রাজধানীর ব্যস্ত সড়ক। একদিকে ছুটছে বাস, প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল। অন্যদিকে ফুটপাত ধরে ছুটছে মানুষ। মাঝখানে কিংবা সড়কের পাশে সারি সারি গাছ। রোদে ছায়া দেয়, বাতাসে স্বস্তি আনে। নগরের ধূসরতার মধ্যে সবুজের উপস্থিতি জানান দেয়।
অথচ সেই গাছের গোড়াতেই জমছে বিপদের গল্প। কোথাও শিকড় উঠে এসেছে ফুটপাতের পেভমেন্ট ভেঙে। কোথাও কাণ্ড হেলে পড়েছে সড়কের দিকে। কোনো গাছের শুকনো ডাল ঝুলছে পথচারীদের মাথার ওপর। আবার কোথাও সরু সড়কদ্বীপে বিশাল গাছ দাঁড়িয়ে আছে অল্প মাটির ওপর ভর করে। বৃষ্টি কিংবা সামান্য ঝোড়ো বাতাসেই উপড়ে পড়ছে গাছ। তৈরি হচ্ছে যানজট। কখনো দুর্ঘটনা, কখনো প্রাণহানি।
উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও নগর পরিকল্পনাবিদদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ভুল প্রজাতির গাছ রোপণ, শিকড়ের জন্য পর্যাপ্ত মাটি না থাকা, ফুটপাত ও সড়ক নির্মাণে শিকড় কেটে ফেলা, অপরিকল্পিত খোঁড়াখুঁড়ি, অপর্যাপ্ত ছাঁটাই এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করার মতো একাধিক কারণ মিলে তৈরি হচ্ছে এই ঝুঁকি। রাজধানীর সড়কদ্বীপে গাছ লাগানোর উদ্দেশ্য ছিল সৌন্দর্যবর্ধন, ছায়া সৃষ্টি এবং নগরের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা।
কিন্তু গাছ নির্বাচনে ভুলের কারণে অনেক ক্ষেত্রেই সেই উদ্দেশ্য প্রশ্নের মুখে পড়েছে। ২০২১ সালে বাংলাদেশ জার্নাল অব প্লান্ট ট্যাক্সনমিতে প্রকাশিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের একটি গবেষণায় ঢাকার সড়কদ্বীপে ৯০ প্রজাতির গাছের সন্ধান পাওয়া যায়। গবেষণায় দেখা যায়, এসব গাছের প্রায় ৫৬ শতাংশই বিদেশি প্রজাতির। গবেষকদের মতে, দ্রুত বেড়ে ওঠে বলে অনেক সময় বিদেশি গাছকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু শহরের চারপাশের কংক্রিট, পিচঢালা সড়ক ও সীমিত মাটির কারণে গাছের শিকড় স্বাভাবিকভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে না। তার ওপর বিভিন্ন উন্নয়নকাজে মাটির নিচে থাকা প্রধান শিকড় কেটে গেলে গাছের ভারসাম্য আরো নষ্ট হয়। ফলে বাইরে থেকে বড় ও শক্তিশালী দেখালেও গাছটি হয়ে উঠতে পারে ভঙ্গুর। রাজধানীতে বর্ষাকালে বিভিন্ন সড়কে গাছ উপড়ে পড়ে কিংবা ডাল ভেঙে দুর্ঘটনা ঘটে।
গত সোমবার রাতে ভারী বর্ষণের সময় ধানমণ্ডি ১২/এ সড়কের আবাহনী মাঠ এলাকায় চার রাস্তার মোড়ে ফুটপাতের ওপরে থাকা একটি বিশাল আকৃতির গাছ উপড়ে সড়কে পড়ে। এতে সড়কে থাকা তিনটি প্রাইভেট কার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তবে কেউ হতাহত হয়নি। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ধানমন্ডি অঞ্চলের সহকারী কমিশনার (ট্রাফিক) শুভ্র দেব বলেন, বৃষ্টির কারণে হঠাৎ গাছটি উপড়ে চলতি গাড়ির ওপর পড়ে।
এতে গাড়িগুলো দুমড়েমুচড়ে যায়। এর আগে গত ২৬ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি-সংলগ্ন সড়কে একটি রাধাচূড়াগাছ পড়ে যান চলাচলে সাময়িক বিঘ্ন ঘটে। ২০১৬ সালে ধানমন্ডির একটি সড়কের পাশে কৃষ্ণচূড়া গাছ ভেঙে পড়ে চিত্রশিল্পী ও নির্মাতা খালিদ মাহমুদ মিঠুর মৃত্যু রাজধানীর ঝুঁকিপূর্ণ গাছ ব্যবস্থাপনার ভয়াবহ দিকটি সামনে এনেছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিবার ঝড়ের পর গাছ সরিয়ে সড়ক সচল করাই সমাধান নয়।
গাছটি কেন পড়ল? তার শিকড় কি দুর্বল ছিল? গাছটি কি রোগাক্রান্ত ছিল? ভুল জায়গায় ভুল প্রজাতির গাছ লাগানো হয়েছিল কি না? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে ঝড়ের আগেই। তাহলেই দুর্ঘটনার ঝুঁকিমুক্ত থাকা যাবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, ফুটপাতে কিংবা সড়কদ্বীপে না বুঝে বিভিন্ন বিদেশি প্রজাতির গাছ লাগানো হয়।
এগুলো মূলত নরম কাঠের গাছ। পিচঢালা পথ আর কংক্রিটের কারণে এসব গাছের শিকড় মাটির গভীরে ছড়াতে পারে না। পাশাপাশি সেবা সংস্থাগুলোর খোঁড়াখুঁড়ির কারণে কোনো কোনো স্থানে প্রধান শিকড় কাটা পড়ায় গাছগুলো ভারসাম্য হারায়। ফলে বিভিন্ন সময়ে এসব গাছ উপড়ে পড়ে প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, একটি গাছের দৃশ্যমান অংশ যতটা গুরুত্বপূর্ণ, মাটির নিচের শিকড় তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
শিকড়ই গাছকে মাটির সঙ্গে আটকে রাখে, পানি ও পুষ্টি সংগ্রহ করে এবং ভারসাম্য ধরে রাখে। কিন্তু রাজধানীর বহু ফুটপাত ও সড়কদ্বীপে গাছের গোড়ার চারপাশে পর্যাপ্ত খোলা মাটি নেই। কোথাও পেভমেন্ট, কোথাও কংক্রিট, কোথাও ড্রেন কিংবা অন্য অবকাঠামো গাছের গোড়াকে ঘিরে ফেলেছে। এতে একদিকে গাছ দুর্বল হচ্ছে। অন্যদিকে শিকড় নিজেই ফুটপাতের পেভমেন্ট তুলে ফেলছে।
ফলে একই গাছ একসঙ্গে দুই ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। পথচারীর জন্য তৈরি করছে উঁচু-নিচু ফুটপাত, আর ঝড়ের সময় তৈরি করছে উপড়ে পড়ার আশঙ্কা। শুধু গাছ উপড়ে পড়াই বিপদের কারণ নয়। অনেক গাছের শুকনো, রোগাক্রান্ত কিংবা অতিরিক্ত ভারী ডাল দীর্ঘদিন ছাঁটাই না হওয়ায় পথচারী ও যানবাহনের ওপর ঝুলে থাকে। ঝোড়ো বাতাসে এসব ডাল ভেঙে পড়লে মুহূর্তেই ঘটতে পারে দুর্ঘটনা।
বিভিন্ন সড়কে গাছের ডালের ভেতর দিয়ে বৈদ্যুতিক ও যোগাযোগের তার চলে যেতে দেখা যায়। গাছের ডাল তারে ঘষা খেলে যেমন ক্ষতি হতে পারে, তেমনি ঝড়ে ডাল ভেঙে তার ছিঁড়ে গেলে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। অর্থাৎ একটি ঝুঁকিপূর্ণ গাছের সঙ্গে শুধু পরিবেশ নয়, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ও সড়ক ব্যবস্থাপনাও জড়িয়ে আছে। জানা গেছে, সড়কদ্বীপে গাছ লাগানোর আরেকটি উদ্দেশ্য ছিল বিপরীতমুখী যানবাহনের হেডলাইটের আলো নিয়ন্ত্রণ এবং সড়কের সৌন্দর্য বাড়ানো।
কিন্তু অতিরিক্ত বেড়ে ওঠা ডালপালা অনেক ক্ষেত্রে উল্টো চালকের দৃষ্টিসীমায় বাধা তৈরি করছে। ঘন ডালপালার কারণে রাতের বেলায় সড়কচিহ্ন, ট্রাফিক সিগন্যাল কিংবা মোড়ের দৃশ্যমানতা কমে যেতে পারে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল আরোহী ও পথচারীদের জন্য এটি বাড়তি ঝুঁকি। নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব বলেন, আমাদের দেশি প্রজাতির বিভিন্ন গাছ থাকা সত্ত্বেও বিদেশি প্রজাতির গাছের দিকে ঝোঁকা হচ্ছে।
সিটি করপোরেশনে বৃক্ষবিদের অভাব রয়েছে। এ জন্য একটি গাইডলাইন তৈরি করে তদারকি করতে হবে। এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পরিবেশ সার্কেলের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. মহিউদ্দিন খান ও উপসহকারী প্রকৌশলী মো. উজ্জ্বল আহমেদের ফোনে একাধিকবার কল করেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সমস্যাটি শুধু সড়কদ্বীপ কিংবা ফুটপাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
ঢাকার বিভিন্ন লেকপাড় ও উদ্যানেও বিদেশি গাছের আধিক্য রয়েছে। ২০২৩ সালে প্রকাশিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় ধানমন্ডি, হাতিরঝিল ও গুলশান লেকপাড়ের ২ হাজার ৩২২টি গাছ জরিপ করা হয়। এতে দেখা যায়, প্রায় ৩৯ শতাংশ গাছ বিদেশি প্রজাতির। অন্যদিকে ২০২৪ সালে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার সবুজ বলয়ে ১৫৬ প্রজাতির গাছের মধ্যে প্রায় ৫১ শতাংশ বিদেশি বলে উল্লেখ করা হয়।
গবেষকদের পর্যবেক্ষণ হলো, ঢাকার পরিবেশ ও মাটির সঙ্গে সামঞ্জস্য না থাকা প্রজাতি শুধু জীববৈচিত্র্যের জন্যই কম উপযোগী নয়, কিছু ক্ষেত্রে নগরের প্রতিকূল পরিবেশে দ্রুত দুর্বলও হয়ে পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, চওড়া সড়কদ্বীপে মাঝারি আকৃতির দেশীয় গাছ যেমন পলাশ, শিমুল, সোনালু, কদম, বকুল ও ছাতিম লাগানো যেতে পারে। সরু সড়কদ্বীপে অপেক্ষাকৃত ছোট গুল্মজাতীয় দেশীয় প্রজাতি বেছে নেওয়ার পরামর্শ রয়েছে।
রাজধানীর গাছের আরেকটি বড় সমস্যা হলো রোপণের পর দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার ঘাটতি। একটি গাছ লাগানোর সময় ছবি, প্রচার কিংবা প্রকল্পের সাফল্য দেখানো হয়। কিন্তু কয়েক বছর পর সেই গাছের স্বাস্থ্য কেমন, শিকড় কতটা শক্ত, কাণ্ডে রোগ হয়েছে কি না, শুকনো ডাল তৈরি হয়েছে কি না, এসব দেখার জন্য নিয়মিত ব্যবস্থা কতটা আছে, সেই বিষয়ে তদারকি হয় না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে পরিচালিত একটি গাছশুমারিতে ১৭ হাজার ১৬১টি গাছের মধ্যে প্রায় ২ হাজার ২১৩টি গাছকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
যদিও এটি সড়কদ্বীপের গাছের জরিপ নয়, তবু নগরীর গাছ ব্যবস্থাপনায় নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট করে। রাজধানীর সড়ক, ফুটপাত ও সড়কদ্বীপের গাছের ব্যবস্থাপনায় একাধিক সংস্থা জড়িত। কোথাও সিটি করপোরেশন, কোথাও সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, কোথাও অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ। ফলে কোনো গাছ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠলে তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ছাঁটাই কিংবা অপসারণের দায়িত্ব কার, তা নিয়ে অনেক সময় অস্পষ্টতা তৈরি হয়।
আর এই দায়িত্বের ফাঁকেই হয়তো বছরের পর বছর একটি গাছ হেলে থাকে, শুকনো ডাল ঝুলতে থাকে কিংবা শিকড় ফুটপাত ভেঙে পথচারীর চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে। দুর্ঘটনার পর গাছ সরানোর ব্যবস্থা থাকে, কিন্তু দুর্ঘটনার আগে গাছ শনাক্ত করার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, ফুটপাত, সড়কদ্বীপ, লেকপাড় ও উদ্যানের প্রতিটি গাছ নিয়ে সমন্বিত ‘ট্রি অডিট’ করা জরুরি।
প্রতিটি গাছের বয়স, প্রজাতি, উচ্চতা, কাণ্ডের শক্তি, শিকড়ের অবস্থা, রোগাক্রান্ততা এবং ঝুঁকির মাত্রা নথিভুক্ত করা যেতে পারে। ঝুঁকি অনুযায়ী গাছকে বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে। একই সঙ্গে বর্ষা ও ঝড়ের মৌসুমের আগে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রয়োজনীয় ছাঁটাই, শুকনো ডাল অপসারণ, শিকড় রক্ষায় পর্যাপ্ত মাটি রাখা এবং উন্নয়নকাজের সময় গাছের শিকড় সুরক্ষার বাধ্যবাধকতা দরকার।















