4:30 pm, Thursday, 13 August 2026

শতবর্ষে ফিদেল কাস্ত্রো, কিউবার রাজনীতি ও সমাজে তার বিপ্লবী প্রভাব কতদূর

  • MIT ERP
  • Update Time : 04:23:50 pm, Thursday, 13 August 2026
  • 0

শতবর্ষে ফিদেল কাস্ত্রো, কিউবার রাজনীতি ও সমাজে তার বিপ্লবী প্রভাব কতদূর

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

আজ বৃহস্পতিবার শত বর্ষে পা রাখল ফিদেল কাস্ত্রো। কিন্তু মৃত্যুর এক দশক পরও কিউবার রাজনীতি, সমাজ ও মানুষের স্মৃতিতে তার উপস্থিতি যেন অমোচনীয়। কারো কাছে তিনি বিপ্লব, জাতীয় মর্যাদা ও দরিদ্র মানুষের অধিকার রক্ষার প্রতীক; আবার কারো কাছে তিনি এমন এক রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্থপতি, যার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবেই আজকের কিউবা গভীর সংকটে নিমজ্জিত।

কাস্ত্রোর শতবর্ষকে ঘিরে কিউবায় নানা আয়োজন হয়েছে। আন্তর্জাতিক বইমেলা, শিল্প প্রদর্শনী, সংগীতানুষ্ঠান এবং লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন বামপন্থি সংগঠনের প্রতিনিধিদের সমাবেশ— সবকিছুতেই ফিরে এসেছে তার নাম। হাসপাতাল ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে টানানো হয়েছে তার ছবি। রাস্তার পাশে দেখা যাচ্ছে তার বিখ্যাত স্লোগানসংবলিত বিলবোর্ড— ‘স্বদেশ অথবা মৃত্যু’।

কিউবানদের কাছে তার পরিচয় এতটাই গভীর যে অনেকেই তাকে শুধু ‘ফিদেল’ নামেই স্মরণ করেন। লেখক ও প্রাবন্ধিক মিগেল বারনেট, যিনি কিউবার জাতীয় পরিষদেরও সদস্য, মনে করেন ফিদেল কিউবার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার রেখে গেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, ফিদেল কিউবার জন্য মর্যাদা, নৈতিকতা, অক্লান্ত পরিশ্রম এবং দরিদ্র মানুষের প্রতি উদ্বেগের উত্তরাধিকার রেখে গেছেন।

’ তার মতে, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্যের মতো ক্ষেত্রে কাস্ত্রোর দর্শন বাস্তব নীতিতে রূপ পেয়েছিল। কাস্ত্রোর শতবর্ষ এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন কিউবা দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সংকটে বিপর্যস্ত। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, জ্বালানি সরবরাহের সংকট এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক দুর্বলতা দেশটির পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

এর প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনে। দীর্ঘ বিদ্যুৎ বিভ্রাট, জ্বালানি ও ওষুধের ঘাটতি, শিল্প ও পর্যটন খাতের স্থবিরতা, ফ্লাইট বাতিল, পরিবহন সংকট এবং কর্মঘণ্টা ও স্কুলের সময় কমে যাওয়ার মতো সমস্যায় জর্জরিত কিউবা। এই পরিস্থিতিতে কাস্ত্রোর সমর্থকদের একটি অংশ মনে করেন, তিনি আজ বেঁচে থাকলে সংকট মোকাবিলার কোনো না কোনো পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করতেন।

ওল্ড হাভানার ৬১ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত আরগেলিয়া মুস্তেলিয়ার বলেন, ‘ফিদেল আমাদের জন্য সবকিছু রেখে গেছেন— কিউবার বিপ্লবী প্রক্রিয়া থেকে আসা সব ভালো কিছু। আমরা যে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, তাতে তিনি তাঁর দেশ ও জনগণের জন্য কিছুটা সুখ বয়ে আনার কোনো না কোনো উপায় খুঁজে নিতেন। ’ তবে নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

২৭ বছর বয়সী ক্রিস্টিয়ান কোহেলোর কথায়, ‘আমাদের প্রজন্ম তাঁকে একজন সক্রিয় নেতা হিসেবে দেখেনি। আমরা দেখেছি অপেক্ষাকৃত কম দৃশ্যমান এক ফিদেলকে, যিনি জনসমক্ষে খুব কমই আসতেন। ’ বর্তমান সংকট নিয়ে তার হতাশা আরও তীব্র। কোহেলোর ভাষায়, ‘এখন তারা যদি আরেকজন ফিদেলকেও নিয়ে আসে, তবুও তারা এটি ঠিক করতে পারবে না। ’ ফিদেল কাস্ত্রো রুজের জন্ম ১৯২৬ সালের ১৩ আগস্ট পূর্ব কিউবার ওরিয়েন্তে অঞ্চলের একটি চিনি উৎপাদনকারী এলাকায়।

তার বাবা ছিলেন স্পেন থেকে আসা এক অভিবাসী। শুরুতে তিনি মার্কিন মালিকানাধীন চিনি কোম্পানির জন্য শ্রমিক নিয়োগের কাজ করলেও পরে নিজেই একটি সমৃদ্ধ খামার গড়ে তোলেন। কাস্ত্রোর রাজনৈতিক জীবনের শুরু ছাত্রাবস্থায়। হাভানা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়ার সময়ই তিনি ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ১৯৫০ সালে আইন, আন্তর্জাতিক আইন ও সমাজবিজ্ঞানে ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি আইন পেশায় যুক্ত হন।

কিন্তু আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথ তাঁর জন্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। কিউবার রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাকে দ্রুতই রাজনীতির সংঘাতময় পথে নিয়ে যায়। ১৯৫২ সালে ফুলজেনসিও বাতিস্তা সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করলে কাস্ত্রো নির্বাচনী রাজনীতির পথ থেকে সশস্ত্র আন্দোলনের দিকে ঝুঁকে পড়েন। ১৯৫৩ সালের ২৬ জুলাই তিনি শতাধিক সহযোগীকে নিয়ে সান্তিয়াগো দে কিউবার মনকাডা ব্যারাকে হামলা চালান।

অভিযান ব্যর্থ হয়। কাস্ত্রো গ্রেপ্তার হন এবং তাকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে প্রায় ১৯ মাস পর বাতিস্তা সরকার রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দিলে কাস্ত্রোও কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন। এরপর তিনি মেক্সিকোতে নির্বাসনে যান। সেখানেই গড়ে তোলেন তার বিপ্লবী দল ‘২৬ জুলাই আন্দোলন’। ১৯৫৬ সালের শেষ দিকে কাস্ত্রো ও তার সহযোগীরা ‘গ্রানমা’ নামের একটি নৌযানে করে কিউবায় ফিরে আসেন।

তাদের লক্ষ্য ছিল বাতিস্তা সরকারকে উৎখাত করা। অভিযান শুরুতে বিপর্যয়ের মুখে পড়লেও কাস্ত্রো, তার ভাই রাউল কাস্ত্রো এবং আর্নেস্তো ‘চে’ গেভারাসহ বিপ্লবীরা পাহাড়ি অঞ্চলে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করেন। ১৯৫৭ সাল নাগাদ কাস্ত্রোর নাম কিউবার সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও আলোচিত হতে শুরু করে। সেই সময়ের একটি প্রতিবেদনে টাইম ম্যাগাজিন তাকে এমন এক তরুণ বিপ্লবী হিসেবে তুলে ধরেছিল, যাকে ঘিরে কিউবায় একই সঙ্গে প্রশংসা ও ক্ষোভ তৈরি হচ্ছিল।

হাভানার দেয়ালে তার অনুসারীরা লিখত— ‘এই বছরই সেই বছর। ’ তবে কাস্ত্রোর বিপ্লবী উত্থানকে শুধু সামরিক অভিযান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। তার ব্যক্তিত্ব, দীর্ঘ বক্তৃতা, অসাধারণ কর্মশক্তি এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষমতা তাঁকে দ্রুতই এক কিংবদন্তিতুল্য নেতায় পরিণত করেছিল। ১৯৫৯ সালের শুরুতে বাতিস্তা দেশ ছেড়ে পালান।

কাস্ত্রো ও তার বিপ্লবীরা বিজয়ী হয়ে হাভানায় প্রবেশ করেন। বিপ্লবের আগে কাস্ত্রো প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বাতিস্তাকে সরিয়ে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করে পরে অবাধ নির্বাচন আয়োজন করা হবে। কিন্তু ক্ষমতা দখলের পর সেই রাজনৈতিক পরিকল্পনা দ্রুত বদলে যায়। কাস্ত্রো কৃষি সংস্কার, ব্যাপক সাক্ষরতা অভিযান এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন বহু প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের মতো আমূল পরিবর্তন আনেন।

কিউবার অর্থনীতি ও সমাজে এর গভীর প্রভাব পড়ে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁর সরকারের সম্পর্ক দ্রুত অবনতির দিকে যায়। কিউবা ধীরে ধীরে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত একদলীয় কমিউনিস্ট শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। লাতিন আমেরিকা ও উন্নয়নশীল বিশ্বের বহু মানুষের কাছে কাস্ত্রো হয়ে ওঠেন উপনিবেশবাদবিরোধী সংগ্রামের প্রতীক।

যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যের বিরুদ্ধে তার অবস্থান তাকে বিশ্বের বামপন্থীদের কাছে বিশেষ মর্যাদা এনে দেয়। কিন্তু একই সময়ে তার শাসনের বিরুদ্ধে বাড়তে থাকে সমালোচনা। বিপুলসংখ্যক কিউবান দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে চলে যান। রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়ন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা এবং কমিউনিস্ট পার্টির একচেটিয়া রাজনৈতিক আধিপত্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

কিউবার বিরোধী দল ‘কাউন্সিল ফর দ্য ডেমোক্রেটিক ট্রানজিশন’-এর সভাপতি ও ইতিহাসবিদ ম্যানুয়েল কুয়েস্তা মুরুয়া বলেন, ‘তিনি একজন বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব। ’ তার মতে, কোনো রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য স্বাধীনতা বিসর্জন দেওয়ার যুক্তি থাকতে পারে না। তিনি বলেন, ‘কিউবার বাকি জনগণকে— দেশের রাজনৈতিক বৈচিত্র্য ও বহুত্বকে— নিজেদের মতামত প্রকাশে বাধা দেওয়ারও কোনো যুক্তি ছিল না।

’ তার ভাষায়, এই রাজনীতি এমন এক বিভেদ তৈরি করেছে, যার পরিণতি কিউবানরা আজও ভোগ করছে। ১৯৫৯ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রায় পাঁচ দশক কিউবার ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলেন ফিদেল কাস্ত্রো। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি বিপ্লবের প্রধান মুখ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তার দীর্ঘ বক্তৃতা ছিল কিংবদন্তিতুল্য। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলার ক্ষমতা, বিপুল জনসভা এবং বিপ্লবী ভাষণ তাঁকে অন্য অনেক রাষ্ট্রনায়কের চেয়ে আলাদা করে তুলেছিল।

২০০৮ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব ছোট ভাই রাউল কাস্ত্রোর কাছে হস্তান্তর করেন। তবে ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার পরও তার রাজনৈতিক প্রভাব বজায় ছিল। ২০১৬ সালে ৯০ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়। কাস্ত্রোকে ঘিরে কিউবার সমাজে আজও গভীর বিভাজন রয়েছে। একদল তাকে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সামাজিক সমতার প্রবক্তা হিসেবে দেখে।

অন্যদল মনে করে, তার শাসন কিউবার রাজনৈতিক স্বাধীনতা সংকুচিত করেছে এবং এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট থেকে দেশ এখনও বেরিয়ে আসতে পারেনি। কাস্ত্রোর ব্যক্তিত্ব নিয়ে ১৯৫৯ সালের টাইম ম্যাগাজিনের মূল্যায়নও ছিল দ্বিমুখী। তাকে একই সঙ্গে উচ্চাভিলাষী, আবেগপ্রবণ, অসংগঠিত এবং অসাধারণ আকর্ষণীয় বক্তা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল।

তিনি দীর্ঘ সময় কথা বলতে পারতেন, ঘুম ও দৈনন্দিন নিয়মকানুনের তোয়াক্কা করতেন না এবং বিপুল কর্মশক্তি দিয়ে নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছিলেন। কাস্ত্রোর জীবন ও রাজনীতির এই বৈপরীত্যই সম্ভবত তার সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার— তিনি একই সঙ্গে বিপ্লবের নায়ক এবং কর্তৃত্ববাদের প্রতীক; জাতীয় মর্যাদার প্রতীক এবং রাজনৈতিক বিভেদের উৎস।

তার মৃত্যুর পরও কিউবার দেয়ালে তার ছবি, স্লোগান ও স্মৃতি রয়ে গেছে। প্রবীণ প্রজন্মের কাছে তিনি এখনো ‘ফিদেল’; তরুণদের একাংশের কাছে তিনি ইতিহাসের একটি অধ্যায়। কিন্তু একটি বিষয়ে যেন দ্বিমত নেই— কিউবার আধুনিক ইতিহাসকে ফিদেল কাস্ত্রো ছাড়া কল্পনা করা কঠিন। বিপ্লবের আগুন থেকে উঠে আসা সেই তরুণ আইনজীবী একসময় হয়ে উঠেছিলেন একটি রাষ্ট্রের সমার্থক নাম।

তার উত্থান যেমন কিউবার ইতিহাস বদলে দিয়েছিল, তেমনি তার রেখে যাওয়া রাজনৈতিক ব্যবস্থা আজও দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

বাবা হারানোর চার দিন পর মাঠে নেমে সতীর্থদের বিস্মিত করলেন মেসি

শতবর্ষে ফিদেল কাস্ত্রো, কিউবার রাজনীতি ও সমাজে তার বিপ্লবী প্রভাব কতদূর

Update Time : 04:23:50 pm, Thursday, 13 August 2026

আজ বৃহস্পতিবার শত বর্ষে পা রাখল ফিদেল কাস্ত্রো। কিন্তু মৃত্যুর এক দশক পরও কিউবার রাজনীতি, সমাজ ও মানুষের স্মৃতিতে তার উপস্থিতি যেন অমোচনীয়। কারো কাছে তিনি বিপ্লব, জাতীয় মর্যাদা ও দরিদ্র মানুষের অধিকার রক্ষার প্রতীক; আবার কারো কাছে তিনি এমন এক রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্থপতি, যার দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবেই আজকের কিউবা গভীর সংকটে নিমজ্জিত।

কাস্ত্রোর শতবর্ষকে ঘিরে কিউবায় নানা আয়োজন হয়েছে। আন্তর্জাতিক বইমেলা, শিল্প প্রদর্শনী, সংগীতানুষ্ঠান এবং লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন বামপন্থি সংগঠনের প্রতিনিধিদের সমাবেশ— সবকিছুতেই ফিরে এসেছে তার নাম। হাসপাতাল ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে টানানো হয়েছে তার ছবি। রাস্তার পাশে দেখা যাচ্ছে তার বিখ্যাত স্লোগানসংবলিত বিলবোর্ড— ‘স্বদেশ অথবা মৃত্যু’।

কিউবানদের কাছে তার পরিচয় এতটাই গভীর যে অনেকেই তাকে শুধু ‘ফিদেল’ নামেই স্মরণ করেন। লেখক ও প্রাবন্ধিক মিগেল বারনেট, যিনি কিউবার জাতীয় পরিষদেরও সদস্য, মনে করেন ফিদেল কিউবার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার রেখে গেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, ফিদেল কিউবার জন্য মর্যাদা, নৈতিকতা, অক্লান্ত পরিশ্রম এবং দরিদ্র মানুষের প্রতি উদ্বেগের উত্তরাধিকার রেখে গেছেন।

’ তার মতে, সংস্কৃতি, শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্যের মতো ক্ষেত্রে কাস্ত্রোর দর্শন বাস্তব নীতিতে রূপ পেয়েছিল। কাস্ত্রোর শতবর্ষ এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন কিউবা দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক ও জ্বালানি সংকটে বিপর্যস্ত। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, জ্বালানি সরবরাহের সংকট এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক দুর্বলতা দেশটির পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

এর প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবনে। দীর্ঘ বিদ্যুৎ বিভ্রাট, জ্বালানি ও ওষুধের ঘাটতি, শিল্প ও পর্যটন খাতের স্থবিরতা, ফ্লাইট বাতিল, পরিবহন সংকট এবং কর্মঘণ্টা ও স্কুলের সময় কমে যাওয়ার মতো সমস্যায় জর্জরিত কিউবা। এই পরিস্থিতিতে কাস্ত্রোর সমর্থকদের একটি অংশ মনে করেন, তিনি আজ বেঁচে থাকলে সংকট মোকাবিলার কোনো না কোনো পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করতেন।

ওল্ড হাভানার ৬১ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত আরগেলিয়া মুস্তেলিয়ার বলেন, ‘ফিদেল আমাদের জন্য সবকিছু রেখে গেছেন— কিউবার বিপ্লবী প্রক্রিয়া থেকে আসা সব ভালো কিছু। আমরা যে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, তাতে তিনি তাঁর দেশ ও জনগণের জন্য কিছুটা সুখ বয়ে আনার কোনো না কোনো উপায় খুঁজে নিতেন। ’ তবে নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন।

২৭ বছর বয়সী ক্রিস্টিয়ান কোহেলোর কথায়, ‘আমাদের প্রজন্ম তাঁকে একজন সক্রিয় নেতা হিসেবে দেখেনি। আমরা দেখেছি অপেক্ষাকৃত কম দৃশ্যমান এক ফিদেলকে, যিনি জনসমক্ষে খুব কমই আসতেন। ’ বর্তমান সংকট নিয়ে তার হতাশা আরও তীব্র। কোহেলোর ভাষায়, ‘এখন তারা যদি আরেকজন ফিদেলকেও নিয়ে আসে, তবুও তারা এটি ঠিক করতে পারবে না। ’ ফিদেল কাস্ত্রো রুজের জন্ম ১৯২৬ সালের ১৩ আগস্ট পূর্ব কিউবার ওরিয়েন্তে অঞ্চলের একটি চিনি উৎপাদনকারী এলাকায়।

তার বাবা ছিলেন স্পেন থেকে আসা এক অভিবাসী। শুরুতে তিনি মার্কিন মালিকানাধীন চিনি কোম্পানির জন্য শ্রমিক নিয়োগের কাজ করলেও পরে নিজেই একটি সমৃদ্ধ খামার গড়ে তোলেন। কাস্ত্রোর রাজনৈতিক জীবনের শুরু ছাত্রাবস্থায়। হাভানা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়ার সময়ই তিনি ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ১৯৫০ সালে আইন, আন্তর্জাতিক আইন ও সমাজবিজ্ঞানে ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি আইন পেশায় যুক্ত হন।

কিন্তু আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথ তাঁর জন্য দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। কিউবার রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাকে দ্রুতই রাজনীতির সংঘাতময় পথে নিয়ে যায়। ১৯৫২ সালে ফুলজেনসিও বাতিস্তা সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করলে কাস্ত্রো নির্বাচনী রাজনীতির পথ থেকে সশস্ত্র আন্দোলনের দিকে ঝুঁকে পড়েন। ১৯৫৩ সালের ২৬ জুলাই তিনি শতাধিক সহযোগীকে নিয়ে সান্তিয়াগো দে কিউবার মনকাডা ব্যারাকে হামলা চালান।

অভিযান ব্যর্থ হয়। কাস্ত্রো গ্রেপ্তার হন এবং তাকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে প্রায় ১৯ মাস পর বাতিস্তা সরকার রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দিলে কাস্ত্রোও কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন। এরপর তিনি মেক্সিকোতে নির্বাসনে যান। সেখানেই গড়ে তোলেন তার বিপ্লবী দল ‘২৬ জুলাই আন্দোলন’। ১৯৫৬ সালের শেষ দিকে কাস্ত্রো ও তার সহযোগীরা ‘গ্রানমা’ নামের একটি নৌযানে করে কিউবায় ফিরে আসেন।

তাদের লক্ষ্য ছিল বাতিস্তা সরকারকে উৎখাত করা। অভিযান শুরুতে বিপর্যয়ের মুখে পড়লেও কাস্ত্রো, তার ভাই রাউল কাস্ত্রো এবং আর্নেস্তো ‘চে’ গেভারাসহ বিপ্লবীরা পাহাড়ি অঞ্চলে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করেন। ১৯৫৭ সাল নাগাদ কাস্ত্রোর নাম কিউবার সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও আলোচিত হতে শুরু করে। সেই সময়ের একটি প্রতিবেদনে টাইম ম্যাগাজিন তাকে এমন এক তরুণ বিপ্লবী হিসেবে তুলে ধরেছিল, যাকে ঘিরে কিউবায় একই সঙ্গে প্রশংসা ও ক্ষোভ তৈরি হচ্ছিল।

হাভানার দেয়ালে তার অনুসারীরা লিখত— ‘এই বছরই সেই বছর। ’ তবে কাস্ত্রোর বিপ্লবী উত্থানকে শুধু সামরিক অভিযান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। তার ব্যক্তিত্ব, দীর্ঘ বক্তৃতা, অসাধারণ কর্মশক্তি এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষমতা তাঁকে দ্রুতই এক কিংবদন্তিতুল্য নেতায় পরিণত করেছিল। ১৯৫৯ সালের শুরুতে বাতিস্তা দেশ ছেড়ে পালান।

কাস্ত্রো ও তার বিপ্লবীরা বিজয়ী হয়ে হাভানায় প্রবেশ করেন। বিপ্লবের আগে কাস্ত্রো প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বাতিস্তাকে সরিয়ে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করে পরে অবাধ নির্বাচন আয়োজন করা হবে। কিন্তু ক্ষমতা দখলের পর সেই রাজনৈতিক পরিকল্পনা দ্রুত বদলে যায়। কাস্ত্রো কৃষি সংস্কার, ব্যাপক সাক্ষরতা অভিযান এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন বহু প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের মতো আমূল পরিবর্তন আনেন।

কিউবার অর্থনীতি ও সমাজে এর গভীর প্রভাব পড়ে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁর সরকারের সম্পর্ক দ্রুত অবনতির দিকে যায়। কিউবা ধীরে ধীরে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত একদলীয় কমিউনিস্ট শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। লাতিন আমেরিকা ও উন্নয়নশীল বিশ্বের বহু মানুষের কাছে কাস্ত্রো হয়ে ওঠেন উপনিবেশবাদবিরোধী সংগ্রামের প্রতীক।

যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যের বিরুদ্ধে তার অবস্থান তাকে বিশ্বের বামপন্থীদের কাছে বিশেষ মর্যাদা এনে দেয়। কিন্তু একই সময়ে তার শাসনের বিরুদ্ধে বাড়তে থাকে সমালোচনা। বিপুলসংখ্যক কিউবান দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে চলে যান। রাজনৈতিক বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়ন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা এবং কমিউনিস্ট পার্টির একচেটিয়া রাজনৈতিক আধিপত্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

কিউবার বিরোধী দল ‘কাউন্সিল ফর দ্য ডেমোক্রেটিক ট্রানজিশন’-এর সভাপতি ও ইতিহাসবিদ ম্যানুয়েল কুয়েস্তা মুরুয়া বলেন, ‘তিনি একজন বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব। ’ তার মতে, কোনো রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য স্বাধীনতা বিসর্জন দেওয়ার যুক্তি থাকতে পারে না। তিনি বলেন, ‘কিউবার বাকি জনগণকে— দেশের রাজনৈতিক বৈচিত্র্য ও বহুত্বকে— নিজেদের মতামত প্রকাশে বাধা দেওয়ারও কোনো যুক্তি ছিল না।

’ তার ভাষায়, এই রাজনীতি এমন এক বিভেদ তৈরি করেছে, যার পরিণতি কিউবানরা আজও ভোগ করছে। ১৯৫৯ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত প্রায় পাঁচ দশক কিউবার ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলেন ফিদেল কাস্ত্রো। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি বিপ্লবের প্রধান মুখ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তার দীর্ঘ বক্তৃতা ছিল কিংবদন্তিতুল্য। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলার ক্ষমতা, বিপুল জনসভা এবং বিপ্লবী ভাষণ তাঁকে অন্য অনেক রাষ্ট্রনায়কের চেয়ে আলাদা করে তুলেছিল।

২০০৮ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব ছোট ভাই রাউল কাস্ত্রোর কাছে হস্তান্তর করেন। তবে ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার পরও তার রাজনৈতিক প্রভাব বজায় ছিল। ২০১৬ সালে ৯০ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়। কাস্ত্রোকে ঘিরে কিউবার সমাজে আজও গভীর বিভাজন রয়েছে। একদল তাকে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সামাজিক সমতার প্রবক্তা হিসেবে দেখে।

অন্যদল মনে করে, তার শাসন কিউবার রাজনৈতিক স্বাধীনতা সংকুচিত করেছে এবং এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট থেকে দেশ এখনও বেরিয়ে আসতে পারেনি। কাস্ত্রোর ব্যক্তিত্ব নিয়ে ১৯৫৯ সালের টাইম ম্যাগাজিনের মূল্যায়নও ছিল দ্বিমুখী। তাকে একই সঙ্গে উচ্চাভিলাষী, আবেগপ্রবণ, অসংগঠিত এবং অসাধারণ আকর্ষণীয় বক্তা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল।

তিনি দীর্ঘ সময় কথা বলতে পারতেন, ঘুম ও দৈনন্দিন নিয়মকানুনের তোয়াক্কা করতেন না এবং বিপুল কর্মশক্তি দিয়ে নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছিলেন। কাস্ত্রোর জীবন ও রাজনীতির এই বৈপরীত্যই সম্ভবত তার সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার— তিনি একই সঙ্গে বিপ্লবের নায়ক এবং কর্তৃত্ববাদের প্রতীক; জাতীয় মর্যাদার প্রতীক এবং রাজনৈতিক বিভেদের উৎস।

তার মৃত্যুর পরও কিউবার দেয়ালে তার ছবি, স্লোগান ও স্মৃতি রয়ে গেছে। প্রবীণ প্রজন্মের কাছে তিনি এখনো ‘ফিদেল’; তরুণদের একাংশের কাছে তিনি ইতিহাসের একটি অধ্যায়। কিন্তু একটি বিষয়ে যেন দ্বিমত নেই— কিউবার আধুনিক ইতিহাসকে ফিদেল কাস্ত্রো ছাড়া কল্পনা করা কঠিন। বিপ্লবের আগুন থেকে উঠে আসা সেই তরুণ আইনজীবী একসময় হয়ে উঠেছিলেন একটি রাষ্ট্রের সমার্থক নাম।

তার উত্থান যেমন কিউবার ইতিহাস বদলে দিয়েছিল, তেমনি তার রেখে যাওয়া রাজনৈতিক ব্যবস্থা আজও দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে।