রাজশাহীর তানোরে ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যানরাই উন্নয়ন সহায়তা তহবিলের কোটেশন কাজের বড় ঠিকাদার বলে অভিযোগ উঠেছে। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, উন্নয়ন সহায়তা তহবিলের বরাদ্দের সিংহভাগ টাকা কোটেশনের নামে চেয়ারম্যান ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তছরুপ করছেন। তারা নানা কায়দা-কৌশলে এবং সচিবদের মাধ্যমে লাইসেন্স সংগ্রহ করে কাগজে-কলমে কোটেশন দেখিয়ে নিম্নমানের কাজ করে থাকেন। জানা গেছে, গত অর্থবছরে উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে উন্নয়ন সহায়তা তহবিলের বরাদ্দ দেওয়া হয় দুই কিস্তিতে। এসব বরাদ্দের কাজ কোটেশন বা টেন্ডারের মাধ্যমে করার কথা। কিন্তু চেয়ারম্যান ও তাদের ঘনিষ্ঠ সদস্যরাই এসব বরাদ্দের বিষয়ে জানতে পারেন। তাছাড়া চেয়ারম্যানরা কোনোভাবেই বরাদ্দের বিষয়গুলো অন্যদের বুঝতে দেন না। তারা নিজেদের পছন্দের কিছু লাইসেন্স সংগ্রহ করে কাগজে-কলমে কোটেশন দেখিয়ে ইচ্ছেমতো কাজ করে থাকেন। তিন লাখ টাকার কাজ এক লাখ থেকে দেড় লাখ টাকায় করে বরাদ্দের টাকা তছরুপ করা হয়। সূত্র জানায়, স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে উন্নয়ন সহায়তা তহবিলের বরাদ্দ দেওয়া হয়। বরাদ্দ দেওয়ার পর কাজ শুরুর আগে কাজের বিবরণ উল্লেখ করে সাইনবোর্ড টানানোর নিয়ম রয়েছে, যাতে জনসাধারণ কাজের বিষয়ে অবগত হতে পারে। আবার কাজের তদারকি করে স্থানীয় সরকার বিভাগ, এলজিইডি ও ডিডিএলজি। কিন্তু এসব শুধু কাগজে-কলমের নিয়মমাত্র। চেয়ারম্যানরা যা করেন, সেটাই সঠিক বলে ধরে নেওয়া হয়। এসব বরাদ্দ অর্থবছরের শুরুতে দেওয়া হয় না। শুকনো মৌসুম পার হওয়ার পর বর্ষা মৌসুমে বরাদ্দ দেওয়া হয়। যার কারণে কাজও হয় নিম্নমানের। এক প্রকল্প একাধিকবার দেখানোরও অভিযোগ রয়েছে। জানা গেছে, উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে দুই দফায় বরাদ্দ দেওয়া হয়। প্রথম কিস্তির বরাদ্দ পাওয়ার পর কাজ শেষ হলে বা কাজ চলাকালেই দ্বিতীয় কিস্তির বরাদ্দ দেওয়া হয়। গত অর্থবছরের বরাদ্দ ছাড় হয়েছে চলতি অর্থবছরে। বিভিন্ন ইউনিয়নে জুন মাস ও তার পরেও কাজ হয়েছে। উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের মধ্যে ছয়টিতে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত চেয়ারম্যান এবং একটিতে বিএনপি-সমর্থিত চেয়ারম্যান রয়েছেন। কলমা ইউনিয়ন পরিষদে জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি খাদেমুন নবী বাবু চৌধুরী, বাঁধাইড় ইউনিয়ন পরিষদে ইউপি আওয়ামী লীগের সভাপতি আতাউর রহমান। তিনি ২০১৬ সাল থেকে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাঁচন্দর ইউনিয়ন পরিষদে ইউপি আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল মতিন ২০১১ সাল থেকে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তালন্দ ইউনিয়ন পরিষদে নাজিমুদ্দিন বাবু, তিনি ইউপি আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি। তিনি ২০২১ সাল থেকে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কামারগাঁ ইউনিয়ন পরিষদে সুফি কামাল মিন্টু। তিনি ২০২৪ সালের আগে বিনা ভোটে চেয়ারম্যান হন। [155966] পরে কর্তৃপক্ষের যোগসাজশে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর শপথ নেন। সরনজাই ইউনিয়ন পরিষদে আলহাজ মোজাম্মেল হক খান। তিনি ২০২১ সালের নির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। চান্দুড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মিজানুর রহমান মেজর। সেও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নেতা। গত ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর তারা সবাই আত্মগোপনে ছিলেন এবং কয়েকজন মামলার আসামিও আছেন। বিশেষ করে পাঁচন্দর ও বাঁধাইড় ইউপির চেয়ারম্যান আতাউর রহমান এবং আব্দুল মতিন একচেটিয়া দাপট দেখিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, তারা ইচ্ছেমতো প্রকল্প লুট করেছেন। এমনকি বিভিন্ন কায়দায় তারা এখনো লুটপাটে ব্যস্ত। ইউপি সদস্যরা জানান, ইউনিয়ন পরিষদে উন্নয়ন সহায়তা তহবিলের বরাদ্দের বিষয়ে চেয়ারম্যান ও সচিব কাউকেই কিছু বুঝতে দেন না। তারা ইচ্ছেমতো প্রকল্প গ্রহণ করেন। দু-একজন সদস্য বিষয়টি জানতে পারলে তাদের কিছু সুবিধা দিয়ে মুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়। সাতটি ইউনিয়নের মধ্যে চারটি বড় ইউনিয়ন পরিষদ। এসব ইউনিয়নে বরাদ্দের পরিমাণও বেশি। সেগুলো হলো কলমা, কামারগাঁ, বাঁধাইড় ও পাঁচন্দর। আর তিনটি ছোট ইউনিয়ন পরিষদ হলো তালন্দ, সরনজাই ও চান্দুড়িয়া। তালন্দ ইউপির এক সদস্য জানান, এই ইউপির চেয়ারম্যান লুটপাট ছাড়া কিছুই বোঝেন না। প্রায় প্রতিদিন পরিষদে চেয়ারম্যান ও সদস্যদের মধ্যে এসব বিষয় নিয়ে হট্টগোল লেগেই থাকে। প্রকল্প নিয়ে তাকে বাজারে প্রকাশ্যে পেটানো হয়েছে। কিন্তু তার কোনো লজ্জা নেই। তিনি মহিলা সদস্যদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখেন। কারণ, মহিলা সদস্যরা কোনো প্রতিবাদ করেন না। তাদের নামমাত্র সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়। ইউপির কালনা আদিবাসী পাড়ায় জেঠা টুডুর বাড়ির সামনের পুকুরে উন্নয়ন সহায়তা তহবিলের বরাদ্দ থেকে তিন লাখ টাকার প্রটেকশন ওয়াল নির্মাণ করেন চেয়ারম্যান নাজিমুদ্দিন বাবু। প্রকল্পের নাম ‘জেঠার বাড়ি থেকে নরেশের বাড়ি পর্যন্ত প্রটেকশন ওয়াল নির্মাণ’। বরাদ্দ ৩ লাখ ৬১ হাজার টাকা। অর্থবছর ২০২৫-২৬। অর্থের উৎস উন্নয়ন সহায়তা তহবিল। দৈর্ঘ্য ৫০ মিটার, প্রস্থ ০.৬৫০০ মিটার। সার্বিক সহযোগিতায় চেয়ারম্যান নাজিমুদ্দিন বাবু। বাস্তবায়নে মেসার্স এ আর কনস্ট্রাকশন, বোয়ালিয়া, রাজশাহী। স্থানীয়রা জানান, এই প্রটেকশন ওয়াল নির্মাণে তিন নম্বর ইটের পরিমাণ বেশি ব্যবহার করা হয়েছে। একেবারে দায়সারা কাজ করা হয়েছে। চেয়ারম্যান নিজের মিস্ত্রি দিয়ে কাজ করিয়েছেন। ওয়াল নির্মাণে খুব বেশি হলে এক লাখ টাকা খরচ হবে। প্রতিটি ইউনিয়নেই এভাবেই কাজ হয়েছে। প্রকল্প ধরে সরেজমিনে তদন্ত করলেই ভয়াবহ অনিয়ম ধরা পড়বে। চেয়ারম্যান জানান, কাজ শেষ করার পর কাজের ছবি ডিডিএলজিসহ স্থানীয় সরকার বিভাগের দপ্তরে পাঠাতে হয়। ফাঁকি দেওয়ার কোনো উপায় নেই। কাজ যদি আপনি করে থাকেন, তাহলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নাম কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এভাবেই কাজ হয়ে থাকে। উপজেলা প্রকৌশলী নুর নাহারের কাছে এসব বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এসব আমাদের দেখার বিষয় নয়। বরাদ্দ হয় নির্বাহী দপ্তর থেকে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাঈমা খানের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবহিত নন। গুরুত্বসহকারে বিষয়টি দেখা হবে।
1:01 am, Thursday, 30 July 2026
শিরোনাম :
তানোরে কোটেশন কাজের বড় ঠিকাদার চেয়ারম্যানরাই
-
MIT ERP
- Update Time : 11:52:00 pm, Wednesday, 29 July 2026
- 1
Tag :













