সিলেটের আধ্যাত্মিক সাধক হজরত শাহ পরাণ (রহ.)-এর মাজারে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজারো মানুষ আসেন। কেউ মানত করেন, কেউ দান করেন, আবার কেউ নজরানা দেন। বিশেষ দিনগুলোতে মাজারের দানবাক্স ও অন্যান্য উৎসে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা হয়।
মানুষের বিশ্বাস, এই অর্থ ব্যয় হবে মাজার, মসজিদ, মাদ্রাসা ও ধর্মীয় জনকল্যাণমূলক কাজে। কিন্তু সেই দানের অর্থের ব্যবস্থাপনা নিয়েই উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। অভিযোগ, মাজারের দান ও সম্পদ ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী খাদেম সিন্ডিকেট। দীর্ঘদিন ধরে একই বলয়ের হাতে রয়েছে মাজারের নিয়ন্ত্রণ। অভিযোগকারীদের দাবি, এই বলয়ের ২৯ সদস্যের অনেকেই একসময় ছিলেন আর্থিকভাবে অসচ্ছল।
অথচ মাজারের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার পর তাদের কারো কারো নামে গড়ে উঠেছে বিপুল সম্পদ। দেশে-বিদেশে বাড়ি, জমি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, দোকান ও ফ্ল্যাটের মালিক হয়েছেন তারা। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন মোতাওয়াল্লি মামুনুর রশিদ। স্থানীয়দের দাবি, তাকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে পরিবার ও স্বজননির্ভর এই বলয়। মাজারের অর্থ ও ব্যবস্থাপনার ওপর দীর্ঘদিনের নিয়ন্ত্রণকে তারা এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছেন যে, ওয়াকফ প্রশাসনের নির্দেশনাও কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।
আর এ কারণেই স্থানীয়দের প্রশ্ন, মাজার কি ওয়াকফ প্রতিষ্ঠানের নিয়মে চলছে, নাকি একটি পরিবারের নিয়ন্ত্রণে? স্থানীয় অভিযোগ ও সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মাজারকেন্দ্রিক এই বলয়ের অন্যতম সদস্য মামুনুর রশিদ, তার ভাই আমিনুর রশিদ, ভাইপো ও সাবেক কমিশনার কামাল আহমদ, চাচাতো ভাই আজিজুর রহমান কুনু এবং ভাতিজা ফিরোজ মিয়া।
এ ছাড়া ছাদিকুর রহমান, কবির আহমদ, ফরিদ গাজী, ফজলুর রহমান, আবদুল আহাদ, আবদুল আজিজ, আবদুল ওয়াহিদ তৌহিদ, হাফিজ আবদুর নুর, হাফেজ আবদুল হান্নান, ময়না মিয়া, জাবেদ, কবির, আমাল মিয়া, আজাদুর রহমান রাজা, শাহজাহান আহমদ শাজা, ফারুক মিয়া, অরিদ মিয়া, জামাল আহমদ, রঞ্জু মিয়া, সাদিকুর রহমান ও কাবুল আহমদের নামও অভিযোগে এসেছে। তাদের একাধিকবার ফোন দিয়েও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মোতাওয়াল্লি মামুনুর রশিদের ফোন নম্বরটিও বন্ধ রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, আত্মীয়তা ও ঘনিষ্ঠতার সূত্রে এই বলয় মাজারের বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করে আসছে। দান সংগ্রহ, ব্যবস্থাপনা, জমি, দোকানপাট এবং বিভিন্ন আয়-উৎসে তাদের প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ। মাজারের বর্তমান নিয়ন্ত্রণ কীভাবে একটি বলয়ের হাতে গেল, তার ইতিহাস ঘাঁটলেও উঠে আসে নানা প্রশ্ন।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য ও বিভিন্ন নথির বরাতে জানা যায়, একাত্তরের আগে মাজারের মোতাওয়াল্লি ছিলেন তারা মিয়া। মুক্তিযুদ্ধের সময় তার ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয় এবং স্বাধীনতার পর তিনি কারাভোগ করেন বলে অভিযোগকারীরা জানান। এরপর এলাকাবাসীর সমর্থনে কুটি মিয়াকে মাজার পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। সে সময় মসজিদের মুয়াজ্জিন হারুনুর রশিদের ছেলে মামুনুর রশিদকে সহযোগী মোতাওয়াল্লি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
অভিযোগকারীদের দাবি, ১৯৭৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর কৌশলে মামুনুর রশিদ মাজারের প্রধান খাদেম ও মোতাওয়াল্লির নিয়ন্ত্রণ নেন। এরপর থেকেই তার দীর্ঘ নিয়ন্ত্রণ শুরু। মাজার এলাকার বাসিন্দা বদরুল আলমসহ বেশ কয়েকজন রূপালী বাংলাদেশকে জানান, সংশ্লিষ্ট পরিবারের সদস্যদের অনেকের আর্থিক অবস্থা একসময় ছিল খুবই সাধারণ। অথচ বর্তমানে তাদের কারো কারো রয়েছে বিপুল সম্পদ।
মাজারের অর্থ ও প্রভাব কাজে লাগিয়ে এই বলয়ের সদস্যরা বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। তাদের মধ্যে মামুনুর রশিদের সম্পদ নিয়েই সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে। খাদিমপাড়া এলাকায় তার উচ্চমূল্যের সম্পত্তি রয়েছে। নোয়াগাঁও এলাকায় রয়েছে শত শত একর জমি। মৌলভীবাজারে দুটি ক্লিনিক, সিলেট শহরে একটি ক্লিনিক, নগরীর বিভিন্ন শপিং মলে দোকান, শাহজালাল উপশহরে বাড়ি এবং রাজধানীর উত্তরায় ফ্ল্যাট ছাড়াও নামে-বেনামে দেশে-বিদেশে রয়েছে বিপুল বিত্তভৈবব।
যুক্তরাজ্যের ওল্ডটাউন এলাকায়ও তার বাড়ি থাকার দাবি করা হয়েছে। অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, শেয়ারবাজার ও বিভিন্ন ব্যাংকে তার বিপুল অর্থ রয়েছে। মাজার ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের প্রতিবাদকারী বদরুল আলম বলেন, প্রায় ৫০ বছর ধরে এই চক্র মাজারের দানের অর্থ লুটেপুটে খাচ্ছে। প্রতি বছর ২০ কোটিরও অধিক টাকা আয় হয় শুধু মাজার থেকেই। মাজার এলাকায় দুটি ডেগ ও ছয়টি দানবাক্স রয়েছে।
দানের টাকা ওয়াকফ প্রশাসনের অসাধু কর্মচারীদের সহযোগিতায় খাদেম সিন্ডিকেট হাতিয়ে নিচ্ছে। সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে ওয়াকফ প্রশাসনের তদন্ত নিয়ে। অভিযোগকারীদের দাবি, মাজারের নজরানার অর্থ আত্মসাৎ, অনিয়ম ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওয়াকফ প্রশাসন বিভিন্ন সময়ে একাধিক তদন্ত করেছে। তাদের ভাষ্য, ১১টি তদন্ত প্রতিবেদনেও মাজারের ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুতর অনিয়মের কথা উঠে এসেছে।
বর্তমান কমিটিকে অবৈধ বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। একটি কমিটি অবৈধ ঘোষণার পরও কীভাবে বছরের পর বছর কার্যক্রম পরিচালনা করে? ওয়াকফ প্রশাসনের নির্দেশ বাস্তবায়নে বাধা কোথায়? কারা সেই নির্দেশ কার্যকর হতে দিচ্ছে না? আর এত তদন্তের পরও কেন একই ব্যক্তিরা মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার নিয়ন্ত্রণে থাকছেন? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পাচ্ছেন না এলাকাবাসী।
এসব বিষয়ে ওয়াকফ প্রশাসক (সচিব) সাফিজ উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে একাধিকবার চেষ্টা করেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগকারীদের দাবি, ওয়াকফ প্রশাসন একাধিকবার মাজার ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিলেও বাস্তবে তা কার্যকর হয়নি। মামলার পর মামলা করে বিষয়টি বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে আদালত ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া চলার মধ্যেই একই বলয় মাজারের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
মাজারের অনিয়মের পাশাপাশি ওয়াকফ প্রশাসনের কতিপয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, সিলেটের ওয়াকফ কার্যালয়ের কিছু কর্মকর্তা মাজার নিয়ন্ত্রণকারী বলয়ের কাছ থেকে নিয়মিত আর্থিক সুবিধা নেন। এ কারণেই অভিযোগ ও তদন্তের পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। তাদের অভিযোগ, প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা মাজারের আয় যথাযথ হিসাবে না দেখিয়ে আত্মসাৎ করছেন মামুনুর রশিদ ও তার সিন্ডিকেটের সদস্যরা।
তাদের সঙ্গে যোগসাজশ রয়েছে ওয়াকফ প্রশাসনের দুই কর্মচারীর। তারা হলেন, বাংলাদেশ ওয়াকফ প্রশাসনের সহকারী প্রোগ্রামার মো. শাহ আলম ও শাখা কেরানি জসিম উদ্দিন। মাজারের মোতাওয়াল্লি মামুনুর রশিদের সঙ্গে তাদের গোপন আঁতাত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তারা মাসোয়ারার বিনিময়ে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র এমনকি গুরুত্বপূর্ণ নথি গোপন করেন।
অবশ্য এসব অভিযোগ তারা দুজনই প্রত্যাখ্যান করেছেন। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, মোতাওয়াল্লি অপসারণ এবং অবৈধ কমিটির বিরুদ্ধে তিনি একটি রিট করেছেন। আদালতে বিষয়টি বিচারাধীন থাকলে এর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি আদালতের মাধ্যমেই হবে। মাজারে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ দান করেন। শুক্রবার, ওরস, শবে বরাত, শবে কদরসহ বিশেষ দিনগুলোতে বাড়ে দানের পরিমাণ। দেশ-বিদেশ থেকে আসে অনুদান।
রয়েছে দানবাক্স। মানতের অর্থ ও সামগ্রীও আসে। মাজারের বিভিন্ন স্থাপনা ও দোকান থেকেও আয় হওয়ার কথা। কিন্তু মূল প্রশ্ন হচ্ছে, মোট আয় কত? দানবাক্স থেকে বছরে কত টাকা পাওয়া যায়? কে সেই টাকা গণনা করেন? গণনার সময় ভিডিও ধারণ করা হয় কি না? কত টাকা ব্যাংকে জমা হয়? ব্যাংক হিসাবের সঙ্গে দানবাক্সের হিসাব মেলে কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর মিলছে না সংশ্লিষ্ট কারও কাছ থেকেই।
মাজারের ভক্তদের একটি বড় অংশের প্রশ্ন, একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অধিকার কীভাবে একটি পরিবার বা গোষ্ঠীর হাতে দীর্ঘদিন আটকে থাকতে পারে? বিশ্লেষকেরা বলছেন, মাজারের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ সত্য কি না, তা প্রমাণের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সম্পদের উৎস অনুসন্ধান। মামুনুর রশিদ ও অভিযোগে নাম আসা অন্যদের ক্ষেত্রে পাঁচটি বিষয় পাশাপাশি পরীক্ষা করা যেতে পারে।
প্রথমত, মাজারের দায়িত্ব নেওয়ার আগের সম্পদ কত ছিল; দ্বিতীয়ত, পরবর্তী সময়ে তাদের নামে কী পরিমাণ জমি ও স্থাবর সম্পদ হয়েছে; তৃতীয়ত, এসব সম্পদের ক্রয়মূল্য ও অর্থের উৎস কী; চতুর্থত, মাজারের তহবিল থেকে তাদের বা তাদের প্রতিষ্ঠানের কাছে কোনো অর্থ গেছে কি না; পঞ্চমত, মাজারের অর্থ ও ব্যক্তিগত সম্পদের মধ্যে কোনো আর্থিক যোগসূত্র আছে কি না, এই পাঁচ প্রশ্নের উত্তর পেলেই অভিযোগের বড় অংশ পরিষ্কার হয়ে যাবে।
এ বিষয়ে দুদকের আশুদৃষ্টি কামনা করছেন তারা। তাদের মতে, মাজারের অর্থ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা থাকলে অভিযোগকারীদের এত বছর ধরে একই প্রশ্ন করতে হতো না। দানবাক্স খোলার সময় নিরপেক্ষ প্রতিনিধি থাকবেন। টাকা গণনার ভিডিও থাকবে। গণনার পর নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাবে টাকা জমা হবে। মাসিক আয়-ব্যয়ের হিসাব তৈরি হবে। প্রতি বছর স্বাধীন অডিট হবে।
সেই অডিটের সারসংক্ষেপ প্রকাশ হবে। এতে কারও আপত্তি থাকার কথা নয়, বরং স্বচ্ছতা মাজারের মর্যাদাই বাড়াবে। এসব বিষয়ে সিলেটের জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল মামুন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘আমরা শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারের দানবাক্স নিয়ন্ত্রণে নিয়েছি। বাণিজ্যমন্ত্রী মহোদয়ের নির্দেশে শনিবার (আজ) আবার দানবাক্স খুলে টাকা গণনা করা হবে।
তবে শাহ পরান (রহ.) মাজারের দানবাক্সের বিষয়ে এখনো কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, যেহেতু ওয়াকফ প্রশাসনের একটি কমিটি আছে ওই মাজারে, তারা তা তদারক করছে। পরবর্তীতে সরকার কোনো উদ্যোগ নিলে আমরা নির্দেশনা অনুযায়ী পদক্ষেপ নেব।
















