জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের এক ঐতিহাসিক মাইলফলক। এই আন্দোলনের মূল চেতনা ছিল বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাউবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান এসব কথা বলেছেন। তিনি বলেন, শহীদদের আত্মত্যাগের যথার্থ মর্যাদা দিতে হলে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা এবং দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক সহনশীলতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চার মাধ্যমে একটি শান্তিপূর্ণ, ন্যায়ভিত্তিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। সোমবার (৩ আগস্ট) সকালে গাজীপুরে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় সম্মেলন কেন্দ্রে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত “জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও নতুন বাংলাদেশের অঙ্গীকার” শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
উপাচার্য আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় শুধু জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র নয়; এটি নাগরিক চেতনা, নৈতিকতা, গবেষণা, উদ্ভাবন ও নেতৃত্ব বিকাশের অন্যতম ভিত্তি। তাই শিক্ষার্থীদের কেবল চাকরিপ্রার্থী হিসেবে নয়, বরং জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করে দায়িত্বশীল, আদর্শবান ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে হবে। তিনি তরুণদের কোনো প্রলোভন বা অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হয়ে সততা, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবিক মূল্যবোধকে ধারণ করে শিক্ষা, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং দেশ গঠনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।
বাউবির প্রো-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো. সিরাজুল ইসলামের সভাপতিত্বে এবং ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার আহমেদ হুসেইনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রো-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. আনিসুর রহমান এবং ট্রেজারার অধ্যাপক ড. শেখ রফিকুল ইসলাম। সভায় মুখ্য আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. লুৎফর রহমান।
তিনি বলেন, “জুলাই ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; বরং দীর্ঘ দেড় দশকের শোষণ-বঞ্চনা, স্বৈরাচারী শাসন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবক্ষয়, মানবাধিকার লঙ্ঘন, দুর্নীতি, দমন-পীড়ন এবং জনগণের ভোটাধিকার হরণের বিরুদ্ধে সঞ্চিত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। ” তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলন দ্রুত সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয় এবং জুলাইয়ের যোদ্ধাদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান দেশের ইতিহাসে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। অধ্যাপক লুৎফর রহমান বলেন, “ফ্যাসিবাদের পতনের মধ্যেই সংগ্রামের সমাপ্তি নয়; ক্ষুধা, দারিদ্র্য, দুর্নীতি ও অপশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সবাইকে জুলাইয়ের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
” আলোচনা সভায় সামাজিক বিজ্ঞান, মানবিক ও ভাষা স্কুলের ডিন অধ্যাপক তানভীর আহসান, কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন স্কুলের অধ্যাপক ড. মো. আবু তালেব, প্রকাশনা, মুদ্রণ ও বিতরণ বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ আলী এবং বাউবির আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ও জুলাই যোদ্ধা মোদাচ্ছির হোসেন বক্তব্য দেন। এর আগে সকালে জুলাই কর্মসূচির অংশ হিসেবে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খানের নেতৃত্বে ক্যাম্পাসের জুলাই জাগরণী স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
এ সময় প্রো-উপাচার্যদ্বয়, ট্রেজারার, ডিন, পরিচালক, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া শহীদদের স্মরণে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় কনফারেন্স হলসংলগ্ন নির্ধারিত স্থানে দিনব্যাপী জুলাই গণআন্দোলন-২০২৪-এর তাৎপর্য তুলে ধরে গ্রাফিতি, ফেস্টুন, প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। প্রদর্শনীতে প্রায় ১৫টি গ্রাফিতি এবং ৪০টি প্ল্যাকার্ড স্থান পায়।
উপাচার্য প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন, সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং দর্শনার্থী বইয়ে স্বাক্ষর করেন।




















