আজ সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১২ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ১৫ রবিউস সানি ১৪৪৮
ঢাকা
পরিষ্কার আকাশ
৩৪°C
সর্বোচ্চ: ৩৬°C
সর্বনিম্ন: ২৮°C
বৃষ্টির সম্ভাবনা: ৮০%

লতা মঙ্গেশকর: সুরের ওপারেও যিনি অনন্যা

  • MIT ERP
  • Update Time : 08:48:03 am, Monday, 28 September 2026
  • 12

লতা মঙ্গেশকর: সুরের ওপারেও যিনি অনন্যা

Monzu-Info-Tech
Monzu-Info-Tech

সাতটি দশকেরও বেশি সময় ধরে একটি কণ্ঠ ধারণ করেছিল কোটি কোটি মানুষের প্রেম, বিরহ, আনন্দ আর যাতনার অব্যক্ত অনুভূতি। তিনি যখন গাইতেন, মনে হতো সুর যেন কোনো স্বর্গীয় উৎস থেকে নেমে আসছে মর্ত্য।

ে তিনি আর কেউ নন, সুরের নাইটিঙ্গেল, মেলোডি কুইন লতা মঙ্গেশকর। ২০২২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ৯২ বছর বয়সে নশ্বর পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে তিনি চলে গেছেন সুরের ওপারে, কিন্তু তার রেখে যাওয়া কণ্ঠের মায়াজাল আজীবন অক্ষয় হয়ে থাকবে সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে। ১৯২৯ সালের আজকের দিনে ভারতের ইন্দোরে এক সংগীত পরিবারে জন্ম নেন এই সুর সম্রাজ্ঞী। বাবা প-িত দীনানাথ মঙ্গেশকর ছিলেন নামকরা ধ্রুপদি সংগীতশিল্পী ও নাট্য অভিনেতা।

বাবার আদরের হেমা-ই পরবর্তীতে বাবার নাটকের চরিত্র অনুসারে নাম পান লতা। তবে জীবনের শুরুটা মোটেও মসৃণ ছিল না। ১৯৪২ সালে লতার বয়স যখন মাত্র ১৩ বছর, তখন তার বাবার অকালপ্রয়াণ ঘটে। বড় সন্তান হিসেবে পরিবারের হাল ধরতে বাধ্য হয়েই খুব অল্প বয়সে পা রাখেনÑ অভিনয়ের দুনিয়ায়। যদিও অভিনয় তিনি একেবারেই পছন্দ করতেন না। ১৯৪১ সালের ১৬ ডিসেম্বর প্রথমবার রেডিওতে গান গাওয়ার সুযোগ পান লতা।

ক্যারিয়ারের শুরুতে অনেকে তার কণ্ঠকে ‘অতিরিক্ত চিকন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। কিন্তু দমে যাওয়ার পাত্রী ছিলেন না তিনি। ওস্তাদ আমান আলী খান জেন্ডিওয়ালের মতো গুণীজনদের কাছে ধ্রুপদি সংগীতের তালিম নিয়ে নিজের কণ্ঠকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যান, যা পরবর্তীতে ভারতীয় চলচ্চিত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। লতা মঙ্গেশকর শুধু একজন প্রতিভাবান শিল্পীই ছিলেন না, সংগীতের প্রতি তার নিষ্ঠা ছিল প্রবাদপ্রতিম।

রেকর্ডিং স্টুডিওকে তিনি নিজের উপাসনালয় মনে করতেন, আর তাই প্রতিটি গান তিনি গাইতেন খালি পায়ে। একজন নিখুঁত শিল্পী হিসেবে তার সুখ্যাতি ছিল বিশ্বজোড়া। তবে মজার বিষয় হলো, লতা জি কখনো নিজের গাওয়া গান নিজে শুনতেন না! এক সাক্ষাৎকারে তিনি রসিকতা করে বলেছিলেন, নিজের গান শুনলে নাকি তিনি নিজেই সেখানে শয়ে শয়ে ভুল খুঁজে বের করবেন। ৩৬টিরও বেশি আঞ্চলিক ও বিদেশি ভাষায় প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজারেরও বেশি গান রেকর্ড করে তিনি অনন্য এক ইতিহাস গড়েছেন।

‘লগ যা গলে’, ‘অজিব দাস্তা হ্যায় ইয়ে’, কিংবা দেশাত্মবোধক ‘অ্যায় মেরে ওয়াতান কে লগোঁ’Ñতার একেকটি গান যুগে যুগে কোটি মানুষকে কাঁদিয়েছে, ভাসিয়েছে আবেগের জোয়ারে। বলিউডের পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যের যুগে লতা মঙ্গেশকর ছিলেন প্রথম নারী কণ্ঠশিল্পী, যিনি নিজের রয়্যালটি এবং পুরুষ শিল্পীদের সমান পারিশ্রমিকের দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলেন।

কোনো কিছুর কাছে আপস না করার দৃঢ় মানসিকতা তাকে করে তুলেছিল অনন্য। প্রখ্যাত গীতিকার জাভেদ আখতার তার কণ্ঠের প্রশংসা করতে গিয়ে বলেছিলেন, লতার কণ্ঠ যেন সবচেয়ে খাঁটি এবং স্বচ্ছ স্ফটিক মুক্তা। লন্ডনের মর্যাদাপূর্ণ রয়্যাল অ্যালবার্ট হলেÑ প্রথম ভারতীয় শিল্পী হিসেবে পারফর্ম করার গৌরব অর্জন করেছিলেন তিনি। বর্ণিল কর্মজীবনে ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ভারত রতœ (২০০১), দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারসহ ফ্রান্স সরকারের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা অফিসার অব দ্য লেজিওন অব অনার (২০০৭) লাভ করেন তিনি।

এমনকি তার স্মৃতিকে অম্লান করে রাখতে পুনেতে তার নামে এশিয়ার বৃহত্তম হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। লতা মঙ্গেশকর কোনো নির্দিষ্ট সীমানায় আবদ্ধ ছিলেন না। ভারত ছাড়িয়ে বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ সারাবিশ্বের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন এক আবেগের নাম। তিনি আজ সশরীরে আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু একাকী নিস্তব্ধ রাতে কিংবা উৎসবের কোলাহলে যখনই কোনো গ্রামোফোন, রেডিও বা স্মার্টফোনে বেজে ওঠে তার সেই চিরচেনা সুরÑ তখনই মনে হয়, লতা মঙ্গেশকর মরেও অমর।

তিনি বেঁচে আছেন মানুষের নিঃশ্বাসে, গানের প্রতিটি সুরে আর উপমহাদেশের সংগীতের স্পন্দনে।

Tag :

Write Your Comment

About Author Information

MIT ERP

Popular Post

টিকটকে পরিচয়, ইউপি সদস্যের সঙ্গে সন্তান ফেলে গৃহবধূর লাপাত্তা হওয়ার ঘটনায় আদালতের দ্বারস্থ স্বামী

লতা মঙ্গেশকর: সুরের ওপারেও যিনি অনন্যা

Update Time : 08:48:03 am, Monday, 28 September 2026

সাতটি দশকেরও বেশি সময় ধরে একটি কণ্ঠ ধারণ করেছিল কোটি কোটি মানুষের প্রেম, বিরহ, আনন্দ আর যাতনার অব্যক্ত অনুভূতি। তিনি যখন গাইতেন, মনে হতো সুর যেন কোনো স্বর্গীয় উৎস থেকে নেমে আসছে মর্ত্য।

ে তিনি আর কেউ নন, সুরের নাইটিঙ্গেল, মেলোডি কুইন লতা মঙ্গেশকর। ২০২২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ৯২ বছর বয়সে নশ্বর পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে তিনি চলে গেছেন সুরের ওপারে, কিন্তু তার রেখে যাওয়া কণ্ঠের মায়াজাল আজীবন অক্ষয় হয়ে থাকবে সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে। ১৯২৯ সালের আজকের দিনে ভারতের ইন্দোরে এক সংগীত পরিবারে জন্ম নেন এই সুর সম্রাজ্ঞী। বাবা প-িত দীনানাথ মঙ্গেশকর ছিলেন নামকরা ধ্রুপদি সংগীতশিল্পী ও নাট্য অভিনেতা।

বাবার আদরের হেমা-ই পরবর্তীতে বাবার নাটকের চরিত্র অনুসারে নাম পান লতা। তবে জীবনের শুরুটা মোটেও মসৃণ ছিল না। ১৯৪২ সালে লতার বয়স যখন মাত্র ১৩ বছর, তখন তার বাবার অকালপ্রয়াণ ঘটে। বড় সন্তান হিসেবে পরিবারের হাল ধরতে বাধ্য হয়েই খুব অল্প বয়সে পা রাখেনÑ অভিনয়ের দুনিয়ায়। যদিও অভিনয় তিনি একেবারেই পছন্দ করতেন না। ১৯৪১ সালের ১৬ ডিসেম্বর প্রথমবার রেডিওতে গান গাওয়ার সুযোগ পান লতা।

ক্যারিয়ারের শুরুতে অনেকে তার কণ্ঠকে ‘অতিরিক্ত চিকন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। কিন্তু দমে যাওয়ার পাত্রী ছিলেন না তিনি। ওস্তাদ আমান আলী খান জেন্ডিওয়ালের মতো গুণীজনদের কাছে ধ্রুপদি সংগীতের তালিম নিয়ে নিজের কণ্ঠকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যান, যা পরবর্তীতে ভারতীয় চলচ্চিত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। লতা মঙ্গেশকর শুধু একজন প্রতিভাবান শিল্পীই ছিলেন না, সংগীতের প্রতি তার নিষ্ঠা ছিল প্রবাদপ্রতিম।

রেকর্ডিং স্টুডিওকে তিনি নিজের উপাসনালয় মনে করতেন, আর তাই প্রতিটি গান তিনি গাইতেন খালি পায়ে। একজন নিখুঁত শিল্পী হিসেবে তার সুখ্যাতি ছিল বিশ্বজোড়া। তবে মজার বিষয় হলো, লতা জি কখনো নিজের গাওয়া গান নিজে শুনতেন না! এক সাক্ষাৎকারে তিনি রসিকতা করে বলেছিলেন, নিজের গান শুনলে নাকি তিনি নিজেই সেখানে শয়ে শয়ে ভুল খুঁজে বের করবেন। ৩৬টিরও বেশি আঞ্চলিক ও বিদেশি ভাষায় প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজারেরও বেশি গান রেকর্ড করে তিনি অনন্য এক ইতিহাস গড়েছেন।

‘লগ যা গলে’, ‘অজিব দাস্তা হ্যায় ইয়ে’, কিংবা দেশাত্মবোধক ‘অ্যায় মেরে ওয়াতান কে লগোঁ’Ñতার একেকটি গান যুগে যুগে কোটি মানুষকে কাঁদিয়েছে, ভাসিয়েছে আবেগের জোয়ারে। বলিউডের পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যের যুগে লতা মঙ্গেশকর ছিলেন প্রথম নারী কণ্ঠশিল্পী, যিনি নিজের রয়্যালটি এবং পুরুষ শিল্পীদের সমান পারিশ্রমিকের দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলেন।

কোনো কিছুর কাছে আপস না করার দৃঢ় মানসিকতা তাকে করে তুলেছিল অনন্য। প্রখ্যাত গীতিকার জাভেদ আখতার তার কণ্ঠের প্রশংসা করতে গিয়ে বলেছিলেন, লতার কণ্ঠ যেন সবচেয়ে খাঁটি এবং স্বচ্ছ স্ফটিক মুক্তা। লন্ডনের মর্যাদাপূর্ণ রয়্যাল অ্যালবার্ট হলেÑ প্রথম ভারতীয় শিল্পী হিসেবে পারফর্ম করার গৌরব অর্জন করেছিলেন তিনি। বর্ণিল কর্মজীবনে ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ভারত রতœ (২০০১), দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারসহ ফ্রান্স সরকারের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা অফিসার অব দ্য লেজিওন অব অনার (২০০৭) লাভ করেন তিনি।

এমনকি তার স্মৃতিকে অম্লান করে রাখতে পুনেতে তার নামে এশিয়ার বৃহত্তম হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। লতা মঙ্গেশকর কোনো নির্দিষ্ট সীমানায় আবদ্ধ ছিলেন না। ভারত ছাড়িয়ে বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ সারাবিশ্বের মানুষের কাছে তিনি ছিলেন এক আবেগের নাম। তিনি আজ সশরীরে আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু একাকী নিস্তব্ধ রাতে কিংবা উৎসবের কোলাহলে যখনই কোনো গ্রামোফোন, রেডিও বা স্মার্টফোনে বেজে ওঠে তার সেই চিরচেনা সুরÑ তখনই মনে হয়, লতা মঙ্গেশকর মরেও অমর।

তিনি বেঁচে আছেন মানুষের নিঃশ্বাসে, গানের প্রতিটি সুরে আর উপমহাদেশের সংগীতের স্পন্দনে।