আজ শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
২৪ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ২৭ রবিউস সানি ১৪৪৮
ঢাকা
আংশিক মেঘলা
৩১°C
সর্বোচ্চ: ৩৩°C
সর্বনিম্ন: ২৪°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৮৯%

প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে গুপ্তচরবৃত্তি

  • MIT ERP
  • Update Time : 08:02:10 am, Saturday, 10 October 2026
  • 20
Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

গুপ্তচরবৃত্তির ইতিহাস যত পুরোনো, এর কৌশলও ততটাই পরিবর্তনশীল। একসময় শত্রুর রাজদরবারে গোপনে ঢুকে তথ্য সংগ্রহ করাই ছিল গুপ্তচরের কাজ। এখন সেই কাজের পরিধি ছড়িয়ে পড়েছে সামরিক ঘাঁটি, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, সম্পত্তি, যোগাযোগব্যবস্থা, উপাত্তভান্ডার থেকে শুরু করে ভার্চুয়াল জগৎ পর্যন্ত।

তবে উদ্দেশ্য সেই একইÑ অন্যের গোপন তথ্য সংগ্রহ এবং প্রয়োজনমতো তা ব্যবহার করা। ইতিহাসবিদদের মতে, রাষ্ট্রব্যবস্থার বিকাশের সঙ্গে গুপ্তচরবৃত্তিরও বিকাশ ঘটেছে। রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যেমন গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে, তেমনি প্রতিপক্ষের দুর্বলতা খুঁজে বের করতেও গুপ্তচর নিয়োগ করা হয়েছে।

গোপনে তথ্য সংগ্রহের এই পেশাকে তাই বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন পেশা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কেন গুপ্তচর হয় একজন মানুষ : গুপ্তচর হওয়ার পেছনে একক কোনো কারণ থাকে না। অর্থ, মতাদর্শ, চাপ বা ব্ল্যাকমেইলের পাশাপাশি প্রতিশোধ, দেশপ্রেম, রোমাঞ্চের আকাক্সক্ষা কিংবা নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণের বাসনাও কাউকে এই পথে ঠেলে দিতে পারে। গুপ্তচরদের উদ্দেশ্য বিশ্লেষণে একটি বহুল ব্যবহৃত ধারণায় চারটি কারণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়Ñ অর্থ, মতাদর্শ, চাপ এবং অহংকার।

কেউ অর্থের বিনিময়ে গোপন তথ্য বিক্রি করেন, কেউ নিজের রাজনৈতিক বা আদর্শিক বিশ্বাস থেকে প্রতিপক্ষকে সহযোগিতা করেন। আবার কেউ হুমকি, দুর্বলতা বা ব্যক্তিগত গোপন তথ্য ফাঁসের ভয়েও গুপ্তচরবৃত্তিতে জড়িয়ে পড়তে পারেন। অর্থের জন্য গুপ্তচরবৃত্তির ক্ষেত্রে আনুগত্য অনেক সময় দুর্বল থাকে। যে পক্ষ বেশি অর্থ দেয়, তার কাছেই তথ্য বিক্রির প্রবণতা দেখা যায়।

ইতিহাসে এমন ব্যক্তিরও নজির রয়েছে, যারা একই তথ্য একাধিক পক্ষের কাছে বিক্রি করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গুপ্ত নেটওয়ার্ক : বিশ শতকের ত্রিশের দশকে ব্রিটেনের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে গড়ে ওঠা সোভিয়েত গুপ্তচর নেটওয়ার্ক এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। সোভিয়েত গোয়েন্দারা সরাসরি সেনাবাহিনী বা গোয়েন্দা সংস্থার উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের নিয়োগের পরিবর্তে সম্ভাবনাময় বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষার্থীদের বেছে নিয়েছিল।

কারণ ভবিষ্যতে এসব শিক্ষার্থী রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে পৌঁছাতে পারেনÑ এই সম্ভাবনাকেই কাজে লাগাতে চেয়েছিল তারা। পরবর্তী সময়ে ওই নেটওয়ার্ক ব্রিটেনের রাষ্ট্রীয় ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সোভিয়েত ইউনিয়নের হাতে পৌঁছে দেয়। এতে মিত্র দুই দেশ ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেও গভীর অবিশ্বাস তৈরি হয়। ইউরোপে সম্পত্তি কিনে গুপ্ত ঘাঁটি?

বর্তমান সময়ে রাশিয়াকে ঘিরে ইউরোপে নতুন করে গুপ্তচরবৃত্তির উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের অভিযোগ, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনার কাছাকাছি সম্পত্তি কিনে সেগুলোকে সম্ভাব্য গুপ্ত তৎপরতার ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে। গ্রীষ্মকালীন বাড়ি, কেবিন, গুদাম, শহরের ফ্ল্যাট এমনকি দ্বীপও এ ধরনের কাজে ব্যবহারের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

নজরদারি, যোগাযোগ, নাশকতা কিংবা ভবিষ্যৎ সংকটে গোপন অভিযান চালানোর প্রস্তুতি হিসেবে এসব সম্পত্তি ব্যবহার করা হতে পারে বলে পশ্চিমা কর্মকর্তাদের ধারণা। ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের পর ইউরোপে অগ্নিসংযোগ, নাশকতা, পার্সেল বিস্ফোরণ ও গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন ঘটনার অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনাকে অনেক পশ্চিমা কর্মকর্তা সম্ভাব্য বৃহত্তর অভিযানের প্রস্তুতি বা সক্ষমতা যাচাইয়ের অংশ হিসেবে দেখছেন।

ফিনল্যান্ডের দ্বীপে রহস্য : ফিনল্যান্ডে একটি রুশ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি ক্রয় সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দেয়। প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ও যোগাযোগ অবকাঠামোর কাছে বহু সম্পত্তি কিনেছিল। এর মধ্যে একটি দ্বীপে জেটি, হেলিপ্যাড, নিরাপত্তা ক্যামেরা, চলাচল শনাক্তকারী যন্ত্র এবং উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা পাওয়া যায়। ফিনল্যান্ড পরে রুশ ও বেলারুশ নাগরিকদের সম্পত্তি কেনার ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে।

বাল্টিক অঞ্চলের কয়েকটি দেশও একই পথে হাঁটে। ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরুর পর ছোট ছোট সম্পত্তি ব্যাপকভাবে অধিগ্রহণ করে সেগুলোকে সম্ভাব্য নিরাপদ আশ্রয়, নজরদারি কেন্দ্র বা অস্ত্র মজুতের জায়গা হিসেবে ব্যবহারের আশঙ্কা আরও বেড়েছে। নরওয়ে ও সুইডেনেও সামরিক ঘাঁটি, নৌবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কাছে রুশ-সংশ্লিষ্ট সম্পত্তি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা বাণিজ্যিক স্থাপনার আড়ালেও গুপ্ত তৎপরতা চালানোর আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন নিরাপত্তা কর্মকর্তারা। শুধু রাশিয়া নয়, নজরে চীনও : ইউরোপীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা বলছেন, এ ধরনের কৌশল শুধু রাশিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। চীনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগব্যবস্থা, তন্তুভিত্তিক তথ্যপ্রবাহ, তথ্যকেন্দ্র ও যোগাযোগকেন্দ্রের কাছে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক নজরদারি ও নাশকতার আশঙ্কা বেশি, আর চীনের কৌশল তুলনামূলকভাবে দীর্ঘমেয়াদি তথ্য সংগ্রহকেন্দ্রিক। ইরানেও গুপ্তচরবৃত্তির পাল্টা লড়াই : গুপ্তচরবৃত্তির লড়াই শুধু ইউরোপেই সীমাবদ্ধ নয়। মধ্যপ্রাচ্যেও রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে গোপন তথ্য সংগ্রহ ও নেটওয়ার্ক ভাঙার প্রতিযোগিতা তীব্র। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে এমন পাল্টাপাল্টি তৎপরতা চলছে।

একইভাবে ভারতেও পাকিস্তান-সংশ্লিষ্ট সন্দেহভাজন গুপ্তচর নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর খবর সামনে এসেছে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে পরিচালিত অভিযানে নৌবাহিনীর সদস্যসহ কয়েকজনকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে বলে দেশটির সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তদন্তকারীদের সন্দেহ, গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনার ছবি ও তথ্য সংগ্রহ করে বিদেশে থাকা নিয়ন্ত্রকদের কাছে পাঠানো হতে পারে।

কয়েকটি ক্ষেত্রে যোগাযোগের জন্য গোপন বার্তাবিনিময় ব্যবস্থা ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। এর আগে ভারতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলো পাকিস্তান-সংশ্লিষ্ট গুপ্তচর নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত সন্দেহে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছিল। তাদের বিরুদ্ধে সামরিক ও আধাসামরিক স্থাপনার আশপাশে নজরদারি যন্ত্র বসানো এবং ছবি-ভিডিও বিদেশে পাঠানোর অভিযোগ ওঠে। বদলে যাচ্ছে গুপ্তচরবৃত্তির চেহারা : একসময় গুপ্তচরের প্রধান অস্ত্র ছিল ছদ্মবেশ, গোপন যোগাযোগ ও মানুষের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ।

এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈদ্যুতিন নজরদারি, চালকবিহীন উড়োজাহাজ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার অনুপ্রবেশ এবং উপাত্ত বিশ্লেষণ। তবে প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, মানুষের দুর্বলতাকে কাজে লাগানোর পুরোনো কৌশল এখনো কার্যকর। অর্থের লোভ, আদর্শিক বিশ্বাস, ব্যক্তিগত ক্ষোভ, প্রতিশোধ কিংবা চাপÑ এসব কারণেই মানুষ আজও গোপন তথ্য পাচারে জড়িয়ে পড়ছে।

তাই তিন হাজার বছরের পুরোনো এই পেশার মূল চরিত্র বদলায়নি। শুধু বদলে গেছে মঞ্চ। রাজপ্রাসাদের অন্ধকার কক্ষ থেকে গুপ্তচরবৃত্তি এখন পৌঁছে গেছে শহরের ফ্ল্যাট, সমুদ্রের দ্বীপ, সামরিক ঘাঁটি, যোগাযোগব্যবস্থা এবং অদৃশ্য তথ্যজগতের গভীরে। আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধ শুধু সীমান্তে নয়, তথ্যের আড়ালেও লড়া হচ্ছে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

ককরোচ পার্টির বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লিতে কড়া নিরাপত্তা, বন্ধ মেট্রো ও ইন্টারনেট

প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠেছে গুপ্তচরবৃত্তি

Update Time : 08:02:10 am, Saturday, 10 October 2026

গুপ্তচরবৃত্তির ইতিহাস যত পুরোনো, এর কৌশলও ততটাই পরিবর্তনশীল। একসময় শত্রুর রাজদরবারে গোপনে ঢুকে তথ্য সংগ্রহ করাই ছিল গুপ্তচরের কাজ। এখন সেই কাজের পরিধি ছড়িয়ে পড়েছে সামরিক ঘাঁটি, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো, সম্পত্তি, যোগাযোগব্যবস্থা, উপাত্তভান্ডার থেকে শুরু করে ভার্চুয়াল জগৎ পর্যন্ত।

তবে উদ্দেশ্য সেই একইÑ অন্যের গোপন তথ্য সংগ্রহ এবং প্রয়োজনমতো তা ব্যবহার করা। ইতিহাসবিদদের মতে, রাষ্ট্রব্যবস্থার বিকাশের সঙ্গে গুপ্তচরবৃত্তিরও বিকাশ ঘটেছে। রাষ্ট্রের রাজনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যেমন গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে, তেমনি প্রতিপক্ষের দুর্বলতা খুঁজে বের করতেও গুপ্তচর নিয়োগ করা হয়েছে।

গোপনে তথ্য সংগ্রহের এই পেশাকে তাই বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন পেশা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কেন গুপ্তচর হয় একজন মানুষ : গুপ্তচর হওয়ার পেছনে একক কোনো কারণ থাকে না। অর্থ, মতাদর্শ, চাপ বা ব্ল্যাকমেইলের পাশাপাশি প্রতিশোধ, দেশপ্রেম, রোমাঞ্চের আকাক্সক্ষা কিংবা নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণের বাসনাও কাউকে এই পথে ঠেলে দিতে পারে। গুপ্তচরদের উদ্দেশ্য বিশ্লেষণে একটি বহুল ব্যবহৃত ধারণায় চারটি কারণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়Ñ অর্থ, মতাদর্শ, চাপ এবং অহংকার।

কেউ অর্থের বিনিময়ে গোপন তথ্য বিক্রি করেন, কেউ নিজের রাজনৈতিক বা আদর্শিক বিশ্বাস থেকে প্রতিপক্ষকে সহযোগিতা করেন। আবার কেউ হুমকি, দুর্বলতা বা ব্যক্তিগত গোপন তথ্য ফাঁসের ভয়েও গুপ্তচরবৃত্তিতে জড়িয়ে পড়তে পারেন। অর্থের জন্য গুপ্তচরবৃত্তির ক্ষেত্রে আনুগত্য অনেক সময় দুর্বল থাকে। যে পক্ষ বেশি অর্থ দেয়, তার কাছেই তথ্য বিক্রির প্রবণতা দেখা যায়।

ইতিহাসে এমন ব্যক্তিরও নজির রয়েছে, যারা একই তথ্য একাধিক পক্ষের কাছে বিক্রি করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গুপ্ত নেটওয়ার্ক : বিশ শতকের ত্রিশের দশকে ব্রিটেনের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ঘিরে গড়ে ওঠা সোভিয়েত গুপ্তচর নেটওয়ার্ক এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। সোভিয়েত গোয়েন্দারা সরাসরি সেনাবাহিনী বা গোয়েন্দা সংস্থার উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের নিয়োগের পরিবর্তে সম্ভাবনাময় বিশ্ববিদ্যালয়শিক্ষার্থীদের বেছে নিয়েছিল।

কারণ ভবিষ্যতে এসব শিক্ষার্থী রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে পৌঁছাতে পারেনÑ এই সম্ভাবনাকেই কাজে লাগাতে চেয়েছিল তারা। পরবর্তী সময়ে ওই নেটওয়ার্ক ব্রিটেনের রাষ্ট্রীয় ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সোভিয়েত ইউনিয়নের হাতে পৌঁছে দেয়। এতে মিত্র দুই দেশ ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেও গভীর অবিশ্বাস তৈরি হয়। ইউরোপে সম্পত্তি কিনে গুপ্ত ঘাঁটি?

বর্তমান সময়ে রাশিয়াকে ঘিরে ইউরোপে নতুন করে গুপ্তচরবৃত্তির উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের অভিযোগ, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনার কাছাকাছি সম্পত্তি কিনে সেগুলোকে সম্ভাব্য গুপ্ত তৎপরতার ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে। গ্রীষ্মকালীন বাড়ি, কেবিন, গুদাম, শহরের ফ্ল্যাট এমনকি দ্বীপও এ ধরনের কাজে ব্যবহারের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

নজরদারি, যোগাযোগ, নাশকতা কিংবা ভবিষ্যৎ সংকটে গোপন অভিযান চালানোর প্রস্তুতি হিসেবে এসব সম্পত্তি ব্যবহার করা হতে পারে বলে পশ্চিমা কর্মকর্তাদের ধারণা। ইউক্রেনে রুশ আগ্রাসনের পর ইউরোপে অগ্নিসংযোগ, নাশকতা, পার্সেল বিস্ফোরণ ও গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন ঘটনার অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনাকে অনেক পশ্চিমা কর্মকর্তা সম্ভাব্য বৃহত্তর অভিযানের প্রস্তুতি বা সক্ষমতা যাচাইয়ের অংশ হিসেবে দেখছেন।

ফিনল্যান্ডের দ্বীপে রহস্য : ফিনল্যান্ডে একটি রুশ মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি ক্রয় সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দেয়। প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ও যোগাযোগ অবকাঠামোর কাছে বহু সম্পত্তি কিনেছিল। এর মধ্যে একটি দ্বীপে জেটি, হেলিপ্যাড, নিরাপত্তা ক্যামেরা, চলাচল শনাক্তকারী যন্ত্র এবং উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা পাওয়া যায়। ফিনল্যান্ড পরে রুশ ও বেলারুশ নাগরিকদের সম্পত্তি কেনার ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে।

বাল্টিক অঞ্চলের কয়েকটি দেশও একই পথে হাঁটে। ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরুর পর ছোট ছোট সম্পত্তি ব্যাপকভাবে অধিগ্রহণ করে সেগুলোকে সম্ভাব্য নিরাপদ আশ্রয়, নজরদারি কেন্দ্র বা অস্ত্র মজুতের জায়গা হিসেবে ব্যবহারের আশঙ্কা আরও বেড়েছে। নরওয়ে ও সুইডেনেও সামরিক ঘাঁটি, নৌবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার কাছে রুশ-সংশ্লিষ্ট সম্পত্তি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বা বাণিজ্যিক স্থাপনার আড়ালেও গুপ্ত তৎপরতা চালানোর আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন নিরাপত্তা কর্মকর্তারা। শুধু রাশিয়া নয়, নজরে চীনও : ইউরোপীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা বলছেন, এ ধরনের কৌশল শুধু রাশিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। চীনের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগব্যবস্থা, তন্তুভিত্তিক তথ্যপ্রবাহ, তথ্যকেন্দ্র ও যোগাযোগকেন্দ্রের কাছে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক নজরদারি ও নাশকতার আশঙ্কা বেশি, আর চীনের কৌশল তুলনামূলকভাবে দীর্ঘমেয়াদি তথ্য সংগ্রহকেন্দ্রিক। ইরানেও গুপ্তচরবৃত্তির পাল্টা লড়াই : গুপ্তচরবৃত্তির লড়াই শুধু ইউরোপেই সীমাবদ্ধ নয়। মধ্যপ্রাচ্যেও রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে গোপন তথ্য সংগ্রহ ও নেটওয়ার্ক ভাঙার প্রতিযোগিতা তীব্র। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে এমন পাল্টাপাল্টি তৎপরতা চলছে।

একইভাবে ভারতেও পাকিস্তান-সংশ্লিষ্ট সন্দেহভাজন গুপ্তচর নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর খবর সামনে এসেছে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে পরিচালিত অভিযানে নৌবাহিনীর সদস্যসহ কয়েকজনকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে বলে দেশটির সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তদন্তকারীদের সন্দেহ, গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনার ছবি ও তথ্য সংগ্রহ করে বিদেশে থাকা নিয়ন্ত্রকদের কাছে পাঠানো হতে পারে।

কয়েকটি ক্ষেত্রে যোগাযোগের জন্য গোপন বার্তাবিনিময় ব্যবস্থা ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। এর আগে ভারতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলো পাকিস্তান-সংশ্লিষ্ট গুপ্তচর নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত সন্দেহে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছিল। তাদের বিরুদ্ধে সামরিক ও আধাসামরিক স্থাপনার আশপাশে নজরদারি যন্ত্র বসানো এবং ছবি-ভিডিও বিদেশে পাঠানোর অভিযোগ ওঠে। বদলে যাচ্ছে গুপ্তচরবৃত্তির চেহারা : একসময় গুপ্তচরের প্রধান অস্ত্র ছিল ছদ্মবেশ, গোপন যোগাযোগ ও মানুষের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ।

এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈদ্যুতিন নজরদারি, চালকবিহীন উড়োজাহাজ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার অনুপ্রবেশ এবং উপাত্ত বিশ্লেষণ। তবে প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, মানুষের দুর্বলতাকে কাজে লাগানোর পুরোনো কৌশল এখনো কার্যকর। অর্থের লোভ, আদর্শিক বিশ্বাস, ব্যক্তিগত ক্ষোভ, প্রতিশোধ কিংবা চাপÑ এসব কারণেই মানুষ আজও গোপন তথ্য পাচারে জড়িয়ে পড়ছে।

তাই তিন হাজার বছরের পুরোনো এই পেশার মূল চরিত্র বদলায়নি। শুধু বদলে গেছে মঞ্চ। রাজপ্রাসাদের অন্ধকার কক্ষ থেকে গুপ্তচরবৃত্তি এখন পৌঁছে গেছে শহরের ফ্ল্যাট, সমুদ্রের দ্বীপ, সামরিক ঘাঁটি, যোগাযোগব্যবস্থা এবং অদৃশ্য তথ্যজগতের গভীরে। আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধ শুধু সীমান্তে নয়, তথ্যের আড়ালেও লড়া হচ্ছে।