আজ সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
৫ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ০৮ রবিউস সানি ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
৩২°C
সর্বোচ্চ: ৩৬°C
সর্বনিম্ন: ২৭°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৪৫%

শর্টকাটের স্বপ্নে বড় দীর্ঘশ্বাস

  • MIT ERP
  • Update Time : 03:42:47 am, Monday, 3 August 2026
  • 68

শর্টকাটের স্বপ্নে বড় দীর্ঘশ্বাস

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

মানুষ স্বপ্ন দেখে। কেউ নিজের জন্য, কেউ পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। বাংলাদেশের হাজারো তরুণ প্রতি বছর বিদেশে পাড়ি জমান ভালো চাকরি, উন্নত আয় এবং একটি নিরাপদ ভবিষ্যতের আশায়। কিন্তু বৈধ পথে বিদেশে যেতে সময়, কাগজপত্র ও খরচের বিষয়টি অনেকের কাছে কঠিন মনে হয়। সেই সুযোগেই সক্রিয় হয়ে ওঠে মানবপাচারকারী দালালচক্র। তারা অল্প সময়েই ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য কিংবা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশে পৌঁছে দেওয়ার লোভনীয় প্রতিশ্রুতি দেয়। অনেকেই জমি বিক্রি করেন, ঋণ নেন কিংবা গহনা বন্ধক রাখেন। কিন্তু সেই স্বপ্নের যাত্রা শেষ হয় অনেক সময় বিদেশের কারাগারে, আটক শিবিরে কিংবা নিঃস্ব অবস্থায় দেশে ফিরে আসার মধ্য দিয়ে। অবৈধ অভিবাসনের পেছনের বাস্তবতা অবৈধ অভিবাসন কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; এর পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানসিক নানা কারণ। দেশে কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, বেকারত্ব, নি¤œ আয়, পরিবারের আর্থিক চাপ এবং দ্রুত অর্থ উপার্জনের আকাক্সক্ষা অনেককে ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঠেলে দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদেশে সফল হওয়া মানুষের গল্প, পরিচিতজনের অতিরঞ্জিত অভিজ্ঞতা কিংবা দালালদের বিভ্রান্তিকর প্রচারণাও এই প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়। অনেকেই বুঝতেই পারেন না যে তাদের হাতে দেওয়া ভিসা, চাকরির চুক্তি কিংবা ভ্রমণপথের বড় অংশই প্রতারণার ফাঁদ। সীমানা পেরোনোর আগেই শুরু হয় দুর্ভোগ অবৈধ পথে বিদেশযাত্রা কখনোই সহজ নয়। কোথাও দিনের পর দিন সীমান্তবর্তী জঙ্গলে লুকিয়ে থাকতে হয়, কোথাও মরুভূমি পাড়ি দিতে হয়, আবার কোথাও ছোট্ট রাবারের নৌকায় উত্তাল সমুদ্র অতিক্রম করতে হয়। পথে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট, অসুস্থতা, দালালদের নির্যাতন, মুক্তিপণের দাবি এবং মৃত্যুভয় হয়ে ওঠে নিত্যসঙ্গী। ভূমধ্যসাগর, আন্দামান সাগর কিংবা বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় প্রায়ই অভিবাসীবাহী নৌকাডুবি, নিখোঁজ বা মৃত্যুর খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে। তবু উন্নত জীবনের স্বপ্ন অনেককে একই ঝুঁকিপূর্ণ পথে হাঁটতে উদ্বুদ্ধ করে। বিদেশে পৌঁছেও মেলে না মুক্তি গন্তব্য দেশে পৌঁছানো মানেই নিরাপত্তা নয়। বৈধ কাগজপত্র না থাকলে অনেকেই দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হন। বিভিন্ন দেশে অবৈধ অভিবাসীদের জন্য নির্ধারিত ডিটেনশন সেন্টার বা আটক কেন্দ্রে মাসের পর মাস, কখনো বছরের পর বছর কাটাতে হয়। সেখানে চলাফেরার স্বাধীনতা থাকে না, কাজের সুযোগ থাকে না এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয় গভীর অনিশ্চয়তা। অনেকের পরিবার দীর্ঘদিন জানতে পারে না তাদের স্বজন কোথায় আছেন। দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ, পরিচয় যাচাই এবং দেশে ফেরার প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের অপেক্ষা করতে হয়। শূন্য হাতে দেশে ফেরা আটক হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষ পরিচয় নিশ্চিত করে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় জরুরি ভ্রমণ অনুমতিপত্র প্রস্তুত করে। এরপর বিশেষ বা নিয়মিত ফ্লাইটে দেশে ফেরানো হয়। কিন্তু দেশে ফিরে বাস্তবতা আরও কঠিন হয়ে ওঠে। বিদেশে যাওয়ার জন্য নেওয়া ঋণ তখনো পরিশোধ হয়নি, পরিবারের সঞ্চয় শেষ, নতুন কোনো কাজও নেই। অনেকেই আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীর প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। ব্যর্থতার বেদনা এবং ঋণের চাপ তাদের আবারও ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিতে পারে। অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি মানসিক বিপর্যয় অবৈধ অভিবাসনের ক্ষতি কেবল অর্থনৈতিক নয়; এর গভীর মানসিক প্রভাবও রয়েছে। দীর্ঘদিন আটক থাকা, নির্যাতনের শিকার হওয়া, অনিশ্চয়তায় দিন কাটানো কিংবা মৃত্যুভয় অনেককে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। দেশে ফিরে কেউ হতাশায় ভোগেন, কেউ সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। পরিবারের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারার অপরাধবোধ অনেকের আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে দেয়। ফলে পুনরায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা তাদের জন্য সহজ হয় না। রাষ্ট্রের জন্যও বড় উদ্বেগ অবৈধ অভিবাসন শুধু একজন ব্যক্তির ক্ষতি নয়; এটি রাষ্ট্রের জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। মানবপাচারকারী চক্রের বিস্তার, আন্তর্জাতিক পরিম-লে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হওয়া এবং বৈধ শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাবÑ সবই এর সঙ্গে জড়িত। অনেক ক্ষেত্রে গন্তব্য দেশগুলো অভিবাসন নীতিতে কঠোরতা আরোপ করে, যার প্রভাব বৈধভাবে বিদেশে যেতে ইচ্ছুক কর্মীদের ওপরও পড়ে। ফলে নিরাপদ শ্রম অভিবাসনের সুযোগও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। পুনর্বাসন : নতুন জীবনের ভিত্তি অবৈধভাবে বিদেশে গিয়ে ফিরে আসা ব্যক্তিদের জন্য শুধু বিমানবন্দরে গ্রহণ করাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি, পরিকল্পিত ও মানবিক পুনর্বাসন কর্মসূচি। দেশে ফেরার পর তাদের দক্ষতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং কর্মঅভিজ্ঞতা মূল্যায়ন করে উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তথ্যপ্রযুক্তি, ইলেকট্রিক্যাল, প্লাম্বিং, ওয়েল্ডিং, কৃষি, গার্মেন্টস, ড্রাইভিং কিংবা অন্যান্য চাহিদাসম্পন্ন খাতে প্রশিক্ষণ তাদের নতুন কর্মসংস্থানের পথ খুলে দিতে পারে। এর পাশাপাশি সহজ শর্তে ঋণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সহায়তা, ব্যবসা শুরুর মূলধন এবং আর্থিক পরামর্শসেবার সুযোগ তৈরি করা জরুরি। যারা বিদেশে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাদের জন্য কাউন্সেলিং, মনোসামাজিক সহায়তা এবং পরিবারভিত্তিক পুনর্বাসন কার্যক্রম প্রয়োজন। স্থানীয় প্রশাসন, ব্যাংক, বেসরকারি সংস্থা, প্রবাসীকল্যাণ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং দক্ষতা উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ এই পুনর্বাসনকে আরও কার্যকর করতে পারে। একই সঙ্গে দেশে ফিরে আসা ব্যক্তিদের বৈধ অভিবাসনবিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে তারা সরকার অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে বৈধ ভিসা ও কর্মচুক্তি নিয়ে বিদেশে যেতে পারেন। তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে সচেতনতামূলক প্রচারণায় ব্যবহার করলে সমাজের অন্যরাও ঝুঁকিপূর্ণ পথ সম্পর্কে সতর্ক হতে পারবেন। সচেতনতাই হতে পারে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজন সচেতনতা বৃদ্ধি। বিদেশে যাওয়ার আগে চাকরির সত্যতা, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের বৈধতা, ভিসার ধরন এবং কর্মচুক্তি ভালোভাবে যাচাই করা উচিত। সরকার অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশে গেলে প্রতারণার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। একই সঙ্গে মানবপাচারকারী দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা, সীমান্তে নজরদারি বৃদ্ধি এবং স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতামূলক প্রচারণা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। বৈধ পথই নিরাপদ ভবিষ্যৎ বিদেশে গিয়ে সফল হওয়ার অসংখ্য গল্প রয়েছে, কিন্তু সেই সাফল্যের বড় অংশই এসেছে বৈধ উপায়ে। বৈধ ভিসা, লিখিত কর্মচুক্তি এবং আইন মেনে বিদেশে গেলে নিজের অধিকার রক্ষা করা সম্ভব হয়। অন্যদিকে অবৈধ পথ শুরুতে সহজ মনে হলেও শেষ পর্যন্ত তা প্রায়ই নিয়ে আসে কারাবাস, আর্থিক ক্ষতি, মানসিক যন্ত্রণা এবং অপূর্ণ স্বপ্ন। স্বপ্ন দেখা মানুষের সহজাত অধিকার। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথ যদি প্রতারণা, অনিশ্চয়তা ও আইনভঙ্গের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তবে তার মূল্য অনেক সময় জীবন দিয়েও দিতে হয়। তাই বিদেশে যাওয়ার আগে প্রয়োজন সঠিক তথ্য, ধৈর্য, দক্ষতা অর্জন এবং বৈধ পথের প্রতি আস্থা। কারণ শর্টকাটের প্রলোভন ক্ষণিকের হলেও, নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে কেবল বৈধ ও সঠিক পথেই।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

সোনারগাঁয়ে বেহাল সড়কে সামান্য বৃষ্টিতেই জমে পানি, উলটে যায় গাড়ি

শর্টকাটের স্বপ্নে বড় দীর্ঘশ্বাস

Update Time : 03:42:47 am, Monday, 3 August 2026

মানুষ স্বপ্ন দেখে। কেউ নিজের জন্য, কেউ পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। বাংলাদেশের হাজারো তরুণ প্রতি বছর বিদেশে পাড়ি জমান ভালো চাকরি, উন্নত আয় এবং একটি নিরাপদ ভবিষ্যতের আশায়। কিন্তু বৈধ পথে বিদেশে যেতে সময়, কাগজপত্র ও খরচের বিষয়টি অনেকের কাছে কঠিন মনে হয়। সেই সুযোগেই সক্রিয় হয়ে ওঠে মানবপাচারকারী দালালচক্র। তারা অল্প সময়েই ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য কিংবা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশে পৌঁছে দেওয়ার লোভনীয় প্রতিশ্রুতি দেয়। অনেকেই জমি বিক্রি করেন, ঋণ নেন কিংবা গহনা বন্ধক রাখেন। কিন্তু সেই স্বপ্নের যাত্রা শেষ হয় অনেক সময় বিদেশের কারাগারে, আটক শিবিরে কিংবা নিঃস্ব অবস্থায় দেশে ফিরে আসার মধ্য দিয়ে। অবৈধ অভিবাসনের পেছনের বাস্তবতা অবৈধ অভিবাসন কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; এর পেছনে রয়েছে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানসিক নানা কারণ। দেশে কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, বেকারত্ব, নি¤œ আয়, পরিবারের আর্থিক চাপ এবং দ্রুত অর্থ উপার্জনের আকাক্সক্ষা অনেককে ঝুঁকিপূর্ণ পথে ঠেলে দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদেশে সফল হওয়া মানুষের গল্প, পরিচিতজনের অতিরঞ্জিত অভিজ্ঞতা কিংবা দালালদের বিভ্রান্তিকর প্রচারণাও এই প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়। অনেকেই বুঝতেই পারেন না যে তাদের হাতে দেওয়া ভিসা, চাকরির চুক্তি কিংবা ভ্রমণপথের বড় অংশই প্রতারণার ফাঁদ। সীমানা পেরোনোর আগেই শুরু হয় দুর্ভোগ অবৈধ পথে বিদেশযাত্রা কখনোই সহজ নয়। কোথাও দিনের পর দিন সীমান্তবর্তী জঙ্গলে লুকিয়ে থাকতে হয়, কোথাও মরুভূমি পাড়ি দিতে হয়, আবার কোথাও ছোট্ট রাবারের নৌকায় উত্তাল সমুদ্র অতিক্রম করতে হয়। পথে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট, অসুস্থতা, দালালদের নির্যাতন, মুক্তিপণের দাবি এবং মৃত্যুভয় হয়ে ওঠে নিত্যসঙ্গী। ভূমধ্যসাগর, আন্দামান সাগর কিংবা বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় প্রায়ই অভিবাসীবাহী নৌকাডুবি, নিখোঁজ বা মৃত্যুর খবর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে। তবু উন্নত জীবনের স্বপ্ন অনেককে একই ঝুঁকিপূর্ণ পথে হাঁটতে উদ্বুদ্ধ করে। বিদেশে পৌঁছেও মেলে না মুক্তি গন্তব্য দেশে পৌঁছানো মানেই নিরাপত্তা নয়। বৈধ কাগজপত্র না থাকলে অনেকেই দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হন। বিভিন্ন দেশে অবৈধ অভিবাসীদের জন্য নির্ধারিত ডিটেনশন সেন্টার বা আটক কেন্দ্রে মাসের পর মাস, কখনো বছরের পর বছর কাটাতে হয়। সেখানে চলাফেরার স্বাধীনতা থাকে না, কাজের সুযোগ থাকে না এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয় গভীর অনিশ্চয়তা। অনেকের পরিবার দীর্ঘদিন জানতে পারে না তাদের স্বজন কোথায় আছেন। দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ, পরিচয় যাচাই এবং দেশে ফেরার প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের অপেক্ষা করতে হয়। শূন্য হাতে দেশে ফেরা আটক হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষ পরিচয় নিশ্চিত করে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় জরুরি ভ্রমণ অনুমতিপত্র প্রস্তুত করে। এরপর বিশেষ বা নিয়মিত ফ্লাইটে দেশে ফেরানো হয়। কিন্তু দেশে ফিরে বাস্তবতা আরও কঠিন হয়ে ওঠে। বিদেশে যাওয়ার জন্য নেওয়া ঋণ তখনো পরিশোধ হয়নি, পরিবারের সঞ্চয় শেষ, নতুন কোনো কাজও নেই। অনেকেই আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীর প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। ব্যর্থতার বেদনা এবং ঋণের চাপ তাদের আবারও ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিতে পারে। অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি মানসিক বিপর্যয় অবৈধ অভিবাসনের ক্ষতি কেবল অর্থনৈতিক নয়; এর গভীর মানসিক প্রভাবও রয়েছে। দীর্ঘদিন আটক থাকা, নির্যাতনের শিকার হওয়া, অনিশ্চয়তায় দিন কাটানো কিংবা মৃত্যুভয় অনেককে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। দেশে ফিরে কেউ হতাশায় ভোগেন, কেউ সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। পরিবারের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারার অপরাধবোধ অনেকের আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে দেয়। ফলে পুনরায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা তাদের জন্য সহজ হয় না। রাষ্ট্রের জন্যও বড় উদ্বেগ অবৈধ অভিবাসন শুধু একজন ব্যক্তির ক্ষতি নয়; এটি রাষ্ট্রের জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। মানবপাচারকারী চক্রের বিস্তার, আন্তর্জাতিক পরিম-লে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হওয়া এবং বৈধ শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাবÑ সবই এর সঙ্গে জড়িত। অনেক ক্ষেত্রে গন্তব্য দেশগুলো অভিবাসন নীতিতে কঠোরতা আরোপ করে, যার প্রভাব বৈধভাবে বিদেশে যেতে ইচ্ছুক কর্মীদের ওপরও পড়ে। ফলে নিরাপদ শ্রম অভিবাসনের সুযোগও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। পুনর্বাসন : নতুন জীবনের ভিত্তি অবৈধভাবে বিদেশে গিয়ে ফিরে আসা ব্যক্তিদের জন্য শুধু বিমানবন্দরে গ্রহণ করাই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি, পরিকল্পিত ও মানবিক পুনর্বাসন কর্মসূচি। দেশে ফেরার পর তাদের দক্ষতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং কর্মঅভিজ্ঞতা মূল্যায়ন করে উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। তথ্যপ্রযুক্তি, ইলেকট্রিক্যাল, প্লাম্বিং, ওয়েল্ডিং, কৃষি, গার্মেন্টস, ড্রাইভিং কিংবা অন্যান্য চাহিদাসম্পন্ন খাতে প্রশিক্ষণ তাদের নতুন কর্মসংস্থানের পথ খুলে দিতে পারে। এর পাশাপাশি সহজ শর্তে ঋণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সহায়তা, ব্যবসা শুরুর মূলধন এবং আর্থিক পরামর্শসেবার সুযোগ তৈরি করা জরুরি। যারা বিদেশে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাদের জন্য কাউন্সেলিং, মনোসামাজিক সহায়তা এবং পরিবারভিত্তিক পুনর্বাসন কার্যক্রম প্রয়োজন। স্থানীয় প্রশাসন, ব্যাংক, বেসরকারি সংস্থা, প্রবাসীকল্যাণ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং দক্ষতা উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ এই পুনর্বাসনকে আরও কার্যকর করতে পারে। একই সঙ্গে দেশে ফিরে আসা ব্যক্তিদের বৈধ অভিবাসনবিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে তারা সরকার অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে বৈধ ভিসা ও কর্মচুক্তি নিয়ে বিদেশে যেতে পারেন। তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে সচেতনতামূলক প্রচারণায় ব্যবহার করলে সমাজের অন্যরাও ঝুঁকিপূর্ণ পথ সম্পর্কে সতর্ক হতে পারবেন। সচেতনতাই হতে পারে সবচেয়ে বড় প্রতিরোধ অবৈধ অভিবাসন ঠেকাতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজন সচেতনতা বৃদ্ধি। বিদেশে যাওয়ার আগে চাকরির সত্যতা, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের বৈধতা, ভিসার ধরন এবং কর্মচুক্তি ভালোভাবে যাচাই করা উচিত। সরকার অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশে গেলে প্রতারণার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। একই সঙ্গে মানবপাচারকারী দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা, সীমান্তে নজরদারি বৃদ্ধি এবং স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতামূলক প্রচারণা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। বৈধ পথই নিরাপদ ভবিষ্যৎ বিদেশে গিয়ে সফল হওয়ার অসংখ্য গল্প রয়েছে, কিন্তু সেই সাফল্যের বড় অংশই এসেছে বৈধ উপায়ে। বৈধ ভিসা, লিখিত কর্মচুক্তি এবং আইন মেনে বিদেশে গেলে নিজের অধিকার রক্ষা করা সম্ভব হয়। অন্যদিকে অবৈধ পথ শুরুতে সহজ মনে হলেও শেষ পর্যন্ত তা প্রায়ই নিয়ে আসে কারাবাস, আর্থিক ক্ষতি, মানসিক যন্ত্রণা এবং অপূর্ণ স্বপ্ন। স্বপ্ন দেখা মানুষের সহজাত অধিকার। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথ যদি প্রতারণা, অনিশ্চয়তা ও আইনভঙ্গের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তবে তার মূল্য অনেক সময় জীবন দিয়েও দিতে হয়। তাই বিদেশে যাওয়ার আগে প্রয়োজন সঠিক তথ্য, ধৈর্য, দক্ষতা অর্জন এবং বৈধ পথের প্রতি আস্থা। কারণ শর্টকাটের প্রলোভন ক্ষণিকের হলেও, নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে কেবল বৈধ ও সঠিক পথেই।