‘কায়দা রে কায়দা, ওরে কায়দা কায়দার কায়দা, বাক্সের ভেতর দুনিয়া আছে, দেইখ্যা যান মন ভইরা। ঘুরাই দিলাম কায়দার চাকা, দেখতে হলে লাগবে টাকা’—ডুগডুগির ছন্দ আর ডাকের সঙ্গে একটি হাতল ঘোরার মাধ্যমে এভাবেই ফুটে ওঠে ঐতিহ্যবাহী বায়োস্কোপের দৃশ্য।
লাল রঙের পুরোনো বাক্সের ছোট ছোট লেন্সে চোখ রাখে কৌতূহলী শিশুরা। বাক্সের ভেতর একের পর এক বদলে যায় ছবি। কয়েক মিনিটের জন্য যেন খুলে যায় অন্য এক দুনিয়ার দরজা। প্রযুক্তির ঝলমলে সময়ে এমন দৃশ্য এখন আর সহজে চোখে পড়ে না। কিন্তু বরিশালের আগৈলঝাড়ার বাগধা গ্রামের ৮১ বছরের সর্বানন্দ মধু এখনো আঁকড়ে ধরে আছেন হারিয়ে যেতে বসা সেই গ্রামীণ বিনোদন বায়োস্কোপ।
আর সেই বায়োস্কোপই তার জীবিকার অবলম্বন। দীর্ঘ পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মেলা, পার্বণ ও নানা অনুষ্ঠানে ঘুরে ঘুরে বায়োস্কোপ দেখাচ্ছেন তিনি। তার বায়োস্কোপের নাম কায়দার কায়দা বায়োস্কোপ। এই নামেই এখন অনেকের কাছে পরিচিত সর্বানন্দ। ১৮ টাকায় কেনা বাক্স, বদলে গেল জীবন সর্বানন্দ মধুর শৈশব কেটেছে অভাব-অনটনের মধ্যে।
পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। বাবা ছিলেন কাঠমিস্ত্রি। সংসারের টানাপোড়েনে প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা বেশি দূর এগোয়নি। বাবার কাছেই কাঠমিস্ত্রির কাজ শেখেন। কৈশোরেই হয়ে ওঠেন দক্ষ কাঠমিস্ত্রি। প্রায় ৫০ বছর আগে, তখন তার বয়স ৩০। কাজের সন্ধানে যশোরের বেনাপোল এলাকায় ছিলেন তিনি। সেখানেই এক ব্যক্তির কাছ থেকে মাত্র ১৮ টাকায় একটি বায়োস্কোপ কিনে নেন।
সেই বাক্সের নাম দেন কায়দার কায়দা। এরপর কাঠমিস্ত্রির কাজের পাশাপাশি শুরু হয় বায়োস্কোপ দেখানো। এক হাতে ডুগডুগি, অন্য হাতে বাক্সের হাতল—ছন্দময় কথায় মানুষকে ডাকতেন তিনি। তার ডাক শুনে ছুটে আসত শিশু-কিশোরেরা। সেই যে শুরু, এরপর আর থামেনি ‘কায়দার কায়দা’র পথচলা। বাক্সের ভেতরেই ছিল এক টুকরো পৃথিবী একসময় তার বায়োস্কোপে দেখা যেত বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা, মুক্তিযুদ্ধের নানা ছবি, বিশ্বের দর্শনীয় স্থান, পশুপাখিসহ বিভিন্ন চিত্র।
একই সঙ্গে পাঁচজন দর্শক বায়োস্কোপে চোখ রাখতে পারতেন। সর্বানন্দের ভাষায়, একসময় টাকা নয়—চাল, পয়সা কিংবা সামান্য কিছু দিলেই মানুষ বায়োস্কোপ দেখত। কখনো ৫ পয়সা, কখনো ১০ পয়সা, পরে ৫০ পয়সা ছিল দর্শকদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ। তখন গ্রামের হাট, মেলা কিংবা পাড়া-মহল্লায় বায়োস্কোপ ছিল মানুষের বিনোদনের অন্যতম আকর্ষণ। সন্ধ্যা নামলেই ডুগডুগির শব্দে জড়ো হতো শিশু-কিশোরদের দল।
বায়োস্কোপের আয়েই সংসার অভাবের দিনে নিজের পড়াশোনার বই পর্যন্ত বিক্রি করে চাল কিনে খেতে হয়েছে সর্বানন্দকে। সেই মানুষটিই পরে বায়োস্কোপ দেখিয়ে নিজের ভাই-বোন ও সন্তানদের পড়াশোনা করিয়েছেন। কিনেছেন জায়গা-জমিও। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় মেলা কিংবা অনুষ্ঠানে বায়োস্কোপ নিয়ে হাজির হন তিনি। বাড়ি বাড়িও যান। এখন জনপ্রতি ১০ টাকা করে নেন।
কেউ কেউ খুশি হয়ে দেন আরও বেশি। সব মিলিয়ে দিনে তার আয় হয় প্রায় এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা। বয়স ৮১ হলেও জীবিকার তাগিদে এখনো কাঁধে বায়োস্কোপের বাক্স নিয়ে পথে বের হন তিনি। প্রযুক্তির ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্য একসময় গ্রামবাংলার বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম ছিল বায়োস্কোপ। কিন্তু টেলিভিশন, সিনেমা, স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারে সেই জায়গা দখল করেছে আধুনিক প্রযুক্তি।
ফলে বায়োস্কোপ এখন বিলুপ্তপ্রায়। নতুন প্রজন্মের অনেকেই জানে না, একসময় একটি কাঠের বাক্সের ভেতর চোখ রেখে কীভাবে মানুষ দূরদেশ, পশুপাখি কিংবা নানা দৃশ্য দেখত। তবুও থামেননি সর্বানন্দ মধু। তার কাছে বায়োস্কোপ শুধু জীবিকার মাধ্যম নয় এটি গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা একটি স্মৃতি, একটি সংস্কৃতি। ‘কায়দার কায়দা’ যেন এক চলমান ইতিহাস লাল রঙের পুরোনো বাক্সটির সামনের দুই পাশে চোঙার মতো কয়েকটি মুখ।
প্রতিটি মুখে বসানো লেন্স। বাক্সের ভেতরে কাপড়ে লাগানো ছবি। দুই পাশে থাকা কাঠির সঙ্গে কাপড়টি পেঁচানো। বাইরে থাকা হাতল ঘোরালে এক পাশ থেকে অন্য পাশে এগিয়ে যায় ছবির ফিতা। সেই হাতল ঘোরানোর সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় ছবি, বদলে যায় দর্শকের চোখের সামনে থাকা দৃশ্য। আর পাশে দাঁড়িয়ে সর্বানন্দের কণ্ঠে শোনা যায় সেই পুরোনো ডাক কায়দা রে কায়দা, ওরে কায়দা আধুনিক প্রযুক্তির যুগে যখন বায়োস্কোপ প্রায় হারিয়েই গেছে, তখন ৮১ বছরের সর্বানন্দ মধু একাই যেন ধরে রেখেছেন গ্রামবাংলার সেই পুরোনো বিনোদনের শেষ সুতোটি।
তার কাঁধের বাক্সে শুধু কিছু ছবি নয়; আটকে আছে কয়েক দশকের স্মৃতি, গ্রামীণ জীবনের এক হারানো অধ্যায় এবং এক ঐতিহ্যের শেষ আলো। সর্বানন্দের ‘কায়দার কায়দা বায়োস্কোপ’ তাই শুধু জীবিকার গল্প নয় এটি হারিয়ে যেতে বসা বাংলার এক জীবন্ত ইতিহাস।














