স্বপ্নের কোনো নির্দিষ্ট ব্যাকরণ থাকে না, থাকে না কোনো উচ্চবিত্ত সীমানা। দারিদ্র্যের ধূসর ক্যানভাসেও কখনো কখনো ফুটে ওঠে জয়ের রাজকীয় রক্তকমল। এক মেঠো পথ ধরে যে তিন চাকার রিকশাটি প্রাত্যহিক দিনবদলের গল্প আঁকে, সেই রিকশার পেডেলে জমা ঘামেই বীজ রোপণ হয়েছিল এক মহামেধার।
বাবার কপালে ভাঁজ পড়া ক্লান্তির রেখাকে জয় করে ছেলে নাজমুল হাসান আজ ছুঁতে চলেছেন সুদূর স্ক্যান্ডিনেভিয়ার বরফশীতল সুইডেনের আকাশ। বাবা আয়নাল হকের উপার্জনের একমাত্র সম্বল তিন চাকার রিকশা। সেই কাক ডাকা ভোরে রিকশা নিয়ে বেরিয়ে যান শহরে। রিকশার পেডেল ঘোরানোর ক্লান্তি, মাথার ঘাম পায়ে ফেলা কষ্ট-কোনো কিছুই তাকে দমাতে পারেনি। রিকশা চালকের অদম্য ইচ্ছা ছিল, “তার ছেলেকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলবে, সমাজে আর দশজন প্রতিষ্ঠিত মানুষের কাঁতারে যে দাঁড়াতে পারে।
” পিতার ইচ্ছার প্রতিফলনে ছেলে নাজমুলের শিক্ষা জীবনে মেধার প্রদীপে ছায়া ফেলতে পারেনি। মেধা আর অদম্য অধ্যবসায়ের শক্তিতে তিনি জয় করেছেন, সুদূর স্ক্যান্ডিনেভিয়ার দেশ সুইডেনের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার যোগ্যতা। তবে উচ্চ স্বপ্নের সফলতা যখন তার দোরগোড়ায়, বাধা হয়ে দাড়ায় পিতার দারিদ্রতার আর্থিক অসচ্ছলতা।
কথা বলে, “যার কেউ নাই, তার সৃষ্টিকর্তা সহায় হন,” কথাটা সত্যতা প্রমাণে নাজমুলের জীবনে যখন আর্থিক অনটনের ছায়া এসে দাঁড়িয়েছিল, ঠিক তখনই অবিশ্বাস্যভাবে সেই স্বপ্নকে সত্যি করার কাণ্ডারী হয়ে পাশে দাঁড়ালেন স্বয়ং দেশনায়ক প্রধান মন্ত্রী তারেক রহমান। বগুড়ার শেরপুর উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত গ্রামের নাম খামারকান্দি।
আর সবুজে গাছ-পালায় ঘেরা এই গ্রামেরই হতদরিদ্র রিকশাচালক আয়নাল হকের ছোট ঘরটিতে জন্ম নেয় নাজমুল হাসান। তার আরেকটি ছোট ছেলে সন্তান আতিক হাসান রয়েছে। সেও শেরপুর সরকারি কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে অধ্যায়নরত। এদিকে বড় ছেলে নাজমুলের সাফল্যে হতদরিদ্র রিকশাচালকের ঘর-বাড়ীতে এখন শুধুই বিরাজ করছে ‘আনন্দের ফলগুধারা ও স্বপ্নজয়ের আকুলতা।
” পিতা আয়নাল হক তার দুই সন্তানকে শিক্ষিত করে গড়ে তোলার যে কঠিন লড়াই তিনি এতদিন চালিয়ে এসেছেন, নাজমুল হাসানের সাফল্য সেই ত্যাগেরই সবচেয়ে সুন্দর স্বীকৃতি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী নাজমুল অর্জন করেছেন সুইডেনের ইউনিভার্সিটি অব স্কোভদে-তে ‘মাস্টার্স ইন বায়োসায়েন্স’ পড়ার জন্য শতভাগ টিউশন ফি মওকুফের বিরল সুযোগ।
কিন্তু বিদেশে পড়ার আনন্দটুকুর পেছনেই লুকিয়ে ছিল এক গভীর দীর্ঘশ্বাস। বিশ্ববিদ্যালয়ের শতভাগ স্কলারশিপ মিললেও বিমানভাড়া, পরবাসের আবাসন আর প্রাথমিক জীবনযাপনের অংকটি ছিল এক রিকশাচালক বাবার সাধ্যের অনেক বাইরে। রঙিন স্বপ্নের ক্যানভাসে হঠাৎ করেই নেমে এসেছিল অনিশ্চয়তার ধূসর মেঘ। ঠিক সেই মুহূর্তে নাজমুলের এই অদম্য লড়াই আর মেধার জয়ের গল্প পৌঁছে যায় বিএনপি প্রধান ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দেশনায়ক তারেক রহমানের কাছে।
খবর শোনা মাত্রই মেধার মূল্যায়ন করতে তিনিও আর বিন্দুর মাত্র দেরি করেননি। ডেকে পাঠান ওই শিক্ষার্থী নাজমুল ও তার দরিদ্র বাবা রিকশাচালক আয়নাল হকে। প্রধানমন্ত্রীর ডাকে দ্রুত সাড়া দিয়ে বুধবার(১২ আগস্ট) বাংলাদেশ সচিবালয়ে উপস্থিত হয় পিতা-পুত্র। সেখানে এক আবেগঘন পরিবেশে নাজমুল হাসান ও তার বাবা সাক্ষাৎ করেন দলীয় প্রধান ও অভিভাবকের সঙ্গে।
প্রধানমন্ত্রী গভীর আন্তরিকতায় শোনেন, পিতা-পুত্রের ইচ্ছা ও স্বপ্নজয়ের লুকানো কাহিনী। একজন সাধারণ রিকশাচালকের সন্তানের কথাগুলো শুনেই, তাকে বুকে টেনে নেন অভিভাবকের মতো। সুইডেনে যাওয়ার বাকি খরচ বহনের জন্য নাজমুলের হাতে তুলে দেন প্রয়োজনীয় আর্থিক অনুদান। দেন সফল মানবসম্পদ হয়ে গড়ে ওঠার আশীর্বাদ, দেন আদর মাখা স্নেহময় নির্দেশনা।
প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ শেষে আবেগাপ্লুত নাজমুল বলেন. “ছোটবেলা থেকেই তিনি আমার অনুপ্রেরণা, আমার আদর্শ। বাবার রিকশার চাকায় ভর করে আমার পড়াশোনা চলেছে। এত দূর এসেও যখন অর্থের অভাবে পিছিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন তিনি আমার স্বপ্নের নতুন কাণ্ডারী হয়ে পাশে দাঁড়ালেন। এটি কেবল আর্থিক সহায়তা নয়, এটি আমার পুরো জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো এক মহৎ অনুপ্রেরণা।
” তিনি বলেন, বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনার চেষ্টা করি। পরে শেরপুরের ডা. মনজুর রশিদের সহযোগিতায় প্রধানমন্ত্রীর সহকারী চিকিৎসক ডা. এ.এন.এম. মনোয়ারুল কাদির বিটুর মাধ্যমে আমার আবেদনপত্র প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। তিনি বিষয়টি বিবেচনা করে আমাকে সহায়তার ব্যবস্থা করেন। নাজমুল আরও বলেন, বাবাকে সঙ্গে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ হয়।
তিনি অত্যন্ত আন্তরিকভাবে আমার কথা শুনেছেন এবং আমাকে দোয়া করেছেন। পাশাপাশি মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করে একজন দক্ষ বিশেষজ্ঞ হিসেবে গড়ে ওঠার এবং ভবিষ্যতে দেশের মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার পরামর্শ দিয়েছেন। এই কঠিন সময়ে তিনি যদি আমার পাশে না দাঁড়াতেন, তাহলে হয়তো সুইডেনে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন বাস্তবায়ন হতো না। তার এই সহায়তা আমার জন্য শুধু আর্থিক সহযোগিতা নয়, এটি নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা।
আমি এই সুযোগের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করে দেশ ও মানুষের জন্য কাজ করতে চাই। এই অভাবনীয় অর্জনের পেছনে যারা সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছিলেন তাদেরর মধ্যে ডা. এ.এন.এম. মনোয়ারুল কাদির বিটু, ডা. মনজুর রশিদ এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের নেতৃবৃন্দ উল্লেখযোগ্য। সবার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন নাজমুল। সকাল থেকে রাত গভীর অবধি রিকশার চাকার প্রতিটি ঘূর্ণন এতদিন কেবল পরিবারের আহার জুগিয়েছে, আর আজ সেই চাকার ধুলো মেখে ওঠা এক তরুণ উড়াল দিচ্ছেন বিশ্বজয়ের উদ্দেশ্যে।
নাজমুলের এই স্বপ্নযাত্রা কোনো একক ব্যক্তির গল্প নয়-এটি মেধা, অধ্যবসায় আর স্নেহের মেলবন্ধনে রচিত এক আশাজাগানিয়া সুর, যা বারবার মনে করিয়ে দেয় -ইচ্ছার তেজ থাকলে রাতের আঁধার ফুঁড়ে ভোরের আলো ফুটবেই।

















