সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন এতিম শিশুদের কল্যাণে পরিচালিত শেখ জায়েদ বিন সুলতান আল-নাহিয়ান ট্রাস্ট (বাংলাদেশ)-এ স্বজনপ্রীতি, জাল সনদ, নিয়মবহির্ভূত নিয়োগ ও আর্থিক অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে।
ট্রাস্টের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোছা. উম্মে হাবিবাকে ঘিরে ওঠা এসব অভিযোগে প্রতিষ্ঠানজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা রুজু করা হয়েছে এবং তদন্ত কমিটি চাকরি থেকে অপসারণের সুপারিশ করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, উম্মে হাবিবা সাবেক সমাজকল্যাণ মন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদের স্ত্রীর বড় ভাইয়ের মেয়ে।
অভিযোগ রয়েছে, ট্রাস্টি বোর্ডের তৎকালীন সভাপতি হিসেবে নিজের প্রভাব খাটিয়ে নুরুজ্জামান আহমেদ কোনো উন্মুক্ত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই ২০২০ সালের ৩০ ডিসেম্বর ফাইল নোটের মাধ্যমে উম্মে হাবিবার নিয়োগপত্র ইস্যু করেন। পরে ২০২১ সালের ৪ জানুয়ারি তিনি প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে যোগদান করেন। ট্রাস্টের কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রবিধানমালা, ২০০৬ অনুযায়ী প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে নিয়োগের জন্য স্নাতকোত্তর ডিগ্রি বাধ্যতামূলক।
তবে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, যোগদানের সময় উম্মে হাবিবার শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল এইচএসসি। তিনি সে সময় অঙ্গীকারনামা দিয়ে দাবি করেন, নর্দান ইউনিভার্সিটি বন্ধ থাকায় এমবিএ সনদ জমা দিতে পারছেন না এবং পরে তা দাখিল করবেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হলেও তিনি কোনো স্নাতকোত্তর সনদ জমা দিতে পারেননি। এদিকে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা যাচাই করতে গিয়ে আরও গুরুতর তথ্য সামনে আসে।
ট্রাস্টে জমা দেওয়া তার স্নাতক (ডিগ্রি) সনদটি ২০১২ সালে ধানমন্ডিতে অবস্থিত দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অননুমোদিত আউটার ক্যাম্পাস থেকে ইস্যুকৃত বলে জানা গেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা এবং উচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী, ২০০৬ সালের পর দারুল ইহসানের অননুমোদিত ক্যাম্পাস থেকে দেওয়া সনদগুলো অবৈধ হিসেবে বিবেচিত। ইউজিসির তথ্য অনুযায়ীও সংশ্লিষ্ট ক্যাম্পাসটি অনুমোদিত ছিল না।
ফলে ট্রাস্টে জমা দেওয়া ওই সনদটির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ট্রাস্টের নথিপত্রে দেখা যায়, ২০২৩ সালের ৩০ মে অনুষ্ঠিত ১০৩তম ট্রাস্টি বোর্ড সভায় তার চাকরি স্থায়ীকরণের বিষয়টি উত্থাপিত হয়। তবে প্রয়োজনীয় স্নাতকোত্তর সনদ, পুলিশ ভেরিফিকেশন প্রতিবেদন এবং বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন (এসিআর) না থাকায় তার চাকরি স্থায়ী করা হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় তিনি দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন।
পরবর্তীতে এ অননুমোদিত অনুপস্থিতির ঘটনায় ট্রাস্টের তৎকালীন নির্বাহী পরিচালক মোছা. মাসুম বিল্লাহ তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করেন। একই সঙ্গে কর্মচারী কল্যাণ সমিতির আবেদনের ভিত্তিতে গঠিত তদন্ত কমিটি তার নিয়োগকে বিধিবহির্ভূত উল্লেখ করে চাকরি থেকে অপসারণের সুপারিশ করে। এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি অননুমোদিত অনুপস্থিতিকালীন সময়ের বেতন-ভাতা উত্তোলন করেছেন।
সরকারি গাড়ির অপব্যবহার এবং ট্রাস্টের হাউজিং কমপ্লেক্সের ফ্ল্যাট ভাড়া সংক্রান্ত নানা জটিলতা সৃষ্টি করে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতিও করেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ট্রাস্টের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী দাবি করেছেন, উম্মে হাবিবা নিয়মিত অফিসে উপস্থিত থাকতেন না এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব খাটিয়ে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতেন।
তার বিরুদ্ধে কর্মচারীদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগও রয়েছে। এদিকে এসব অনিয়ম, জাল সনদ ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ২০২৫ সালের ২৩ জুন দৈনিক সংগ্রামের লালমনিরহাট জেলা প্রতিনিধি মো. লাভলু শেখ জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক এইচ এম রকিব হায়দার ২৬ জুন ৪০ পৃষ্ঠার প্রমাণাদিসহ বিষয়টি তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে পাঠান।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের অনুদান ও বিভিন্ন স্থাবর সম্পদের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত ট্রাস্টটিতে দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অস্বচ্ছতা বিরাজ করছে। ট্রাস্টের বিধি অনুযায়ী প্রতি বছর অডিট হওয়ার কথা থাকলেও গত এক দশকে কোনো বার্ষিক অডিট সম্পন্ন হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে আয়-ব্যয়ের সঠিক হিসাব এবং সম্পদের প্রকৃত চিত্র নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
ট্রাস্ট সূত্রে জানা গেছে, উত্থাপিত অভিযোগ এবং তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে উম্মে হাবিবার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তবে অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে উম্মে হাবিবার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।















