একসময় বাংলাদেশের প্রকৃতি থেকে হারিয়ে গিয়েছিল নীলগাই। উত্তরাঞ্চলের মাঠ, বন ও ঝোপঝাড়ে বিচরণ করা প্রাণীটি দীর্ঘদিন ছিল দেশের বন্য পরিবেশে অনুপস্থিত। সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে উদ্ধার হওয়া কয়েকটি নীলগাইকে আশ্রয় দেওয়া হয় গাজীপুর সাফারি পার্কে।
সেখানে শুরু হয় বংশবিস্তার। একের পর এক শাবকের জন্মে বাড়তে থাকে সংখ্যা। এবার সেই পরিবারে যুক্ত হয়েছে নতুন চার শাবক। সব মিলিয়ে গাজীপুর সাফারি পার্কে নীলগাইয়ের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩টিতে। সাফারি এলাকার হরিণ সাফারির বনের মধ্যে মা নীলগাইয়ের সঙ্গে চারটি শাবককে বিচরণ করতে দেখেন সংশ্লিষ্ট কর্মীরা। নতুন শাবকগুলোর নিরাপত্তা ও পরিচর্যায় বিশেষ নজরদারির ব্যবস্থা করেছে পার্ক কর্তৃপক্ষ।
শাবকগুলো এখন মায়ের সঙ্গে বনের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মানুষের উপস্থিতি টের পেলেই মা নীলগাই শাবকদের নিয়ে বনের গভীরে চলে যায়। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বিকেলে গণমাধ্যমকে নতুন চার শাবকের জন্মের তথ্য জানায় গাজীপুর সাফারি পার্ক কর্তৃপক্ষ। পার্কের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও সহকারী বন সংরক্ষক তারেক রহমান জানান, প্রায় দেড় মাস আগে কোর সাফারির হরিণ সাফারি এলাকায় মা নীলগাইয়ের সঙ্গে চারটি শাবককে দেখা যায়।
এরপর থেকেই তাদের বিশেষ নজরদারিতে রাখা হয়েছে। শাবকগুলোর দেখভালের জন্য সার্বক্ষণিক একজন কর্মীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে তাদের বয়স প্রায় দেড় মাস। তবে শাবকগুলো পুরুষ না মাদি, তা এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে তাদের কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে না। তিনি আরও জানান, দেশের বিভিন্ন সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে বিভিন্ন সময়ে উদ্ধার করা নীলগাই গাজীপুর সাফারি পার্কে আনা হয়েছিল।
পরে সেখানে প্রজননের মাধ্যমে কয়েকটি শাবকের জন্ম হয়। সর্বশেষ পার্কে ১১টি নীলগাই ছিল। এর মধ্যে দুটি কক্সবাজারের ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে পাঠানো হয়েছে। নতুন চার শাবক জন্ম নেওয়ায় বর্তমানে পার্কে নীলগাইয়ের সংখ্যা ১৩টি। নীলগাই অ্যান্টিলোপ গোত্রের সবচেয়ে বড় প্রাণী। একসময় বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় এদের অবাধ বিচরণ ছিল।
বিশেষ করে দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় অঞ্চলে নীলগাই দেখা যেত। কিন্তু বনভূমি ও প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া, নির্বিচারে শিকার এবং মানুষের কর্মকাণ্ডে পরিবেশের পরিবর্তনের কারণে ধীরে ধীরে প্রাণীটির সংখ্যা কমে যায়। একপর্যায়ে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে নীলগাই হারিয়ে যায়। ১৯৪০ সালের পর দেশের বন্য পরিবেশে এ প্রাণীর নিয়মিত উপস্থিতির নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।
দীর্ঘ বিরতির পর ২০১৮ সালে ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে নীলগাই আবার বাংলাদেশে প্রবেশ করতে শুরু করে। উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় প্রাণীটির দেখা মেলে। কোথাও স্থানীয় লোকজনের হাতে ধরা পড়ে, কোথাও জবাইয়ের প্রস্তুতির সময় উদ্ধার করা হয় নীলগাই। পরে বন বিভাগ ও প্রশাসনের সহযোগিতায় উদ্ধার হওয়া প্রাণীগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়া হয়।
সেগুলোর কয়েকটি স্থান পায় গাজীপুর সাফারি পার্কে। ২০১৯ সাল থেকে পার্কে নীলগাই সংরক্ষণ ও প্রজননের কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছায়। উদ্ধার হওয়া পুরুষ ও স্ত্রী নীলগাইকে উপযুক্ত পরিবেশে রাখার পর তাদের মধ্যে প্রজনন শুরু হয়। ২০২১ সালের ১ আগস্ট পার্কে প্রথমবারের মতো দুটি শাবকের জন্ম হয়। দীর্ঘদিন দেশের প্রকৃতি থেকে হারিয়ে থাকা প্রাণীটির বন্দী পরিবেশে সফল প্রজনন তখন বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আশার খবর হয়ে ওঠে।
পরবর্তী সময়েও পার্কে একাধিকবার নীলগাইয়ের শাবকের জন্ম হয়েছে। নীলগাইয়ের বংশবিস্তারের পাশাপাশি পার্কটির নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও অতীতে প্রশ্ন উঠেছে। ২০২১ সালে একটি নীলগাই পার্ক থেকে পালিয়ে যায়। প্রায় দুই মাস পর টাঙ্গাইলের মধুপুর এলাকা থেকে প্রাণীটিকে উদ্ধার করে আবার পার্কে ফিরিয়ে আনা হয়। এরপর ২০২৫ সালের ১৬ জানুয়ারি আরেকটি পুরুষ নীলগাই পার্কের সীমানাপ্রাচীর টপকে বাইরে চলে যায়।
পরে গাজীপুরের শ্রীপুর, ময়মনসিংহের ভালুকা এবং টাঙ্গাইলের সখীপুরের বিভিন্ন এলাকায় প্রাণীটির উপস্থিতি শনাক্ত হয়। বন বিভাগ ও পার্ক কর্তৃপক্ষ প্রাণীটিকে উদ্ধারের চেষ্টা চালায়। ওই সময় পার্কের পুরোনো সীমানাপ্রাচীরের দুর্বলতা নিয়েও উদ্বেগের কথা জানিয়েছিলেন তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে শুধু প্রাণীর সংখ্যা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন নিরাপদ আবাসস্থল, উপযুক্ত খাদ্য, চিকিৎসা ও প্রজনন ব্যবস্থাপনা।
বিশেষ করে নতুন জন্ম নেওয়া শাবকগুলোর জন্য বাড়তি পরিচর্যা এবং মায়ের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। বাংলাদেশের প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাওয়া নীলগাইয়ের বংশবিস্তার গাজীপুর সাফারি পার্কের জন্য ইতিবাচক ঘটনা। তবে এ সাফল্যকে দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে প্রতিটি প্রাণীর জন্ম, মৃত্যু, স্থানান্তর, স্বাস্থ্য ও প্রজননের সঠিক হিসাব সংরক্ষণ এবং পার্কের নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
একসময় দেশের প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যাওয়া নীলগাই এখন গাজীপুর সাফারি পার্কে নতুন প্রজন্মের জন্ম দিচ্ছে। চারটি নতুন শাবকের আগমন সেই সম্ভাবনাকে আরও উজ্জ্বল করেছে। এখন এই নতুন অতিথিদের নিরাপদে বেড়ে ওঠা এবং প্রাণীটির দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ নিশ্চিত করাই পার্ক কর্তৃপক্ষের সামনে বড় দায়িত্ব।





















