসময় তা ফাটবেই।

যখন তা ফাটল, তখন নিঃস্ব হয়ে পথে বসল লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষ। দেশের অর্থনীতি ধসে পড়ল এবং কোটি কোটি মানুষ চরম দুর্দশার মধ্যে ডুবে গেল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যারা তাদের টাকা হারাল, সেই টাকা আসলে গেল কোথায়? সেগুলো কি হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে? না, সে সমস্ত টাকা আসলে চলে গেছে বড় বড় আর্থিক মাফিয়া এবং তাদের সাঙ্গপাঙ্গদের পকেটে।

সাধারণ মানুষ যখন সর্বস্বান্ত, ব্যাংক যখন দেউলিয়া, তখন ফুলে-ফেঁপে এক বিশাল অর্থের গম্বুজে পরিণত হয়েছে সেই কৌশলী দুর্বৃত্তরা। তবে আবারও প্রশ্ন জাগে, দুর্বৃত্তরা কি জন্মগতভাবেই প্রতারক? না, তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সুযোগের পরিস্থিতিতে সৃষ্টি হওয়া মানুষ। সুযোগ মানুষকে বিপথে নিয়ে যায়, আবার যেখানে সুযোগ থাকে না, সেখানে মানুষ নিয়ম মেনে চলার মাঝেই সুখী থাকে।

ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে মূলত দুটি ধারায় ভাগ করা যায়, প্রচলিত বা কনভেনশনাল (সুদভিত্তিক) ব্যাংকিং এবং সুদমুক্ত বা ইসলামিক (শরীয়াহভিত্তিক) ব্যাংকিং। কাগজে-কলমে এই দুই ব্যবস্থার দর্শন সম্পূর্ণ আলাদা। কনভেনশনাল ব্যাংকিং এর মূল ভিত্তি হলো ‘সুদ’। ব্যাংক নির্দিষ্ট হারে আমানতকারীদের সুদ দেয় এবং তার চেয়ে বেশি সুদে গ্রহীতাদের ঋণ দেয়।

সমস্ত আর্থিক ঝুঁকি কেবল ঋণগ্রহীতার ওপর বর্তায়। ব্যবসা লাভ করুক বা লোকসান হোক, ব্যাংক তার পূর্বনির্ধারিত সুদ আদায়ে অনড় থাকে। এটি অর্থ দিয়ে অর্থ উৎপাদনের একটি চক্র, যা অনেক সময় বাস্তব অর্থনীতির সাথে মিল থাকে না এবং ধনীকে আরও ধনী করার সুযোগ তৈরি করে। অন্যদিকে ইসলামিক ব্যাংকিং এর মূল ভিত্তি হলো ‘লাভ-ক্ষতির অংশীদারিত্ব’ এবং বাস্তব সম্পদভিত্তিক লেনদেন।

ব্যাংক ও আমানতকারী বা উদ্যোক্তার মধ্যে লাভ বা ক্ষতি উভয়ের ভাগাভাগি হওয়ার কথা। টাকা সরাসরি না দিয়ে পণ্য বা সম্পদ ক্রয়ের মাধ্যমে অর্থায়ন করা হয়। এর তাত্ত্বিক সৌন্দর্য অতুলনীয় হলেও, বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে এটি কনভেনশনাল ব্যাংকের চেয়ে আলাদা হয় কেবল একটি মৌলিক প্যারামিটারে, আর তা হলো ব্যাংক পরিচালনাকারীদের ব্যক্তিগত চারিত্রিক শক্তি, যা দিয়ে তাঁরা শরীয়ার নিয়মগুলোকে কঠোরভাবে রক্ষা করবেন।

রাষ্ট্রের বা জনগণের স্বার্থ রক্ষায় কনভেনশনাল কিংবা ইসলামিক, যেকোনো ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সবার আগে প্রয়োজন সঠিক হিসাব ও স্বচ্ছতা। বিশেষ করে সুদমুক্ত ব্যাংকিংয়ে ‘লাভ-ক্ষতির অংশীদারিত্ব’ নিশ্চিত করার জন্য ব্যবসার প্রকৃত লাভ বা লোকসান সকলেরই জানা আবশ্যক। কিন্তু বাস্তবে উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ীরা প্রায়শই ট্যাক্স ফাঁকি দিতে বা ব্যাংকের নিয়ম মানাতে ভুয়া ভাউচার, কৃত্রিম খরচ এবং কাল্পনিক হিসাব তৈরির অভিযোগ পাওয়া যায়।

ব্যাংকগুলো হিসাব যাচাইয়ের জন্য চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফার্ম বা অডিট টিম নিয়োগ করলেও অনেক ক্ষেত্রে সেই অডিট কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা রয়েছে। উদ্যোক্তা অসৎ হলে সহজেই ভুয়া পেপার দিয়ে অডিট পাশ করিয়ে নিতে পারেন। ইসলামিক ব্যাংকেও যেখানে সরাসরি পণ্য কিনে দেওয়ার কথা, সেখানে যদি ফাইলের পাতায় পণ্যের নাম লিখে সরাসরি নগদ টাকা ছাড় করা হয়, তবে সুদমুক্ত ব্যাংকিংয়ের মূল আত্মাও হারিয়ে যায়।

তবে ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে ভয়ংকর রূপটি দেখা যায় তখন, যখন অনিয়মের সাথে ব্যাংক ও গ্রাহকের পাশাপাশি খোদ ব্যাংকের নীতিনির্ধারকরা জড়িয়ে পড়েন। করপোরেট ভাষায় একে বলা হয় ‘কলিউশন’ বা অভ্যন্তরীণ আঁতাত। ব্যাংকের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ব্যক্তিগত লাভের জন্য বা ঘুষের বিনিময়ে যখন কাল্পনিক ব্যবসার বিপরীতে শত শত কোটি টাকা ছাড় করেন, তখন ব্যাংকের সমস্ত নিয়মনীতি মাকড়সার জালের মতো ছিঁড়ে যায়।

এই আঁতাতকে ধামাচাপা দিতে অভ্যন্তরীণ অডিট টিম এবং পরবর্তীতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শকরাও যখন সুবিধা নিয়ে চোখ বন্ধ করে রাখেন, তখন জন্ম নেয় ‘সিস্টেমিক করাপশন’ বা প্রাতিষ্ঠানিক পচন। বাইরে থেকে সফল মনে হলেও ভেতর থেকে ব্যাংকটি পুরোপুরি ফাঁপা হয়ে যায়। তাহলে উত্তরণের পথ কি সত্যিই নেই? অবশ্যই আছে; এখানে রাষ্ট্রের ভূমিকা মূল, কিন্তু রাষ্ট্রকে তার সেই ভূমিকা পালনে বাধ্য করার জন্য জনগণের ভূমিকা আরও বেশি।

দেশ হলো জনগণের সম্পদ, ব্যাংক হলো জনগণের প্রতিষ্ঠান। তাই জনগণকে সচেতন হয়ে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যাংককে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বাধ্য করতে হবে। রাষ্ট্রকেও তার অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে সাজাতে হবে যুগোপযোগী প্রয়োজনের তাদিগ থেকে। এই ক্ষেত্রে দুটি ভিন্ন মুদ্রার প্রচলন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। হায়ার কারেন্সি (সম্পূর্ণ ডিজিটাল মানি) যা দিয়ে সমস্ত বড় ধরনের লেনদেনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

এর ফলে কোন ব্যাংক থেকে কার অ্যাকাউন্টে টাকা গেল বা যাচ্ছে, তার নিখুঁত ও স্পষ্ট ডিজিটাল ট্রেইল বা রেকর্ড কেন্দ্রীয়ভাবে থেকে যাবে। এবং লেনদেনের সেইসব হিসাব লাইভে অনলাইনে জনগণের কাছেও স্পষ্ট রাখার ব্যবস্থা প্রয়োজন হবে। আর থাকবে লোয়ার কারেন্সি (ধাতব মুদ্রা) যা শুধু দৈনন্দিন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র লেনদেনে ব্যবহারযোগ্য হবে।

এই ব্যবস্থা চালু হলে অসৎ কর্মকর্তা, অসাধু অডিটর কিংবা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দুর্নীতিবাজ পরিদর্শকরা যারা ব্যক্তিগত অবৈধ সুযোগের আশায় ব্যাংক পরিচালনার প্রতিষ্ঠিত প্রথা ভেঙে ব্যাংকগুলোকে দেউলিয়া করে দেন, তারা আর সেই অবৈধ অর্থ গ্রহণ, জমা রাখা বা খরচ করার সুযোগ পাবেন না। অবৈধ লেনদেনের পথ বন্ধ হয়ে গেলে তারা বাধ্য হয়েই সততার সাথে দায়িত্ব পালন করবেন।

কিন্তু এই ব্যবস্থা কেবল ব্যাংককেই দুর্নীতিমুক্ত করবে এমন নয়, বরং প্রতি বছর কাগজের টাকা ছাপানোর বিস্তর খরচ থেকেও রাষ্ট্র মুক্তি পাবে। ডিজিটাল হায়ার কারেন্সি ব্যবহারের ফলে অর্থনৈতিক লেনদেন হবে সহজ ও স্বচ্ছ। এর জাদুকরী প্রভাবে দেশের অভ্যন্তরে প্রায় সব ধরনের অপরাধ থেমে যেতে বাধ্য হবে; কারণ, প্রায় প্রতিটি অপরাধের পেছনেই কালো টাকার লেনদেন থাকে।

সেই অবৈধ অর্থের চলাচলের পথ যখন বন্ধ হয়ে যাবে, তখন বড় বড় অপরাধগুলোও আপনাআপনি বিলীন হয়ে যাবে। প্রিয় পাঠক, দেশ যেহেতু আপনার, অর্থ যেহেতু আপনার তাই দেশের অর্থ ব্যবস্থা রক্ষার দায়িত্বও আপনার। এগিয়ে আসুন বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য আর প্রতিক্রিয়া লিখুন, মতামত দিন।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

মূল্যস্ফীতি কমার কথা বলা হলেও বাজারে স্বস্তি নেই, দিশেহারা স্বল্প আয়ের মানুষ

ডিজিটাল অর্থব্যবস্থা: ব্যাংকিং খাতের দুর্নীতির বিরুদ্ধে নতুন পদক্ষেপ

Update Time : 09:22:59 pm, Saturday, 15 August 2026

আধুনিক সভ্যতার অর্থনৈতিক ফুসফুস হলো ব্যাংক। সাধারণ মানুষের জমানো সঞ্চয়কে সচল রাখা, ব্যবসার প্রসার ঘটানো এবং রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখতে ব্যাংকিং খাতের কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর এই কর্পোরেট যুগে দাঁড়িয়ে ব্যাংকগুলোর দিকে তাকালে এক গভীর অস্বস্তি কাজ করে।

যে প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ ছিল আমানতকারীর কষ্টার্জিত অর্থের সুরক্ষা দেওয়া, তারাই আজ চরম আস্থার সংকটে ভুগছে। কোনো কোনো ব্যাংক আজ দেউলিয়া হয়েছে, কেউ গ্রাহকের অর্থ ফেরত দিতে বহু ধাপে কিস্তি প্ল্যান করছে, আবার কেউবা সরকারি বিশেষ সাহায্যে কোনো রকমে টিকে আছে। কিন্তু কেন এই ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হলো? শুরুতে ব্যাংক ছিল একটি সহজ ও সরল আমানত ও লেনদেনের জায়গা।

মানুষ বিশ্বাস করে তাদের টাকা ব্যাংকে রাখত, আর ব্যাংক সেই টাকা উদ্যোক্তাদের ঋণ দিয়ে অর্থনীতির চাকা ঘোরাত। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে এই সাধারণ চিত্রটি বদলে গেল। ব্যাংক কেবল আর্থিক মধ্যস্থতাকারি থাকল না; এটি বিশাল এক লাভের সাম্রাজ্যে পরিণত হলো, যার পেছনে তাড়া করে চলেছে লাগাতার মুনাফা অর্জনের এক তীব্র প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতায় যুক্ত হতে থাকল নানা কৌশল।

ব্যাংক নিজেই অর্থ তৈরির (Money Generation) কৌশল ব্যবহার করল এবং সৃষ্টি হলো অর্থনৈতিক বুদ্বুদের (Economic Bubble)। একই সম্পদ কয়েক হাত ঘুরে একটি বুদ্বুদকে আরও অনেক বুদ্বুদে পরিণত করল। নানা কারসাজিতে শেয়ারের দাম ঝড়ের বেগে বাড়তে শুরু করল। শুধু একটি কাগজ বিক্রি করে একদিনেই কেউ কেউ মিলিয়নার হয়ে গেল। কিন্তু বুদ্বুদ তো বুদ্বুদই, একসময় তা ফাটবেই।

যখন তা ফাটল, তখন নিঃস্ব হয়ে পথে বসল লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষ। দেশের অর্থনীতি ধসে পড়ল এবং কোটি কোটি মানুষ চরম দুর্দশার মধ্যে ডুবে গেল। কিন্তু প্রশ্ন হলো, যারা তাদের টাকা হারাল, সেই টাকা আসলে গেল কোথায়? সেগুলো কি হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে? না, সে সমস্ত টাকা আসলে চলে গেছে বড় বড় আর্থিক মাফিয়া এবং তাদের সাঙ্গপাঙ্গদের পকেটে।

সাধারণ মানুষ যখন সর্বস্বান্ত, ব্যাংক যখন দেউলিয়া, তখন ফুলে-ফেঁপে এক বিশাল অর্থের গম্বুজে পরিণত হয়েছে সেই কৌশলী দুর্বৃত্তরা। তবে আবারও প্রশ্ন জাগে, দুর্বৃত্তরা কি জন্মগতভাবেই প্রতারক? না, তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সুযোগের পরিস্থিতিতে সৃষ্টি হওয়া মানুষ। সুযোগ মানুষকে বিপথে নিয়ে যায়, আবার যেখানে সুযোগ থাকে না, সেখানে মানুষ নিয়ম মেনে চলার মাঝেই সুখী থাকে।

ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে মূলত দুটি ধারায় ভাগ করা যায়, প্রচলিত বা কনভেনশনাল (সুদভিত্তিক) ব্যাংকিং এবং সুদমুক্ত বা ইসলামিক (শরীয়াহভিত্তিক) ব্যাংকিং। কাগজে-কলমে এই দুই ব্যবস্থার দর্শন সম্পূর্ণ আলাদা। কনভেনশনাল ব্যাংকিং এর মূল ভিত্তি হলো ‘সুদ’। ব্যাংক নির্দিষ্ট হারে আমানতকারীদের সুদ দেয় এবং তার চেয়ে বেশি সুদে গ্রহীতাদের ঋণ দেয়।

সমস্ত আর্থিক ঝুঁকি কেবল ঋণগ্রহীতার ওপর বর্তায়। ব্যবসা লাভ করুক বা লোকসান হোক, ব্যাংক তার পূর্বনির্ধারিত সুদ আদায়ে অনড় থাকে। এটি অর্থ দিয়ে অর্থ উৎপাদনের একটি চক্র, যা অনেক সময় বাস্তব অর্থনীতির সাথে মিল থাকে না এবং ধনীকে আরও ধনী করার সুযোগ তৈরি করে। অন্যদিকে ইসলামিক ব্যাংকিং এর মূল ভিত্তি হলো ‘লাভ-ক্ষতির অংশীদারিত্ব’ এবং বাস্তব সম্পদভিত্তিক লেনদেন।

ব্যাংক ও আমানতকারী বা উদ্যোক্তার মধ্যে লাভ বা ক্ষতি উভয়ের ভাগাভাগি হওয়ার কথা। টাকা সরাসরি না দিয়ে পণ্য বা সম্পদ ক্রয়ের মাধ্যমে অর্থায়ন করা হয়। এর তাত্ত্বিক সৌন্দর্য অতুলনীয় হলেও, বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে এটি কনভেনশনাল ব্যাংকের চেয়ে আলাদা হয় কেবল একটি মৌলিক প্যারামিটারে, আর তা হলো ব্যাংক পরিচালনাকারীদের ব্যক্তিগত চারিত্রিক শক্তি, যা দিয়ে তাঁরা শরীয়ার নিয়মগুলোকে কঠোরভাবে রক্ষা করবেন।

রাষ্ট্রের বা জনগণের স্বার্থ রক্ষায় কনভেনশনাল কিংবা ইসলামিক, যেকোনো ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সবার আগে প্রয়োজন সঠিক হিসাব ও স্বচ্ছতা। বিশেষ করে সুদমুক্ত ব্যাংকিংয়ে ‘লাভ-ক্ষতির অংশীদারিত্ব’ নিশ্চিত করার জন্য ব্যবসার প্রকৃত লাভ বা লোকসান সকলেরই জানা আবশ্যক। কিন্তু বাস্তবে উদ্যোক্তা বা ব্যবসায়ীরা প্রায়শই ট্যাক্স ফাঁকি দিতে বা ব্যাংকের নিয়ম মানাতে ভুয়া ভাউচার, কৃত্রিম খরচ এবং কাল্পনিক হিসাব তৈরির অভিযোগ পাওয়া যায়।

ব্যাংকগুলো হিসাব যাচাইয়ের জন্য চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফার্ম বা অডিট টিম নিয়োগ করলেও অনেক ক্ষেত্রে সেই অডিট কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা রয়েছে। উদ্যোক্তা অসৎ হলে সহজেই ভুয়া পেপার দিয়ে অডিট পাশ করিয়ে নিতে পারেন। ইসলামিক ব্যাংকেও যেখানে সরাসরি পণ্য কিনে দেওয়ার কথা, সেখানে যদি ফাইলের পাতায় পণ্যের নাম লিখে সরাসরি নগদ টাকা ছাড় করা হয়, তবে সুদমুক্ত ব্যাংকিংয়ের মূল আত্মাও হারিয়ে যায়।

তবে ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে ভয়ংকর রূপটি দেখা যায় তখন, যখন অনিয়মের সাথে ব্যাংক ও গ্রাহকের পাশাপাশি খোদ ব্যাংকের নীতিনির্ধারকরা জড়িয়ে পড়েন। করপোরেট ভাষায় একে বলা হয় ‘কলিউশন’ বা অভ্যন্তরীণ আঁতাত। ব্যাংকের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ব্যক্তিগত লাভের জন্য বা ঘুষের বিনিময়ে যখন কাল্পনিক ব্যবসার বিপরীতে শত শত কোটি টাকা ছাড় করেন, তখন ব্যাংকের সমস্ত নিয়মনীতি মাকড়সার জালের মতো ছিঁড়ে যায়।

এই আঁতাতকে ধামাচাপা দিতে অভ্যন্তরীণ অডিট টিম এবং পরবর্তীতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শকরাও যখন সুবিধা নিয়ে চোখ বন্ধ করে রাখেন, তখন জন্ম নেয় ‘সিস্টেমিক করাপশন’ বা প্রাতিষ্ঠানিক পচন। বাইরে থেকে সফল মনে হলেও ভেতর থেকে ব্যাংকটি পুরোপুরি ফাঁপা হয়ে যায়। তাহলে উত্তরণের পথ কি সত্যিই নেই? অবশ্যই আছে; এখানে রাষ্ট্রের ভূমিকা মূল, কিন্তু রাষ্ট্রকে তার সেই ভূমিকা পালনে বাধ্য করার জন্য জনগণের ভূমিকা আরও বেশি।

দেশ হলো জনগণের সম্পদ, ব্যাংক হলো জনগণের প্রতিষ্ঠান। তাই জনগণকে সচেতন হয়ে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যাংককে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বাধ্য করতে হবে। রাষ্ট্রকেও তার অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে সাজাতে হবে যুগোপযোগী প্রয়োজনের তাদিগ থেকে। এই ক্ষেত্রে দুটি ভিন্ন মুদ্রার প্রচলন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। হায়ার কারেন্সি (সম্পূর্ণ ডিজিটাল মানি) যা দিয়ে সমস্ত বড় ধরনের লেনদেনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

এর ফলে কোন ব্যাংক থেকে কার অ্যাকাউন্টে টাকা গেল বা যাচ্ছে, তার নিখুঁত ও স্পষ্ট ডিজিটাল ট্রেইল বা রেকর্ড কেন্দ্রীয়ভাবে থেকে যাবে। এবং লেনদেনের সেইসব হিসাব লাইভে অনলাইনে জনগণের কাছেও স্পষ্ট রাখার ব্যবস্থা প্রয়োজন হবে। আর থাকবে লোয়ার কারেন্সি (ধাতব মুদ্রা) যা শুধু দৈনন্দিন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র লেনদেনে ব্যবহারযোগ্য হবে।

এই ব্যবস্থা চালু হলে অসৎ কর্মকর্তা, অসাধু অডিটর কিংবা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দুর্নীতিবাজ পরিদর্শকরা যারা ব্যক্তিগত অবৈধ সুযোগের আশায় ব্যাংক পরিচালনার প্রতিষ্ঠিত প্রথা ভেঙে ব্যাংকগুলোকে দেউলিয়া করে দেন, তারা আর সেই অবৈধ অর্থ গ্রহণ, জমা রাখা বা খরচ করার সুযোগ পাবেন না। অবৈধ লেনদেনের পথ বন্ধ হয়ে গেলে তারা বাধ্য হয়েই সততার সাথে দায়িত্ব পালন করবেন।

কিন্তু এই ব্যবস্থা কেবল ব্যাংককেই দুর্নীতিমুক্ত করবে এমন নয়, বরং প্রতি বছর কাগজের টাকা ছাপানোর বিস্তর খরচ থেকেও রাষ্ট্র মুক্তি পাবে। ডিজিটাল হায়ার কারেন্সি ব্যবহারের ফলে অর্থনৈতিক লেনদেন হবে সহজ ও স্বচ্ছ। এর জাদুকরী প্রভাবে দেশের অভ্যন্তরে প্রায় সব ধরনের অপরাধ থেমে যেতে বাধ্য হবে; কারণ, প্রায় প্রতিটি অপরাধের পেছনেই কালো টাকার লেনদেন থাকে।

সেই অবৈধ অর্থের চলাচলের পথ যখন বন্ধ হয়ে যাবে, তখন বড় বড় অপরাধগুলোও আপনাআপনি বিলীন হয়ে যাবে। প্রিয় পাঠক, দেশ যেহেতু আপনার, অর্থ যেহেতু আপনার তাই দেশের অর্থ ব্যবস্থা রক্ষার দায়িত্বও আপনার। এগিয়ে আসুন বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য আর প্রতিক্রিয়া লিখুন, মতামত দিন।