নব্বইয়ের দশকের ঢাকাই চলচ্চিত্রের আকাশে ধূমকেতুর মতো উদয় হয়েছিলেন সালমান শাহ। মাত্র চার বছরের ক্যারিয়ারে তিনি হয়ে উঠেছিলেন কোটি কোটি তরুণ-তরুণীর স্বপ্নের নায়ক। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তার আকস্মিক মৃত্যু পুরো দেশকে স্তব্ধ করে দেয়।
সালমানের মৃত্যুর পর থেকেই তার ব্যক্তিগত জীবন, স্ত্রী সামিরা হক এবং বন্ধু তথা সহ-অভিনেতা খলনায়ক আশরাফুল হক ডনকে ঘিরে তৈরি হয় নানা রহস্য ও গুঞ্জন। যার মধ্যে অন্যতম ছিল সামিরা ও ডনের ‘পরকীয়া’ সম্পর্ক। এদিকে সালমান শাহর মৃত্যুর কয়েক বছর পর মুশতাক ওয়াইজ নামে এক ব্যবসায়ীকে বিয়ে করেন সামিরা। সালমান শাহর মৃত্যুর পর তার মা নীলা চৌধুরী এবং ভক্তদের একটি বড় অংশ দাবি করেন, এটি আত্মহত্যা নয়, বরং পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
সালমান শাহর পরিবারের পক্ষ থেকে সামিরা, ডনসহ ১১ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়। অভিযোগ ওঠে, সামিরার সঙ্গে ডনের বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। এই সম্পর্কের কথা সালমান জেনে যাওয়ার কারণেই তাকে মরতে হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে দাবি করা হয়, সালমানের অনুপস্থিতিতে ডন ও সামিরার অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা সহজভাবে নিতে পারেননি নব্বইয়ের দশকের এই হার্টথ্রুব নায়ক।
এই ত্রিমুখী সম্পর্কের টানাপড়েনই সালমানকে মানসিক অবসাদের দিকে ঠেলে দেয়। সালমান শাহ হত্যা মামলায় সম্প্রতি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ডন গ্রেপ্তার হওয়ার পর নতুন মোড় নিয়েছে ঘটনা। তাকে গ্রেপ্তারের পর টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হয়েছে সামিরা হক ও ডনের বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের পুরোনো গল্প। ডনকে গ্রেপ্তারের পর আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের বক্তব্য এবং মামলার নথিতে পুরোনো অনেক চাঞ্চল্যকর অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে।
শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী উল্লেখ করেন, মামলার অন্যতম আসামি রেজভি আহমেদ ওরফে ফরহাদ অতীতে স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন যে, সালমানের স্ত্রী সামিরার সঙ্গে অভিনেতা ডনের অবৈধ বা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক ছিল। শুধু তাই নয়, এই সম্পর্কের জের ধরেই সালমান শাহকে হত্যায় ডনসহ অন্য আসামিদের সঙ্গে ১২ লাখ টাকার চুক্তি করেছিলেন সামিরা হক ও চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই।
আদালতের এই বিবরণী প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও চলচ্চিত্রপাড়ায় সামিরা-ডনের সম্পর্কের খবরটি আবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সে সময়ের এক প্রযোজক এবং সালমান পরিবারের ঘনিষ্ঠজন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘সালমানের বাসায় ডনের যাতায়াত ছিল। একটা পর্যায়ে সামিরার সঙ্গে ডনের প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হয়।
এটা ছিল চলচ্চিত্রপাড়ায় ওপেন সিক্রেট। সে সময়ে আমরা অনেকেই এ বিষয়টি জেনেছি। প্রায়ই এ নিয়ে চর্চা হতো। যদিও এখন এর প্রমাণ কেউ দিতে পারবে না। তবে ডন যদি স্বীকার করে, সেটি আলাদা বিষয়। আমরাও চাই সালমানের মৃত্যুরহস্য উন্মোচিত হোক। অকালে সালমানকে হারিয়ে ইন্ডাস্ট্রির অনেক বড় ক্ষতি হয়ে গেছে। ’ সে সময়ের সিনে সাংবাদিকদের সঙ্গেও কথা বলে জানা যায়, ডন-সামিরার মধ্যে আলাদা একটি সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল, যা স্বাভাবিক ছিল না।
এদিকে ডন বিভিন্ন সময়ে সাক্ষাৎকারে সামিরাকে তার ‘ভাবির মতো’ এবং সালমানকে ‘ভাইয়ের মতো’ বলে অভিহিত করেন। তিনি দাবি করেন, একটি বিশেষ মহল তাদের ক্যারিয়ার ধ্বংস করতে এই গুঞ্জন ছড়িয়েছে। অন্যদিকে, ঘটনা ব্যাখ্যা করে বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে সামিরা বলেন, ‘আমার একটি ছবি দেখিয়ে মিথ্যা কথা ছড়ানো হচ্ছে। ওর (সালমান শাহ) ভক্তরা না জেনে আমাকে ভুল বুঝছেন, অপবাদ দিচ্ছেন।
তারা আসলে ইমনের (সালমান শাহর ডাকনাম) ভালোবাসার মানুষকেই ছোট করছেন। ডন আমার ছোটভাইয়ের মতো। সে প্রতি ঈদে আমার পা ছুঁয়ে সালাম করত। তার সঙ্গে জড়িয়ে যে নোংরা কথা ছড়ানো হচ্ছে, তা শুনে ভীষণ লজ্জা পাচ্ছি। ’ সামিরা সালমান শাহকে ‘স্বভাবগতভাবে আত্মঘাতী’ হিসেবেও বর্ণনা করেন। তিনি দাবি করেন, সালমান আগেও আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন।
মামলার এজাহার ও রাষ্ট্রপক্ষের দাবি অনুযায়ী, ডনের নিয়মিত যাতায়াত ছিল সালমানের ইস্কাটনের বাসায়। এই সুযোগে সামিরার সঙ্গে তার বিবাহবহির্ভূত গোপন সম্পর্ক গড়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, ঘটনার দিন সালমান শাহর পরিবার তার সঙ্গে দেখা করতে গেলে স্ত্রী সামিরা তাদের বাসায় ঢুকতে দেননি। পরে জানা যায়, মৃত্যুর আগে সালমানকে প্রথমে অচেতন করা হয়।
ঘটনাটি ধামাচাপা দিয়ে এটিকে আত্মহত্যা হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার জন্য তার মরদেহ সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। আদালতের নির্দেশে গত বছর ২১ অক্টোবর সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর বাদী হয়ে রমনা থানায় এই হত্যামামলা করেন। মামলায় সামিরা ও ডনসহ ১১ জনকে আসামি করা হয়। এর পর থেকেই ডন আত্মগোপনে ছিলেন। তার ওপর দেশত্যাগে আইনি নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল।
এর মধ্যে গত রোববার সকালের দিকে ওমরাহ করতে সৌদি আরবে যাওয়ার চেষ্টা করেন ডন। তবে বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন পুলিশের তৎপরতায় আটক হন তিনি। এরপর তাকে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরবর্তীকালে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এ ছাড়া তদন্ত সংস্থা সিআইডিকে আগামী ৩০ আগস্টের মধ্যে এই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন আদালত।
ডন গ্রেপ্তারের পর সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী বলেন, ‘স্বার্থ ছাড়া ডন কখনো সালমানের প্রকৃত বন্ধু হতে পারেনি, তাকে এই পাপের শাস্তি পেতেই হবে। ’ প্রসংগত, নীলা চৌধুরী দীর্ঘ তিন দশক ধরে দাবি করে আসছেন যে, তার ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং এর পেছনে সামিরা ও ডনের ভূমিকা ছিল স্পষ্ট। দেশের সাধারণ মানুষ ও সালমানের ভক্তরা এখনো জানতে চান, আসলে কী হয়েছিল ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর?
সালমান শাহ কি আত্মহত্যা করেছিলেন? নাকি তাকে মেরে ফেলা হয়েছিল? হত্যা করা হলে কে বা কারা ছিল এর পরিকল্পনাকারী? সামিরা-ডন কি অবৈধ সম্পর্কে ছিলেন? চাঞ্চল্যকর এই মামলার সমাপ্তিতেই মিলতে পারে সব প্রশ্নের উত্তর।


















