ঘন কুয়াশার চাদরে ঢেকে যাচ্ছে উত্তরের জনপদ। ভোরের হিমেল বাতাসে অনুভূত হচ্ছে হালকা শীতের পরশ। প্রকৃতিতে ঋতুবদলের এমন আভাস মিলছে রংপুর অঞ্চলের জেলাগুলোতে। রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী ও গাইবান্ধার বিভিন্ন এলাকায় গত এক সপ্তাহ ধরে ভোরে বাড়ছে কুয়াশার উপস্থিতি।
যদিও দিনের বেলায় সূর্যের দেখা মিলছে এবং তাপমাত্রা এখনো তেমন কমেনি, তবু ভোরের প্রকৃতিতে স্পষ্ট হয়ে উঠছে শীতের আগমনী বার্তা। শীতের অনুভূতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তরের হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে শীতজনিত রোগীর সংখ্যা। শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষ সর্দি, কাশি ও জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছেন। চিকিৎসকেরা এ সময়ে সবাইকে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার আশিকুর রহমান বলেন, গত এক সপ্তাহে শীতজনিত রোগে এ হাসপাতালে ৩৮২ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। রংপুর রেলওয়ে স্টেশনে আশ্রয় নেওয়া মোখছেদ আলী শীতের এই পরিবর্তন টের পাচ্ছেন ভোরের বাতাসে। তিনি বলেন, ‘এখনো তেমন শীত দেখা দেয় নাই। সকালবেলা একটু একটু শীত লাগে। চারপাশে কুয়াশা পড়ে। দিন দিন শীত বাড়তে শুরু করছে।
’ একই স্টেশনে আশ্রয় নেওয়া আছিয়া খাতুন বলেন, ‘বাতাস উঠলে একটু শীত লাগে। তখন আমাদের খুব কষ্ট হয়। ভোরবেলা একটু কুয়াশা পড়লে শীত লাগে। সকাল ৭টার পর আকাশে সূর্য দেখা দেয়। তখন আর তেমন শীত থাকে না। যত দিন যাচ্ছে, ততই আমাদের শীতের ভয় বাড়ছে। আমাদের তো গরম কাপড়চোপড় নেই। ’ তাঁদের কথায়, এখনো শীতের তীব্রতা শুরু না হলেও আবহাওয়ার পরিবর্তন নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ছে।
বিশেষ করে পর্যাপ্ত গরম কাপড় না থাকায় প্রকৃত শীত নামলে দুর্ভোগে পড়ার আশঙ্কা করছেন তাঁরা। লালমনিরহাটের কালীগঞ্জের ট্রাকচালক রফিকুল ইসলাম জানান, ভোর থেকে সকাল সাড়ে ৬টা পর্যন্ত চারপাশ কুয়াশায় ঢেকে থাকে। এ সময় হেডলাইট জ্বালিয়ে গাড়ি চালাতে হয়। এতে সড়কে চলাচলের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হচ্ছে। তবে দিনের বেলায় এখনো তেমন ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছে না।
রংপুর অঞ্চলের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক নিবিড়। ফলে ঋতুবদলের এই সময়ে আবহাওয়ার পরিবর্তনের দিকে বাড়তি নজর রাখছেন কৃষকেরা। মাঠে কোথাও আমন ধান কাটার প্রস্তুতি চলছে, কোথাও ধান ঘরে তোলার ব্যস্ততা। পাশাপাশি শীতকালীন সবজি চাষেও ব্যস্ত সময় পার করছেন অনেকে। ভোরের কুয়াশা ও তাপমাত্রার ওঠানামা ফসলের ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়েও ভাবছেন তাঁরা।
কালীগঞ্জের কাকিনা এলাকার কৃষক কৃষব চন্দ্র রায় বলেন, গত এক সপ্তাহ ধরে ভোরে ঘন কুয়াশা থাকায় জমিতে কাজ করতে যেতে কিছুটা ভয় লাগে। তবে সকাল ৭টার পর সূর্যের দেখা মেলায় তেমন ঠান্ডা অনুভূত হয় না। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এ অঞ্চলে শীতের তীব্রতা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি। এদিকে শীতের আগাম প্রস্তুতি শুরু হয়েছে শহরের বাজারগুলোতেও।
রংপুর স্টেশন রোডের শীতবস্ত্র বিক্রেতা মোসলেম উদ্দিন জানান, শীতের পোশাক, চাদর ও কম্বল নিয়ে ব্যবসায়ীরা দোকান সাজাতে শুরু করেছেন। ক্রেতাদের মধ্যেও শীতবস্ত্র কেনার আগ্রহ তৈরি হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমিসহ সব কাপড় ব্যবসায়ী শীতের কাপড় নিয়ে দোকান খুলেছি। বিক্রি শুরু হয়েছে। তবে এখনো পুরোদমে বিক্রি হচ্ছে না। ’ আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কাও।
বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে তাপমাত্রার ওঠানামা এবং ঠান্ডাজনিত রোগের বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. তানভীর আহমেদ বলেন, আবহাওয়ার পরিবর্তনের কারণে হাসপাতালে প্রতিদিনই শিশু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। অনেক শিশু জ্বর ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। শিশুদের প্রতি বিশেষ যত্ন নেওয়ার পাশাপাশি আবহাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেন তিনি।
রংপুর আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মোস্তাফিজার রহমান জানান, ভোরের তাপমাত্রা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য এবং আবহাওয়ার পরিবর্তনশীলতার কারণে ভোরে কুয়াশা দেখা দিচ্ছে। মৌসুমি বায়ুর সক্রিয়তা ও নিষ্ক্রিয়তার পরিবর্তনের প্রভাবেও আবহাওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। দীর্ঘ সময় আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকার পর মেঘ সরে আকাশ পরিষ্কার হলে ভোরের দিকে কুয়াশা তৈরি হচ্ছে।
তিনি জানান, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে রংপুর অঞ্চলের কোথাও কোথাও হালকা শীতের অনুভূতি হতে পারে। বয়ে যেতে পারে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ। রংপুরের বিভাগীয় কমিশনার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এ বিভাগের প্রতিটি উপজেলায় পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। শীত পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই হতদরিদ্র, ছিন্নমূল ও অসহায় মানুষের মধ্যে শীতবস্ত্র বিতরণ করা হবে।






















