সাতক্ষীরা-খুলনা মহাসড়ক ধরে তালা উপজেলার দিকে এগোলেই চোখ জুড়িয়ে যায় দিগন্তবিস্তৃত জলাশয় আর চারপাশের গাঢ় সবুজের সমারোহে। সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী মাছের ঘেরগুলোর চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে।
ঘেরের আইল বা পাড়গুলোকে আর কেবল সীমানা হিসেবে ফেলে রাখছেন না স্থানীয় চাষিরা; বরং সেই পতিত জমিতে গড়ে তুলেছেন ফলনশীল সবজির খেত। নিচে পানিতে খেলা করছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, আর ওপরে বাঁশের মাচায় ঝুলছে লাউ, চালকুমড়া, করলা ও বরবটি। আইলের সমতল অংশে সারিবদ্ধভাবে দেখা মিলছে ঢেঁড়স, পুঁইশাক ও কলাগাছের। স্থানীয়দের ভাষায় ‘সাথি ফসল’ নামের এই সমন্বিত চাষাবাদ পদ্ধতি এখন গোটা জেলাজুড়ে এক সম্ভাবনাময় কৃষিকাজে রূপ নিয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলার প্রায় ৮৭৫ হেক্টর ঘেরের পাড়ে নানাজাতের সবজির আবাদ হয়েছে। কৃষি বিভাগের ধারণা, হেক্টরপ্রতি গড় উৎপাদন ১৯ টন ধরে এ বছর ঘেরের পাড় থেকেই পাওয়া যাবে প্রায় ১৬ হাজার ৬২৫ মেট্রিক টন সবজি। তালা উপজেলার সরুলিয়া ইউনিয়নের ৩০ একর ঘেরের মালিক বড়বিলা গ্রামের রশিদ আমিন জানান, আগে শুধু মাছ চাষেই সীমাবদ্ধ ছিলেন তিনি।
তবে এবার ৮০ হাজার টাকা বাড়তি খরচ করে ঘেরের তিন পাশের পাড়ে সবজি আবাদ করেছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এই সবজি থেকেই তাঁর দেড় থেকে দুই লাখ টাকা বাড়তি আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। একই ইউনিয়নের এক একর জলাশয়ের মালিক বাদশা মোড়ল জলাশয়ের ওপর দ্বি-স্তরবিশিষ্ট মাচা তৈরি করে বাড়তি ৫০ হাজার টাকার বেশি মুনাফা পাওয়ার আশা করছেন। ছোট কিংবা বড়—সব ধরনের চাষির জন্যই ঘেরের আইলে অতিরিক্ত জমি ছাড়াই বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে ফলনে সফলতা এলেও বাজারজাতকরণ নিয়ে আক্ষেপ রয়েছে কৃষকদের। তালা উপজেলার পাটকেলঘাটার কৃষক হাসিবুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা খেত থেকে যে সবজি ৩০ থেকে ৩৫ টাকা কেজি দরে পাইকারদের কাছে দিতে বাধ্য হই, সাধারণ বাজারে সেটিই বিক্রি হয় ৭০ থেকে ৮০ টাকায়। সরাসরি বড় বাজারে পৌঁছানোর মাধ্যম না থাকায় বাধ্য হয়ে স্থানীয় মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছেই কম মূল্যে ফসল তুলে দিতে হচ্ছে।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, সাতক্ষীরার প্রায় প্রতিটি উপজেলাতেই এই সমন্বিত আবাদের ছোঁয়া লেগেছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৪০ হেক্টর জমিতে ঘেরের পাড়ে সবজি চাষ হয়েছে সদর উপজেলায়। এছাড়া তালায় ১৬৫ হেক্টর, কালীগঞ্জে ১৩৫ হেক্টর, আশাশুনিতে ৮০ হেক্টর, শ্যামনগরে ৮০ হেক্টর, কলারোয়ায় ৫৫ হেক্টর এবং দেবহাটায় ২০ হেক্টর জমিতে সবজি চাষ হয়েছে। পাশাপাশি কৃষকেরা বর্ষাকালীন সবজি তোলার সঙ্গে সঙ্গে আগাম শীতকালীন ফসলের প্রস্তুতিও নিতে শুরু করেছেন।
সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাইফুল ইসলাম জানান, জেলাজুড়ে উৎপাদিত লাউ, শিম, শসা ও বরবটি ইতোমধ্যে বাজারে আসছে এবং কৃষকেরাও এটি থেকে ভালো বাড়তি আয় করছেন। সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ জানান, জেলার মোট সবজি চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ এখন ঘেরের আইল থেকেই সরবরাহ করা হচ্ছে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বড় শহরে পণ্য পাঠানো সহজ হয়েছে, যা সবজি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়েছে।
পাশাপাশি বাজারে অসাধু সিন্ডিকেটের তৎপরতা রোধে তদারকি জোরদার করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। মাছ চাষের জন্য বিখ্যাত সাতক্ষীরায় একই জমিতে দ্বিমুখী এই উৎপাদন ব্যবস্থা এক নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার রূপ নিয়েছে। তবে কৃষকদের কঠোর পরিশ্রমের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে দ্রুত বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল।














